Home শীর্ষ সংবাদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে চুল্লি স্থাপন হচ্ছে আজ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে চুল্লি স্থাপন হচ্ছে আজ

ছবি- সংগৃহীত।

পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লি উদ্বোধন হচ্ছে আজ রবিবার। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর বা কমিশনিং প্রক্রিয়ায় এই চুল্লি স্থাপন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরমাণু বিজ্ঞানীরা রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেলকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘হার্ট বা হৃৎপিণ্ড’ বলে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটোমের প্রধান নির্বাহী আলেক্সি লিখাচোখ ও এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রসিডেন্ট আলেকজান্ডার লকসিনের।

রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের আগে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে রূপপুর প্রকল্পের বাংলাদেশি ও রাশিয়ান কর্মকর্তারা। এককভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প এটি। ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচের এ প্রকল্পের নব্বই ভাগ টাকা ঋণ দিয়েছে রাশিয়া। ঋণ হিসেবে রাশিয়া দিচ্ছে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। বাকিটা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। একই সঙ্গে আন্তরাষ্ট্রীয় কয়েকটি চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রুশ ঠিকাদার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি এটি পরিচালনার জন্য জনবলও তৈরি করে দিচ্ছে রাশিয়া।

রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

এদিকে চুল্লি স্থাপনের আগে রুশ পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচেভ বলেন, বিজ্ঞান নিয়ে বছরের পর বছর রাশিয়া যে উৎকর্ষ অর্জন করেছে, সেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান রূপপুরে প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কিছু ব্যবস্থাপনা রূপপুর প্রকল্পকে করেছে সবচেয়ে নিরাপদ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেছেন, নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের মাধ্যমে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ। শিডিউল অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ করার প্রত্যাশা করেন তিনি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা শুধুই একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। এর সঙ্গে আবেগ রয়েছে। বাঙালি নিউক্লিয়ার জাতি হিসেবে বিশ্বে এর মাধ্যমে পরিচিতি পাবে।’ সময়মতো প্রল্পের কাজ শেষ হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘কাজ চলছে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থায় এর নকশা করা হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির (ক্লিন এনার্জি) মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে, যা থেকে দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া যাবে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত বিদ্যুৎ।’

নিরাপত্তা বিষয়ে জোর দিয়ে ইয়াফেস ওসমান বলেন, ‘সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ছাড় দিচ্ছি না আমরা। নিরাপত্তা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে হলেও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। যে কারণে নিরাপত্তাকেই আমরা সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছি।’

আরও পড়তে পারেন-

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রুশ নকশার আওতায় এই প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ভিভিআর-প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টরের দুটি ইউনিট তৈরি হবে। শিডিউল অনুসারে ২০২৩ সালে ইউনিট-১, ২০২৪ সালে ইউনিট-২ চালুর জন্য সময় নির্ধারিত রয়েছে।

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ান ফেডারেশনের রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটোম ঈশ^রদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের প্রাথমিক চুক্তিটি ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

এর আগে ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬২-৬৮ পর্যন্ত পাবনার ঈশ^রদীর পদ্মা নদী তীরবর্তী রূপপুরকে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান হিসেবে নির্বাচন এবং প্রকল্পের জন্য ২৬০ একর ও আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। অবশেষে উদ্যোগ গ্রহণের ৬০ বছর পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।

সময়মতো প্রকল্প শেষ করতে চলছে কর্মযজ্ঞ : প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, করোনার মধ্যে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চলেছে রূপপুরে। বন্ধ থাকেনি এক দিনের জন্যও। ওই সময়ে কিছুটা গতি কমলেও নতুন বাস্তবতায় লোকবল বাড়িয়ে এগিয়ে চলছে প্রকল্প। ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

তিনি আরও বলেন, ইউনিট-২-এর কাজও চলছে জোরেশোরে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিভিন্ন প্রস্তুতি পর্ব শেষে প্রথমত ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর সেসব অবকাঠামোর মধ্যে পারমাণবিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভৌতকাঠামো নির্মাণের পর খুব দ্রুতগতিতে চলে যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ। ভৌতকাঠামো নির্মাণ গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করা হচ্ছে রাশিয়ায়। ইতিমধ্যে প্রথম ইউনিট ও দ্বিতীয় ইউনিটের বেশিরভাগ যন্ত্রই প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছেছে।

রিঅ্যাক্টর ভবনে যা বসবে : রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেখানে মূল জ্বালানি থাকে। রোসাটম জানায়, পারমাণবিক চুল্লির পাত্রটির ওজন ৩৩৩ দশমিক ৬ টন। এই চুল্লি কৃষ্ণসাগর এবং সুয়েজ ক্যানেল হয়ে প্রথমে মোংলা বন্দরে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে নৌপথে পাবনার রূপপুরে নেওয়া হয়।

সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ‘ভিভিইআর-১২০০’ রিঅ্যাক্টর স্থাপিত হবে রূপপুরে। রিঅ্যাক্টরগুলোর কার্যকাল ৬০ বছর, যা প্রয়োজনে আরও ২০ বছর চালানো যাবে। ভিভিইআর টাইপ রিঅ্যাক্টরে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকবে। মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যেমন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা ইত্যাদি মোকাবিলায় সক্ষম এই রিঅ্যাক্টর।

প্রকল্প এলাকায় গোলাকৃতি যে দুটি ভবন দেখা যায়, সেগুলোই রিঅ্যাক্টর ভবন। এদের মধ্যে আজ একটিতে বসানো হবে রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা পরমাণু চুল্লিপাত্র। এটিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘হার্ট বা হৃৎপিণ্ড’ বলা যেতে পারে। এই ভবনের বিভিন্ন ধাপে বসানো হয়েছে নিউক্লিয়ার যন্ত্রপাতি। পাঁচ ধরনের যন্ত্রের মধ্যে প্রেসারাইজার, কুল্যান্ট পাম্প এবং হাইড্রো এক্যুমুলেটর বসানো সম্পন্ন হয়েছে এরই মধ্যে। রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের পরপরই স্টিম জেনারেটর স্থাপন করা হবে আগামী মাসে। স্টিম জেনারেটরের মাধ্যমে প্রথম ইউনিটে সব ধরনের নিউক্লিয়ার যন্ত্রপাতি বসানো শেষ হবে।

প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবর বলেন, প্রতিটি যন্ত্র সর্বোচ্চ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে নকশা অনুযায়ী বসানো হচ্ছে। এ জন্য নিয়ন্ত্রণ কর্র্তৃপক্ষের সনদ নিতে হয়েছে। কাজের মান দেখে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছে।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।