Home ওপেনিয়ন ভারতবর্ষকে বিশ্বে সভ্য ও সমৃদ্ধশালী হিসেবে পরিচিতি করেছে মুসলিমরাই

ভারতবর্ষকে বিশ্বে সভ্য ও সমৃদ্ধশালী হিসেবে পরিচিতি করেছে মুসলিমরাই

।। হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসান ।।

বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদিরা যদি ভারতবর্ষের ইতিহাস জানতো, এনআরসি ও নাগরিকত্ব আইন করার ভাবনা জাগলেও এ জন্য শতবার লজ্জিত হতো। দীর্ঘ কয়েক শত বছর মুসলমানরা ভারতবর্ষ শাসন করেছে। সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সম্পদের অব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খল ভারতবর্ষকে তারা বিশ্ববাসীর কাছে অন্যতম সভ্য ও প্রাচুর্যশালী দেশ হিসেবে পরিচিতি করিয়েছে। এই দীর্ঘ শাসনামলে মুসলিম শাসকরা ভারতের হিন্দুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকারকে একদিনের জন্যও সামান্যতম খাটো করে দেখেনি। যদি মুসলমান শাসকরা সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করতো, তাহলে দিল্লীতে কোন মন্দির যেমন খুঁজে পাওয়া যেতো না, তেমনি মুসলমানরাও সংখ্যালঘু থাকতো না।

মাত্র কয়েক বছর ভারতের শাসন ক্ষমতায় এসে আজ যারা মুসলিম উচ্ছেদের খাহেশ থেকে এনআরসি ও নাগরিকত্ব আইন করছে, ভারতবর্ষের ইতিহাসে তারা জঘন্য, বর্বর ও আগ্রাসী হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।

“যাহারাল ফাসাদু ফিল বাররি ওয়াল বাহর, বিমা কাসাবাত আয়দিন নাস”। যা কিছু বিভ্রাট ও ফাসাদ আজ আমাদের দোরগড়ায়, সবই আমাদের হাতের কামাই।

ভারতবর্ষের মুসলমানদের বর্তমান দূর্দশনার জন্য মূলত: আমাদের পূর্ববর্তী শাসকদের স্বেচ্ছাচারি ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকাটাই প্রধানত: দায়ী। একদিকে তারা সাম্প্রদায়িক সহনশীলতা ও সমতার ভিত্তিতে দেশ শাসন করে মানুষের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে, এটা খুবই প্রশংসিত দিক। অন্যদিকে তারা সমৃদ্ধশালী দেশের উদ্বৃত্ত যেসব সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে, সেটাকে ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসিতা ও আরাম-আয়েশে খরচ করে মুসলিম শাসনের কবর রচনা করেছে।তারা যদি ভোগ-বিলাসিতায় না ডুবে ইসলামের নীতি-দর্শন, শিক্ষা, সুশাসন ও দাওয়াহ ছড়িয়ে দিতে মনোযোগী হতেন, তাহলে দিল্লীর লালকেল্লায় এখনো মুসলমানদের পতাকা ওড়তো।

আমরা নিজেরা উদাসীন থাকি, পরবর্তীতে ভাগ্যকে দোষারোপ করি।বর্মার রাখাইন রাজ্য ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের। এ রাজ্যে ৩৮৫ বছর পর্যন্ত মুসলিম খেলাফত ছিল। আর দিল্লীতে মোগলদের মুসলিম শাসন ছিল ৩৬০ বছর। তখন বিশ্বব্যাপী শিল্প বিপ্লবের উন্মেষ চলছিল।

মোগল বাদশাহ’র স্বেচ্ছাচারিতা কীভাবে বিপদ ডেকে এনেছে, তার ছোট্ট একটা উদাহরণ দিচ্ছি। একবার বাদশাহ জাহাঙ্গীরের চিকিৎসা করেছেন এক ইংরেজ ডাক্তার। সুস্থ হওয়ার পর বাদশাহ ইংরেজ ডাক্তারকে বললেন, কি পুরষ্কার চাও? ডাক্তার বললেন, আমি তেমন কিছুই চাই না। শুধু এ সুযোগটা চাই, যাতে উপকূলীয় এলাকায় বিনা শুল্কে ব্যবসা করতে পারি। এই সুযোগ নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারত বর্ষে আসল। ১৬০২ খ্রীস্টাব্দে ভাস্কো দা গামা সর্বপ্রথম বোম্বে উপকূলে জাহাজ ভীড়াল। এরপরের দীর্ঘ ইংরেজ পদানতের ইতিহাস সকলের জানা আছে। এভাবে দুই শত বছর পর্যন্ত এই ভারতবর্ষ থেকে শোষণ করে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী অঞ্চলকে হতদরিদ্রে পরিণত করে তারা বিদায় নিল।

ভারতবর্ষ তো এমন সমৃদ্ধশালী দেশ ছিল, চীনের রাজা মণি-মুক্তা, হীরা-জওহরের উপঢৌকন সমেত শুধুমাত্র শান্তিচুক্তি করার প্রস্তাব নিয়ে দিল্লীতে ৫০ জনের এক প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল। এই প্রতিনিধি দল দিল্লীর লাল কেল্লার গেট থেকে দরবার পর্যন্ত হাঁটুতে ভর করে ঝুঁকে ঝুঁকে গিয়েছিল, স্বাভাবিক হেঁটে যাওয়ার সাহস করেনি মোগল রাজ দরবারে বেয়াদবি হয়ে যায় কিনা এই ভয়ে। তারপর মণি-মুক্তা, হীরা-জওহরের উপঢৌকন রাজদরবারে রেখে ভারত থেকে যেনো চীনে আক্রমণ করা না হয়, এ জন্য শান্তিচুক্তির বিনীত আবেদন করে তারা। এই ছিল দিল্লীর মুসলিম মোগল রাজা-বাদশাহদের শান ও শৌর্য। বাদশাহ আকবরকে বলা হতো দিল্লিশ্বর।

মোগল রাজা-বাদশাহরা এই সম্পদ ও বীরত্বকে কাজে না লাগিয়ে, শিল্প বিপ্লবের সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে ২০ হাজার লোককে ২২ বছর কাজে লাগিয়ে তৎকালীন ৮ কোটি স্বর্ণমূদ্রা খরচ করে সৌধ বানিয়েছে স্ত্রী মমতাজ বেগমের কবরের উপরে। যে সৌধ বিশ্বে খ্যাতি লাভ করেছে সপ্ত আশ্চর্যের এক আশ্চর্য হিসেবে।

মূলত: এটা মমতাজের কবর নয়, বরং এটাই হল ভারতবর্ষে মুসলমানদের শৌর্য-বীর্য ও সমৃদ্ধের কবর।

আমি চার বছর দেওবন্দে লেখাপড়া করেছি। দেওবন্দ যাওয়ার পথে অসংখ্য বার আগ্রা স্টেশনে ট্রেনে থেমেছি। এই চার বছর সময়ে কোন একদিনও আমার মনে তাজমহল দেখার আগ্রহবোধ জাগেনি। এটা তো আসলে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের কবর। মুসলিম বীরত্বের কবর। এটা দেখতে গেলে তো আক্ষেপ, গ্লানি ও কষ্ট বাড়বে।

২০ হাজার লোককে ২২ বছর খাটানো হলো বিপুল সম্পদ ব্যয় করে একটা কবর বানানোর জন্য। আর এটাকে সারা ভারত বর্ষের মুসলমানরা গৌরব রূপে দেখছে। এটা বড়ই আফসোসের বিষয়। এটা তো গৌরবের কিছু নয়, বরং রাজা-বাদশাহরা এভাবে ভোল-বিলাসিতায় মত্ত থেকে ভারতবর্ষের মুসলমানদেরকে ডুবানোর কবর রচনা করেছেন সে তখনই।

দিল্লীর রাজা বাদশাহরা যদি এভাবে নিজেদেরকে ভোগ-বিলাসিতায় ডুবিয়ে না রাখতেন, তাহলে আজকেও সেই লালকেল্লাতে মুসলমানদেরই পতাকাই ওড়তো। এনআরসি, নাগরিকত্ব আইন আসার কল্পনাও কি কেউ করতে পারতো?

ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ আটশত বছর পর্যন্ত মুসলমানরা ভারত শাসন করেছে। এই আটশত বছরে যদি মাত্র ৮ দিনের জন্য হিন্দু দমনের বৈধতা রাখতো মুসলিম শাসকরা, পুরো ভারত বর্ষে একটা মন্দির থাকতো না। আটশত বছর ভারত শাসন করেছে মুসলমানরা। অথচ এখনো দিল্লীতে ২০ ভাগের বেশি মুসলমান নাই। এই দীর্ঘ মুসলিম শাসনামলের কোন একদিনও দিল্লীতে মুসলমানদের গরিষ্ঠতা ছিল না। অথচ খোদ দিল্লীর লালকেল্লা থেকেই মুসলমানরা সমগ্র ভারতবর্ষ শাসন করেছে সাড়ে তিনশত বছর। এই সাড়ে তিনশত বছরে দিল্লীর মুসলমান শাসকরা যদি সাড়ে তিন দিনের জন্যও হিন্দু দমনের বৈধতা দিতেন, তাহলে একটা মন্দির থাকতো না দিল্লীতে। ভারতে তখন হিন্দুরা আর সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকার সুযোগ পায় না।

এখন যারা এনআরসি ও নাগরিকত্ব আইন করছে যে, শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার কারণে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না, যদি তাদের ভারত বর্ষের ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ থাকতো, তাহলে এ জন্য তারা শতবার লজ্জিত হতো এমন আইন করার মনে ভাবনা জাগার জন্য। তারা ভাবতো, কাদেরকে আমরা অপমান করতে চাচ্ছি, যারা আমাদেরকে হাজার বছর পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে সমৃদ্ধের সাথে লালন-পালন করে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে? এরাই তো আমাদেরকে সভ্যতা শিখিয়েছে। আমরা তো কাপড়ও পরতে জানতাম না। এরা আমাদেরকে শিক্ষা, দীক্ষা, সামাজিকতা, উন্নত আচরণ শিখিয়েছে ও সমৃদ্ধি দিয়েছে। বিশ্বের কাছে মর্যাদাশীল জাতি ও ধনবান দেশ বলে পরিচিত করেছে।

কিন্তু আমরা মুসলমানদের জন্য শত আফসোসের বিষয় হলো- এই ভারতবর্ষের সম্পদ শাহজাহানের কোষাগারে ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবেই। কিন্তু এই সম্পদ কোহিনূর কেনার জন্যও ছিল না, ময়ূর সিংহাসন বানানোর জন্যও ছিল না, তাজমহলের সৌধ নির্মাণের জন্যও ছিল না। যদি দিল্লীর বাদশাহরা ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসিতায় না ডুবে যেতেন, তাহলে আজ ভারত বর্ষের মুসলমানদের ঘরে ঘরে তাজমহল হতো- যদি ওই তাজমহলের পেছনে এই বিশাল অপব্যয়টা না হতো। এই রাজা বাদশাহরা একবার বাথরুমে যাওয়ার আগে সাড়ে ৭ কেজী আতর ঢালতো। যাতে কোনরূপ দূর্গন্ধ স্পর্শ করতে না পারে।

ইতিহাসের মুসলিম শাসদের স্বেচ্ছাচারিতার যেমন আজ কোটি কোটি মুসলমানকে অসহায়ত্ব, অনিরাপদ ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে এনেছে, তেমনি ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে বর্তমান হিন্দুত্ববাদিদের শাসককূলের স্বেচ্ছাচারি আগ্রাসী নীতির জন্য একদিন সমগ্র হিন্দু জাতিকেও অসভ্য, আগ্রাসী ও জঘন্য সাম্প্রদায়িকতার কাঠগড়ায় নিয়ে হাজির করবে। ইতিহাস থেকে সকলের শিক্ষার্জন করা জরুরী। ইতিহাস আপন গতিতেই চলে। কাউকে ছাড় দিয়ে ইতিহাস রচিত হয় না।

লেখক: ভাইস প্রিন্সিপাল ও মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা-ঢাকা, প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল- ঢাকা উত্তরা রওজাতুস সালিহাত মহিলা মাদ্রাসা, খতীব-  উত্তরা ১২নং সেক্টর বায়তুন নূর জামে মসজিদ, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডটকম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।