Home ওপিনিয়ন পাকিস্তান কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ‘মিডল পাওয়ার’ হয়ে উঠল

পাকিস্তান কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ‘মিডল পাওয়ার’ হয়ে উঠল

সায়মা আফজাল (এশিয়া টাইমস): বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে যখন প্রতিযোগিতার পারদ ক্রমশ চড়ছে, তখন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সাথে কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম দেশগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপরিহার্য হয়ে উঠছে। বিশ্ববাসীর নজর যখন প্রধান শক্তিগুলোর দ্বৈরথের দিকে নিবদ্ধ, ঠিক তখনই আরেক শ্রেণির রাষ্ট্রগুলো নীরবে তাদের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলছে; এরা হলো সেইসব ‘মিডল পাওয়ার’ বা মধ্যম শক্তি, যারা কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়েও— সব পক্ষকে আস্থায় নিতে সক্ষম।

পাকিস্তান ধীরে ধীরে এই শ্রেণির অগ্রভাগে পুনরায় আবির্ভূত হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তানকে মূলত সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির চশমায় দেখা হতো। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসলামাবাদ নিজেকে এমন এক সক্রিয় কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যার প্রভাব তার অর্থনীতির আকারের চেয়েও বহুগুণ বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের আবহে ইসলামাবাদের এই অবস্থান পরিবর্তনের চিত্রটি বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে চরম তিক্ততা থাকা সত্ত্বেও— পাকিস্তান যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের পথ সুগম করতে সহায়তা করেছে। ইসলামাবাদ তার এই মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে, যা এই ধারণাকেই পোক্ত করে যে—যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান, উভয়ের সাথেই বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রাখার মতো হাতেগোনা কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম।

ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের এই আন্তর্জাতিক পরিবেশে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক নমনীয়তা বা ‘ডিপ্লোম্যাটিক ফ্লেক্সিবিলিটি’ দেশটির অন্যতম প্রধান কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে কোনো দেশের মর্যাদা নির্ণয় করা হতো তার অর্থনৈতিক উৎপাদন, সামরিক ব্যয়, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাপকাঠিতে। এই বিষয়গুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ, তবে বহুমাত্রিক ও মেরুকৃত বিশ্বব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি শুধু এগুলো দিয়ে আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

সফট পাওয়ারের প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ এস নাই যুক্তি দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রভাবের শক্তি পায় অদৃশ্য কিছু উৎস থেকেও—যার মধ্যে রয়েছে কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং সফট পাওয়ার বা নমনীয় শক্তি। একইভাবে রবার্ট এ. ডাল ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন অন্যের আচরণকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা হিসেবে। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আঞ্চলিক বিবর্তনে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ভূমিকা দেশটির ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।

বহুমুখী জোট সক্ষমতার গুরুত্ব

পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রাসঙ্গিকতার একটি বড় উৎস হলো দেশটির ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী জোটবদ্ধতার সক্ষমতা। কঠোর ও একরোখা কোনো জোট ব্যবস্থায় আটকা না পড়ে ইসলামাবাদ একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এই নমনীয়তাই পাকিস্তানকে আঞ্চলিক অস্থিরতার সময়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দেয়।

ইরানের জন্য পাকিস্তান ছিল এক বাস্তবসম্মত মধ্যস্থতাকারী; কারণ মাঝেমধ্যে এই প্রতিবেশীর সঙ্গে তেহরানের উত্তজনা থাকলেও— ভৌগোলিক নৈকট্য, ইতিহাস এবং দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মিথস্ক্রিয়ার কারণে দেশ দুটির মধ্যে সবসময় একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় ছিল। এই ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক বন্ধনই তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে যোগাযোগের পথগুলোকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও পাকিস্তান সবসময়ই প্রয়োজনীয় ছিল; কারণ কয়েক দশকের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি ও যোগাযোগের নির্দিষ্ট পথ তৈরি করে রেখেছে। একই সাথে ওয়াশিংটন মনে করে, ইসলামাবাদ কোনো উগ্র আদর্শিক বৈরিতা ছাড়াই তেহরানের সাথে আলোচনায় বসতে সক্ষম, যার ফলে উত্তেজনা না বাড়িয়েই একটি বিশ্বাসযোগ্য আলাপচারিতা সম্ভব হয়।

প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে রেষারেষি যত বাড়ছে, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনগুলোর মাঝে সেতুবন্ধন করতে পারে এমন দেশগুলোর গুরুত্ব ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক এই কূটনৈতিক তৎপরতা— তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে নতুন করে গড়ে তোলার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে। এর গত বছরের মে মাসে, ভারতের সাথে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র সামরিক সংঘাত— দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত সামরিক শক্তির ভারসাম্যহীনতা নিয়ে পুরনো ধারণাগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এটি পাকিস্তানকে একটি সক্ষম নিরাপত্তা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে—যাদের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা ও উত্তেজনা মোকাবিলার সামর্থ্য রয়েছে।

ইসলামাবাদের এই অবস্থান অনেক আঞ্চলিক অংশীদারের কাছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। যেখানে পাকিস্তানকে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যম শক্তির অনেক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল, কিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত নির্দেশনার অভাবে দেশটির প্রভাব প্রায়ই সীমিত হয়ে পড়ত। অতি সম্প্রতি সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং একটি সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি— ইসলামাবাদকে তার কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাব আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।

পাকিস্তান নিজেকে আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের অধীনে, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার নিন্দা জানানোর মধ্য দিয়ে ইসলামাবাদ নিজেকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব, সংযম এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে বড় একটি ফ্যাক্টর। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে, পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। করাচি বন্দরের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং গোয়াদর বন্দরের অব্যাহত উন্নয়ন— দেশটিকে ভবিষ্যতে এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আফ্রিকার সাথে সংযোগকারী একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে শুধু ভৌগোলিক অবস্থানই মধ্যম শক্তির প্রভাব তৈরি করে না। কৌশলগত প্রাসঙ্গিকতা এখন অনেকাংশেই নির্ভর করে কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং বিবাদমান ক্ষমতাধর দেশগুলোর মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখার দক্ষতার ওপর। ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি—মুসলিম বিশ্বে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পাকিস্তানের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বর্তমান মেরুকৃত বিশ্বে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা

ক্রমবর্ধমান প্রাসঙ্গিকতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের উত্থান এখনো কিছু সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসনের অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক অসঙ্গতি দেশটির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ব্যাহত করছে। কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়াতে পারলেও— সেই প্রভাব ধরে রাখতে হলে, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন জরুরি।

চলমান উগ্রবাদ, আফগানিস্তান কেন্দ্রিক অস্থিরতা এবং বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমিত করছে এবং একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ছাড়া পাকিস্তান ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও— অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছে— যেখানে প্রভাব কেবল পরাশক্তিদের হাতেই থাকবে না, বরং তাদের মাঝে সেতুবন্ধনকারী দেশগুলোর হাতেও থাকবে। পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব মূলত সেই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। দেশটির গুরুত্ব এখন আর কেবল ভূগোল বা সামরিক সক্ষমতা থেকে আসছে না, বরং বিবাদমান পক্ষগুলোর সাথে একসাথে সম্পৃক্ত থাকার সক্ষমতা থেকেই আসছে।

বিশ্বব্যবস্থা যত বেশি বিকেন্দ্রীভূত এবং খণ্ডিত হবে, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে কাজ করতে সক্ষম রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত মূল্য ততই বাড়বে। পাকিস্তানের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সে তার এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাকে টেকসই কূটনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারবে কিনা।


লেখক: সায়মা আফজাল একজন গবেষক, যিনি দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কার্যক্রম এবং মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি জার্মানির জাস্টাস লিবিগ ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি গবেষণায় নিয়োজিত।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।