Home ধর্মতত্ত্ব মহান আল্লাহর কুদরত ও মহিমা

মহান আল্লাহর কুদরত ও মহিমা

2

।। মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী ।।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, “তিনিই (আল্লাহ্) আসমান যমীনকে সঠিকভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের (মানুষের) আকৃতিকে সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে উত্তম করে গড়েছেন এবং তাঁর কাছেই শেষ কালে ফিরে যেতে হবে।” (সূরা তাগাবূন)।

বর্তমান সভ্যতার দাবীদার মানুষ কেন চিন্তা করে না, কুরআনে পাকের উপরিউক্ত উক্তির সাথে মানুষের অবয়বের কত নিখুঁত মিল। মানুষের মত এত সুন্দর গঠনে আল্লাহ্ পাক তাঁর একটি মাখলুককেও সৃষ্টি করেন নাই। মানুষ ছাড়া সব মাখলুককেই আল্লাহ্ পাক ‘কুন’ শব্দ দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। শুধুমাত্র মানুষকেই তিনি নিজ কুদরতি হাতে মাটিকে খামির করে তাতে নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এককভাবে। এর জন্যও কি বান্দার উচিত নয় সেই মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ পাকের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা?

হে মানুষ! তুমি যদি একবার তোমার মাটির তৈরী সাড়ে তিন হাত দেহখানার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গভীরভাবে চিন্তা কর যে, মাওলা কিভাবে কুদরতী কায়দায় দেহখানা সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তো তোমার চেতনা অবলুপ্তি হবার কথা, তোমার আহার, নিদ্রা ভুলে যাবার কথা, মাওলার ইশ্কে তোমার পাগল হবার কথা। কিন্তু আমি দেখি তোমার কানের মাছিও নড়ে না। কেন, কি হলো তোমার?

কোন মন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে তুমি আত্মহংকারে নিজের অতীতকে ভুলে বসলে? ভুলে গেলে তোমার সৃষ্টিকর্তাকে। তুমি কি ভেবেছ, যে শয়তান তোমাকে এই দুনিয়ায় কু-মন্ত্রণা দিয়ে আরাম আয়েশের নরম বিছানায় সুখের নিদ্রায় বিভোর করে রেখেছে, আখিরাতেও সেই ইব্লিশ তোমাকে উদ্ধার করবে? কখনো না। সে তখন সমস্ত দোষ তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজের বাহাদুরির জন্য অট্টহাসি হাসবে। তাই সময় থাকতে হুঁসে এসে চিন্তা কর, প্রভুর সৃষ্টি সম্বন্ধে, তাহলেই স্রষ্টার সান্নিধ্য তোমার লাভ হবে এবং তুমি বেঁচে যাবে কঠিন আযাব হতে। দাখিল হতে পারবে অনন্তকালের সেই চিরস্থায়ী জান্নাতে, যার শুরু আছে শেষ নাই।

হে মানুষ জাতি! কেন বুঝতে চাও না দুনিয়াতে যাদের মুহাব্বাতে আকৃষ্ট হয়ে আল্লাহ্ পাকের আদেশ নিষেধ ভুলে গিয়ে অন্যায়কে অন্যায় মনে করলেনা, হারামকে হারাম ভাবলেনা, অন্ধের মত দুনিয়ার সাথে মহব্বতে জড়িয়ে পড়লে, সেই স্ত্রী-পুত্র পরিজন কেউই তোমার আপন নয়, সময় ও সুযোগ বুঝে সবাই তোমাকে ত্যাগ করবে, তোমার নিদানের সাথী কেউ হবে না, তার উদাহরণ লক্ষ্য কর। তুমি যতদিন উপার্জনক্ষম থেকে রুজি রোজগার কর স্ত্রী পুত্র পরিজনদের সুখশান্তি প্রদান করতে পারবে, যতদিন তাদের চাহিদা মত আহার যোগাতে পারবে, পোষাক পরিচ্ছদ সজ্জিত করতে পারবে ততদিন তারা সবাই তোমাকে শ্রদ্ধা করবে, ভালবাসবে ও তোমাকে ভয় করবে।

কিন্তু নিয়তির অখন্ড বিধানে তুমি যদি পতিত হও। তোমার রোযগারের পথ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তোমার চলৎ শক্তি যদি রহিত হয়ে পড়ে, তুমি যদি তোমার পরিবারের সদস্যদের গলগ্রহ হয়ে পড়, তাহলে দেখবে ক্রমান্বয়ে তোমার উপর থেকে তাদের ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা শিথিল থাকবে, দেখবে আগের মত আর স্ত্রী ভালবাসে না, পুত্র কন্যারা শ্রদ্ধা করে না, ভাই বোনের ভক্তি ভয় আর তোমার হাতে নেই। তুমি তখন পরিবারের একজন অবাঞ্ছিত ব্যক্তি বৈ আর কিছু নও।

তার পর ঐ অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু হয় তাহলে দেখবে যাদের জন্য তুমি একদিন নিজের জীবন তুচ্ছ ভেবে, নিজের সুখ শান্তির কথা ভুলে গিয়ে আল্লাহ্র নাফরমানী করে নিজের পরকালকে ধ্বংস করেছ, সেই অতি আদরের স্ত্রী-পুত্র পরিবার পরিজন কৃত্রিম দু’ফোটা চোখের পানি ফেলে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তোমাকে বাড়ী থেকে বিদায় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

তোমাকে রেখে আসবে কোন এক জঙ্গল বাড়ীর অন্ধকার কবরে। জীবনেও আর কেউ তোমার খোঁজ করবেনা। সবাই নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তারপর একদিন তোমার স্মৃতিও তারা ভুলে যাবে। তুমি তোমার কবরে একা হিসাব মিলাতে থাকবে যে, দুনিয়াতে থাকাকালীন সময়ের যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ। এখন চিন্তা কর, দুনিয়ার কৃত্রিম ভালবাসার কি মূল্য আছে?

তুমি যদি তোমার মাওলাকে রাজি খুশী করে কবরে যেতে পার, তাহলে সারা পৃথিবী তোমাকে অবজ্ঞা করলেও তোমার কোন চিন্তা নেই, তোমার কোন ভয় নেই। আল্লাহ্ই তোমার জন্য যথেষ্ট। আর যদি আল্লাহ্ তোমার উপর বেজার হয়ে যান, তাহলে সারা জাহান তোমার প্রশংসা করলেও তোমার উদ্ধার পাবার কোন পথ থাকবে না।

উপরের আলোচনায় পরিস্কার জানা গেল মহব্বত ভালবাসার মূল উৎস স্বার্থ। স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নিঃস্বার্থভাবে তোমাকে ভালবাসেনা। সবই কৃত্রিম স্বার্থ হাসিলের রাস্তা মাত্র। অথচ তুমি সেই মেকী ভালবাসায় অন্ধ হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে এগিয়ে চলেছ জাহান্নামের দিকে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব তো আল্লাহ্ ফরয করে দিয়েছেন, তাহলে আর ব্যক্তির দোষ কোথায়?

এ প্রশ্নের জবাব হল, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন রুজি রোজগার করে পরিবার প্রতিপালন করা বান্দার জন্য ফরয করে দিয়েছেন। তবে সেই রুজি রোজগার করতে হবে আল্লাহ্কে সাথে নিয়ে তাঁরই নির্দেশিত পথে। যেমন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন এবং আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গানে দ্বীনেরা পালন করে গেছেন। ইসলামে মুসলমানদের জন্য প্রতিটি কাজই ইবাদতের মধ্যে গণ্য। তবে সে কাজগুলি হতে হবে শরীয়ত সম্মতভাবে।

শরীয়তের সীমার মধ্য থেকে আয় উপার্জন, সংসার ধর্ম পালন একজন মুসলমান পুরুষের জন্য বৈধ। শুধু বৈধই নয় ইবাদত তুল্যও বটে। “সীমা লংঘনকারীকে আল্লাহ্ ভালবাসেনা” আর সীমা লংঘনকারীদের জন্যই উপরোক্ত আলোচনা।

আমি আবার মূল বক্তব্যে ফিরে যাচ্ছি। এ নিবন্ধের মূল বক্তব্য হল মানুষ অকৃতজ্ঞ। আল্লাহ্ পাকের দেয়া নিয়ামত ভোগ করে শয়তানের পায়রবী করতে তারা পরঙ্গম। অথচ মানুষ চিন্তা করেনা এক গ্লাস পানি পান করাবার ক্ষমতাও শয়তান রাখে না। আল্লাহ্ পাকের ক্ষমতায় সে ক্ষমতাবান। আর এই ওদাসীনতার একমাত্র কারণ হলো উপলব্ধির অভাব ও চিন্তার দৈন্যতা। সৃষ্টি সম্বন্ধে গভীরভাবে চিন্তাই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। এখানে আবার প্রশ্ন উঠতে পারে, সৃষ্টি যা তাতো অবলোকনই করছি চিন্তা করে আর কি হবে?

আমি বলব, তুমি কিছুই অবলোকন কর না। তোমার বাইরের চোখ দু’টি খোলা থাকলেও অন্তর চোখ তোমার অন্ধ। তাই সৃষ্টি বস্তুই শুধু দেখতে পাও, কিন্তু তার রহস্য অনুধাবন করতে পারনা।

হে মানুষ! তুমি কি তোমাকে নিয়েই কখনো চিন্তা ভাবনা করেছ? একই মুখে পানিও খাও, খাদ্যও আহার কর, হলকুমের নীচে নামার পর সেগুলো পৃথক করে কে? তুমি প্রস্রাব কর পানি, পায়খানা কর মল, পানি মল একসাথে কেন নির্গত হয়না? কে এই পৃথিকরণের প্রক্রিয়া তোমার মাঝে সৃষ্টি করে দিলেন? এক সেকেন্ড সে শ্বাস-প্রশ্বাস না চললে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অনন্তকাল ধরে সেই শ্বাস-প্রশ্বাস আসা যাওয়া করছে অথচ কখনই তা বন্ধ হলোনা আল্লাহ্র হুকুম ছাড়া, তোমার ভিতর এই মেসিন কে স্থাপন করল?

তুমি কখনো কি চিন্তা করেছ তোমার ভিতর পঞ্চ ইন্দ্রিয় কে সংযোজন করল? যার সাহায্যে তুমি ভালমন্দ স্বাদ গ্রহণ করে থাক, সুঘ্রান বা সুগন্ধ অনুভব কর, বিভিন্ন প্রকার বাক্য ও শব্দ শ্রবণ করে থাকো, আল্লাহ্র অপূর্ব সৃষ্টি দর্শন কর, শব্দমালা গঠন করে মনের ভাব প্রকাশ কর, বায়ূ গ্রহণ কর এবং ত্যাগ কর।

তোমার চোখ দু’টি না থাকত যদি, তাহলে তুমি বঞ্চিত হতে দর্শন থেকে। কান যদি বধির হতো তুমি বঞ্চিত হতে শ্রবণ হতে। জিহ্বা যদি না থাকত তুমি বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারতে না। নাক না থাকলে তুমি শ্বাস-প্রশ্বাস কিভাবে নিতে? এমনিভাবে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তোমাকে সাহার্য করছে সুন্দরভাবে জীবন যাপনের কাজে। আর এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যিনি দান করলেন সেই মহাপ্রভু স্রষ্টাকে তুমি ভুলে বসে আছ।

অথচ তুমি দাবী কর আমি মুসলমান, ইসলাম আমার ধর্ম, নামায-রোযা না করলেও ঈমান আমার ঠিক আছে, আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস আমার অগাধ। আসলে তুমি একজন মুনাফিক। তোমার অন্তরের সাথে মুখের মিল নাই। যাদের কথার সাথে কাজের মিল নাই তারাই মুনাফিক। মুনাফিকদের সম্বন্ধে তোমার আমার প্রভু কি বলেন শোনঃ

“মুনাফিক নারী-পুরুষ সকলেরই একই স্বভাব, তারা কু-কাজ করতে বলে এবং ভাল কাজ করতে নিষেধ করে। দান-খয়রাতের বেলায়ও তারা হাত গুটিয়ে রাখে, তারা আল্লাহ্কে ভুলে থাকে এবং আল্লাহ্ও তাদেরকে ভুলে যান। আল্লাহ্ মুনাফিক নর-নারী কাফিরদিগকে জাহান্নামের আগুনের ওয়াদা দিচ্ছেন, ইহাই তাদের উপযুক্ত শাস্তি।” (সূরা তাওবা)।

হে মুসলমান জাতি! এখনো সময় আছে চিন্তা-ভাবনা করার। গভীরভাবে চিন্তা করে দেখ, কোনটা আসল কোনটা নকল। ইহ্কালীন সুখ-শান্তির যদি কোন মূল্য থাকত, তাহলে স্বর্ণের পাহাড় যাকে দান করা হয়েছিল সেই দু’জাহানের বাদশা দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র দেহ মুবারকে খেজুর পাতার দাগে চিহ্নিত হত না। স্প্রীং এর নরম গদীতে সুখের নিদ্রায় জীবন কাটাতে পারতেন পেটে পাথর বাঁধার প্রয়োজন হতো না।

অর্ধ জাহানের খলিফা হযরত উমর ফারুক (রাযি.) গাছের নীচে মাটির বিছানায় ইটকে বালিশ করে বিশ্রাম করতেন না, রাজ মহল তৈরী করে সুখের শয্যা রচনা করে আরাম আয়েশে জীবন কাটিয়ে দিতেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে মানব শ্রেষ্ঠ উপাধিতে যিনি ভূষিত, তিনি শ্রেষ্ঠ ধনী হয়েও ছেঁড়া চট খেজুরের কাঁটা দিয়ে সেলাই করে পরিধান করতেন না। অথচ আল্লাহ্ পাক তাঁদের প্রতি রাজী খুশী হয়ে দুনিয়াতেই জান্নাত দানের সু-সংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন।

দুনিয়ার নিশ্চিত আরাম আয়েশ সে তো শয়তানের জন্য। ভোগবাদী নারী পুরুষই তো ধর্ম বিমুখ জীবন যাপন করে থাকেন, আর তাদের মন্ত্রণা দাতা হল অভিশপ্ত শয়তান। এ দুনিয়ায় মুসলমানদের জন্য আমোদ আহলাদ ভোগ বিলাস আল্লাহ্ পাক হারাম করে দিয়েছেন। বিনিময়ে জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামত তাদের জন্য আছে। আল্লাহ্ পাক বলেন, “এবং যে কেউ তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ মেনে চলবে এবং নেক কাজ করবে, তাকে আমি দ্বিগুণ পুরস্কার দিব। এবং তার জন্য আমি বেহেস্তে উত্তম আহার প্রস্তুত করে রেখেছি।” (সূরা আহ্যাব)।

আল্লাহ্ পাকের যে সমস্ত বান্দাবান্দী শয়তানের ধোকায় পড়ে দিক ভ্রান্ত হয়ে বিপথে পদচারণা করে আখিরাত হারাতে বসেছে, তাদের প্রতি দয়াময় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের অভয়বাণী-

“তোমরা যারা নিজেদের জীবনের প্রতি অত্যাচার করেছ, তারা আল্লাহ্র দয়া থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ্ সমূদয় পাপ মাফ করবেন, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালূ।” (সূরা যুমার)।

“আর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ক্ষমাশীল পরম দয়াবান।” (সূরা নিসা)।

অর্থাৎ বান্দা যত পাপই করুক না কেন একবার যদি খাস নিয়্যাতে আল্লাহ্ পাকের দরবারে ক্ষমা ভিক্ষা করে, তাহলে তার আর কোন ভয় নাই। আল্লাহ্ তার সমস্ত পাপকে পূণ্যে পরিণত করে দিবেন। এত সুযোগ থাকার পরও মুসলমান কেন জাহান্নামে যাবে আমি বুঝতে পারিনা।

হে মানুষ! এমন দয়ালু মেহেরবান আল্লাহ্কে ছেড়ে কিসের মোহে শয়তানের তাবেদারী করে পরকালের অফুরন্ত নিয়ামত হতে বঞ্চিত হতে চলেছ? চিন্তা কর, হে মানুষ জাতি! গভীরভাবে চিন্তা কর, তোমার সাড়ে তিন হাত দেহ একটি অঙ্গও কি পৃথিবীর কোন বৈজ্ঞানিক, ইঞ্জিনিয়ার আজ পর্যন্ত তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে, যা তোমার বিকল অঙ্গের বিকল্প হিসাবে কাজ করতে পারে? তোমার সেই নির্ধারিত মৃত্যুর সময়কে কি কোন বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার পাঁচ দশ মিনিট আগে পাছে করতে পেরেছে?

তোমার জন্মের ব্যাপারে চিন্তা কর। কোন আধুনিক বৈজ্ঞানিক কি নির্ধারিত সময়ের অর্থাৎ দশ মাসের বা নয় মাসের পরিবর্তে সাত মাসে জন্ম ঘটাতে পেরেছে, অথবা নির্ধারিত সময়ের পরে কোন অসুবিদার অজুহাতে দুই চার মাস বিলম্বে প্রসব করানোর নজির স্থাপন করতে পেরেছে? আরও চিন্তা কর, আল্লাহ্ পাক তোমার ভিতরে মেরুদন্ডের সাথে ছোট ছোট দু’টি মূত্রথলি (কিড়নী) সংযোজন করে দিয়েছেন, যাতে তোমার প্রস্রাবে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়। তার একটি যদি কোন কারণে অকেজো হয়ে যায়, সেটি অপারেশন করে ফেলে দিলেও অপরটি দিয়ে তোমার জীবন অতিবাহিত করতে কষ্ট হবেনা। কিন্তু দু’টিই যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তোমার বেঁচে থাকার আর কোন ব্যবস্থাই আধুনিক বিজ্ঞান উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয় নাই।

অর্থাৎ সামান্য একটি মূত্র থলি আবিস্কার করবার ক্ষমতা পৃথিবীর কোন মানুষের হয় নাই। অথচ একজন মানুষের ঐ কিড্নী কেটে এনে তোমার দেহে সংযোজন করতে পারলে তুমি বেঁচে যাবে, কিন্তু বিনিময়ে তোমাকে খরচ করশেত হবে চার পাঁচ লাখ টাকা।

তাহলে চিন্তা কর আল্লাহ্ পাকের কুদরতি সৃষ্টি দুই ইঞ্চি একটি মূত্র থলির মূল্য যদি পাঁচ লাখ টাকা হয়, তাহলে গোটা একটি দেহের মূল্য কত? সেই অমূল্য দেহ তোমাকে দান করা হয়েছে, অথচ তুমি সেই অমূল্য দেহকে নিকৃষ্ট কাজে ব্যবহার করে মূল্যহীন করে দোযখের খড়ি বানিয়ে নিয়েছ। যে বিজ্ঞান মানুষকে চাঁদে পৌঁছে দিচ্ছে, রকেটে পৃথিবী ভ্রমণ করাচ্ছে সেই বিজ্ঞান আল্লাহ্ প্রদত্ত একটি ক্ষুদ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আবিস্কার করতেও সক্ষম নয়। শুধু তাই কেন, একটি ঘাসও কি তারা জন্মাতে সক্ষম হয়েছে যা আল্লাহ্ পাকের কুদরতি খেয়ালে সৃষ্টি?

হে মানুষ জাতি! তোমাদের মধ্যে অনেক বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবীরা বলে থাকে, আল্লাহ্ কোথায়? আল্লাহ্কে তো দেখলাম না। যাকে দেখা যায় না তার উপর বিশ্বাস আনি কিভাবে? (নাউযুবিল্লাহ্)। ঐ সমস্ত অবিশ্বাসীদের জিজ্ঞাসা করি, আল্লাহ্কে আর কিভাবে দেখতে চাও? সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর মাঝেই তো আল্লাহ্ বিদ্যমান। প্রতিটি সৃষ্টি বস্তুই তো তাঁর নিদর্শন ঘোষণা করছে, আসলে তোমরা অন্ধ। এই অন্ধত্বই তোমাদের ধ্বংস ডেকে আনবে।

আখেরাত, জান্নাত, গোর আযাব মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকলেও এই নিবন্ধে আলোচিত উপরোক্ত বিষয়গুলোতে মানুষের সামনে এবং তার জ্ঞানের পরিধির মধ্যেই সংঘটিত হচ্ছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চৌদ্দশত বছর আগে বর্ণিত ইহ্কাল সম্বন্ধে হাদীসগুলি কি বাস্তবে সংঘটিত হচ্ছে না? যদি হয়ে থাকে, তাহলে পরকাল বিষয়ক হাদীসগুলি মিথ্যা হবে কোন যুক্তিতে? আসলে দুনিয়ার মোহ ওদের অন্ধ করে ফেলেছে। কৃত্রিম আলোক সজ্জাকে নূরের দুনিয়া মনে করে অবগাহন করছে।

হে মানুষ জাতি! দুনিয়ার অস্থায়ী ভোগ-বিলাস, আমোদ-প্রমোদ পরিত্যাগ করে চিন্তা কর তুমি কে? কোথায় ছিলে, কোথায় এলে, কে তোমাকে পাঠাল এবং কেন পাঠাল? আর বিশাল এই সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি? সৃষ্টি সম্বন্ধে তুমি যত চিন্তা করবে স্রষ্টার পরিচয় ততই তোমার কাছে উন্মুক্ত হতে থাকবে। তখন তুমি মারিফাতের দরজায় পৌঁছে যাবে, দুনিয়া তোমার কাছে তুচ্ছ মনে হবে, আখিরাতের সঞ্চয় সংগ্রহে তুমি ব্যস্ত হয়ে উঠবে, আর এতেই তুমি মুক্তিপ্রাপ্ত হবে।

হে মানুষ! অহমিকা পরিত্যাগ কর। আল্লাহ্ পাকের দানকৃত বিবেক বুদ্ধি শয়তানী খেয়াল নষ্ট না করে সৎ পথে পরিচালিত কর। হতে পার তুমি একজন আল্লাহ্র মকবুল বান্দা হয়ে কবরে যেতে পারবে।

হে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ! কেন বুঝতে চাওনা বিশাল এ পৃথিবীর স্রষ্টা এবং চালক আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন। তাঁরই ইঙ্গিতে চন্দ্র উঠে সূর্য অস্ত যায়, বাতাস প্রবাহিত হয়। সাগরের উত্তাল তরঙ্গমালা সৃষ্টি তাঁর। তিনিই জীবন দান করেন আবার হরণ করেন। সেই মহা প্রভুর বিনা নির্দেশে গাছের একটি পাতাও নড়তে পারে না। হে মানুষ! তুমি কেন বুঝতে চাওনা জন্মের পরে মুত্যু অবধারিত, মৃত্যুর পরে ফিরে যেতে হবে সেই মহাপ্রভু আল্লাহ্র কাছে, যেখানে হিসাব হবে দুনিয়ায় থাকাকালীন সময়ের কর্মময় জীবনের। তুমি কেন চিন্তা করনা একদিন দুনিয়ার কোথায়ও তোমার অস্তিত্ব ছিলনা, আবার একদিন সে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এই অস্তিত্ব দান এবং বিলীনের মূলে কোন মহাশক্তি কাজ করছে?

শুনে রাখ হে মানুষ! তোমাকে আমাকে দুনিয়ার এ পাঠশালায় পাঠানো হয়েছে পরীক্ষার মাধ্যমে সনদ গ্রহণের জন্য। যারা পরীক্ষায় কামিয়াব হবে তারাই প্রাপ্ত হবে আল্লাহ্ পাকের ঐ সমস্ত পুরস্কার যার ওয়াদা আল্লাহ্ পাক কালামে পাকে করেছেন।

দুনিয়ার এ পাঠশালার পরীক্ষার শেষ হবে মৃত্যু। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চলবে এ পরীক্ষা। পরীক্ষার বিষয়বস্তু সন্নিবেশিত হয়েছে পবিত্র কুরআনে। শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছেন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যাঁর শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন। তিনি হাতে কলমে শিখিয়ে গেছেন উম্মতকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন পরীক্ষার নীতিমালা হাদীস শরীফ, যাতে শিক্ষানবীস উম্মত বিভ্রান্তিতে পতিত না হয়। এর পরেও কি মানুষ কামিয়াব হাসিলে বঞ্চিত হবে? এর পরেও কি পরীক্ষার খাতা (আমলনামা) শূন্য থেকে বাম হাতে প্রদত্ত হবে?

হে মানুষ! তোমরা আজ তোমাদের প্রতিপক্ষ শয়তানের সেবায় আত্ম নিয়োগ করছ, ভেবেছ ওরাই তোমাদের উদ্ধার করবে। কিন্তু মনে রেখ, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশী হয় না, হতে পারে না। কারণ মায়ের নাড়ির সাথে সন্তানের নাড়ীর সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত, যা মাসির সাথে নেই।

তদ্রুপ সম্পর্ক আল্লাহ্র সাথে বান্দার। মা পেটে ধারণ করে জন্ম দিয়েছেন, আল্লাহ্ নিজ কুদরতি হাতে সৃষ্টি করেছেন, যার কারণে মানুষের প্রতি আল্লাহ্ অতি দয়াবান, স্নেহপরায়ণ এবং ক্ষমাশীল। মানুষের প্রতি আল্লাহ্ পাকের মুহাব্বাত সবকিছুর ঊর্ধ্বে। মায়ের চেয়ে শতগুণ বেশী স্নেহ করেন আল্লাহ্ বান্দাকে। বান্দার এক ফোঁটা চোখের পানি মায়ের আঁচল ভিজাতে পারে না কিন্তু আল্লাহ্র আরশ কাঁপিয়ে তোলে, সেই করুণাময় আল্লাহ্র প্রতি মানুষ কেন উদাসীন আমি বুঝতে পারি না।

হে মুসলমান জাতি! হিম্মত কর। হিম্মতে ক্বিমত বাড়ায়। যার হিম্মত নাই তার ক্বিমত নাই। ইসলাম একমাত্র সত্য ধর্ম আর মুসলমান হল সেই সত্যের পূজারী, যাদের পৃষ্ঠপোষক আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন, আল্লাহ্ ছাড়া যাদের মাথা অন্য কোন শক্তির কাছে সহজে নত হয়না। অথচ সমস্ত অপশক্তির মাথা লুটিয়ে পড়ে তাদের পদতলে, আমরা সেই মুসলমান। তাই আর দেরী না করে পার্থিব ভোগ বিলাস ভুলে গিয়ে এসো স্রষ্টার দাসত্বে নিজে নিয়োজিত করে দ্বীনের হিফাযতে আত্মনিয়োগ করি তাহলেই দুনিয়ার আমরত্ব লাভ এবং আখিরাতের নাজাতের ফায়সালা নিয়ে আমরা কবরে যেতে পারব। আল্লাহ্ মুসলমানদের হিফাযত করুন। আমীন॥

লেখকঃ ফাযেলে- দারুল উলূম দওেবন্দ (দাওরা ও ইফতা), মুফতী ও মুহাদ্দসি- জাময়িা মাদানয়িা বারধিারা, ঢাকা এবং উপদষ্টো সম্পাদক- উম্মাহ ২৪ডটকম।

প্রশ্ন-উত্তর বিভাগ: জবাব লিখেছেন- মুফতী মুনির হোসাইন কাসেমী

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.