Home সম্পাদকীয় সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিত মুখোশ খুলে দেয়ার জন্য ইতিহাসে অ্যাসাঞ্জদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিত মুখোশ খুলে দেয়ার জন্য ইতিহাসে অ্যাসাঞ্জদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে

2

।। জামাল উদ্দিন বারী ।।

প্রায় সাত বছর ধরে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নিয়ে থাকা অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করেছে বৃটিশ পুলিশ। তাঁকে এখন মার্কিনীদের হাতে সোর্পদ করার আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছে বৃটেন।

মুক্ত গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক আইন এবং কনভেনশেনের বিপরীতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের এই গ্রেফতার ও সম্ভাব্য প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়া একটি চরম নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য হতে চলেছে। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকার করে নেয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য নাগরিকের মত প্রকাশের নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য।

কর্পোরেট মিডিয়ার সাথে বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সে নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য ইতিমধ্যে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর নেতৃত্বে ইরাকে ন্যাটো বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের শুরুতে পেন্টাগনের সামরিক কর্মকর্তারা অ্যাম্বেডেড জার্নালিজমের নমুনা বিশ্বকে দেখিয়েছিল। সে সময় সামরিক সাঁজায়ো বহরের সাথে যাওয়া সিএনএন, সিবিসি ও ফক্স নিউজের সাংবাদিকরা যুদ্ধক্ষেত্রের যে সব সংবাদ পাঠিয়েছিল তার প্রায় পুরোটাই ছিল মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর কমান্ডারদের সেন্সর করা ও অনুমোদিত।

এসব সংবাদে ন্যাটো বিমান হামলা, স্থল অভিযান এবং ইরাক-আফগানিস্তান দখলের ধারাবাহিক ঘটনাবলীর সাথে নৈতিক ও রাজনৈতিক রং মিশিয়ে বিশ্বের সমর্থন আদায়ের জন্য একটি মনস্তাত্তি¡ক ক্যাম্পেইনে নেমেছিল এ সব মিডিয়া গোষ্ঠি।

মূলত: নিউইয়র্কে নাইন-ইলেভেন সন্ত্রাসী বিমান হামলা এবং পরবর্তি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে থেকেই একতরফা অভিযোগ (যার প্রায় সবই মিথ্যা) তুলে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং আফগানিস্তানের তালেবানদের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমতকে বিষিয়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিল কিছু মিডিয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থা। পরবর্তীতে যর্থাথভাবেই প্রমানিত হয়েছিল, ইরাকের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপের অজুহাত, ইরাকের হাতে ব্যাপক বিদ্ধংসী ক্ষেপনাস্ত্র থাকাসহ আরোপিত অভিযোগগুলো ছিল মিথ্যা ও বানোয়াট। তারা মূলত ইরাকি রেভ্যুলেশনারি গার্ড বাহিনীর কমান্ডারদের গোয়েন্দা ফাঁদে ফেলে এবং নানাবিধ অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে ইরাকে দখলদারিত্ব কায়েমের রাস্তা পরিস্কার করেছিল।

ইরাক দখলের আগে মার্কিন কমান্ডাররা দাবী করেছিল, ইরাকের জনগণ তাদেরকে বসরাই গোলাপ দিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষা করছে এবং তারা ইরাকে শীঘ্রই গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বিশ্বস্ত রেভ্যুলেশনারী গার্ড বাহিনীর তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ন্যাটো বাহিনী ইরাক দখল করতে সক্ষম হলেও ইরাকি জনগণের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ যুদ্ধের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ বা বিজয় অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন বাহিনী।

শত শত কোটি ডলারের সামরিক বাজেট এবং সম্মিলিত বিশাল সামরিক বাহিনীর শত শত বিমান ও হাজার হাজার ট্যাঙ্ক নিয়ে বিশ্বের অন্যতম দুর্বল অর্থনীতির দেশ আফগানিস্তানের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তা দখল করে নেয়ার পর দেড়যুগেও তার উপর সামরিক-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি পশ্চিমা বাহিনী। মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্সের হাজার হাজার কোটি ডলারের মুনাফাবাজির স্বার্থ এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, সম্পদ লুন্ঠন এবং অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এসব যুদ্ধ, দখলদারিত্বের নেপথ্য কারণ।

এসব দখলদারিত্ব জায়েজ করতে মিথ্যা প্রচারনার উপর ভিত্তি করে যে পটভ’মি তৈরী করা হয়েছিল এমনিতেই তা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে প্রায় প্রতিটা দখলদারিত্বের যুদ্ধের শেষ পরিনতি এক ধরনের পরাজয়ের গ্লানি ও পশ্চাদপসারণের আপসকামিতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষত: উইকিলিকসের মাধ্যমে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের লাখ লাখ গোপন তারবার্তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বব্যবস্থার উপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ এবং পররাষ্ট্রনীতির সাথে মার্কিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, ষড়যন্ত্র ও অর্থনৈতিক তৎপরতার ঘটনাগুলো বিশ্বের সামনে পরিস্কার হয়ে যায়।

রাষ্ট্র আসলে কে বা কারা চালায়, এটা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কথিত ডিপ স্টেট এবং এমআইসি (মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্স)র যোগসাজশে পুঁজিবাদের উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দুর্দিন ঠেকাতে যুদ্ধবাদী অর্থনীতি চালু করতে দেশে দেশে অনৈতিক গোয়েন্দা তৎপরতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সামরিক আগ্রাসন, গৃহযুদ্ধ, সম্পদ লুন্ঠন ও লাখ লাখ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার মুখোশ উন্মোচনের শেষ পর্দাটি তুলে দিয়েছিলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ।

২০১০ সালে অ্যাসাঞ্জ প্রথম দফায় কয়েক হাজার গোপণ তারাবার্তা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শেয়ার করার ঘটনা অনেকটা পারমানবিক বোমার মত এক একটি তথ্যবোমা হয়ে দেখা দিয়েছিল। ইতিপূর্বে ১৯৭২ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ওয়াটারগেট কমপ্লেক্সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সহকারী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ডেমোক্রেটিক পার্টির অফিসে আড়িপাতার যন্ত্র স্থাপণের ঘটনাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। সে ঘটনায় রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি উৎঘাটনের পেছনে ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের ধারাবাহিক প্রতিবেদন এবং সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড ও কার্ল বার্নস্টেইন মূল ভ‚মিকা পালন করেছিলেন। তাদের দেখানো পথে অন্যান্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও ওয়াটারগেট স্ক্যান্ডালের তথ্য উৎঘাটন ও ধারাবাহিক পরিক্রমার দিকে নজর রেখে এবং জনসম্মুখে তুলে ধরার মাধ্যমে তা ধামাচাপা দেয়ার প্রশাসনিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিতে বিশেষ ভ‚মিকা রেখেছিল।

ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ছিল মার্কিন গণতান্ত্রিক রাজনীতির গোপন তৎপরতার একটি আভ্যন্তরীণ দলিল। আর উইকিলিকসের কথিত ক্যাবলগেট হচ্ছে এমন হাজার হাজার নয় লাখ লাখ কেলেঙ্কারির দলিল। যেখানে দেখা যাবে, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, পেন্টাগণ এবং হোয়াইট হাউজের নির্দেশনায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের সহযোগী বিভিন্ন দেশের সংস্থা কিভাবে দেশে দেশে গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতা ও ষড়যন্ত্রের বিস্তার ঘটিয়েছে। উইকিলিক্স ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের ঘটনাপ্রবাহে সারাবিশ্বের এমন প্রায় এক কোটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হস্তগত করার কথা জানিয়েছিল। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগের আড়াই লাখ গুরুত্বপূর্ণ তারবার্তা হাতে পাওয়ার দাবী করেছিল। এর মধ্যে মাত্র অল্প কিছু তারবার্তা ইউরোপের কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

লাখ লাখ তারবার্তার মধ্যে বিশ্বের প্রায় সব দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি, সামরিক বাহিনী, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির বিশাল তথ্য ভান্ডার গত ৫ বছরে দেশে দেশে অনেক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিচারিক ওলটপালট ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ফাঁস হওয়া উইলিক্সে বাংলাদেশের বেশ কিছু রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির বোমা ফাটানো তথ্য পাওয়া গেলেও এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সরকার, আদালত বা দুর্নীতি দমন কমিশনের তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

তবে উইকিলিক্সের তথ্যবোমায় মার্কিন সহযোগি আরব রাষ্ট্রগুলোতে বড় ধরনের রাজনৈতিক তোলপাড় শুরু হয়েছিল। আরব বসন্ত এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করলে দেখা যাবে, উইকিলিক্সে ফাঁস হওয়া তথ্যের প্রতিক্রিয়ায় আরব বিশ্বে পশ্চিমা বশংবদ শাসকদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। তিউনিসিয়ায় গণবিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর এর ঢেউ যখন পুরো আরব বিশ্বকে উলটপালট করতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনি লিবিয়া ও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ, আইএস গ্রপের আত্মপ্রকাশ, ইরানের পারমানবিক প্রকল্পসহ মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের বিস্ফোরন্মোখ পরিস্থিতি তৈরী করা হয়। এসব ঘটনা প্রবাহের সাথে সিআইএ, মোসাদসহ পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ইতিমধ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের উইকিলিক্স বোমায় বিশ্বব্যবস্থা, রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের অনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অপতৎপরতার গোপনীয়তা উলঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উইকিলিক্স তথ্যের আগের ও পরের বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষন ও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে হার্ভাড রিভিওতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সাবেক বৃটিশ ডিপ্লোম্যাট কার্নে রস উইকিলিক্স বিশ্বের ক‚টনৈতিক নীতিমালা ও কূটনৈতিক যোগাযোগে বিশাল পরিবর্তন সূচিত করবে বলে মন্তব্য করেছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি ও ক‚টনৈতিক যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারণা তুলে ধরার মত বাস্তব স্থিতিশীল পরিস্থিতি এখনো দেখা যায়নি। নতুন সহস্রব্দের শুরু থেকে একের পর ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশেষত: ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রত্যাশিত সব পরিবর্তন নেতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

আরব-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়া, বায়তুল মোকাদ্দাস ও পূর্ব জেরুজালেমের আন্তর্জাতিক মর্যাদা, ইরানের সাথে ৬ জাতির সমঝোতা চুক্তি, জলবায়ুর পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্জিত ঐকমত্য ও অগ্রগতি ইত্যাদি সবকিছুই নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। লন্ডনে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের অ্যাসাইলাম, ইকুয়েডরের নাগরিকত্ব বাতিল, নিরাপত্তা ও আইনগত সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশন রদ করে তার গ্রেফতার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের সম্ভাব্য প্রক্রিয়ায় মুক্ত গণমাধ্যম, বিশ্বজনমত, তথ্য অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সভ্যতায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের নিরাপত্তার উপর অনাকাঙ্খিত ও অপ্রত্যাশিত আঘাত। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কোনো তথ্য বিকৃতি বা বিভ্রাট ঘটিয়ে থাকলে তার বিচার হতে পারে।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একজন গণমাধ্যমকর্মী। মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরায় তার কাজের মূল কৃতিত্ব নির্ভর করে। তিনি মার্কিন নাগরিক নন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তিনি কোথাও শপথ নেননি। যে সব ঘটনা ঘটেছে বা যা সম্ভাব্য ছিল সে সব বিষয় সম্পর্কে মার্কিন ক’টনীতিক ও গোয়েন্দাদের তারবার্তা হুবুহু প্রকাশ করে দেয়া যদি কোনো অপরাধ না হয়, তাহলে তার এই অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদন্ডের মত সম্ভাব্য শাস্তির আশঙ্কা থাকতে পারে না।

বৃটেনসহ বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে গিয়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও তার আইনজীবীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার জীবন সংশয়ের আশঙ্কার কথা বলেছেন। এহেন বাস্তবতা সামনে রেখে ম্যাগনা কার্টার দেশ গ্রেট বৃটেন কি করে বিশ্বের সামনে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের গোপন তৎপরতার লাখ লাখ উদাহরণ তুলে ধরা গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যার্পণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা’ দেখে মুক্ত বিশ্বের মানবিক মানুষ বিষ্মিত, হতবাক ও শঙ্কিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের সর্বত্র মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারির তথ্য ফাঁস করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ানটেড তালিকাভুক্ত রাশিয়ায় স্বেচ্ছা নির্বাসিত তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড স্নোডেন লন্ডনে আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অন্ধকার মুহূর্ত বলে মন্তব্য করেছেন।

গত ১০ বছরে বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। আগের চেয়ে অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ২০১০ সালে উইকিলিক্স প্রথম বোমা ফাটানো মার্কিন ক্যাবলগেট ফাঁস করার পর বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিনীদের ন্যক্কারজনক ভ’মিকার বিষয়টি অনেকটা প্রমানিত হয়ে যায়। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক বা আইনগতভাবে তাদের তেমন কিছু ছিলনা বলেই ধরে নেয়া যায়। তবে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সুইডেনে একটি নারী ঘটিত মামলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা হয়। এসব মামলার বস্তুনিষ্ঠতা শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিৎ চেহারা উন্মোচন করে দেয়ার মত তৎপরতার বিরুদ্ধে তারা চুপ করে বসে থাকেনি। যেনতেন প্রকারে অ্যাসাঞ্জকে ধরে এনে তার মুখ চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়ার প্রয়াস প্রকাশ্য ও গোপনে অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার সাহসী নেতা ইকুয়েডরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রাফায়েল করেয়া লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে অ্যাসাঞ্জের রাজনৈতিক আশ্রয় মঞ্জুর এবং নাগরিকত্বের মর্যাদা দিয়ে সারাবিশ্বে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিনত হয়েছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইকুয়েডর একটি স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তা হিসেবে এক ধরনের নতুন স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর আটলান্টিক ও আমাজনে অনেক পানি গড়িয়েছে। করেয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি অবশেষে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। লেনিন মোরেনোর এই আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে ইকুয়েডরের স্বাধীনতাই বিকিয়ে দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পশ্চিমা কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এর পশ্চাতে ইকুয়েডরে বিগত নির্বাচনের কারচুপি, অর্থনৈতিক দুর্নীতি এবং আত্মবিক্রয়ের নেপথ্য ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন কেউ কেউ।

প্রকাশ্য বিষয় হিসেবে দেখা গেছে, লন্ডন দূতাবাসে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করিয়ে দেয়ার পর রাতারাতি ইকুয়েডরের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। আএমএফ ৪.২বিলিয়ন ডলারের একটি প্রাদেশিক প্রকল্পের ফান্ডে টাকা ছাড় করে দিয়েছে। আর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে মিথ্যা এবং মার্কিন সরকারের আত্মমর্যাদাহীনতাকেই প্রমাণ করে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মার্কিন ট্রেজারির ইকোনমিক পলিসি বিভাগের সেক্রেটারী এবং ওয়ালস্ট্রীট জার্নালের সহযোগী সম্পাদক ড.ক্রেইগ রবার্টস।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার এবং বিচারের নামে হেনস্থার প্রতিবাদে বিশিষ্ট সাংবাদিক জন পিলজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি মনে করেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে এটাই প্রমানিত হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছে এবং এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে গেস্টাপোর শাসন চলছে। সুইডেন, বৃটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইকুয়েডরের শাসকশ্রেনীর সুসমন্বিত পরিকল্পনার শিকার জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে যে নাটক মঞ্চস্থ হতে চলেছে তা’ ইতিমধ্যেই মানবিক ও সত্যপ্রয়াসী বিশ্বসম্প্রদায় এবং উদার গণতান্ত্রিক ও মুক্তবুদ্ধির প্রতিনিধিদের দ্বারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।

উইকিলিক্স যে সত্য বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছে, তাতে আগামীর বিশ্বব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের দুয়ার খুলবেই। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতিতে সেই পরিবর্তনের জন্য অধীর হয়ে আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশের মহানায়ক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনদের ভাগ্যে যাই ঘটুক, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কুৎসিত মুখোশ খুলে দেয়ার জন্য ইতিহাসে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আগামীর বিশ্ব তাদেরকে মনে রাখবে।

– জামাল উদ্দিন বারী, ইমেইল- [email protected]

ইসলামী বিধান অনুসরণ সূচকে শীর্ষে আয়ারল্যান্ড: সৌদি আরবের অবস্থান ১৩১