Home ইসলাম পবিত্র ঈদুল আযহা ও কুরবানীর ফাযায়েল ও মাসায়েল

পবিত্র ঈদুল আযহা ও কুরবানীর ফাযায়েল ও মাসায়েল

1

।। মুফতী জাকির হোসাইন কাসেমী ।।

ইসলামে মাহে যিলহজ্ব অন্যতম ফযীলত ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। কুরবানীর মত গুরুত্ববহ ইবাদত, ইসলামের অন্যতম রুকন হজ্ব, আরাফার দিনের মত ফযীলতপূর্ণ দিন, এ মাসকে গুরুত্ব ও মর্যাদার দিক দিয়ে ঊর্ধ্বে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। এ মাসের প্রথম দশটি দিন এত মাহাত্ম্যময় যে, পুরো বছরের মধ্যে এ দিনগুলোর চেয়ে শ্রেষ্ঠতম দিন আর নাই। এক এক দিনের রোযা অন্য সময়ের এক এক বছরের রোযা রাখার সমতুল্য।

হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহর ইবাদতের নিমিত্তে যিলহজ্বের প্রথম দশ দিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠতম কোন দিন নাই। এক এক দিনের রোযা এক এক বছর রোযা রাখার সমতুল্য এবং এক এক রাত ইবাদত করা শবে ক্বদরে ইবাদত করার সমতুল্য।

হযরত আবু ক্বাতাদাহ্ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ্ তায়ালা আরাফার এক এক দিনের রোযা দ্বারা পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ্ মাফ করে দিবেন বলে আমি আশা রাখি।

হাদীস বিশারদগণের মতে পুরো বছরের মধ্যে যিলহজ্বের প্রথম দশ দিন- দিন হিসেবে শ্রেষ্ঠ এবং রমযানুল মুবারকের ২১ থেকে ২৯ এবং ৩০ তারিখের রাতগুলো পুরো বছরের রাতগুলো অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ মর্মে উক্ত দিনগুলোর যথাযোগ্য মূল্যায়ন মুসলমানদের জন্য নিতান্ত জরুরী।

তাকবীরে তাশরীকঃ আরাফার দিন অর্থাৎ- ৯ই জিলহজ্ব ফজরের নামায থেকে শুরু করে ১৩ই যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত প্রতি ফরয নামাযান্তে একবার করে তাকবীরে তাশরীক “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আক্বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ” বলা ওয়াজিব। পুরুষ ও মহিলা, একাকী বা জামাআতের নামাযে তাকবীর বলার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নাই। পুরুষ উচ্চস্বরে এবং মহিলা অনুচ্চস্বরে তাকবীর বলবে। তবে নফল, বিতির ও জানাযার নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক নাই।

ঈদের নামাযের নিয়ম ও মাসায়েল

ঈদুল আযহার দিনে যে সকল কাজ সুন্নাত, তন্মধ্যে সকালে মিস্ওয়াক করা, গোসল করা, পাক পবিত্র ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, খুশ্বু লাগানো, ঈদের নামাযের পূর্বে কোন কিছু আহার না করা, ঈদগাহে যেতে উল্লিখিত তাকবীরে তাশরীক উচ্চস্বরে বলতে থাকা, এক রাস্তায় যাওয়া অন্য রাস্তায় প্রত্যাবর্তন করা অন্যতম।

ঈদের নামায দুই রাকাআত। অন্যান্য নামাযের চেয়ে এই দুই রাকাত নামায আদায়ে পার্থক্য হচ্ছে, কেবল প্রথম রাকাআতে তাক্বীরে তাহরীমা বাঁধার পর সুব্হানাকা শেষ পর্যন্ত পড়ে ক্বিরাতের পূর্বে হাত উঠিয়ে তিনটি অতিরিক্ত তাকবীর বলতে হবে। এর প্রথম দু’টিতে হাত ছেড়ে দিতে হবে, তৃতীয় তাকবীরে হাত বাঁধতে হবে। দ্বিতীয় রাকাআতে ক্বিরাতের শেষে রুকুর পূর্বে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে তিনটি অতিরিক্ত তাকবীর বলতে হবে, যার তিনটিতেই হাত ছেড়ে দিতে হবে। চতুর্থ তাকবীর বলে রুকুতে চলে যাবে। ঈদের নামাযান্তে খুতবা পাঠ করা সুন্নাত, কিন্তু শ্রবণ করা ওয়াজিব। ঈদের নামাযে আযান ইক্বামত নাই।

যেখানে ঈদের নামায আদায় করা হবে, সেখানে ঐদিন ফজর নামাযের পর থেকে ঈদের নামাযের পূর্ব পর্যন্ত এবং নামায শেষ হবার পরেও কোন প্রকারের নফল নামায আদায় করা মাকরূহ।

যদি কোন ব্যক্তি এমন সময় ঈদের নামাযে শরীক হন যে, ইমাম সাহেব তাকবীর বলে শেষ করে নিয়েছেন, তাহলে মুক্তাদীকে নিয়্যাত করে সাথে সাথে তাক্বীরগুলো বলে হাত বেঁধে নিতে হবে, যদিও বা ইমাম সাহেব ক্বিরাত পড়া শুরু করে দেন। যদি রুকুতে এসে শরীক হন, তাহলে দুই অবস্থা হতে পারে। যদি নিয়াতের পরে তাকবীর বলে ইমাম সাহেবকে রুকুতে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে নিয়াত করে তাকবীরগুলো বলে নিতে হবে, নতুবা রুকুতে গিয়ে তাসবীহ’র পরিবর্তে তাকবীর বলে নিতে হবে। কিন্তু রুকু অবস্থায় তাকবীরগুলো বলতে হাত উঠাতে হবে না। যদি উক্ত অবস্থায় তাকবীর শেষ করার পূর্বেই ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে যান, তাহলে ঐ ব্যক্তিও সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যাবে এবং যে কয়টি তাকবীর বাকী থেকে গেল, তা মাফ হয়ে যাবে।

যদি কোন ব্যক্তির ঈদের নামাযে প্রথম রাকাআত ছুটে যায়, তাহলে ইমাম সাহেব সালাম ফেরানোর পর উক্ত রাকাআত আদায় করতে হবে। ক্বিরাত শেষ করে রুকুর পূর্বে তাকবীর বলতে হবে। যদিও বা নিয়মানুযায়ী প্রথম রাকাআতে ক্বিরাতের পূর্বেই তাকবীর বলা উচিত ছিল।

কেউ যদি শরীয়ত সম্মত কোন কারণে প্রথম দিন ঈদের নামায না পড়তে পারেন, তাহলে ঈদুল ফিত্রের নামায ২য় দিনে এবং ঈদুল আযহার নামায ১২ তারিখ পর্যন্ত পড়তে পারবেন।

কুরবানীর ফযীলত

হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, অন্য কোন আমল কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানী করা অপেক্ষা আল্লাহ্র নিকট অধিক প্রিয় নয়। যেহেতু কুরবানীকৃত পশুকে ক্বিয়ামতের দিন শিং, পশম, খুর ইত্যাদিসহ ক্বিয়ামতের ময়দানে উত্থিত করা হবে এবং নেকীর পাল্লায় ওজন করা হবে। কুরবানীর পশু জবাই করার সাথে সাথে রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহ্র দরবারে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা কুরবানী করো আনন্দচিত্তে। (তিরমিযী শরীফ)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, কুরবানীর পশু পুলসিরাতের উপর তোমাদের বাহন হবে। সেহেতু তোমরা মোটাতাজা পশু কুরবানী কর।

কুরবানীর মাসআলা

প্রতিটি সুস্থ মস্তিষ্ক, মুক্বীম, প্রাপ্ত বয়স্ক ও মালিকে নিসাব অর্থাৎ-স্বীয় হাজতে আসলিয়া (পানাহার-বাসস্থান, উপার্জনের উপকরণ ইত্যাদি) ব্যতীত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য কিংবা তার সমমূল্যের সম্পদের অধিকারীর উপরই কুরবানী ওয়াজিব। উক্ত সম্পদ স্বর্ণ-রৌপ্যালংকার, ব্যবসার মাল, বাসগৃহ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারিক সম্পদ থেকে অতিরিক্ত যে কোন সম্পদ হোক ঐ সম্পদের উপর এক বছর সময় অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। বরং ঈদের দিন সকালে উক্ত পরিমাণ সম্পদ থাকাই যথেষ্ট।

প্রত্যেক বিত্তবান ব্যক্তির উপর নিজের পক্ষ থেকে কুরবানী করা ওয়াজিব। পুত্র, কন্যা ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে ওয়াজিব নয়, তারা মালিকে নিসাব হলে নিজেদের সম্পদ থেকে নিজেরাই কুরবানী দিবেন।

উদাহরণত: যে পরিবারের একাধিক পুত্র, পিতাসহ উপার্জনকারী রয়েছে এবং ঐ পরিবারের প্রত্যেক পুত্রবধুর যথেষ্ট অলংকারও রয়েছে। পুত্রগণ পৃথক পৃথক লাইনে অর্থ উপার্জন করে থাকেন। সে পরিবার একান্নভুক্ত পরিবার হওয়া সত্ত্বেও কুরবানীর বেলায় প্রত্যেকের স্বতন্ত্র মালিকানা হিসেব করা হবে, তাদের উপার্জন স্বতন্ত্র হওয়ার কারণে। সুতরাং নিয়মানুযায়ী যত জনের নিসাব পরিমাণ মাল থাকবে ততজনের জন্য স্বতন্ত্র কুরবানী করা ওয়াজিব। এক পরিবার মনে করে একটি মাত্র কুরবানী করলে যথেষ্ট হবে না।

কোন অভাবী ব্যক্তি কুরবানীর দিনসমূহের কোন একদিনে কুরবানীর নিয়াতে পশু ক্রয় করলে ঐ পশু কুরবানী করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে যায়।

কোন ব্যক্তির ওয়াজিব কুরবানী তার নির্দেশ ব্যতীত আদায় করলে ঐ ব্যক্তির ওয়াজিব আদায় হবে না। বরং এরূপ কুরবানীর অংশ যে পশুতে শামিল করা হবে ঐ পশুর অংশীদার কোন ব্যক্তিরই কুরবানী আদায় হবে না। (ফাতওয়ায়ে শামী)।

যে ব্যক্তি স্বীয় প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র কিংবা স্ত্রীর ওয়াজিব কুরবানী প্রতি বছর আদায় করে থাকেন। তার জন্য নতুন করে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নাই। তবে অনুমতি নিয়ে নেওয়া ভালো।

কুরবানীর ইবাদত কেবল মাত্র তিন দিনের মধ্যে সীমিত। কুরবানীর দিন হল ১০, ১১, ১২ই যিলহজ্ব। উক্ত দিনগুলোর যে কোন দিন কুরবানী করতে পারবে। তবে প্রথম দিন করাই উত্তম।

যদি কারো অজ্ঞাতভাবে, অলসতায় বা অন্য কোন ওজর বশতঃ কুরবানীর দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যায় এবং কুরবানী করতে না পারে, তাহলে অভাবী ও মিসকীন ব্যক্তিকে কুরবানীর সমমূল্য সাদ্ক্বা করে দিতে হবে। কিন্তু কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানী না করে তার মূল্য সাদকা করলে কুরবানী আদায় হবে না। কেননা, কুরবানী একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। নামায পড়লে যেমন রোযা আদায় হয় না, তদ্রুপ সাদকা করলেও কুরবানী আদায় হয় না।

যেসব এলাকায় ঈদ ও জুম্আর নামায জায়েয আছে, তথায় ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানী জায়েয নাই। যদি ঈদের নামাযের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলে, তাহলে পুনরায় কুরবানী করা ওয়াজিব। কিন্তু যে শহরে একাধিক জায়গায় ঈদের নামায অনুষ্ঠিত হয়, তথায় কোন এক জায়গায় নামায অনুষ্ঠিত হয়ে গেলেই গোটা এলাকার কুরবানী জায়েয হয়ে যাবে।

যদি কোন কারণ বশতঃ প্রথম দিনে ঈদের নামায না হতে পারে, তবে ঈদের নামাযের ওয়াক্ত অতিবাহিত হওয়ার পরেই কুরবানী জায়েয। রাতের বেলায়ও কুরবানী করা বৈধ, তবে অনুত্তম।

কুরবানীর পশু সংক্রান্ত মাসায়েল

শরীয়তে কুরবানী করার জন্য নির্দিষ্ট পশু রয়েছে। গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা দ্বারাই কুরবানী করতে হবে। অন্য কোন পশু দিয়ে কুরবানী করা জায়েয নয়। তার মূল্য অধিক হোক বা কম হোক। এ কারণেই হরিণ বা বণ্য পশু দ্বারা কুরবানী জায়েয নয়।

ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করতে হয়। গরু, মহিষ ও উটে সাত ব্যক্তি অংশীদার হতে পারে। কিন্তু সকলেরই সাওয়াবের নিয়্যাত হতে হবে। এক জনেরও কেবল গোশত ভক্ষণের নিয়্যাত হলে কারো কুরবানী আদায় হবে না।

ছাগল, খাসী, ভেড়া, ও দুম্বা পূর্ণ এক বছর বয়স্ক হতে হবে। তবে যদি এক বছরের কম বয়স্ক ভেড়া ও দুম্বা এক বছর বয়স্ক ভেড়া, দুম্বার সমকক্ষ মোটতাজা মনে হয় তবে তাতেও কুরবানী করলে আদায় হয়ে যাবে। গরু, মহিষ দুই বছর এবং উট পাঁচ বছর বয়স্ক হতে হবে। উল্লিখিত বয়সের চেয়ে কম বয়স্ক পশু দিয়ে কুরবানী আদায় হবে না।

পশু বিক্রেতা যদি তার পশুটিকে কুরবানী উপযুগী বয়স্ক বলে প্রকাশ করে এবং বাহ্যিক দৃষ্টিতে তার উল্টো মনে না হয়, তবে বিক্রেতার কথার উপর আস্থা রাখা শরীয়ত সম্মত।

যে পশুর জন্মগতভাবে শিং থাকে না বা মাঝখানে ভেঙ্গে যায়, তা দিয়ে কুরবানী জায়েয। হ্যাঁ, যে পশুর শিং গোড়া থেকেই উঠে গেছে, যদ্বারা তার মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা থাকে, এরূপ পশু দিয়ে কুরবানী জায়েয নয়।

অন্ধ (এক চক্ষু দৃষ্টিহীন), খোড়া, শ্রবণ শক্তিহীন; এরূপ পশু দিয়ে কুরবানী জায়েয নাই। অনুরূপভাবে যে পশু এত রুগ্ন  ও দুর্বল যে পায়ে হেঁটে যবাই স্থলে যেতে সক্ষম নয়- এরূপ পশু দিয়েও কুরবানী জায়েয নাই। লেজ, কান ইত্যাদি কাটা এবং সম্পূর্ণ বা অধিকাংশ দন্তহীন পশু দিয়ে কুরবানী জায়েয নাই।

অনুরূপ জন্মগতভাবে কানহীন পশু দিয়ে কুরবানী জায়েয নাই। শর্তসিদ্ধ পশু ক্রয় করার পর যদি তাতে এমন কোন দোষ সৃষ্টি হয়, যা কুরবানী বৈধতার পরিপন্থী। তাহলে ক্রয়কারী যদি সামর্থহীন হয় তবে তার জন্য ঐ পশু কুরবানী করা বৈধ। আর যদি বিত্তশালী হয় তাহলে আরেকটি পশু দিয় কুরবানী করা ওয়াজিব।

বিত্তশালী ব্যক্তির কুরবানীর পশু ক্রয় করার পর চুরি হয়ে গেলে, হারিয়ে গেলে বা মারা গেলে তার স্থলে দ্বিতীয় আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব। যদি দ্বিতীয়টি কুরবানী করার পর প্রথমটি পাওয়া যায়, তাহলে সেটিও কুরবানী করে দেওয়া উত্তম। কিন্তু ওয়াজিব নয়। পক্ষান্তরে বিত্তহীন ব্যক্তি যার উপর কুরবানী ওয়াজিব ছিল না, তদুপরি কুরবানী করার জন্য পশু ক্রয় করেছিল, পরে ঐ পশু চুরি হয়ে গেল, মরে গেল বা হারিয়ে গেল। তাহলে তার উপর আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। হ্যাঁ, যদি হারিয়ে যাওয়া পশুটি কুরবানীর দিনগুলোর মধ্যে পেয়ে যায় তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব।

শরীকে কুরবানীর মাসায়েল

গরু, মহিষ, উটে এক এক অংশ করে সাত ব্যক্তির অংশীদার হওয়া জায়েয। কিন্তু কারো অংশ সাত ভাগের এক অংশের চেয়ে কম হতে পারবে না। সকল অংশীদারেরই কুরবানী বা আক্বীক্বার নিয়্যাত হতে হবে অথবা কারো আক্বীক্বা ও কারো কুরবানীর নিয়্যাত হতে হবে। যে কোন একজনের অংশও যদি সাত ভাগের এক অংশের চেয়ে কম হয়, তাহলে কারো কুরবানী আদায় হবে না।

গরু, মহিষ, উটে যদি সাত জনের চেয়ে কম লোক শরীক হয়, যেমন দুই, তিন, পাঁচ, ছয় ইত্যাদি এবং কারো অংশ সাত ভাগের এক অংশের চেয়ে কম না হয়, তাহলে সকলের কুরবানী জায়েয হবে। সাতের অধিক একজনও যদি শরীক হয় অর্থাৎ আট জন হয়, তাহলে কারো কুরবানী হবে না।

কুরবানীর নিয়্যাত ব্যতিরেকে পশু ক্রয় করলে, চাই কুরবানীর দিনগুলোতে হোক বা পূর্বে, ধনী ও নির্ধনী উভয়ের ক্ষেত্রেই শরীকদার নেওয়া এবং তা দিয়ে কুরবানী করা জায়েয। অনুরূপভাবে শরীক না করার নিয়্যাতে ক্রয় করলেও তাতে অন্যকে শরীক করা জায়েয।

মৃত ব্যক্তি যদি ওসীয়ত করে গিয়ে থাকে যে, আমার সম্পদ দিয়ে আমার জন্য কুরবানী করবে, তাহলে তার এক তৃতীয়াংশ সম্পদ থেকে কুরবানী করতে হবে। এবং এর সম্পূর্ণ গোশত গরীব মুসলমানদেরকে বণ্টন করে দেওয়া ওয়াজিব।

মৃত ব্যক্তি ওসীয়ত করুক বা না-ই করুক, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন স্বীয় সম্পদ থেকে তার জন্য নফল কুরবানী করা জায়েয এবং তার গোশত ধনী-দরিদ্র সকলে খেতে পারবে।

স্বীয় সম্পদ দ্বারা নিজ নামে নফল কুরবানী করে এক বা একাধিক মৃতের জন্য সাওয়াব বখশিশ করে দেওয়া জায়েয। এরূপ কুরবানীর গোশত ধনী-নির্ধনী সকলে খেতে পারে।

কেউ কোন কার্য সিদ্ধির জন্য কুরবানীর মান্নত করলে ঐ কাজটি সিদ্ধি হওয়ার পর তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব; চাই সে ব্যক্তি ধনী হোক বা দরিদ্র। মান্নতের কুরবানীর পশুর সম্পূর্ণ গোশত মিসকীনকে দিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। যদি নিজে খায় বা ধনী ব্যক্তিকে খাওয়ায় তাহলে ঐ পরিমাণ গোশতের মূল্য সাদ্কা করা ওয়াজিব।

কুরবানীর সুন্নাত তরীকা

নিজ হস্তে কুরবানী করা উত্তম। তবে হ্যাঁ, নিজে কুরবানী করতে না জানলে বা না পারলে অপরকে দিয়েও করানো যেতে পারে। তবে যবাই করার সময় সেখানে উপস্থিত থাকা ভাল।

শুধুমাত্র মনে মনে কুরবানীর নিয়্যাত করাই যথেষ্ট। মৌখিক উচ্চারণ জরুরী নয়। কিন্তু যবাই করার সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আক্বার” মুখে বলা জরুরী। মাসনূন তরীকা এই, যখন যবাই করার জন্য পশুটিকে ক্বিবলামুখী করে শোয়াবে, তখন এই আয়াত শরীফ পাঠ করবে- “ইন্নী ওয়াজ্জাহ্তু ওয়াজ্ হিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস্ সামা ওয়াতি ওয়াল র্আদা হানীফাঁউ ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন, ইন্না সালাতী ওয়ানুসুকী ওয়া মাহ্ইয়া-ইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন”।

অতঃপর “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আক্বার” বলে যবাই করবে। যবাই করার পর এই দোয়া পাঠ করবে। “আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বালহু মিন্নী কামা তাক্বাব্বালতা মিন হাবীবিকা মুহাম্মাদিন ওয়া খালীলিকা ইবরাহীমা আলাই হিমাস্ সালাম”।

মুসলমান নর-নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক, পাকী-নাপাকী, জ্ঞানী-অজ্ঞানী যে কারো যবাইকৃত পশুর গোশত ভক্ষণ করা হালাল। তবে শর্ত হচ্ছে, যবাই করার সময় বিসমিল্লাহ্ অবশ্যই পড়তে হবে এবং যবাই করার নিয়ম কানূন জানতে হবে। কিন্তু যারা কেবলমাত্র পশু ধরবে তাদের বিসমিল্লাহ্ পড়া জরুরী নয়।

পশু যবাই করার পূর্বে ছুরি খুব ধার করে নিতে হবে এবং এক পশুর সামনে অন্য পশু যবাই করবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে জীবনী শক্তি নিঃশেষ না হয়ে যায়, তাড়াহুড়ার বশর্বতী হয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত যবাইকৃত পশুর চামড়া খসানো বা গোশত কাটায় লিপ্ত হবে না। কারণ, তাতে পশুর কষ্ট হয়।

যবাই করার শরীয়ত সম্মত নিয়ম হচ্ছে, পশুর শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং রক্ত চলাচলের মোটা মোটা দু’টি ধমনীসহ এ চারটির মধ্যে কমপক্ষে যে কোন তিনটি অবশ্যই কাটতে হবে; তাহলে ভক্ষণ হালাল হবে, নতুবা হারাম।

কুরবানীর পশু কুরবানীর কিছু দিন পূর্বে ক্রয় করে লালন-পালন করা উত্তম। কুরবানীর পশুর দুধ দোহন বা পশম কাটা নাজায়েয। কেউ এরূপ করলে উক্ত দুধ বা পশম বা তার সমপরিমাণ মূল্য সাদ্কা করে দেওয়া ওয়াজিব। কিন্তু মালিক বিত্তশালী হলে এবং তার ঘাস পানির ব্যবস্থা করলে ঐ ব্যক্তির জন্য সাদ্কা করা ওয়াজিব নয়।

কুরবানীর পশু যবাই করার পূর্বে বা যবাই করার সময় জীবিত বাচ্চা প্রসব করলে সেটাকেও যবাই করে দিতে হবে। কিন্তু যবাই করে তার গোশত কিংবা পারতপক্ষে তার মূল্য সাদকা করে দিতে হবে। কারো কারো মতে জীবিত সাদকা করাই মুস্তাহাব।

বছরের অন্যান্য সময় যেমন হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগল ইত্যাদি যবাই করা জায়েয, তদ্রুপ যিলহজ্বের চাঁদ উদয়ের পরে দশ তারিখ পর্যন্তও জায়েয। সাধারণ মানুষের ধারণা, যিলহজ্বের চাঁদ উঠার পর কোন পশুপাখী যবাই করা নাজায়েয। এ কথার আদৌ কোন ভিত্তি নাই, সম্পূর্ণ অবান্তর। তবে কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানীর নিয়্যাতে হাঁস-মুরগী দিয়ে কুরবানী জায়েয নয়, তবে হালাল- এমন পশুপাখী যবাই করা মাকরূহ্ হবে। (ফাতওয়ায়ে আলমগিরিয়্যা)।

কুরবানীর গোশতের মাসাআলা

যে পশুতে একাধিক অংশীদার হবে তার গোশত ওজন করে ভাগ করা ওয়াজিব। অনুমান করে ভাগ করা নাজায়েয। হ্যাঁ, যদি গোশ্তের সাথে গোটা মাথা গোটা পা ইত্যাদি এমনভাবে ভাগ করে নেয় যে, মাথা ওয়ালার ভাগে গোশত কম হয়, তাহলে ওজন করে ভাগ করা জরুরী নয়। (দুররুল মুখতার, ফাতওয়ায়ে শামী, হিদায়া)।

কুরবানীর গোশত তিনভাগ করে একভাগ পরিবার পরিজনের জন্য রাখা, একভাগ আত্মীয়-স্বজনদেরকে দেওয়া, একভাগ গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া মুস্তাহাব। এটা জরুরী নয় বিধায় বন্টন ব্যতীত সম্পূর্ণ গোশত পরিবার পরিজনের জন্য রাখতেও দোষ নাই। তবে এটা অনুত্তম।

স্বেচ্ছায় কোন মৃতের নামে সাওয়াব পৌঁছানোর জন্য কুরবানী করলে তার গোশত নিজে খেতে পারবে, বিলাতে পারবে এবং অপরকেও খাওয়াতে পারবে। কুরবানীর গোশত বিক্রয় করা সম্পূর্ণ হারাম।

যবাইকারী ও গোশত তৈয়ারকারীর মজুরী হিসেবে কুরবানীর গোশত বা চামড়া দেওয়া জায়েয নাই। সুতরাং তাদের মজুরী নগদ টাকা বা ভিন্নভাবে আদায় করতে হবে।

যেসব মজদুর মালিকের ঘরে পানাহার করে, তাদের খাবার, তরকারী ইত্যাদি মজুরীর মধ্যে শামিল। কেননা, পানাহার করা না করার কারণে বেতনের তারতম্য হয়ে থাকে। এ কারণে তাদেরকে কুরবানীর গোশত খাওয়ালে প্রকৃতপক্ষে তা মজুরী হিসেবে দেওয়া এবং বিক্রি করায় গণ্য হয়। সুতরাং এ অসুবিধা থেকে বাঁচতে হলে, তাদেরকে ভিন্ন তরকারী দিয়ে খাবার দিতে হবে এবং অতিরিক্ত তরকারী হিসেবে কুরবানীর গোশত দেওয়া যাবে।

যদি সকল অংশীদার মিলে নিজ নিজ গোশত একত্রে পাকিয়ে খায় বা অন্যকে খাওয়ায়, তাহলে কাঁচা গোশত বন্টনের ন্যায় ওজন করে খাওয়ার প্রয়োজন নাই।

কুরবানীর চামড়ার মাসআলা

কুরবানীর চামড়া কোন কাজ বা খিদমতের বিনিময় হিসেবে দেওয়া জায়েয নয় বিধায় মসজিদের মুয়ায্যিন, ইমাম বা অন্য কোন কর্মচারীকে তার কাজের বিনিময় বা পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয নাই।

দ্বীনি মাদরাসার গরীব ছাত্রদেরকে কুরবানীর চামড়া দান করা উত্তম। এতে দু’টি দিক রয়েছে, একদিকে গরীবকে দান করার সাওয়াব, অপর দিকে দ্বীনি ইলম প্রচার-প্রসার তথা দ্বীনি খিদমতের সাওয়াব। কিন্তু শিক্ষকগণের বেতন কিংবা অন্যান্য কর্মচারীদের পারিশ্রমিক কুরবানীর চামড়ার অর্থ থেকে দেওয়া জায়েয নাই। কুরবানীর চামড়া বিক্রি করে তার মূল্য মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদি নির্মাণ ও মেরামত কাজে ব্যয় করা জায়েয নাই।

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডটকম এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।
ই-মেইল- [email protected]