Home ওপেনিয়ন কিশোর গ্যাং কালচার: শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চাহীনতার ফসল

কিশোর গ্যাং কালচার: শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চাহীনতার ফসল

0

।। কামরুল হাসান দর্পণ ।।

গত কয়েক দিন ধরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ‘কিশোর গ্যাং’-এর সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। আমাদের উঠতি বয়সী কিশোররা কতটা বিপজ্জনক ও বিপথে ধাবিত এবং এ থেকে উত্তরণের পথ কি, তা সমাজ বিশ্লেষকদের অভিমত সহকারে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনগুলো পড়ে, যে কোনো সচেতন ব্যক্তি ও মহলের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। কিশোর গ্যাংদের অপরাধের ধরণ দেখে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কোথায় ঠেলে দিচ্ছি? তাদের কি কোনো অভিভাবক নেই? এসব প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহর, পাড়া, মহল্লায় যেভাবে কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হয়েছে, এসব গ্যাংয়ের সাথে জড়িতদের কোনো অভিভাবক নেই। তাদের নিবৃত্ত করারও যেন কেউ নেই। যদি থাকত, তাহলে এইট-নাইনে পড়ুয়া সন্তানের সন্ত্রাসী, মাস্তান হয়ে উঠার কোনো কারণ থাকতে পারে না। এই বয়সে তাদের যেখানে স্কুলে যাওয়া-আসা এবং পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকার কথা, তা না করে নিজে গ্যাং তৈরি করা বা গ্যাংয়ের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

এক্ষেত্রে গ্যাং চক্রের সাথে জড়িত কিশোরদের বাবা-মা যে প্রধানত দায়ী তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এরপর দায়ী, জনপ্রতিনিধি, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষক। এসব অভিভাবকরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না বলেই কিশোররা পথভ্রষ্ট হয়ে বিপদগামী হয়ে উঠছে। যেসব কিশোর গ্যাং চক্র গড়ে উঠেছে, তাদের অপকর্মের ধরণ দেখলে আঁৎকে উঠতে হয়। খুন, ইভটিজিং, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবন ও কেনাবেচা, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারিসহ হেন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করছে না।

এটা কি কল্পনা করা যায়, ১৪-১৫ বছরের নাবালকরা পাড়া-মহল্লার মোড়ে বসে তাদের চেয়ে বয়সে বড় কোনো মেয়েকে এমনকি মায়ের বয়সী মহিলাকে ইভ টিজিং করছে? কোনো কোনো ক্ষেত্রে দল বেঁধে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করছে? রাস্তার মোড়ে দল বেঁধে বসে মাদক গ্রহণ, প্রতিপক্ষ আরেক গ্রæপের সঙ্গে মারামারি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছে?

[ দুই ]

পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় শতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে। শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ৫০-এর অধিক। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা গড়ে ১৫ জন। এ হিসেবে সারাদেশে প্রায় দেড় হাজার কিশোর গ্যাং চক্রে জড়িত। ১৬ কোটি মানুষের দেশে সংখ্যাটিকে নিতান্ত ক্ষুদ্র মনে হলেও এই কিশোররা যে সমাজের জন্য একেকটি ডিনামাইট হয়ে উঠছে, তা ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই।

অসংখ্য মানুষ মারার জন্য একটি ডিনামাইটই কিংবা হাজার হাজার মানুষের মিছিল-সমাবেশ পন্ড করে দিতে একটি ককটেল বিস্ফোরণ বা বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজই যথেষ্ট। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দিক-বেদিক ছুটতে শুরু করে। কাজেই দেড় সহস্রাধিক কিশোর গ্যাং যেভাবে ভয়ংকর ও হিংস্র হয়ে উঠছে, তাতে গোটা সমাজ ব্যবস্থা এবং দেশকে অস্থিতিশীল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

দুই দশক আগে এই গ্যাং চক্রের যখন সূত্রপাত হয়, তখন এত ব্যাপক আকার ধারণ করেনি। এর প্রতিকার না হওয়ায় ধীরে ধীরে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। অনেকটা কচু গাছ কাটতে কাটতে ডাকাতে পরিণত হওয়ার মতো। এখন যেভাবে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তাতে সমাজে সচ্ছন্দে ও নিরাপদে চলা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিশোর গ্যাং চক্রের সদস্যদের বেশ-ভুষা, কথা-বার্তা ও আচারণ-আচরণ দেখে যে কেউ বিভ্রত হয়ে একশ’ হাত দূর দিয়ে চলে যায়। এমনকি পাড়া-মহল্লার দেয়ালে দেয়ালে গ্যাং চক্রের নাম দেখেও আঁৎকে উঠে অন্য দিকে হাঁটা শুরু করে।

এই যে চলে যাওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া, এটাই কিশোর গ্যাংদের শক্তির মূল উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা পুলকিত হয়ে মনে করছে, মহল্লার মান্যগণ্যরাও তাদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে। তাদের ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করছে। কাজেই আমাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কেউ নেই। তারা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য ভাবতে শুরু করেছে এবং অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি করে চলেছে। তাদের একমাত্র প্রতিদ্ব›দ্বী প্রতিপক্ষ আরেক গ্যাং গ্রæপ। তাদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা। দুঃখের বিষয়, আমরা যারা এড়িয়ে যাচ্ছি, তারা খোঁজ নিচ্ছি না, বিপদগামী এসব কিশোর কারা? তারা কোন পরিবারের সদস্য বা কারা এদের বাবা-মা?

সাধারণত পাড়া-মহল্লায় যারা বসবাস করে, তাদের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের চেনা-জানা থাকে। এই পরিচিতির সূত্র ধরে যে কিশোরদের বাবা-মা ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলবে, এই দায়িত্বটুকু পালন করছে না। অনেকটা উট পাখির বালিতে মুখ গুঁজে ঝড় উপেক্ষা করার মতো। কিশোর গ্যাং চক্রের সাথে যারা জড়িত, পত্র-পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের বেশির ভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পাশাপাশি রয়েছে উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান। বলা হচ্ছে, এসব কিশোররা প্রযুক্তি ও ভিনদেশি অপসংস্কৃতির শিকার হয়ে বিপদগামী হয়ে পড়ছে। ভিডিও গেম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পর্ণোগ্রাফি, ভিনদেশি অশালীন সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।

এ কথা অনস্বীকার্য, তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা প্রতিরোধ করা যাবে না। তা এগিয়ে যাবেই। এই এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার ব্যবহার-অপব্যবহারের বিষয়টির দিকে সতর্ক দৃষ্টি দেয়ার মধ্যেই এর কল্যাণ নিহিত। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের অধিকাংশ অভিভাবক এ দিকটি খেয়াল করছে না। তারা মনে করছে, তার সন্তান প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হচ্ছে এবং সে দারুণ পারদর্শী হয়ে উঠছে- এটা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। অনেকে বাহ্! বলে আত্মতুষ্টিতে ভোগেন। আমার সন্তান আমার চেয়ে অনেক বেশি জানছে-বুঝছে, নেট চালাতে পারছে- এই ভেবে পুলকিত হন। অথচ এই আনন্দিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তারা যে সন্তানকে কত ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা একবারও চিন্তা করছেন না। এটা ভাবছেন না, তথ্য-প্রযুক্তির ভয়াবহ দিক রয়েছে।

ভয়ংকর বিভিন্ন বিষয় মূহুর্তেই সামনে এসে হাজির হয়। পর্ণোগ্রাফি থেকে শুরু করে ত্রাস সৃষ্টিকারি বিভিন্ন উপকরণ অটোমেটিক্যালি চলে আসে। নিষিদ্ধ এসব বিষয় শিশু-কিশোরের মনে কৌতুহল সৃষ্টি করে এবং তা দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিশোর গ্যাংয়ের সাথে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই প্রযুক্তির এই অপব্যবহারে উৎসাহী হয়ে অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠেছে। ফ্যান্টাসিতে ভুগে বা হিরোইজমে আসক্ত হয়ে, নিজেকে পাওয়ারফুল ভাবা থেকেই গ্যাংয়ের সাথে জড়িয়ে পড়ছে বা নিজে গ্যাং তৈরি করছে। যারা তাদের এই হিরোইজমকে অস্বীকার করে, তাদেরকে বশ্যতা স্বীকার করাতে আক্রমণ করছে। এক অপরাধ থেকে আরেক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এ ধারাবাহিকতায় খুন, ধর্ষণ, মাদক, ছিনতাইয়ের মতো ভয়ানক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। তাদের অভিভাবকদের অনেকে হয়তো জানেনই না, তার সন্তান কত ভয়াবহ অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়েছে। অনেকে হয়তো ছেলের এমন অপকর্মের বাহাদুরিতে মনে মনে খুশি হন কিংবা তিনিও তার সঙ্গে শামিল হন। সন্তানের এই অপরাধ কর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত-অজ্ঞাত উভয় শ্রেণীর অভিভাবকই যে নিজেদের এবং সমাজকে বিপদে ফেলছেন তা বুঝছেন না বা বুঝতে চাইছেন না। কুপথে সন্তানের চলে যাওয়ার যন্ত্রণা কি, তার অসংখ্য নজির চোখের সামনে থাকলেও তা আমলে নিচ্ছেন না।

[ তিন ]

প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু পাশবিক মানসিকতা থাকে। এই মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ ও দমন করেই আদিকাল থেকেই মানুষ সভ্যতার দিকে ধাবিত হয়েছে এবং সভ্য হয়ে উঠেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, যতই আধুনিক হচ্ছে, পাশবিকতা এবং কৃপ্রবৃত্তিরও ভয়ংকর প্রকাশ ঘটাচ্ছে। তা নাহলে, যে কিশোরের বাস্তব জীবনের অনেক কিছুই বোঝার মতো জ্ঞান অর্জিত হয়নি বা তার সে জ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক পর্যায়, সে কেন পশুবত আচরণ করবে। খুন, ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটাবে।

এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই কিশোরদের অভিভাবকরাও নিজেদের সভ্যতার কথা ভুলে সন্তানদের সভ্য করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। শুধু কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িতরাই নয়, তরুণ, যুবক, বয়স্কসহ প্রায় সব শ্রেণীর কিছু মানুষ খুন, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক চোরাচালানসহ হেন কোনো অপরাধ নেই যাতে জাড়াচ্ছে না। দেশব্যাপী অপরাধের যে কুপ্রবাহের জোয়ার বইছে, তার রাশ টেনে ধরার কোনো উদ্যোগই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা, সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরই অনেক সদস্যই ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

রক্ষকই যদি ভক্ষক হয়ে উঠে, তাহলে দুর্বৃত্তের উল্লাসে মেতে উঠাই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য কীভাবে অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়েছে, তার একটি পরিসংখ্যান দিলেও বোঝা যাবে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন অপরাধে ৭৪ হাজার পুলিশের সাজা হয়েছে। এর মধ্যে কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছে। শাস্তির মধ্যে লঘু দন্ড, সতর্ক করা থেকে শুরু করে চাকুরিচ্যুতি রয়েছে। অর্থাৎ দেশের ২ লাখ ৫ হাজার পুলিশ সদস্যর মধ্যে এক তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য অপরাধে জড়িত। একটি দেশে যদি হাজার হাজার পুলিশ সদস্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তবে সে দেশে কি মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারে?

পুলিশ কর্তৃপক্ষ অনেকটা আত্মতৃপ্তি নিয়ে বলছে, এখন পুলিশের কেউই অপরাধ করে পার পাচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশ কেন অপরাধে জড়াবে? তাদের কেন শাস্তি পেতে হবে? তাদের দায়িত্বই তো অপরাধ ও অপরাধীদের দমন করে জনসেবা করা। এই যে হাজার হাজার পুলিশ সদস্যকে শাস্তি দেয়া হলো, এ থেকে কি প্রমাণিত হয় না, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটি ব্যর্থ হচ্ছে? এই ব্যর্থতার ফসলই সব ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি এবং সর্বশেষ কিশোর গ্যাংয়ের দুর্দমনীয় হওয়া?

সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে দেশের সর্বত্র যে ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় চলছে তা রোধ করতে না পারলে আগামী ১০ বছরে দেশে নিরাপত্তা বলতে কিছু থাকবে না। তখন সমাজে শান্তিতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আত্মরক্ষার্থে সাধারণ মানুষও একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক এবং প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠবে। গত পাঁচ বছরে মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে।

এ প্রবণতার মূল কারণ, অপরাধ দমনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকা, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নীতি-নৈতিকতা থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়া বা উপেক্ষা করে চলা। অধিকাংশ মানুষের সুকুমারবৃত্তি, লোভ-লালসা ও ক্রোধের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে অন্যায় ঘটতে দেখেও প্রতিবাদের পরিবর্তে না দেখার ভান করছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যে হাজার বছরের ঐতিহ্য, তা হারিয়ে যাচ্ছে। সিনিয়র-জুনিয়রের আচরণের মধ্যে যে ধরনের ব্যবধান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা প্রয়োজন, তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাদের মধ্যকার আচরণ সমবয়স্ক হয়ে গেছে।

পরিবারের অভিভাকরা সন্তানের প্রতি উদাসীন হয়ে যাচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই সন্তান কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, মোবাইলে, ফেসবুকে কাদের সাথে চ্যাট করছে, এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। এমনকি সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে একবেলা একসঙ্গে খেতেও বসছে না। অভিভাবকদের এই উদাসীনতা ও প্রশ্রয় থেকেই সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি হচ্ছে।

পরিবারের অভিভাবকের কাছে যদি জুনিয়র সদস্যদের জবাবদিহিতা না থাকে, তবে পরিবার ও সমাজ কোনভাবেই স্থির থাকতে পারে না। তারা দুর্নিবার হয়ে উঠে। সন্ত্রাসী, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং থেকে শুরু করে খুন-খারাবির ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। এমনকি আপন মানুষকেও খুন করতে দ্বিধা করে না। পারিবারিক শাসন-বারন এবং নিয়ম-নীতির বিষয়টি যে পরিবারের অভিভাবকরা জানে না, এমন ভাবার কারণ নেই। তারা নিশ্চয়ই জানে।

মূল বিষয়টি হচ্ছে, তারা আমলে নিচ্ছে না। শুধু পরিবারের অভিভাবকই নয়, সমাজে যাদের প্রভাব বিস্তার করার সক্ষমতা রয়েছে, তাদের সামাজিক দায়িত্ব পালনের অবহেলাও সমাজকে বিশৃঙ্খল করে দিচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সমাজে বর্তমানে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তার সঙ্গে পরিবারগুলো তাল মেলাতে পারছে না।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজ করছে অসম প্রতিযোগিতা। ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর একটি শ্রেণী তাদের মূল্যবোধ হারাচ্ছে। এ অবস্থার জন্য রাষ্ট্রের উদাসীনতা দায়ী। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খোলামেলা অনুষ্ঠান ও নিষিদ্ধ সম্পর্কের দেশি-বিদেশি বাংলা সিরিয়াল আমাদের পারিবারিক বন্ধন শিথিল করে দিচ্ছে। মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে।

মানুষ তার লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারছে না। সব মিলিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতায় মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক সম্পর্কে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে যে দায়িত্ব পালন করার কথা, তারা এ দায়িত্ব পালন করছেন না। ফলশ্রæতিতে কিশোর গ্যাংয়ের মতো নতুন নতুন অপরাধী চক্রের সৃষ্টি হচ্ছে।

[ চার ]

পারিবারিক, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসনÑএসব কোন আইনের মাধ্যমে হয়নি। জীবনকে সুশৃঙ্খল ও সঠিকপথে পরিচালিত করার লক্ষ্যেই মানুষ নিজস্বার্থে এসব মানবিক গুণাবলী ধারণ করেছে। তা নাহলে মানুষ সেই আদিম যুগেই পড়ে থাকত, আজকের সভ্যযুগে বসবাস করত না। আইনের মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে হয়তো দৃষ্টান্ত স্থাপন ও অন্যদের সতর্ক করা সম্ভব। তবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে শোধরানো সম্ভব নয়।

এজন্য পরিবার ও সমাজের সৎ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত। পরিবার ঠিক থাকলে সমাজে তার প্রতিফলন ঘটে। পরিবারের অভিভাবক শ্রেণীকেই এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবারের নবীণ সদস্যদের আচার-আচরণ ও চলাফেরার দিকে তী² নজর রাখতে হবে। তাদের সামনে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধের চেতনাগুলো তুলে ধরতে হবে। পাড়া-মহল্লায় প্রভাবশালীদের নিজ নিজ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজনে অপকর্মে লিপ্তদের পরিবারের অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে হবে।

স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে শিক্ষকদের মোটিভেশনাল ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। জুম্মার নামাজের সময় মসজিদের ইমামদের এ ব্যাপারে নিয়মিত বয়ান দেয়া উচিত। এখন আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, কেউ ধর্মীয় কথা বললে তাকে বক্রদৃষ্টিতে দেখা হয়। কেউ কথা বলা থামিয়ে দেয়। অথচ সারা বিশ্বেই এখন মানুষ স্ব স্ব ধর্মের প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে।

এমনকি উন্নত বিশ্বের সিনেমাগুলোও ধর্মকে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করছে। এর মূল অর্থই হচ্ছে, মানুষকে মানবিক করে তোলা। আমাদের দেশ নিশ্চয়ই তাদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নয়। তবে আমরা যে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধ থেকে তাদের চেয়ে এগিয়ে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। এই মূল্যবোধগুলো প্রত্যেকের মধ্যে সদা জাগ্রত থাকলেই পরিবার, সমাজ ও দেশ শান্তিতে থাকতে পারবে।

এসব মূল্যবোধ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জাগানো সম্ভব নয়। আমাদের প্রত্যেককে স্ব স্ব অবস্থান থেকে আমাদের চিরায়ত পারিবারিক ও সামাজিক প্রথা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের দিকে দৃষ্টি দিলেই এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। আধুনিকতা ও অপসংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিলে সন্তানদের কি ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়, তা তো আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। যেসব বাবা-মা’র সন্তান কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িয়েছে তাদের যেমন সতর্ক হতে হবে, তেমনি তাদের দেখে অন্য বাবা-মাদেরও নিজ সন্তানের প্রতি খেয়াল দিতে হবে।

অন্যদিকে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করা প্রয়োজন। তাদের শুধু অপরাধ বা অপরাধীদের ধরণ নিয়ে গবেষণা করলে চলবে না। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবর্তন কিভাবে হচ্ছে, কোন দিকে ধাবিত, এসব বিষয় নিয়েও গবেষণা করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.