Home ওপিনিয়ন মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ বাস্তবতা ও বিশ্বশান্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ বাস্তবতা ও বিশ্বশান্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

।। মাওলানা মুনির আহমদ ।।

মধ্যপ্রাচ্য আজ এমন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে, যেখানে যুদ্ধ এড়ানোর ঘোষণা যত উচ্চারিত হচ্ছে, বাস্তবে ততই যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। সামরিক প্রস্তুতি, কৌশলগত অবস্থান ও কূটনৈতিক দ্বৈততার সমন্বয়ে একটি বিস্ফোরণোন্মুখ বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যা শুধু আঞ্চলিক নয়- বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা নিছক দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নয়; বরং বহুমাত্রিক শক্তি-সমীকরণের সংঘর্ষ। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে, অন্যদিকে স্থল অভিযানের সম্ভাবনা অস্বীকার করে কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখছে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের অস্পষ্টতা প্রায়ই বৃহৎ সংঘাতের পূর্বাভাস বহন করে। অপরদিকে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো সরাসরি আক্রমণ একটি বিস্তৃত প্রতিরোধের জন্ম দেবে, যা দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।

এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- সীমিত যুদ্ধের ভ্রান্ত ধারণা। সামরিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো সংঘাত একবার শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি প্রবলতর হয়ে ওঠে। ইরান-সংক্রান্ত সম্ভাব্য সংঘাত আরও জটিল; কারণ, দেশটি সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি প্রক্সি বাহিনী, গেরিলা কৌশল এবং আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে একটি আঞ্চলিক সংঘর্ষ খুব সহজেই বহুস্তরীয় বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

এখানে বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকাও গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। রাশিয়া ও চীন সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক কৌশল, বিশেষত ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ; এই সংঘাতকে ত্বরান্বিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে ভুল হিসাব বা সীমিত সংঘর্ষ মুহূর্তেই বৃহৎ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

আরও পড়তে পারেন-

অন্যদিকে, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো একটি নীরব ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অনুসরণ করছে। তারা একদিকে ইরানের প্রভাবকে সীমিত করতে চায়, অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে সচেষ্ট। পাকিস্তান, তুরস্ক ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যস্থতার উদ্যোগ এই সংকট নিরসনে একটি সম্ভাবনার দ্বার খুললেও পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে জটিল রেখেছে।

ইরানের কৌশলগত অবস্থানও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সামরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে তারা টিকে থাকার এবং প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করার নীতি অনুসরণ করছে। অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিকল্প ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে তারা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে সংঘাত কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- কেউই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দ্বৈত অবস্থানই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় উৎস। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো সংঘাতগুলো শুরু করা যত সহজ ছিল, শেষ করা ততই কঠিন হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের সংঘাত মানবজাতির জন্য এক গভীর বিপর্যয়। ইসলাম শান্তি, ন্যায় ও মানবজীবনের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল’। (সূরা মায়িদা- ৩২)। অতএব, যুদ্ধ ও ধ্বংসের পরিবর্তে সংলাপ, সংযম ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধানই হওয়া উচিত সমঝোতা উদ্যোগের মূল ভিত্তি।

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট শুধু একটি অঞ্চলের নয়; এটি পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। শক্তির অহংকার, কৌশলগত অস্পষ্টতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে, তবে তার পরিণতি হবে সর্বজনীন বিপর্যয়। তাই বিশ্বনেতাদের উচিত দায়িত্বশীলতা, ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ সুগম করা। মানবতার কল্যাণেই এ মুহূর্তে সেটিই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখক: শিক্ষক, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম, সম্পাদক- উম্মাহ২৪ডটকম।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।