Home প্রবন্ধ-নিবন্ধ সুদের কুফল ও ক্ষতিকর প্রভাব

সুদের কুফল ও ক্ষতিকর প্রভাব

1

।। মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী ।।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুদ ভিত্তিক। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের সরকারী বেসরকারী সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহে যে লেন-দেন এবং ঋণদান পদ্ধতি চালু আছে, তা মূলতঃ সুদ ভিত্তিক। সাহায্যের নামে এনজিওগুলো যে ঋণ দান করে, তাও সুদভিত্তিক। গ্রামে-গঞ্জে এক শ্রেণীর মানুষ ধার হিসেবে গরীব জনসাধারণকে টাকা দিয়ে থাকে। তাতেও তারা উচ্চ হারে সুদ নেয়। স্বল্পমেয়াদী দীর্ঘ মেয়াদী সকল  প্রকার ঋণ ব্যবস্থায় বিভিন্ন হারে সুদের প্রচলন রয়েছে। অথচ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আন্যান্য পদ্ধতি সুদ নির্ভর না হয়ে ইসলামী শরীয়া মোতাবেক পরিচালিত হওয়াই কাম্য ছিল।

একটি দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ব্যাংক ব্যবস্থা ভাল হলে দেশের উন্নয়ন ভাল হয়। দেশ সামনের দিকে অগ্রসর হয়। আর এই ব্যাংক ব্যবস্থা ও ঋণদান পদ্ধতি হতে হবে সহজ ও গ্রহণযোগ্য। যাতে করে ঋণ গ্রহীতারা ঋণ গ্রহণের পর তা থেকে সুবিধা ভোগের পর সহজে তা পরিশোধ করতে পারে এবং যেন ঋণের ভারে জর্জরিত না হতে হয়।

কিন্তু এটা ধ্রুব সত্য যে, সুদ ভিত্তিক ঋণদান ব্যবস্থায় তা কখনোই সম্ভব নয়। সুদরে টাকা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে গিয়ে দাড়ায়, অনেকে তা আর পরিশোধ করতে পারে না। জানা যায়, সুদের টাকা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে বাড়তে পাহাড় সমান হয়ে যায়। ফলে ঋণের টাক পরিশোধ না করার কারণে বা অক্ষমতার দরুন শিল্প কারখানায় লালবাতি জ্বলে।

আবার কেউ ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করে বা কেউ ঋণ পরিশোধ করতে চায় না বা অস্বীকার করে। ফলে ঋণদাতা সংস্থা ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে জটিলতার সম্মুখীন হয়। এটা কেবল উচ্চ হারে সুদ ভিত্তিক ঋণ দান পদ্ধতির কারণেই হয়ে থাকে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। বাস্তব ক্ষেত্রেও তাই দেখা যায়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এর কুফলটা প্রকট আকার ধারণ করে।

সাময়িক অভাব অনটনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঋণ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। গরীব, অসহায়, দরিদ্র মানুষ নির্ধারিত মোয়াদান্তে ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খেয়ে যায়। দেখা যায়, অনেক সময় সুদে আসলে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আর গ্রাম-গঞ্জের দরিদ্র মানুষেরা ধনীদের নিকট থেকে উচ্চহারে সুদের উপর ঋণ নেয়ার ফলে তা বৃদ্ধি পেয়ে কয়েকগুণ হয়েছে। তখন তারা হাড়ে হাড়ে টের পায়, সুদের উপর ঋণ নেয়ার পরিণামটা কি দাঁড়ায়। বাধ্য হয়ে গরু-ছাগল ভিটে-মাটি, গহনা ইত্যাদি বিক্রি করে ঋণের দায় থেকে মুক্ত হয়ে সর্বহারা হয়ে যায়। গরীব দরিদ্র মানুষেরা আর্থিক অসচ্ছলতার সুযোগে এনজিওগুলো দারিদ্রতা বিমোচন, সচ্ছলতা ও স্বনির্ভরতার লোভ দেখিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায়।

দরিদ্র সাধারণ মানুষগুলো প্রথমে বুঝতে না পেরে তাদের নিকট থেকে স্বল্প মেয়াদী, দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ গ্রহণ করে। মেয়াদান্তে সুদসহ মোটা অংকের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে সব বিকিয়ে হয়ে যায় সর্বস্বাš। আবার কেউ সুদের উপর কিস্তিতে নেয়। নির্ধারিত সময়ে কিস্তির টাকা দিতে না পারলে হতে হয় অপমানিত আর লাঞ্ছিত।

তবে এ কথা স্বীকার করতে আপত্তি নেই যে, ঋণ গ্রহণ করলে সাময়িকভাবে হলেও উপকৃত হওয়া যায়। তাৎক্ষণিক অভাব অনটন মোচন, কন্যাদায় ব্যক্তির বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য, দরিদ্র মানুষের অনাহারি ছেলে-মেয়ের জীবন বাঁচানোর জন্য অভাবী কৃষকের হালের বলদ ক্রয়ের জন্য, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংসার পরিচালনার নিমিত্তে, ছোটবড় শিল্প-কারখানা স্থাপন ইত্যাদির ক্ষেত্রে সুদ ভিত্তিক হলেও ঋণ গ্রহণ বিশেষ ফলদায়ক বলে অনেকে জোরালো কথা বলেন।

তাদের বক্তব্য হলো, এসব ক্ষেত্র  তো বটেই, তাছাড়া যেখানে কিছু না কিছু উপকার পাওয়া যায়, সেখানে সুদের উপর টাকা ধার নিতে দোষের কি আছে। তারা আরো বলেন, যে কৃষক হালের বলদ কিনতে পারছে না, যে ব্যক্তি তার মেয়েকে যৌতুকের টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারছে না, ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে পারছে না, সেখানেই সুদটা বড় কথা নয়। সব ক্ষেত্রে হালাল-হারাম দেখলে চলে না।

এসব লোকের কথা শুনলে মনে হয়, ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটুকুও তাদের নেই। তাদের ঈমানের ব্যাপারেও সন্দেহ জাগে। এসব নামধারী মুসলমান নিজেরাও কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপন করে না, অন্য কেউ করুক তাও চায় না।

সুদের ব্যবসা করে টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে। সুদকে সুদ মনে করে না। তাদের নিকট এটা মুনাফা বা লভ্যাংশ। মনগড়াভাবে সুদকে মুনাফা বা লাভ মনে করে জায়েয করে নিয়েছে। ব্যাংক যে  সুদ দেয়, সেটা তাদের কাছে মুনাফা, সুদ নয়। কোন দরিদ্র মানুষ এসব তথাকথিত জনদরদী লোকের কাছে অভাবের সময় বিনা সুদে টাকা চাইলে তাদের পকেট থেকে টাকা বের হয় না, আবার সুদের উপর আপত্তি করে না।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। মানব জাতির মঙ্গল ও কল্যাণের ধর্ম হলো ইসলাম। মানুষ যাতে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারে, সে বিধান দিয়েছে ইসলাম। মানুষের জন্য কোনটা ভাল আর মন্দ, তা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ তাআলাই অধিক ভাল জানেন। ইসলাম আল্লাহ্ তাআলার মনোনীত ধর্ম। এতে মানুষের মনগড়া কিছু সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ নেই, আর প্রয়োজনও নেই।

মানুষের ভালমন্দের দিকে লক্ষ্য রেখেই আল্লাহ্ তাআলা হালাল হারামের বিধান দিয়েছেন। সুদকে আল্লাহ্ তাআলা মানুষের কল্যাণের জন্যই হারাম করেছেন, এটা আল্লাহ্ তাআলার বিধান। এই বিধানকে অস্বীকার করা আল্লাহ্ তাআলার বিধানকে অস্বীকার করার নামান্তর। সুদের উপর ঋণ নিয়ে সাময়িক উপকৃত হওয়া যায়, তা সত্য, কিন্তু এর ক্ষতির পরিমাণটা তুলনা মূলকভাবে বেশী।

পার্থিব ও অপার্থিব অর্থাৎ ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনেই সুদের ক্ষতির দিকটা বেশী। এর জন্য রয়েছে পরকালে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। একজন সুদখোর অনেক টাকার মালিক হয়। সুন্দর গাড়ী ও বাড়ীর মালিক হয়। আরাম আয়েশ ও ভোগ বিলাসের যাবতীয় সামগ্রী তার হাতের মুঠোয় থাকে। পানাহার পোষাক পরিচ্ছদ ও বসবাসের প্রয়োজনীয় দামী দামী আসবাব পত্রের অভাব থাকে না। শান-শওকতের যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম তার থাকে। দেখে মনে হয়, লোকটি সুখ-শান্তিময় জীবন যাপন করছে।

কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আরাম-আয়েশের যাবতীয় সাজ-সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও সে অশান্তিময় জীবন যাপন করছে। নিদ্রাটুকুও তার শান্তিতে হয় না। কারণ প্রকৃত শান্তিতো ভিন্ন জিনিষ। প্রকৃত শান্তি আসে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে। সুদখোরদের পাহাড় পরিমান সম্পদ তো সাময়িক ও অস্থায়ী, যা দরিদ্র মানুষের শরীরের রক্ত চুষেই পুঞ্জিভূত করা হয়েছে। যা অস্থায়ী তা চিরস্থায়ী শান্তির উপকরণ হতে পারে না।

সুদখোর সারাক্ষণ টাকার পিছনে ছুটে বেড়ায়। কিভাবে আরো সম্পদ বাড়ানো যায়, এই চিন্তায় বিভোর থাকে। সংসার, স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের খোঁজ-খবর নেওয়ার সময় তার থাকে না। সে মনে করে তার সম্পদ বৃদ্ধি পেলেই প্রকৃত শান্তিময় জীবন লাভ করবে। সম্পদের মধ্যে সে প্রকৃত শান্তি খুঁজে। সে সম্পদ বৈধ অবৈধ যে কোন পথে উপার্জিত হোক।

কিন্তু প্রকৃত শান্তির খোঁজ সে আর পায় না। এমনকি ঘুমের ঔষধ না খেলে তার ঘুম আসে না। সুদ খোরের বংশধরের জীবনও সুখময় হয় না। সুদখোর হয় কঠোরপ্রাণ ও নির্দয়। দরিদ্র মানুষের রক্ত চুষে নিজেদের সম্পদ বাড়ানো তাদের পেশা ও নেশা।

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডটকম এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।
ই-মেইল- [email protected]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.