Home ইসলাম মাহে রমযান ইবাদত-বন্দেগী, প্রার্থনা, ধৈর্য্যধারণ, দান-সদক্বা ও সহানুভূতি প্রকাশের মাস

মাহে রমযান ইবাদত-বন্দেগী, প্রার্থনা, ধৈর্য্যধারণ, দান-সদক্বা ও সহানুভূতি প্রকাশের মাস

।। মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী ।।

পবিত্র মাহে রমযান রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে নাজাত লাভের বরকতময় মাস। মানব মনের সকল প্রবৃত্তির কু-তাড়না ও গুনাহের চিন্তা বর্জন করে মানবিক উৎকর্ষতা ও পূণ্যময়গুণ অর্জন করার মাস এ রমযানুল মুবারক। রাত্র-দিন ইবাদত-প্রার্থনা, দান-সদক্বা, কুরআনুল কারীম পাঠ ও শ্রবণ, তারাবিহ্ , তাহাজ্জুদ ইত্যাদি ইবাদত করার মাস এ মাহে রমযান।

এ মাসের সাওম বা রোযা রেখে এবং বিবিধ ইবাদতের অধ্যাবসায়ের মধ্য দিয়ে মানবদেহের পাপ-পঙ্কিল চিন্তাকে বর্জন করে কলুষমুক্ত পূণ্যময় গুণাবলী অর্জনের মাস এ রমযানুল মুবারক। গরীব অত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী, এতিম, বিধবা, মাযূর, বিকলাঙ্গসহ সমাজের দুঃস্থ ও অসহায় লোকদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে সহানুভূতি প্রকাশের মাস এ মাহে রমযান।

আল্লাহর নাফরমানী ত্যাগ, রোযার যথার্থ হক্ব রক্ষা ও হযরত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত পালনের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধতায় নির্মল করার মাস এ পবিত্র রমযানুল মুবারক।

অন্তরে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় আস্থা, ভয় পোষণ এবং তাক্বওয়া অর্জন মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ। মানব মনে সদা জাগ্রত আল্লাহর ভয় বিরাজমান থাকলে মানুষ কখনো আল্লাহ্ ও তাঁর সৃষ্টিকূলের হককে নষ্ট করতে পারে না। আর হক নষ্ট করতে পারে না বলে এই মানুষ সমাজের মাঝে কোন প্রকার অশান্তির দাবানল ছড়াতে পারে না। এ মহা গুণটি অর্জনের একটি মাস, এ মাহে রমযান। এ মাসেই সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ আল্লাহর ভয় মানব জীবনে অর্জিত হয়

অপরদিকে রমযান মাস ধৈর্য্য ধারণের মাস, আর্তমানবতার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাস, ইবাদত প্রার্থনা করার মাস।

হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “হে মানব সমাজ! একটি মহান মাস, একটি বরকতময় মাস তোমাদের উপর ছায়াপাত করছে। যে মাসের মধ্যে এমন একটি রাত্রের উপস্থিতি বিদ্যমান, যে রাতের মর্যাদা সহস্র মাসের চেয়েও অধিক। এ মাসের প্রতিটি দিবসে আল্লাহর রোযা (বা পানাহার ও জৈবিক ক্ষুধা নিবারণ থেকে মুক্ত থাকা)কে ফরয করেছেন। আর এ মাসের প্রতিটি রাতে দন্ডায়মান (বা তারাবিহর নামায)কে অসীম পুণ্য অর্জনের কাজরূপে নির্ধারণ করেছেন। এ মাসের একটি ফরয (বা অবশ্যই পালনীয় কর্তব্য)কে অন্য মাসের সত্তর ফরযের সমান এবং একটি নফল (বা যে কাজ করলে পুণ্য, তবে না করলে কোন ক্ষতি নেই এমন কাজ)কে অন্য মাসের একটি ফরযের সমান করেছেন।

রমযান সবর (বা ধৈয্য ধারণ)এর মাস। আর সবরের প্রতিদান হলো জান্নাত। এটি সমবেদনা প্রকাশের মাস। এ মাসে মু’মীনদের রিযিক বৃদ্ধি করা হয়। এ মাসের প্রথম অংশ রহমতের, (দ্বিতীয়াংশ মাগফিরাতের) এবং শেষাংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের”।

বিশ্বনবী হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, “যখন রমযান মাস আসে, বেহেস্তের প্রতিটি দরজা খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের প্রতিটি দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানকে বন্দি করে রাখা হয়”।

পবিত্র রমযান তাক্বওয়া অর্জন বা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা’র অনুশীলনের মাস। তাক্বওয়ার শাব্দিক অর্থ বেঁচে থাকা, বিরত থাকা, সর্তক হওয়া ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায়, জীবনের সকল পাপ-পঙ্কিলতা, অন্যায়-আনাচার, জুলুম-নির্যাতন, অশ্লীলতা, প্রবৃত্তির দাসত্ব প্রভৃতি থেকে বিরত হয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁরই নির্ধারিত পথে এবং হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পথে যাবতীয় কর্মকান্ড সম্পাদন করার নামই ‘তাক্বওয়া’।

পবিত্র কুরআনুল কারীমে তাক্বওয়া শব্দটি তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথা- ভীতি, আনুগত্য ও গুনাহ্ বর্জন। তাই, তাক্বওয়া অর্জনের জন্য অন্তরে একমাত্র আল্লাহর ভয় রেখে তার পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে সমস্ত গুনাহ্ বর্জন করতে হবে। এভাবে চলতে গেলে মন বা অন্তরসহ শরীরের বিবিধ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে হিফাযত করে চলতে হবে, তথা- চোখ, কান, জিহ্বা, অন্তঃকরণ ও যৌনাঙ্গকে নাজায়েয কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। আর এভাবে চলার জন্য রমযান মাস তথা রোযাই উপযোগী। তাই, এ মাস তাক্বওয়া অর্জনের মাস।

এ মাস অত্যধিক পুণ্যার্জনের মাস। কামাই রুজি বৃদ্ধি করার মাস। জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে বেহেস্তে গমনের মাস। এ মাসেই মানুষের প্রবৃত্তি দমনের প্রশিক্ষণের মাস। এ মাস সংযম প্রশিক্ষণের মাস।

মোটকথা, রমযানুল মুবারক বা মাহে রমযান মানুষের জন্য শুদ্ধতায় পরিপূর্ণ হবার একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাস। সুতরাং এই বরকতময় মাস এখন চলছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে আয়-রোজগারে অসুবিধা সৃষ্টি হলেও ইবাদত-বন্দেগীর জন্য আবারিত সুযোগ বয়ে এনেছে। সুতরাং সকলেই কোয়ারেন্টাইনকে কোরানিক টাইমে রূপান্তরিত করে ফরয ও নফল নামায, দান-সদক্বার পাশাপাশি বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করতে সচেষ্ট থাকবেন। এই বরকতময় মাসের পুণ্যতা অর্জনের বদৌলতে আল্লাহ চাইলে করোনার মহামারি থেকেও আমাদেরকে হেফাজত করবেন এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজে বরকত দান করবেন।

পরম করুণাময় আল্লাহ আমাদের সকলকে বরকত ও রহমতের মাস রমযানের পরিপূর্ণ মর্যাদানের মাধ্যমে অতিবাহিত করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকলের হাজতকে পুরণ করুন। আমীন।

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডট কম এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। ই-মেইল- [email protected]