Home ওপিনিয়ন ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ পোস্টার ঘিরে ভারতে মুসলিম দমনাভিযানে নতুন মাত্রা

‘আই লাভ মুহাম্মদ’ পোস্টার ঘিরে ভারতে মুসলিম দমনাভিযানে নতুন মাত্রা

ভারতের মুসলিমরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা পোস্টার বা ব্যানারে ভালোবাসার প্রকাশ এত বৈরিতা সৃষ্টি করল কেন?

।। মুনির আহমদ ।।

“ইসলামোফোবিয়া” বা ইসলাম-ভীতি শব্দটি আজকের ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের যে তীব্রতা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে, তা আর ধারণ করতে পারে না। এটি তার চেয়েও গভীর এক বাস্তবতা—যেখানে প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে, “মসজিদ বা মুসলিমমুক্ত এক রাষ্ট্র প্রয়োজন।”

এ এক সংগঠিত ঘৃণার ঢেউ, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও সম্মিলিত বৈরিতার এমন প্রবল স্রোত, যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। হয়তো ‘ইসলামবিরোধী’ শব্দটিই এখানে অধিকতর যথাযথ, যদিও সেটিও যথেষ্ট নয়। এখন যা ঘটছে, তা কেবল মতাদর্শের সংঘাত নয়; এটি পরিচয়ের অবমাননা এবং ইসলামকে টার্গেট বা হেয় করার এক সুপরিকল্পিত চিত্র—যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

ধাপে ধাপে ইসলামবিরোধী নিপীড়ন

গুজরাটের গোধরা শহরে জাকির ঝাভা নামে এক যুবক ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা পোস্টার হাতে নিয়ে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। এরপর যা ঘটল, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। পুলিশ তাঁকে “অপরাধী” হিসেবে গ্রেপ্তার করে এবং নির্মমভাবে প্রহার করে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় মুসলিম যুবকেরা থানার সামনে বিক্ষোভ করে পুলিশের জবাবদিহি দাবি করেন। জবাবে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ এনে নির্বিচারে লাঠিচার্জ চালিয়ে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে এবং আরও ৮৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এমনকি কিছু বিক্ষোভকারীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাস্তায় প্রদক্ষিণ করানোর ঘটনাও ঘটে।

উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে জুমার নামাজের পর জামা মসজিদের বাইরে এক যুবক ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা পোস্টার হাতে দাঁড়ালে পুলিশ দ্রুত পোস্টারটি বাজেয়াপ্ত করে, ছিঁড়ে ফেলে এবং তাঁকে হেফাজতে নেয়। বদাউন, মুজাফফরনগর, দেওয়ানাগেরে (কর্ণাটক) ও কাশীপুরসহ আরও অনেক এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের দাবি—এই পোস্টারগুলো “বিশৃঙ্খলা” সৃষ্টি করতে পারে।

দেওয়ানাগেরের ঘটনায় প্রায় ১০০ জনের বিরুদ্ধে তিনটি ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর) দায়ের করা হয়েছে।

উত্তরাখণ্ডের কাশীপুরে পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তার ও আরও ১০ জনকে আটক করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১০–১২ বছর বয়সী শিশুসহ প্রায় ৫০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আটক অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে; কিছু শিশুকে মারধর করে ভয় দেখানো হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, কাশীপুরের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভারতের মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ক্রমবর্ধমান ধারা ও কাঠামোরই অংশ।

এই শুরুটা কীভাবে হলো?

৪ সেপ্টেম্বর, সীরাতুন্নবী উপলক্ষে উত্তরপ্রদেশের কানপুরের সৈয়দ নগর এলাকায় স্থানীয় মুসলিম যুবকেরা জাফরওয়ালি স্ট্রিটে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা একটি সাইনবোর্ড টানান। হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর সদস্যরা এর বিরোধিতা করে মুসলিমবিরোধী স্লোগান তোলে এবং অভিযোগ করে যে, এটি “নতুন প্রথা” চালুর প্রয়াস।

কর্তৃপক্ষ তখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশ ১২ জন মুসলিমের নাম উল্লেখ করে এবং ১৪–১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি এফআইআর দায়ের করে। পুলিশের দাবি ছিল—ব্যানার নয়, তাঁবু খাটানোর জন্য মামলা হয়েছে। কিন্তু নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা ব্যানার প্রদর্শনের মাধ্যমে “নতুন প্রথা” শুরু করতে চেয়েছিলেন, যা বিরোধী পক্ষের আপত্তির মুখে পড়ে। এফআইআরটি দায়ের করেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরাই।

এই সরল ভক্তির প্রকাশ—‘আই লাভ মুহাম্মদ’—ক্রমে সারাদেশে এক আন্দোলনে পরিণত হয়। কানপুরে মুসলিমরা প্রথমে এফআইআর প্রত্যাহারের দাবি তোলে, কিন্তু প্রশাসন তা অগ্রাহ্য করে। এর পরপরই অন্যান্য শহরে মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একই পোস্টার হাতে প্রতিবাদে যোগ দেয়। অথচ এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান না জানিয়ে, বিভিন্ন রাজ্য কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার ও সহিংসতার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখাযতে শুরু করে। রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকেও প্রকাশ্যে ইসলামবিরোধী মনোভাবের বিবৃতি আসতে থাকে।

মুহাম্মদকে ভালোবাসা কি অপরাধ?

ভারতের মুসলিমরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা পোস্টার বা ব্যানারে ভালোবাসার প্রকাশ এত বৈরিতা সৃষ্টি করল কেন? কবে থেকে স্নেহ প্রকাশ অপরাধ হলো? এতে কার ক্ষতি হতে পারে? এমন বার্তা প্রদর্শন তো সংবিধানবিরোধী নয়। একে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা আইনি ও নাগরিক অধিকারের জায়গায় গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।

২৬ সেপ্টেম্বর, বরেলিতে জুমার নামাজের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন পুলিশ অনুমতি না থাকার অজুহাতে ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ প্রচারণার একটি সমাবেশ বন্ধ করে দেয়। ইসলামিয়া গ্রাউন্ডে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়; ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করা হয়। পালিয়ে যাওয়ার সময়ও বহু মানুষকে প্রহার করা হয়—যার ফলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও আহতের ঘটনা ঘটে।

একই ঘটনায় বরেলির বিভিন্ন থানায় ১০টি এফআইআর দায়ের হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ৮২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে দুজন এনকাউন্টারে গুলিবিদ্ধ হয়ে পরবর্তীতে আটক হন।

বিশিষ্ট মুসলিম নেতা মাওলানা তৌকির রাজা খান প্রথম গ্রেপ্তার হন; পরে তাঁর পরিবারও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। গণমাধ্যমে জানা যায়, তাঁর আত্মীয়দের বাড়িঘর ভাঙতে বুলডোজার ব্যবহার করা হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলোই প্রমাণ করে, ভক্তি ও ভালোবাসার শান্তিপূর্ণ প্রকাশ কীভাবে রাষ্ট্রীয় দমন ও জনভীতিতে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—যিনি নাগরিক নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির দায়িত্বে, সেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রকাশ্যেই মুসলিমদের হুমকি দিয়ে বলেন- “মনে রেখো! যখনই এমন করার সাহস দেখাবে, বরেলির মতোই পরিণতি হবে…”।

তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা এমন শিক্ষা দেব যে, তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দাঙ্গা করার সাহস পাবে না…”।

বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ভারতের বহু শহরে হিন্দু উৎসবের সময় রাস্তাজুড়ে “জয় শ্রী রাম” ধ্বনি ওঠে, রাজনৈতিক ব্যানার টাঙানো হয়, মিছিল চলে নির্বিঘ্নে। অথচ মুসলিমরা যখন শান্তিপূর্ণভাবে ব্যানারের মাধ্যমে তাদের বিশ্বাস প্রকাশ করেন, তখনই কর্তৃপক্ষ এফআইআর, গ্রেপ্তার ও সহিংসতার পথ বেছে নেয়।

ভারতের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এমন দ্বিচারিতা কেবল আইনের প্রয়োগে বৈষম্যের উদাহরণ নয়; এটি মুসলিমবিরোধী এক গভীর ষড়যন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা—কখনও কখনও সক্রিয় সহযোগিতাও—ইঙ্গিত দেয় যে, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি নীরব সমর্থনের অংশ।

প্রশ্নটি তাই এখন কেবল ‘কেন মুসলিমরা ব্যানার টাঙাচ্ছে’—এটুকু নয়; বরং, ভারতের সব নাগরিকের ধর্মীয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি সমানভাবে সুরক্ষিত?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে কেন কেবল একটি ব্যানারের জন্য মুসলিমদের বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে? এটি কেবল একটি পোস্টারের প্রশ্ন নয়; এটি ভারতের সংবিধান ও নাগরিক স্বাধীনতার মৌলিক মূল্যবোধকে ঘিরে এক গভীর সংকেত। ভারতের গণতন্ত্রের এই বাস্তবতা আমাদের এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—ধর্মীয় স্বাধীনতা কি এখনও সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য?

লেখক: সম্পাদক- উম্মাহ২৪ডটকম, নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

উম্মাহ২৪ডটকম: আইএএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।