।। সালাহুদ্দীন তোফেল ।।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ইলমে হাদীসের চর্চা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শিক্ষিত শ্রেণি—সকলের মাঝে হাদীস বিষয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। এর ফলে বহু ভুল ধারণা দূর হচ্ছে এবং দীনের বহু বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে। তবে এই আগ্রহের পাশাপাশি একটি সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। অনেক মানুষ বিষয়গুলোকে যথাস্থানে রাখতে পারছেন না এবং হাদীসের পরিভাষা যথাযথ অনুধাবন করতে পারছেন না। বিশেষ করে “সহীহ হাদীস” প্রসঙ্গে একটি সাধারণ ভুল প্রচলিত হয়ে গেছে। কেউ কেউ মনে করেন যে, হাদীস সহীহ হলে তা সর্বাবস্থায় আমলযোগ্য। অর্থাৎ সহীহ হওয়া মানেই আমলের বাধ্যবাধকতা। অথচ বিষয়টি এত সহজ নয়। সহীহ হওয়া মানে শুধু বর্ণনার দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হওয়া। কিন্তু আমলযোগ্য হওয়া আরও কিছু শর্ত, প্রেক্ষাপট ও ফিকহী বিবেচনার উপর নির্ভর করে।
এই ভুল ধারণা থেকে অনেক সময় মানুষ এমন স্থানে দলিল ব্যবহার করেন, যেখানে তা প্রযোজ্য নয়। বা এমন হুকুম দাবি করেন, যা সেই হাদীসের উদ্দেশ্য নয়। ফলে আমজনতা বিভ্রান্ত হয় এবং শারয়ী মাসায়েলের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এ কারণে প্রয়োজন, “সহীহ হাদীস” এবং “আমলযোগ্য হাদীস”—এই দুইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক ও পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। আমার এই প্রবন্ধ সেই প্রয়োজন থেকেই প্রস্তুত করা, যাতে বিষয়টির সুসংহতভাবে ব্যাখ্যা হয় এবং পাঠক সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করতে পারেন।
মানগত বিচারে হাদীস তিন প্রকার। সহীহ, হাসান এবং জয়ীফ। হাদীস সহীহ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত আছে। এই পাঁচ শর্তের উল্লেখের মাধ্যমে প্রকারান্তরে সহীহ হাদীসের সংজ্ঞায়ন হয়ে যায়। সে পাঁচ শর্ত হলো: (ক) হাদীসের বর্ণনাকারী বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ন হওয়া, (খ) বর্ণনাকারী আয়ত্ত্ব ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়া, (গ) বর্ণনাকারীদের পরম্পরা অবিচ্ছিন্ন হওয়া, (ঘ) হাদীসে সূক্ষ্ম কোনো দোষত্রুটি না থাকা, (ঙ) বর্ণনাকারী তারচে’ বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বিরোধিতা না করা। এই পাঁচটি শর্তের উপস্থিতিতে হাদীস সহীহ সাব্যস্ত হয়। বিপরীতে কোনো শর্ত যদি অনুপস্থিত হয়, তাহলে হাদীস জয়ীফ বিবেচিত হবে। সহীহ এবং জয়ীফের মাঝামাঝি অবস্থানে আছে হাদীসের আরেক প্রকার হাদীসে হাসান। সকলের ঐক্যমতে সহীহ ও হাসান হাদীসের মাধ্যমে আমল করা, কোনো বিধান সাব্যস্ত করা, নীতিমালা প্রনয়ণ করা, বিশ্বাস স্থির করা, কোনো কিছুর আদেশ নিষেধ করা সহ শরয়ী সকল বিষয় প্রমাণিত হয়।
এ থেকে প্রতিভাত হয় যে, হাদীস সহীহ বা হাসান হলেই কেবল তা আমলযোগ্য। জয়ীফ হলে আমলযোগ্য হবে না। কিন্তু এই অর্থে সীমাবদ্ধতা আছে। হাদীস সহীহ হলে আমল করতেই হবে, তা বাধ্যতামূলক না। বরং অনেক হাদীস এমন আছে, যেগুলো সহীহ হওয়া সত্ত্বেও পূর্বসূরি আলিমরা সে হাদীস মতে আমল করেননি। অতএব আমরা একটি মূলনীতি দাঁড় করাতে পারি। তা হলো, হাদীস আমলযোগ্য হওয়ার জন্য সহীহ হওয়া শর্ত, তবে হাদীস সহীহ হলে আমলযোগ্য হওয়া শর্ত না। এই মূলনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রথমে ইলমে হাদীসের বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করবো, যেখানে বলা আছে, প্রত্যেক সহীহ হাদীস আমলযোগ্য না এবং প্রত্যেক সহীহ হাদীসের উপর আমল করতে গেলে বিপদ আছে, যদি সে হাদীস মতে কোনো ইমামের আমল না থাকে। এরপর সহীহ হাদীস আমলযোগ্য না হওয়ার বেশকিছু কারণ উল্লেখ করবো।
ইলমে হাদীসের ইমামদের মতামত
হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, “যদি বলা হয়— ‘তাহলে তো এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে হাদীসকে সহীহ বলা হবে, কিন্তু তা অনুযায়ী আমল করা হবে না।’ আমি (এর উত্তরে) বলবো, এতে কোনো অসুবিধা নেই। সব সহীহ হাদীসের উপর আমল করা যাবে না। এর প্রমাণ হলো— মানসূখ তথা রহিত হাদীস।” (তাদরীবুর রাবী, সুয়ূতী- ১/১১৭, দারু ইবনিল জাওজী, ১ম প্রকাশ ১৪৩১ হি.।)
হাফিজ শামসুদ্দীন জাহাবী (রহ.) বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি একটি সহীহ হাদীসকে আঁকড়ে ধরে, অথচ মুজতাহিদ অন্যান্য সব ইমাম তা গ্রহণ করেননি (বা সে পথ থেকে সরে গেছেন), তবে তা গৃহীত হবে না।’ (সিয়ারু আলামিন নুবালা- ১৬/৪০৫, মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৮৫ ইং।)
হাফিজ ইবনু রজব হাম্বালী (রহ.) বলেন, ‘আর ইমাম ও মুহাদ্দিস ফকিহগণ সহীহ হাদীসের অনুসরণ করেন, যার উপর সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁদের পরে আসা আলিমগণ, অথবা অন্তত কোনো একটি দল আমল করে থাকেন। কিন্তু যে হাদীসের উপর আমল ত্যাগ করতে উলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন, সে হাদীসের উপর আমল করা বৈধ নয়। কারণ, তারা তা এমনিতে ত্যাগ করেননি; বরং এ কথা নিশ্চিত জেনে যে, এ হাদীসে আমল করার মতো বিষয় নেই।’ (ফাজলু ইলমিস সালাফ- ১৭, আল- ফারূক হাদীসিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ ২০০৪ ইং।)
হাফিজ ইবনুস সালাহ (রহ.) আলোচনার এক পর্যায়ে গিয়ে এই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আর শাফেয়ী মাজহাবের যেসব ব্যক্তি এই পথে হাঁটেন তাদের মধ্যে কতক এমনও আছেন, যারা একটি হাদীসের উপর আমল করেন। অথচ ইমাম শাফেয়ী (রহ.) হাদীসটি সহীহ জানা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে আমল করেননি। কারণ, এর উপর আমল করার প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে তিনি জানতেন, যা অন্যদের কাছে স্পষ্ট না।’ (আদাবুল মুফতি, ইবনুস সালাহ- ১১৮-১১৯, মাকতাবাতুল উলূম ওয়াল হিকাম, ১ম প্রকাশ, ১৯৮৬ ইং।)
পূর্ববর্তী বিজ্ঞ আলিমরা হাদীস গ্রহণ করার জন্য নানান শর্ত আরোপ করতেন। হাদীস সহীহ হলেই তা আমলে নিতেন না। হাদীস অনুযায়ী ইমামদের আমল আছে কি-না, তা প্রথমে যাচাই করতেন। হাদীসের উপর কোনো ইমাম আমল করলে তাহলে সে অনুযায়ী আমল করতেন। এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে খতীব বাগদাদী (রহ.) হাফিজ মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা আত- তাব্বা’ (রহ.)-এর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যে সকল হাদীস তোমার নিকট এসেছে এবং তুমি এ কথা জানো না যে, এই হাদীস অনুসারে কোনো সাহাবী আমল করেছেন, তাহলে তা ছেড়ে দাও।’ এরপর খতীব বলেন, যদি কোনো নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী কোনো হাদীস বর্ণনা করেন এবং হাদীসের সনদও অবিচ্ছিন্ন হয়, তবুও বেশকিছু কারণে হাদীস ছেড়ে দেওয়া হয়। (আল- ফাকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ- ১/৩৫৪, দারু ইবনিল জাওজী, ২য় প্রকাশ, ১৪২১ হি.।)
তাদের মূলনীতিই ছিল এমন যে, সকল প্রকার হাদীস বর্ণনা করবেন। তবে প্রত্যেক হাদীসের উপর আমল করবেন না। এজন্যই তো ইব্রাহিম নাখয়ী (রহ.) বলেছেন, ‘আমি হাদীস শুনি। এরপর দেখি, যদি তা গ্রহণ করার মতো হয়, তাহলে তা গ্রহণ করি এবং বাকি হাদীস ছেড়ে দিই।’ (হিলয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম- ৪/২২৫, মাতবায়াতুস সায়া’দাহ ১৯৭৪ ইং।)
কাজী ইবনু আবি লায়লা (রহ.) বলেন, ‘তুমি হাদীসে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি কিছু হাদীস গ্রহণ করো এবং কিছু ছাড়।’ (জামিয়ু বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার্- ২/১০৩৬, দারু ইবনিল জাওজী, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪ ইং।)
আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী (রহ.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি ইমাম হতে পারে না যতক্ষণ না সে জানতে পারে যে, কোন হাদীস সহীহ ও কোন হাদীস সহীহ না, এবং যতক্ষণ না সে এও জানতে পারে যে, প্রত্যেক হাদীসের মাধ্যমে (আমল) প্রমাণ করা যায় না।’ (হিলয়াতুল আওলিয়া- ৯/৩, মাতবায়াতুস সায়া’দাহ ১৯৭৪ ইং।)
হাদীস সহীহ হওয়া যেহেতু আমলের জন্য যথেষ্ট না, সেজন্য সচেতন আলিমরা বড়দের শরণাপন্ন হতেন। অভিজ্ঞ ও শাস্ত্রজ্ঞ আলিমরা যা বলতেন এবং ফুকাহায়ে কেরাম (ইসলামী আইনবেত্তা) যে হাদীসের উপর আমল করতেন তারা কেবল সেগুলোই গ্রহণ করতেন। কারণ, প্রত্যেক সহীহ হাদীসের উপর আমল করতে গেলে বিপদ আছে। এ জন্য ইমাম তিরমিজী (রহ.) মৃত ব্যক্তির গোসল-কার্য অধ্যায়ে একটি হাদীস উল্লেখ করে বলেন, ‘ফুকাহায়ে কেরামই হাদীসের অর্থ ভালো বুঝেন।’ এ বিষয়ে খতীব বাগদাদী (রহ.) সুন্দর একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর বরাতে বর্ণিত। একদা ইমাম মালিক (রহ.)-কে বলা হলো, সুফয়ান ইবনু উয়াইনার কাছে জুহরীর সূত্রে বেশকিছু হাদীস আছে, যা আপনার কাছে নেই। তখন ইমাম মালিক বললেন, ‘আমি যা শুনি সবই কি বর্ণনা করবো? এমনটা করার অর্থ হলো তাদের পথভ্রষ্ট করা।’ (আল- জামি’ লিআখলাকির রাবী, খতীব- ২/১০৯, মাকতাবাতুল মায়ারিফ, প্রকাশ ১৪৪৪ হি.।)
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
এ বিষয়ে ইবনু ওয়াহাব (রহ.) বলেন, ‘প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি, যার কাছে শুধু হাদীস আছে এবং ফিকহী বিষয়ে (পথনির্দেশের) কোনো ইমাম নেই, নিশ্চিত সে পথভ্রষ্ট। যদি (ইমাম) মালিক এবং লাইসের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আমাদের না বাঁচাতেন, তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম।’ (আল- জামি’ ফিস সুনান ওয়াল আদাব, ইবনু আবি জায়েদ- ১১৯, মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ২য় প্রকাশ, ১৯৮৩ ইং।)
হাদীসের উপর কোনো ইমাম আমল করলে সে হাদীস আমলযোগ্য হয়ে যায়। কারণ, ফিকহশাস্ত্রবিদরা কিছু হাদীস গ্রহণ করেন আর কিছু হাদীস ছেড়ে দেন। সাধারণ মানুষ যদি তা দেদারসে গ্রহণ করে, তাহলে নিশ্চিত বিপদের সম্মুখীন হবে। এজন্য সুফয়ান ইবনু উয়াইনা (রহ.) বলেন, ‘হাদীস পদচ্যূতির একটি মাধ্যম, যদি তা ফকিহের জন্য না হয়।’ (আল- জামি’ ফিস সুনান, ইবনু জায়েদ- ১১৮, মুয়াসসাতুর রিসসলাহ, ২য় প্রকাশ, ১৯৮৩ ইং।)
কিছু হাদীস গ্রহণ করা এবং কিছু ছেড়ে দেওয়া স্বীকৃত একটি বিষয়। বর্তমানের জন্য বিষয়টি যেমন স্বতসিদ্ধ, ঠিক পূর্বকার মনিষীদের কাছেও তা সিদ্ধ ছিল। এমনকি তাবেয়ীরাও এই নীতি অবলম্বন করতেন। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, ‘তাবেয়ীনদের কতক বিজ্ঞজন হাদীস বর্ণনা করতেন। যখন তাদের কাছে অন্যদের থেকে (ভিন্নধর্মী) হাদীস পৌঁছাত, তখন তারা বলতেন, আমরা এসব জানিনা। কিন্তু বাস্তব আমল এগুলোর বিপরীতে।’ (তারতিবুল মাদারিক, কাজী ইয়াজ- ১/৪৫, মাতবায়াতু ফুজালা ১৯৬৫ ইং।)
এই বিষয়ে ভুরিভুরি প্রমাণ পেশ করা যায়। কিন্তু একটি বিষয়কে সাব্যস্ত করার জন্য উদ্ধৃত প্রমাণগুলোই যথেষ্ট। তাছাড়া এটি কোনো নতুন আবিষ্কার নয়। বরং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল ইমামদের কাছে এটি স্বীকৃত। হাদীস শাস্ত্রজ্ঞ আলিমরা এ বিষয়ে যথেষ্ট কথা বলেছেন। আর এটিই চার ইমামের মতামত। কাজী রামাহুরমুজী (রহ.) এই মতকে সর্বস্তরের ফকিহদের মত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আলোচনার এক প্রাসঙ্গিকতায় বলেন, ‘মুফতীর জন্য তার বর্ণিত প্রতিটি হাদীস অনুযায়ী ফাতওয়া দেওয়া জরুরি নয়। একইভাবে ফাতওয়া না দেওয়ার (তথা আমলযোগ্য না হওয়ার) কারণে সেসব হাদীসের বর্ণনা ছেড়ে দেওয়াও জরুরী নয়। এ ব্যাপারে বিশ্বের সকল ফকিহদের মতামত এক।’ (আল- মুহাদ্দিসুল ফাসিল, রামাহুরমুজী- ৩২৭, দারুজ জাখায়ির, ১ম প্রকাশ ২০১৬।)
হাদীস আমলযোগ্য না হওয়ার কারণ:
হাদীস সহীহ হওয়ার সকল শর্ত পাওয়া গেলেও ক্ষেত্রবিশেষ হাদীসটির উপর আমল করা যায় না। এর অনেক কারণ আছে। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো—
১— হাদীস যদি মানসূখ (রহিত) হয়। সহীহ বুখারী এবং মুসলিমে অনেক হাদীস আছে, যেগুলোর উপর মানসুখ হওয়ার কারণে আমল করা হয় না।
২— সহীহ হাদীস যদি কুরআনের কোনো আয়াতের বিপক্ষে যায়, তাহলে সে হাদীস আমলযোগ্য হবে না।
৩— হাদীস সর্বস্বীকৃত কোনো সুন্নাহর বিপরীত হলে, তাহলে সে হাদীস অনুযায়ী আমল করা যাবে না।
৪— হাদীস সকলের ঐক্যমতে প্রমাণিত কোনো আমলের বিপরীত হলে তৎ অনুসারে আমল করা যাবে না।
৫— সহীহ হাদীসের বিপরীতে যদি দ্বিগুণ শক্তিশালী কোনো হাদীস উপস্থিত থাকে, তাহলে সে সহীহ হাদীস আমলযোগ্য হবে না।
৬— সচরাচর গুরুত্বপূর্ণ কোনো আমল, যা নিত্যদিন প্রয়োজন হয়, যদি আমলটি খবরে ওয়াহেদ (যে হাদীস মুতাওয়াতির না)-এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তাহলে হাদীস সহীহ হওয়া সত্ত্বেও তা পরিত্যাগ্য হবে।
৭— এমন কোনো ঘটনা, যা বাস্তবে সংঘটিত হলে এর সাথে শরীয়তের নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কযুক্ত হতো, যদি তা খবরে ওয়াহেদের মাধ্যমে বর্ণিত হয় এবং বর্ণনা সহীহও হয়, তবু সে বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না।
৮— যদি কোনো বিষয় খবরে ওয়াহেদের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় এবং তা মানুষের বোধবুদ্ধি ও যুক্তির বিপরীত হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা হবে না।
এসব কারণ খতীব বাগদাদী (রহ.) তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ ‘আল- ফাকিহ ওয়াল মুতাখাক্কিহ’-এ উল্লেখ করেছেন। ইবনুস সালাহ (রহ.) এ বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তবে এর বিস্তৃত আলোচনা করেছেন শায়খ আওয়ামাহ (হাফি.) তাঁর ‘আসারুল হাদীসিস শারীফ’ বইয়ে।
একটি আপত্তি ও তার নিষ্পত্তি:
আল্লাহ তা’আলা সূরা হাশরে বলেছেন, ‘রাসূল তোমাদের কাছে যা নিয়ে আসেন তা তোমরা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তিনি বারণ করেন তা তোমরা পরিত্যাগ করো।’ ইমাম জুহরী (রহ.) বলেন, ‘তোমরা সুন্নাহ গ্রহণ করো, এর বিরুদ্ধ কিছু তালাশ করো না।’ ইমাম শাফেয়ী (রহ.) একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে বলেছেন, ‘‘হে লোক! আমি যদি নবী (সা.) থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করি আর তাতে আমল না করি—তবে কোন জমিন আমাকে বহন করবে, আর কোন আকাশ আমার উপর ছায়া দেবে।’ তাছাড়া ইমাম আজম আবু হানিফা এবং ইমাম শাফেয়ী (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, তারা বলেছেন, ‘যদি হাদীস সহীহ হয়, তাহলে তা (অর্থাৎ সে অনুযায়ী আমল করা) আমার মাজহাব।’ কেউ কেউ এই বক্তব্যকে ইমাম মালিক ও ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বালের মতামত হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন সবকিছু গ্রহণ করতে হবে এবং হাদীস সহীহ হলে সে অনুযায়ী আমল করতে হবে। ইত্যাকার সংশয় সাধারণের মনে উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলে বা অভিজ্ঞ কারও দ্বারস্থ হলে এর নিরসন করা সম্ভব। তবুও সংক্ষেপে এখানে বলা হচ্ছে।
কুরআনের অনেক আয়াত আছে, যেগুলোর আক্ষরিক অর্থ উদ্দেশ্য হয় না। বরং এর নানান ব্যাখ্যা থাকে। যেমন, সূরা ফাতহ-এ বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপরে।’ সকল মুফাস্সিরের ঐক্যমতে এখানে আক্ষরিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়। ঠিক অনেক হাদীসও এমন। যেমন, সহীহ মুসলিম-এ উল্লেখ হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় সমস্ত বনি আদমের অন্তর আল্লাহর দু’টি আঙুলের মাঝখানে রয়েছে।’ ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘এখানে হাদীসের আক্ষরিক অর্থ উদ্দেশ্য না।’ অতএব উদ্ধৃত আয়াত এবং ইমামদের বক্তব্যেরও এভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। অর্থাৎ, নবীজি (সা.)-এর সমস্ত হাদীস হাদীস হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, যথাযথ সমীহ করতে হবে এবং যদি আমলের উপযুক্ত হয় তাহলে তৎঅনুযায়ী আমল করতে হবে। আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদ থেকে যে বক্তব্যটি বর্ণিত আছে তথা হাদীস সহীহ হলে সেটি আমার মাজহাব, এর সুন্দর ও সুষ্ঠু ব্যাখ্যা আছে। ইবনুস সালাহ, নববী, কারাফী, সুবকী, ইবনু আবেদীন ও আবু শামাহ প্রমুখের ব্যাখ্যা হলো— সহীহ হাদীসের উপর আমল করলে তা চার ইমামের কোনো এক মাজহাব হিসাবে স্বীকৃতি পাবে, যদি আমলকারী ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখে বা অন্তত এর নিকটতম হয়। অতএব যে কেউ সহীহ হাদীসের উপর আমল করলে তা গৃহীত হবে না। (বিস্তারিত- আসারুল হাদীসিস শারীফ, আওয়ামাহ- ৬৫-৮৭, দারুল মিনহাজ, ৮ম প্রকাশ ২০১৮।)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, হাদীস সহীহ হলেই তা আমলের যোগ্য হয় না। বিবিধ কারণে হাদীস পরিত্যাগ্য হয়। এ জন্য শুধু হাদীসের বাহ্যিক রূপ দেখলে হবে না। হাদীসের ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্যও বুঝতে হবে। এ বিষয়ে ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর একটি উক্তি স্ববিশেষ উল্লেখযোগ্য। উক্তিটি উল্লেখ করে আলোচনার ইতি টানবো। ইমাম আজম (রহ.) বলেন, ‘যে হাদীস শিখলো এবং এর ব্যাখ্যা শিখেনি, তাহলে তার এই চেষ্টা নিরর্থক প্রমাণিত হবে এবং হাদীস তার জন্য বিপদ ডেকে আনবে।’ (মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা, কারদারী- ৩৭৭, দারুল কিতাবিল আরাবী ১৪০১ হি.।)
লেখক: শিক্ষার্থী, উলূমুল হাদীস, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
ইমেইল- salahuddintofel@gmail.com
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








