।। মুনির আহমদ ।।
আজকের পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহ যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন, তা একেবারেই নতুন কিছু নয়। আবার অপ্রত্যাশিতও নয়। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে উম্মাহকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)এর সমসাময়িক সময়ে যেসব সঙ্কট ও দুর্দশার মুখে তাঁরা পড়েছিলেন, তা ছিল সর্বাধিক কঠিন। কিন্তু তাঁরা ধৈর্য, ত্যাগ, ঈমানি দৃঢ়তা ও আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার মাধ্যমে সব সংকট অতিক্রমে ইসলামের সুমহান দাওয়াত ও হিদায়াতের কাজকে এগিয়ে সফলতার উচ্চাসনে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। যুগে যুগে সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব চলমান থেকেছে। একদিকে হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)এর প্রচারিত হিদায়াতের আলো, অন্যদিকে শয়তানি গোমরাহীর অন্ধকার প্রবাহ। এ দ্বন্দ্বের ফলেই মানবতার মুক্তি ও শয়তানি চক্রান্তের সংঘর্ষ আজও চলমান।
বর্তমানের চলমান সংকট অপ্রত্যাশিত নয়- কারণ, গত দুই শতাব্দী ধরে বাতিল শক্তিগুলো পরিকল্পিতভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে ইসলামের মূল শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মুসলিম সমাজের ভেতরে দেখা গেছে চরম উদাসীনতা, বিভক্তি ও দায়িত্বহীনতার করুণ চিত্র। উম্মাহর অভ্যন্তরে নেতৃত্বের দুর্বলতা, স্বার্থান্ধতা, পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি আসক্তি এবং আত্মিক শক্তির অবক্ষয়- সব মিলিয়ে আমরা এমন এক দুরবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, যেখানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাই এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো- আজ উম্মাহর সাধারণ জনগণের বড় অংশই তাদের প্রকৃত ক্ষতি বুঝতে পারছে না। যারা কিছুটা বুঝতে পারছে, তাদের মধ্যেও যুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস, মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের শক্তি দৃশ্যমান নয়। যারা সাহসিকতার সাথে দাঁড়াতে চায়, তাদের পথরোধ করে রাখছে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অপবাদ-দোষারোপসহ ভয়ঙ্কর সব প্রতিবন্ধকতা। এ পরিস্থিতি অতিক্রম করা সম্ভব হবে কেবল ঐক্যবদ্ধ উম্মাহর সমষ্টিগত শক্তি ও আল্লাহর উপর দৃঢ় ভরসার মাধ্যমে।
আজ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো হোক কিংবা অমুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ- প্রায় সর্বত্র একই চিত্র। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সংরক্ষণের প্রচেষ্টা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাহত হয়ে চলেছে। নতুন প্রজন্মকে ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলার কাজ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে নানাভাবে। এমনকি অনেক রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও ঈমানি আহ্বান- এসব অরাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকেও দমন করা হচ্ছে কেবল ক্ষমতা ও স্বার্থরক্ষার অজুহাতে।
বিশেষত শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে মুসলিম সমাজের অবস্থা অনেক করুণ। সেখানে ঈমান ও দ্বীনের রক্ষার সব পথ বন্ধ করার চক্রান্ত চলছে। মুসলমান পরিচয়কে অপরাধ বানানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে নানা দেশে। বাহ্যিকভাবে মুসলিম পরিচয় লুকাতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বৈধ-অবৈধ সব উপায়, অপবাদ ও মিথ্যাচার পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে।
আরও পড়তে পারেন-
- আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ইসলামের ভূমিকা
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন হুমকির মুখে না পড়ে
- সমৃদ্ধ জাতি নির্মাণে দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও আলেমদের এগিয়ে আসা
- সালাম-কালামের আদব-কায়দা
- বিবি খাদিজা (রাযি.): ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নারী
এই দুঃসময়ে উম্মাহর জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধি। যখন সাধারণ মানুষই ক্ষতির গভীরতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ, তখন সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে আলেম সমাজকে, চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বকে। তাদের কর্তব্য হলো- উম্মাহকে জাগ্রত করা, নিজেদের অবস্থান বোঝানো এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো।
তবে এ দায়িত্ব পালন সহজ কাজ নয়। এর জন্য দরকার হবে ইখলাস তথা অকৃত্রিম আন্তরিকতা, আল্লাহর জন্য কাজ করার অঙ্গীকার, প্রশংসার লোভ ও প্রতিদানের প্রত্যাশা থেকে মুক্ত থাকা এবং নিন্দা ও বিরোধিতার ভয় অতিক্রম করে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা। আজ উম্মাহর আকীদা, ঈমান, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
মুসলিম উম্মাহ অতীতে যেমন সঙ্কট পার হয়ে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, আজও তা সম্ভব- যদি আমরা সত্যিকার অর্থে ফিরে আসি আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সুন্নাহর প্রতি। আমাদের অবশ্যই ভুলে গেলে চলবে না- আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অটল, “হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় করে দেবেন”। (সূরা মুহাম্মদ- ৭ আয়াত)।
অতএব, আজকের আহ্বান হলো- উম্মাহর প্রতিটি সদস্য নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঈমানি দায়িত্ব পালন করুন। আলেম-উলামাসহ সকল ইসলামী নেতৃত্ব এবং সচেতন মুসলিম বুদ্ধিজীবী সমাজ একযোগে সরব হয়ে সকল মতভেদ, বিদ্বেষ ও ঈর্ষাকাতরতাকে পেছনে ঠেলে দিয়ে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করুন। কারণ, ঐক্যবদ্ধ শক্তি, অবিচল সাহস ও ঈমানি দৃঢ়তা ছাড়া অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার বিকল্প আর কোনো পথ নেই।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক মুঈনুল ইসলাম, সম্পাদক- উম্মাহ২৪ডটকম, শিক্ষক- দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








