Home ওপিনিয়ন উদ্ভাবন বনাম জননিরাপত্তা: ব্যক্তিগত শখ যখন রাষ্ট্রীয় ঝুঁকির মুখে

উদ্ভাবন বনাম জননিরাপত্তা: ব্যক্তিগত শখ যখন রাষ্ট্রীয় ঝুঁকির মুখে

।। মুনির আহমদ ।।

স্বপ্নের প্রতি শ্রদ্ধা; শঙ্কার শুরু দায়িত্ব থেকে

বাংলাদেশে উদ্ভাবন ও গবেষণার পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবের মাঝেও যারা নতুন কিছু করার সাহস দেখান, তারা নিঃসন্দেহে সম্মানের দাবিদার। তরুণ উদ্ভাবক জুলহাস মোল্লার নিজ হাতে উড়োজাহাজ তৈরির প্রচেষ্টা সেই সাহসী উদ্যোগগুলোর একটি। সীমিত সামর্থ্যে আকাশ ছোঁয়ার এই স্বপ্ন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময় ও অনুপ্রেরণা জাগিয়েছে।

কিন্তু নাগরিক দায়িত্বের জায়গা থেকে একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে—এই উদ্ভাবন কি কেবল ব্যক্তিগত স্বপ্নের বিষয়, নাকি এটি জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় আকাশসীমার সাথেও জড়িয়ে পড়েছে? প্রশ্নটি জুলহাসের মেধা বা সদিচ্ছা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি নিরাপত্তা, আইন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ নিয়ে।

দাবির বিস্তার ও উদ্বেগের গভীরতা

প্রথম দিকে বলা হয়েছিল, জুলহাসের তৈরি উড়োজাহাজটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার। সাম্প্রতিক সময়ে দাবি করা হচ্ছে—নতুন সংস্করণে এই গতি প্রায় দ্বিগুণ। শুধু তাই নয়, তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে বিমানটিকে মেঘের ওপর দিয়ে ওড়ানোর লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছেন।

উড়োজাহাজ বিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র অনুযায়ী, গতি ও উচ্চতা যত বাড়ে, তত দ্রুত বদলে যায় বাতাসের চাপ, কাঠামোগত স্ট্রেস এবং এরোডাইনামিক ব্যালান্স। এই পর্যায়ে প্রবেশ মানেই এটি আর ‘শখের প্রজেক্ট’ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন রিস্ক। প্রশ্ন হলো—যথাযথ স্ট্রাকচারাল টেস্টিং, ফেইল-সেইফ মেকানিজম ও সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়ারিং সুপারভিশন ছাড়া এমন পরীক্ষা কতটা নিরাপদ?

জনসমাগম ও বসতির উপর দিয়ে ওঠছে জুলহাস মোল্লার বিমান।

কেন এটি ব্যক্তিগত ঝুঁকির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়

অনেকে যুক্তি দেন—উদ্ভাবক নিজেই ঝুঁকি নিচ্ছেন, এতে রাষ্ট্র বা সমাজের উদ্বেগের কী আছে? এই যুক্তি বাস্তবতার সাথে মেলে না। কারণ আকাশপথ কোনো ব্যক্তিগত খেলার মাঠ নয়; এটি রাষ্ট্রের অন্যতম সংবেদনশীল পরিসর।

প্রথমত, জননিরাপত্তা। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। যেকোনো যান্ত্রিক ত্রুটি, ইঞ্জিন ফেইলিওর বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে উড়োজাহাজ যদি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়, ক্ষয়ক্ষতি শুধু উড়োজাহাজ চালকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—তাতেও বড় ধরনের জনদুর্ভোগ, প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষতি ঘটে। পাশাপাশি, জুলহাস মোল্লারের জীবনও অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আরও পড়তে পারেন-

দ্বিতীয়ত, আকাশসীমার শৃঙ্খলা। রাষ্ট্রীয় আকাশসীমায় নির্দিষ্ট এয়ার রুট, উচ্চতা স্তর (Altitude Layer) ও ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা থাকে। অনুমোদনহীন উড়োজাহাজ বাণিজ্যিক বা সামরিক ফ্লাইটের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তৃতীয়ত, কারিগরি ও নেভিগেশনাল বাস্তবতা। মেঘের ওপরে উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন সাপোর্ট, প্রেসার কন্ট্রোল, আবহাওয়া রাডার এবং নির্ভুল নেভিগেশন সিস্টেম। এসব ছাড়া উচ্চতায় ওঠার চেষ্টা প্রযুক্তিগতভাবে আত্মঘাতী।

আইনগত কাঠামো ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল আইন- ২০১৭ অনুযায়ী, যেকোনো উড়ন্ত যান পরিচালনার আগে Civil Aviation Authority of Bangladesh (CAAB)-এর অনুমোদন বাধ্যতামূলক। আন্তর্জাতিকভাবেও হোম-মেড এয়ারক্রাফটের ক্ষেত্রে কঠোর লাইসেন্সিং, গ্রাউন্ড টেস্ট ও ফ্লাইট ট্রায়াল প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়।

প্রশ্ন হলো—এই বিমানটি কি সেই মানদণ্ডে পরীক্ষা করা হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তবে জনবসতির ওপর এভাবে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন কীভাবে অনুমোদিত হচ্ছে? আর যদি কোনো অনুমোদনই না থাকে, তবে কর্তৃপক্ষের নীরবতা কি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার শামিল নয়?

রাষ্ট্র বনাম উদ্ভাবক; এই ভ্রান্ত দ্বন্দ্ব নয়

এটি কোনোভাবেই ব্যক্তিগত উদ্ভাবনের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। বরং এটি উদ্ভাবনকে রক্ষা করার প্রশ্ন। রাষ্ট্রের কাজ উদ্ভাবনকে দমন করা নয়; রাষ্ট্রের কাজ হলো তাকে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন ওঠে—

  • বিমানটির কারিগরি সক্ষমতা যাচাইয়ে কি কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে?
  • দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কি সম্ভব নয়?
  • নির্দিষ্ট টেস্ট জোন, রানওয়ে বা নিয়ন্ত্রিত এয়ারস্পেসে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায় না কি?

উদ্ভাবন বাঁচুক, নিরাপত্তার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে

জুলহাস মোল্লার মতো উদ্ভাবকরা এই দেশের সম্পদ। তাদের হাত ধরেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্ভব। কিন্তু সেই অগ্রগতি যদি বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার বাইরে চলে যায়, তবে তা অনুপ্রেরণার বদলে বিপদের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।

আমরা চাই উদ্ভাবন বাঁচুক—কিন্তু তা যেন বিজ্ঞানের হাত ধরে এগোয়। আমরা চাই স্বপ্ন বাস্তব হোক—কিন্তু কোনো দুর্ঘটনার রক্তাক্ত মূল্য দিয়ে নয়। এখনই সময়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা নেবে এবং এই উদ্যোগকে নিয়ন্ত্রিত, পরীক্ষিত ও নিরাপদ কাঠামোর আওতায় আনবে।

কারণ রাষ্ট্রীয় আকাশসীমা কখনোই অপরিকল্পিত পরীক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে না।

সূত্র- জুলহাস মোল্লার ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত।

লেখক: সম্পাদক- উম্মাহ২৪ডটকম, নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক ‍মুঈনুল ইসলাম, শিক্ষক- জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম ‍মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।