Home ইতিহাস ও জীবনী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমান ও আলেম সমাজের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও সমসাময়িক বাস্তবতা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমান ও আলেম সমাজের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও সমসাময়িক বাস্তবতা

।। মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানী ।।

ভারতের স্বাধীনতা অর্জন কোনো একক দিন, একক আন্দোলন বা একক গোষ্ঠীর কৃতিত্ব নয়। এটি ছিল প্রায় আড়াইশো বছরব্যাপী এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও আত্মত্যাগময় সংগ্রামের ফল। এই দীর্ঘ ইতিহাসের অনেক অধ্যায় সময়ের প্রবাহে বিস্মৃত হয়েছে। তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অথচ উপেক্ষিত অধ্যায় হলো—মুসলমান আলেম সমাজ ও মাদরাসাভিত্তিক আন্দোলনের অবদান।

ভারতের স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল প্রায় ২৫০ বছরের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে একটি জাতির স্বাধীনভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা। দাসত্ব দাসত্বই—তা যে রূপেই আসুক না কেন। আর স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো এই বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকা যে, এই দেশ আমাদের এবং এই দেশের মুক্তির জন্য আমরা কুরবানি দিয়েছি।

১৭৫৭ সালে বাংলায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসন উৎখাতের মধ্য দিয়ে ইংরেজদের ভারত দখলের সূচনা হয়। এরপর একে একে বিভিন্ন নবাব ও শাসকের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং অবশেষে ১৮০৩ সালে তারা সমগ্র ভারতের ওপর নিজেদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। ১৭৯৯ সালে শহীদ হন সুলতান টিপু। তাঁর মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে এক ইংরেজ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছিল—“আজ টিপুর মৃত্যুর পর ভারত আমাদের।” এই উক্তির মধ্যেই ইংরেজদের প্রকৃত মানসিকতা প্রতিফলিত হয়।

ইংরেজরা জানত, বহু নবাব ও শাসককে প্রয়োজনে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু টিপু সুলতান ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি কোনো অবস্থাতেই দাসত্ব মেনে নেননি। নবাবদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ ছিল মূলত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। কিন্তু আমাদের আলোচ্য সেই শ্রেণি, যারা ক্ষমতা কিংবা রাজসিংহাসনের লোভে ছিল না। তারা ছিলেন মাদরাসার চাটাইয়ে বসে নবুয়তের ইলম অর্জনকারী আলেম সমাজ। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল—দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে দেশকে স্বাধীন করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে।

১৮০৩ সালে ইংরেজরা ঘোষণা করল—“দেশ বাদশাহের, জনগণ আল্লাহর; কিন্তু শাসনব্যবস্থা আজ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির।” এই ঘোষণার মাধ্যমে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, পারসি—সবাইকে কার্যত দাসে পরিণত করা হলো। সে সময় প্রকাশ্য প্রতিবাদের সাহস কেউ দেখাতে পারেনি। ঠিক তখনই হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)–এর পুত্র, মহান মুহাদ্দিস হজরত শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি (রহ.) ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন—“ভারত দাসত্বে পতিত হয়েছে। একে মুক্ত করা এখন প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ।”

আরও পড়তে পারেন-

এই ঘোষণা কোনো রাজা বা নবাবের পক্ষ থেকে আসেনি; এসেছিল একজন আলেমের কণ্ঠ থেকে। দিল্লির আকবরাবাদি মসজিদে বসে উলামায়ে কেরাম সম্মিলিতভাবে ফতোয়া দেন—দেশের স্বাধীনতার জন্য জিহাদ ফরজ। এর প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী আলেমদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, মাদরাসা ধ্বংস করে এবং সেই ঐতিহাসিক মসজিদটিও গুঁড়িয়ে দেয়, যেখান থেকে স্বাধীনতার প্রথম সংগঠিত আহ্বান উঠেছিল।

হজরত শাহ আবদুল আজিজ (রহ.) কেবল ফতোয়ায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি তাঁর সুযোগ্য শিষ্য সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরেলভি (রহ.) ও শাহ ইসমাইল শহীদ (রহ.)–কে প্রস্তুত করেন। তাঁরা সমগ্র ভারত সফর করে মুসলমান সমাজকে দাসত্বের বাস্তবতা বোঝান এবং স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংগঠিত করেন। বালাকোটের ময়দানে তাঁদের শাহাদাত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

এই আন্দোলন থেমে থাকেনি। ধারাবাহিকভাবে তা বিস্তৃত হয়ে শেষ পর্যন্ত ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে রূপ নেয়। এই বিপ্লবে হজরত কাসেম নানুতবি, হজরত রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী, হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কি (রহ.)–সহ অসংখ্য আলেম সরাসরি নেতৃত্ব দেন। লক্ষ লক্ষ মুসলমান এই আন্দোলনে শহীদ হন। শুধু দিল্লিতেই প্রায় ৩৩ হাজার মুসলমানকে ফাঁসি দেওয়া হয়—যাদের প্রধান ‘অপরাধ’ ছিল, তাঁরা আলেম ছিলেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

এই ভয়াবহ গণহত্যার পর মুসলমান সমাজ কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে, শহীদদের সন্তানরা এতিম হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হয়। এই করুণ বাস্তবতা দেখে আলেম সমাজ উপলব্ধি করেন—যদি এখনই শিক্ষাগত ও নৈতিক পুনর্গঠন না করা হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্ম ইংরেজদের মানসিক গোলামে পরিণত হবে।

এই প্রেক্ষাপটেই ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় ও ঈমানি চেতনায় উদ্বুদ্ধ মুজাহিদ গড়ে তোলার কেন্দ্র ছিল। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই উঠে আসেন শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান (রহ.)—যিনি বিদেশের মাটিতে ইংরেজদের কারাগারে বন্দি থেকেও ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। এক ব্রিটিশ গভর্নর মন্তব্য করেছিল—“শাইখুল হিন্দকে যদি পুড়িয়ে ছাই করা হয়, সেই ছাই থেকেও ইংরেজবিরোধিতা জন্ম নেবে।”

স্বাধীনতার পরও এই আলেম সমাজ ক্ষমতা বা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার লোভে আত্মসমর্পণ করেনি। জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে—তারা সরকার থেকে কোনো পদ বা অনুদান গ্রহণ করবে না; তাদের কাজ হবে দ্বীন ও জাতির খেদমত করা।

আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যে সম্প্রদায় দেশের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে বেশি কুরবানি দিয়েছে, তাদেরই উত্তরসূরিদের দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে। মাদরাসাগুলোকে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। এটি ইতিহাস-বিস্মৃতিরই পরিণাম।

এই আলোচনার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়; বরং নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা—যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে না, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎও গড়তে পারে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মসজিদ, মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানসমূহকে হেফাজত করুন এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের আদর্শে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।