Home সোশ্যাল মিডিয়া জোটরাজনীতি ও দায়বোধ: কিছু স্পষ্ট কথা

জোটরাজনীতি ও দায়বোধ: কিছু স্পষ্ট কথা

।। মাহমুদ আল-মাহরী ।।

আলহামদুলিল্লাহ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো বড় ধরনের অঘটন ছাড়াই ভোটগ্রহণ ও ফলপ্রকাশ শেষ হওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তির বিষয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জোট। এ ফলাফলকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা স্বাভাবিক; তবে সেই আলোচনায় সংযম, ন্যায়বোধ ও তথ্যনির্ভরতা বজায় রাখা জরুরি।

অভিযোগ ও বাস্তবতার প্রশ্ন

নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছু মহল বিএনপির নির্দিষ্ট জোটসঙ্গীকে একটিও আসন না পাওয়ার বিষয়টি সামনে এনে অযৌক্তিকভাবে ‘দালালি’ বা একপাক্ষিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছেন। এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় পরিস্কার করা প্রয়োজন।

প্রথমত, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের প্রশ্নে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, নির্বাচনী ইশতেহার ও কৌশলগত অবস্থানে অনেক ক্ষেত্রেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব, একটি দলের সঙ্গে সমঝোতা বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হলে, অন্য একটি দলের সঙ্গে জোট করাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দোষারোপ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। রাজনীতিতে জোট মানেই আদর্শ বিসর্জন—এমন সরলীকরণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দ্বিতীয়ত, ১১ দলীয় সমঝোতার ক্ষেত্রে আসন-বণ্টন ছিল আলাদা কাঠামোয়; সেখানে প্রত্যেক দল যে ক’টি আসন পেয়েছে, সেটিই তাদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক জোট কাঠামোয় অংশগ্রহণ মানে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্মিলিত প্রচার ও সমন্বিত প্রচেষ্টা। এই বিবেচনায়, কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাপ্ত আসনসংখ্যা দিয়ে কোনো দলের রাজনৈতিক অবদান মূল্যায়ন করা একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে।

আরও পড়তে পারেন-

বিভিন্ন জেলায় জোটসঙ্গীর প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন ও সাংগঠনিক সহযোগিতার বিষয়টি ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। এমনকি কয়েকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যেই জোটসঙ্গীদের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন। গুলশান কার্যালয়ে দলীয় প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোটগত সমন্বয়ের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন বলেও জানা গেছে। সুতরাং জোট-রাজনীতিকে কেবল আসনসংখ্যার অঙ্কে সীমাবদ্ধ করা সমীচীন নয়।

বিদ্রোহী প্রার্থী ও সাংগঠনিক বাস্তবতা

নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়টি একাধিক দলের জন্যই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো একটি দলকে এককভাবে দায়ী করা কিংবা পরাজয়ের পেছনে ‘পরিকল্পিত নকশা’ আছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনো সময়সাপেক্ষ। বরং যেসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত। একই সঙ্গে অন্যান্য দল বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে প্রশ্নও উন্মুক্ত রয়েছে।

কওমি অঙ্গনের জন্য সতর্কবার্তা

কওমি পরিমণ্ডলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংযম ও ভ্রাতৃত্ববোধ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকতেই পারে; কিন্তু সেই ভিন্নতা যদি আলেমসমাজের পারস্পরিক অবিশ্বাসে রূপ নেয়, তবে তা সামগ্রিক ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য কখনো কখনো বিভাজনকে উসকে দিচ্ছে। এতে তৃতীয় পক্ষের সুযোগ সৃষ্টি হয়, আর আমরা নিজেরাই নিজেদের দুর্বল করে তুলি।

আমাদের মনে রাখতে হবে—কওমি অঙ্গনে মৌলিক আকীদা, মানহাজ ও ঐতিহ্যের প্রশ্নে গভীর ঐক্য বিদ্যমান। দেওবন্দি ধারার শিক্ষা, আকাবির-আসলাফের উত্তরাধিকার এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশ্বাস—এসবই আমাদের অভিন্ন সম্পদ। সাময়িক রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে সেই ঐতিহ্যকে কাদা-ছোড়াছুড়ির লক্ষ্যবস্তু বানানো আত্মঘাতী প্রবণতা।

শেষ কথা

আজ প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থার পুনর্গঠন। আমরা একে অপরের পরিপূরক—প্রতিদ্বন্দ্বী নই। রাজনৈতিক কৌশলগত ভিন্নতা যেন আদর্শগত বিভাজনে পরিণত না হয়। আকাবিরদের আমানত আমাদের কাছে গচ্ছিত; তা সংরক্ষণ ও হেফাজত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আমাদের ভালোবাসা হোক মহান রবের সন্তুষ্টির জন্য। আমাদের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও অবস্থানও হোক ন্যায় ও সত্যের পক্ষে—শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা ‘উম্মাহ২৪ডটকম’-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।