।। মুফতি জুনায়েদ কাসেমী ।।
সভ্যতা ও মানবাধিকার। শব্দ দুটি মানব জাতির অধিকার রক্ষায় গভীর ইঙ্গিত বহন করলেও পশ্চিমারা যুগ যুগ ধরে এটিকে ঢাল স্বরূপ ব্যবহার করে আসছে। চারিদিকে তথাকথিত মানবাধিকারের স্লোগান ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের এমন স্লোগানে কিছু সাদাসিধে ইমানদাররা নিজদের অজান্তেই তা লুফে নিতে থাকে। আর এই সুযোগে তারা বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আগ্রাসন চালায়। ফলে মুসলমানদের সুসংঘটিত বিভিন্ন রাষ্ট্রগুলো তথা, ইরাক সিরিয়া আফগানিস্তান সহ আরো অনেক রাষ্ট্রকে তারা ধ্বংস করে দেয়।
পশ্চিমাদের এহেন নিকৃষ্ট আচরণ সত্ত্বেও আমরা তাদের সংস্কৃতি গুলোকে অবলীলায় গ্রহণ করে যাচ্ছি। অথচ, এসব সংস্কৃতি যে কত ধ্বংসাত্মক সচেতন মহলে তা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। হক্কানী ওলামাগণ তাদের সভ্যতা ও মানবাধিকারের মুখোশ উন্মোচন করেই যাচ্ছেন বহু আগ ধরে । তবে সম্প্রতি কালে তাদেরই পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ভেসে উঠেছে নিকৃষ্ট সভ্যতা ও মানবাধিকারের নগ্ন এক চিত্র। ” এপেস্টেইন ফাইল”।
এপেস্টেইন ফাইল পরিচিতি
এপস্টেইন ফাইল (Epstein Files) হলো মার্কিন ধনকুবের এবং দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন-এর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্তে সংগৃহীত হাজার হাজার পৃষ্ঠার আইনি নথিপত্র। এপস্টেইন ফাইল হলো মূলত মার্কিন বিচার বিভাগ (Department of Justice) এবং এফবিআই-এর সংগৃহীত আইনি নথিপত্র, ইমেল, ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দির একটি বিশাল সংকলন। এটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক শিশু পাচার ও যৌন শোষণ চক্রের (Child Trafficking and Sexual Exploitation Ring) দালিলিক প্রমাণ।
বর্তমানে এটি (এপেস্টেইন ফাইল) স্বতন্ত্র কোন ব্যক্তি সম্পর্কিত বিষয় নয় বরং একটি বড় প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তদন্তের নথিপত্রে বর্তমান বিশ্বের বড় বড় ক্ষমতাধরদের নাম উঠে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে নরেন্দ্র মোদি এমনকি আমাদের দেশের কুখ্যাত খুনি শেখ হাসিনার নামও সেই নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও তাদের কারো কারো ব্যপারে এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত নয়।
এপেস্টেইন দ্বীপে যা যা ঘটে
কুখ্যাত নারীলোভী এপেস্টেইন তার কুকর্ম বিস্তৃতির লক্ষ্যে আমেরিকার একটি দীপকে নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলে। নাম রাখে “এপেস্টেইন দীপ” হিসেবে।
একসময় বড় বড় ধনকুব ও রাষ্ট্র প্রধানদের কাম প্রবৃত্তি পূরণের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠে দ্বীপটি। বিষয়গুলো দীর্ঘদিন চক্ষু আড়ালে থাকলেও এখন তা দিনের আলোর মত পরিষ্কার।
প্রশ্ন হল, টাকার পাহাড় ও ক্ষমতার সুউচ্চ প্রাসাদ থাকা সত্ত্বেও এসব ব্যক্তি রা সেখানে কি করে?!
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কিছু বিকল্প গণমাধ্যম ও ভুক্তভোগীদের বয়ানে আঁতকে উঠার মত কিছু ভয়ঙ্কর অভিযোগও উঠে এসেছে । নারীভোগ, অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়েদেরকে নিয়ে নোংরামি করা ইত্যাদি ।
শুধু এতোটুকু নয়। কিছু কিছু গণমাধ্যমে এমনও চিত্রের কথা এসেছে, যে পৈচাশিক নির্যাতন করে অনেকের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি পর্যন্তও তারা ভক্ষণ করে।
তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত নয় এবং কিছু বিষয় বিতর্কিত।
নারীদের সাথে অবৈধ যৌনাচার করে প্রেগন্যান্ট হতে বাধ্য করে। কখনো কখনো ইচ্ছে করেই তাদের পেট চিরে নির্মমভাবে সেই শিশুকে বের করে নিয়ে আসে। (ফেস দ্যা পিপল, যমুনা নিউজ)।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
পশ্চিমা সংস্কৃতির মুখোশ উন্মোচন
পর্দার আড়ালে এই ছিল পশ্চিমাদের মানবাধিকারের আসল চিত্র। একসময় কাউকে তাদের নোংরামি বিশ্বাস না করানো গেলেও বর্তমানে এপেস্টেইন ফাইল তা বিশ্বাসযোগ্য করে দিয়েছে। তাদের সংস্কৃতি এখন যেন ভেতরে ঘুণেধরা সংস্কৃতি। যার উপর চাকচিক্যময় মনে হলেও ভেতর পুরোপুরি অন্তঃসারশূন্য।
এমন একটা ভয়ংকর সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ মুসলিম সমাজকে কুরে কুরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাই, তাদের সংস্কৃতি বনাম অপসংস্কৃতি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হওয়ার পর মুসলিম সমাজকে থেমে থাকার সুযোগ নেই। ঘুরে দাঁড়ার সময় এখনই!!!
ইহুদি খ্রিস্টানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং আদর্শ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّخِذُوا الۡیَہُوۡدَ وَالنَّصٰرٰۤی اَوۡلِیَآءَ ۘؔ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ؕ وَمَنۡ یَّتَوَلَّہُمۡ مِّنۡکُمۡ فَاِنَّہٗ مِنۡہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ অর্থ: হে মুমিনগণ! ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা নিজেরাই একে অন্যের বন্ধু! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদেরকে বন্ধু বানাবে, সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে হিদায়াত দান করেন না। —আল মায়িদাহ – ৫১
এখানে উদ্দেশ্য অন্ধ আনুগত্য ও আদর্শিক অনুসরণ—ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্ক বা দাওয়াতি আচরণ নয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- لا تشبهوا باليهود والنصارى অর্থ: তোমরা ইহুদী খ্রিস্টানদের সাথে (কোন প্রকারের সাংস্কৃতিক, আদর্শিক) সাদৃশ্যতা রেখো না। (মুসনাদে আহমদ: ৮৬৭২)
জেগে ওঠার সময় এখনই
সর্বশেষ কথা হল, আমরা মুসলমান। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অনেক দামি বানিয়েছেন ইসলামের মাধ্যমে। কোরআনই একমাত্র আমাদের জীবন বিধান। যা কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এমন একটি বিধান পাওয়ার পর আর কোন সংস্কৃতি প্রয়োজন হতেই পারে না।
অতএব, আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। যেন কোনভাবেই পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের উপরে না হয়। নিজেও সতর্ক থাকবো, অপরকেও সতর্ক রাখবো । সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। জেগে ওঠার সময় এখনই!
আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন!
– মুফতি জুনায়েদ হাজীপুরী, মুহাদ্দিস: জামিয়া ইসলামিয়া আযিযিয়া ওয়াসেকপুর।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ







