।। মাওলানা মুনির আহমদ ।।
“পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের বিরুদ্ধে যে ‘ইসলামভীতির’ বয়ান তৈরি করা হচ্ছে, তার নেপথ্যে আসলে কার স্বার্থ? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কেন ৯২ শতাংশের খ্রিষ্টায়ন নিয়ে নীরব, অথচ ২ শতাংশের ইসলাম গ্রহণ নিয়ে সরব? বরেণ্য গবেষক মেহেদী হাসান পলাশের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে পাহাড়ি জনপদের এক নীরব ধর্মান্তর ও গভীর ভূ-রাজনৈতিক নীল নকশার চাঞ্চল্যকর স্বরূপ সন্ধানে এই নিবন্ধ।”
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনতাত্ত্বিক কাঠামো ও ধর্মীয় আবহে এক নীরব অথচ গভীর পরিবর্তন চলছে। বিশেষ করে এই জনপদে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের বিরুদ্ধে একশ্রেণির মহলের অপতৎপরতা এখন দৃশ্যমান। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত গণমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে কথিত ‘ইসলামায়ন’ নিয়ে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হলে প্রামাণ্য তথ্য ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই অপপ্রচারের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন পার্বত্য গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক মেহেদী হাসান পলাশ। তাঁর দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ ও সরেজমিন অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার পক্ষটি হলো মূলত ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান সম্প্রদায়।
সিলেক্টিভ রিপোর্টিং ও পক্ষপাতদুষ্টতা
একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর গুটিকয়েক মানুষের ইসলাম গ্রহণ নিয়ে তথাকথিত অনুসন্ধানী রিপোর্ট করা হলেও সেখানে বৃহত্তর সত্যকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমটি ঘটনার গভীরে গিয়ে প্রকৃত সত্য উন্মোচনে ব্যর্থ হয়েছে, অথবা বলা যায়, তারা সত্য দেখতে চায়নি। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রতিবেদক সেখানে অনুসন্ধান করতে গেলেন, তিনি কি একবারও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসা করতে পারতেন না যে, ইসলামের পাশাপাশি এই জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ কেন খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে? যদি রিপোর্টে বলা হতো যে, ম্রো বা মুরং সম্প্রদায় তাদের আদি ধর্ম হারিয়ে বিভিন্ন বিশ্বাসে দীক্ষিত হচ্ছে, তবে সেটি বস্তুনিষ্ঠ হতো। কিন্তু যেখানে তাঁর পর্যবেক্ষণে প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে বলে উঠে এসেছে, সেখানে মাত্র এক-দুই শতাংশ মানুষের ইসলাম গ্রহণকে বড় করে তুলে ধরা চরম পক্ষপাতমূলক সাংবাদিকতা বৈ আর কিছু নয়।
একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সংখ্যাতাত্ত্বিক সত্য
পার্বত্য অঞ্চলের ধর্মান্তর প্রক্রিয়া ও তার নেপথ্যের মানসিকতা বুঝতে মেহেদী হাসান পলাশ তাঁর একটি সেমিনারের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। সেমিনারে মুরং সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে তথাকথিত ইসলামায়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘ বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তাঁর বক্তব্যের শেষে পরিচয় জানতে চাওয়া হলে দেখা যায়, তাঁর নামের সাথে ‘খ্রিষ্টান’ শব্দ যুক্ত। তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি আরও জানান, তাঁদের আদি বিশ্বাস ছিল ‘ক্রামা’ এবং বর্তমানে মুরং সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষই খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে, নিজের পূর্বপুরুষের আদি ধর্ম ত্যাগ করে যখন সিংহভাগ মানুষ খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট নেতার মনে কোনো উদ্বেগ জাগে না। কিন্তু যখন যৎসামান্য কিছু মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়, তখন তা নিয়ে তথাকথিত ‘মানবাধিকার’ বা ‘সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব’ রক্ষার ধুয়া তোলা হয়। এটি প্রতীয়মান করে যে, এই উদ্বেগটি কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের জন্য নয়, বরং এটি ইসলামের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের অংশ।
সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ
পার্বত্য অঞ্চলের কিছু স্থানীয় নেতার সাথে আলাপের সূত্র ধরে গবেষক পলাশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কোনো কোনো স্থানীয় নেতার বক্তব্যে এমন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ফুটে ওঠে, যা দেশের অখণ্ডতার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাঁদের কারও কারও বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, পশ্চিমা বিশ্বের সাথে আত্মীয়তার সূত্রে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে বিদেশি প্রভাবাধীন কোনো বিশেষ ভূখণ্ডে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন লালন করে। এই ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা ও চেতনা কেবল দেশপ্রেমের পরিপন্থীই নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত।
মিশনারী কৌশল ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিষ্টান মিশনারীদের তৎপরতা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কৌশলী। মূলত দুর্গম পাহাড়ের দারিদ্র্য, অপুষ্টি এবং আধুনিক চিকিৎসার অভাবকে পুঁজি করে তারা তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ‘চাক’ সম্প্রদায়ের মানুষও আজ খ্রিষ্টান মিশনারীদের এই তৎপরতার শিকার। কয়েক বছর আগে চাকরা এই খ্রিষ্টায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ পর্যন্ত করেছিল। এছাড়া খিয়াং, বম, পাংখো, লুসাই এবং গারো সম্প্রদায়গুলোর মাঝে ব্যাপক হারে খ্রিষ্টধর্মে রূপান্তরের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। মিশনারীদের কৌশলের একটি প্রধান দিক হলো, তারা ধর্মান্তরিতদের আদি নাম বা মূল সাংস্কৃতিক উৎসবসমূহ পালনে বাধা দেয় না। এই ছদ্মাবরণ ব্যবহার করে তারা নির্বিঘ্নে ধর্মান্তর প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, যা নিয়ে তথাকথিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।
আমাদের দায়বদ্ধতা: অভিযোগ নয়, সমাধান চাই
পাহাড়ের এই নাজুক পরিস্থিতিতে কেবল অপপ্রচারের সমালোচনা করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মিশনারীরা মূলত শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবিক সেবার আড়ালে তাদের ধর্মীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এর বিপরীতে মুসলিম উম্মাহর দায়বদ্ধতা আরও বেশি। পার্বত্য অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ ইসলামী দাওয়াহ পৌঁছানোর পাশাপাশি তাদের মৌলিক অধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় আলেম সমাজ ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা সময়ের অপরিহার্য দাবি। পাহাড়ে মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল গড়ে তোলা প্রয়োজন। মিশনারীদের ‘সেবা বনাম ধর্মান্তর’ কৌশলের বিপরীতে আমাদের ‘মানবিক সেবা ও ভ্রাতৃত্বের’ আদর্শ তুলে ধরতে হবে।
মিয়ানমারের আরাকান থেকে অত্যাচারিত হয়ে আসা ম্রো বা মুরং সম্প্রদায় শুরুতে প্রকৃতি পূজারী ছিল এবং পরবর্তীতে নিজস্ব ‘ক্রামা’ ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আজ সেই জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ খ্রিষ্টান হয়ে গেলেও কোনো আন্তর্জাতিক অর্থায়নে চলা গণমাধ্যম সেখানে সমস্যা খুঁজে পায় না। অথচ সামান্য কয়েকজন মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলে দেশি-বিদেশি মহলে শোরগোল পড়ে যায়। মেহেদী হাসান পলাশের উপস্থাপিত তথ্য ও যুক্তি এটাই ইঙ্গিত করে যে, পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে ইসলামভীতির এই আখ্যানটি মূলত একটি পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা। এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় জাতীয় সচেতনতা এবং ইসলামের মানবিক ও সেবামূলক কার্যক্রমের বিস্তারই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।
লেখক: শিক্ষক, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম, সম্পাদক- উম্মাহ২৪ডটকম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








