Home ধর্মতত্ত্ব শয়তান যেভাবে গুনাহের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করে (২)

শয়তান যেভাবে গুনাহের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করে (২)

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

এবার শয়তানের যুক্তি ‘ধনীরা ভাল আছে’ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা যাক। প্রথমতঃ আমাদের জানা থাকা দরকার যে, ভাল কাজের ফল দুনিয়াতেই পাওয়ার কথা নয়। এখানেই সব পেয়ে গেলে আখেরাতে আবার পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকবে কেন? ভাল কাজ করলে সর্বদা যদি দুনিয়াতে ফায়দা পাওয়া যেত, তবে সেই লোভেই মানুষ ভাল কাজ করত। এর জন্য তো আর ঈমানের প্রয়োজন পড়ে না।

পক্ষান্তরে আল্লাহর হুকুম না মানলে যদি ক্ষতি এখানেই হত, তবে তো আখেরাতে আর শাস্তির প্রয়োজন থাকে না। নগদ শাস্তির ভয়েই তো মানুষ আমল করবে। ঈমান লাগবে আবার কেন? রোজ ২০০ রাক্আত নামায না পড়লে চোখ নষ্ট হয়ে যাবে, এমন ভয়ের ব্যবস্থা আল্লাহ দিয়ে রাখলে এমন কে আছে, যে প্রতিদিন ২০০ রাক্আত নামায পড়ত না? কিন্তু আল্লাহ এভাবে ধরেন না।

এর কারণও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে- যারা আল্লাহ ও তাঁর বিধানকে অমান্য করে (তথা কাফির) তারা যেন অবশ্যই এ কথা মনে না করে যে, আমি তাদেরকে পাকড়াও না করে যে অবকাশ দিচ্ছি, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। অবশ্যই না, বরং আমি তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায়। আর তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (সূরা আল ইমরান- ১৭৮)।

সুতরাং আমাদের মনে রাখতে হবে, নামায রোযা করার উদ্দেশ্য দুনিয়াতে বিশাল বিশাল অট্টালিকা তৈরী করা নয়। যেহেতু আমরা ঈমান রাখি ও আমল করি আখেরাতে পুরস্কার পাওয়ার আশায়, সেহেতু তিনি আমাদের ঈমানকে পরীক্ষা করার জন্য মাঝে মধ্যে মুসীবতেও ফেলে থাকেন। দেখেন আমরা তার প্রতি আস্থা রাখি, না বস্তুবাদী মতবাদে বিশ্বাসী হই। এ জন্য আমাদের ঈমানকে মজবুত করতে হবে। আমরা কখনোই ভাবব না যে, আল্লাহ আমাদেরকে ধনী না করে ঠকিয়েছেন। ধনীরা টাকা দিয়ে জান্নাত কিনে নিল, আমরা পারলাম না।

আসলে যাদের মাল কম তারাই তো লাভবান। তাদের অনেক বিধান কমে গেল। মাল থাকলে যাকাত দিতে হত এবং হজ্ব করতে হত। না করলে যে গুনাহ হত সেই গুনাহ থেকে তো গরীবেরা বেঁচে গেল। অনেক ধনীই তো তা পালন করতে পারছে না। বরং খারাপ কাজে অর্থ ব্যয় করে জাহান্নাম অবধারিত করে নিচ্ছে। আল্লাহ তো গরীবদের বলেননি যে, জান্নাতে যেতে হলে হজ্ব করা লাগবে, যাকাত দেওয়া লাগবে। আখেরাতে গরীবেরা ধনীদের অনেক আগেই জান্নাতে চলে যাবে।

আরও পড়ুন- ‘শয়তান যেভাবে গুনাহের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করে-১ম কিস্তি’

কারণ, ক্বিয়ামতের দিন কড়ায়-গন্ডায় সব হিসাব দেওয়া লাগবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ক্বিয়ামতের দিন কোন আদম সন্তান আল্লাহর নিকট পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে দুই পা উঠাতে পারবে না। (১) তার জীবন সম্পর্কে, সে তা কোন কাজে শেষ করেছে? (২) যৌবন কাল সম্পর্কে, সে তা কোন কাজে লাগিয়েছে? (৩) সম্পদ সম্পর্কে, তা কোন পথে আয় করেছে? (৪) এবং তা কোন পথে ব্যয় করেছে? (৫) আর সে যে ইলম অর্জন করেছিল তার উপর কতটা আমল করেছে। (তিরমিযী শরীফ)।

জীবন, যৌবন, আয়-ব্যয় এবং জ্ঞান সম্মত আমল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তো আর কিছুই বাকী থাকল না। সুতরাং সব সময় ও সব কিছুর জবাবের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। শুধু মুসীবত এলে আল্লাহ্কে খুব করে ডাকব আর পরে বেমালুম ভুলে যাব, এমনটি করা বড়ই অন্যায়। আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য আফ্সোস করে বলছেন- যখন মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে একাগ্রচিত্তে তার পালনকর্তাকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন নিয়ামত দান করেন, তখন সে কষ্টের কথা ভুলে যায়, যার জন্য পূর্বে ডেকে ছিল এবং অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থাপন করে, যাতে করে অপরকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে। (সূরা যুমার- ৮)।

কি বিস্ময়কর অবস্থাই না আমাদের! আমরা ঠেকলে আল্লাহ্কে সর্বশক্তিমান বলি, তার কাছে নানাভাবে সাহায্য চাই, আর পরে ঠেকা দূর হয়ে গেলে আল্লাহর শক্তির কথা ভুলে যাই। বরং অসুখ দরকারী হিসেবে ডাক্তার, ঝড় তুফানের কবল থেকে রক্ষার কৃতিত্ব মাঝির এবং মামলায় জেতার কৃতিত্ব উকিল সাহেবকে অবলীলায় দিয়ে দিই। আল্লাহর কথা ভুলে যাই এবং বলে বসি, অমুক না হলে এবার বাঁচার কোন উপায় ছিল না। মুসীবতে থাকা অবস্থায় বিশ্বাস ছিল সব কিছু করতে পারেন শুধুমাত্র আল্লাহ। আর পরের ভাবখানা বলে- আল্লাহ নয়, ওসব লোকই করার ক্ষমতা রাখে।

আবার অনেকে এই সময় যত সব র্শিক বিদ্আত বা কুসংস্কারের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। জায়েয নাজায়েযের কোন চিন্তা না করে যে যখন যা বলে তখন তাই করে বসেন। এর মধ্যে একটির প্রচলন একটু বেশী। তা হল মান্নত বা নিয়্যাত করা। শরীয়ত সম্মত বিষয়ের মান্নত জায়েয আছে। কিন্তু এই সমাজে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করি না। বরং আনন্দ বেদনা, শুকরিয়া বা প্রার্থনায় আমাদের অধিকাংশ লোক মীলাদ পড়ান বা মাজারের আশ্রয় নেন। অথবা এর মান্নত করে থাকেন।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবায়ে কিরাম এমনটি করতেন না। তাদের চাওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিল নামায। গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছু করতে বা চাইতে তারা নামায পড়তেন। অথবা নামাযের মান্নত করতেন। কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নামায পড়াকে বলা হয় সালাতুল হাজত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আল্লাহ বা কোন মানুষের কাছে যদি কারো কোন প্রয়োজন পড়ে, তবে সে যেন উত্তম রূপে ওযূ করে এবং দুই রাক্আত নামায পড়ে। অতঃপর (নামায শেষে) আল্লাহর প্রশংসা করে ও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর উপর দরূদ পাঠ করে।

এরপর (নির্ধারিত দোয়া, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু হালীমুল কারীম…….) পড়ে। অতঃপর সে তার ইচ্ছামত দুনিয়া-আখেরাতের চাহিদা আল্লাহ তাআলার কাছে চাইবে। আল্লাহ তাআলা তার জন্য তা দান করবেন বা মঞ্জুর করবেন। (তিরমিযী ও ইব্নে মাজাহ)।

কোন লোক আরবীতে দোয়া না জানলেও নামায পড়ে ফায়দা পাবে। তবে ফরয নামায বাদ দিয়ে নয়। এটা অফিস ফাঁকি দিয়ে অভারটাইম করার মানসিকতার মত। তবুও সালাতুল হাজত পড়তে পারবে না বলা যাবে না। আল্লাহ কারো দোয়া কবুল করবেন না বলে নিশ্চিত করে বলা যাবে না।

কারণ, মাত্র একজনই আছেন যিনি চাইলেই খুশী হন। যে চায় না তার প্রতি নাখুশ হন। তিনিই আমাদের আল্লাহ। সুতরাং আমাদের অভাব অভিযোগে আল্লাহর দারস্থ হওয়ার অভ্যাস করতে হবে। মাজার মুখী না হয়ে আল্লাহ মুখী হতে হবে। আমাদের লোকজন মাজারের এত ভক্ত যে, তারা আজমির যায় কিন্তু মদীনায় যায় না। হজ্ব করে না কিন্তু বার বারই আজমির যায়।

অথচ অসুবিধায় পড়লে নামায, রোযা, হজ্ব ও দান খয়রাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। আগে এসব করতে না পারলে এর মান্নতও করা যায়। মাজার ও মীলাদের মান্নত না করে নামায, রোযা, হজ্ব, সাদকা, গরীব-মিসকীনকে খাওয়ানোর মান্নত করা উচিত। এটাই শরীয়ত সমর্থিত। এ জাতীয় মান্নতের আহার্য ধনীকে খাওয়ানো বা নিজে খাওয়া জায়েয নয়। উম্মত জননী হযরত আয়েশা (রাযি.) মান্নত করেছিলেন, নবীজিকে আল্লাহ মক্কার বিজয় দিলে তিনি কা’বা গৃহের ভিতরে নামায পড়বেন। যা পরে আমল করে ছিলেন।

আমাদের মাকসুদ পুরা হলে শুকরিয়া আদায় করার জন্যও সেই একই (মীলাদ, মাজার) পথ ধরি। কিন্তু সাহাবীগণ শুকরিয়া আদায় করার জন্য পূর্বোক্ত (নামায, রোযা, হজ্ব, দান খয়রাত) আমলই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শিখেছেন। আমাদেরও তাই করা উচিত। এরূপ শুকরিয়া আদায়ের নামাযকে ‘সালাতুশ্ শুক্র’ বলা হয়।

মাতা-পিতার মৃত্যু বার্ষিকীঃ

আমরা মাতা-পিতার শুধু মৃত্যু বার্ষিকীতেই তাদের জন্য দোয়া খায়ের করার ব্যবস্থা করি। কিন্তু তাদের কি শুধু মৃত্যু বার্ষিকীতেই সাওয়াবের দরকার? তাই সর্বদা দোয়া খায়ের করার অভ্যাস করতে হবে। এবং শুধু অন্য মানুষ দিয়ে নয়, নিজে করার অভ্যাস করতে হবে। খতম না পরলেও নামায বা কিছু সূরা পড়ে তো সাওয়াব পৌঁছাতে পারি।

আমাদের সমাজে আরেকটি বিধিবহির্ভুত রেওয়াজ আছে। আর তা হল, বিভিন্ন বার্ষিকী বা চল্লিশা ইত্যাদি পালন। কিন্তু ইসলামের নির্দেশনাতে এসব নেই। দাওয়াত খাওয়ানো নিষেধ নয়। কিন্তু কারো মৃত্যুর ৩, ৫, ৪০ বা অন্য কোন নির্ধারিত দিনে ভোজের আয়োজন করতে হবে মনে করাটা শরীয়ত পরিপন্থী।

আরও পড়ুন- ‘বিশ্বনবী (সা.)এর মিরাজ থেকে আমরা যা শিখতে পারি’

ছাড়া এ সমাজে ভোজ বা দাওয়াতের আয়োজনে ভালর চেয়ে মন্দই হয় বেশী। অর্থাৎ সাওয়াবের তুলনায় গুনাহই কামাই হয়। কারণ, এতে একটা নফল কাজ করতে গিয়ে অনেক ফরয তরকের মত ঘটনা ঘটে। পর্দার ব্যবস্থা থাকে না। যারা কাজকর্ম করেন তাদেরসহ বাড়ি ওয়ালাকেও দেখা যায়, জুম্আর নামায পর্যন্ত বাদ দিয়ে দেন।

এ জন্য ঘটা করে এসব পালন করার চেয়ে সেসব অর্থ গরীব-মিসকীনদের দিয়ে দেওয়া, মাদ্রাসার গরীব ছাত্র বা এতীম খানার শিশু কিশোরদের খাওয়ানো অনেক ভাল। দাওয়াত খাওয়ানোকে আমি গুনাহের কাজ বলছি না। কিন্তু পদ্ধতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাই হয়ে যায়।

এছাড়া আরো কিছু আয়োজন আছে যেগুলোতে পুরোপুরি পাশ্চাত্য বা অনৈসলামিক কালচারের সম্মিলন ঘটানো হয়। আবার এর মাঝখানে একটা দোয়া বা মীলাদের ব্যবস্থা থাকে। এতে ইসলামকে হালকাই করা হয়। বেপর্দার আড্ডা, আবার পরে নাচগানের আয়োজন বা এমন কিছুর সাথে ধর্মকে না টানাই ভাল। আল্লাহ এবং শয়তানকে এক সাথে খুশী করার চেষ্টা করে লাভ নেই। কারণ, আল্লাহ খুশী হলে শয়তান হয় না। আর শয়তান খুশী হলে আল্লাহ খুশী হন না। এটাই নিয়ম। সুতরাং আল্লাহ্কে খুশী করার মত ইবাদতই করা উচিত। [শেষ]

লেখক: প্রিন্সিপাল- জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলূম নলজুরী, সিলেট এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেসার্স আব্দুল মজিদ এন্ড সন্স, তামাবিল, সিলেট।

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.