Home সম্পাদকীয় ক্যাসিনো বা জুয়ায় নিজের ধ্বংস এবং পাপ ছাড়া কিছুই অর্জিত হয়...

ক্যাসিনো বা জুয়ায় নিজের ধ্বংস এবং পাপ ছাড়া কিছুই অর্জিত হয় না

0

।। কামরুল হাসান দর্পণ ।।

দেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু জুয়ার আসর ক্যাসিনো। এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার। বিষয়টি যখন উন্মোচিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ হতবাক হয়ে পড়ে। অনেকে বিস্ময়ে মনের অজান্তে বলে উঠেছেন, হায়, আল্লাহ! আমরা কোথায় আছি! এ কীভাবে সম্ভব! মানুষ রাতের মধ্যে কোটি কোটি টাকা কীভাবে উড়ায়!

অনেকে বলছেন, আমাদের মতো ধর্মভীরু মুসলমানের দেশে এমন অনৈতিক কাজ দিনের পর দিন কীভাবে চলে! বলা বাহুল্য, আমাদের দেশে মদ, জুয়া খেলার কথা সাধারণ মানুষ জানলেও ‘ক্যাসিনো’ নামক জুয়া কেন্দ্রের নাম খুব কমই শুনেছে। শুনলেও এ সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো ধারনা নেই। এই জুয়া কীভাবে খেলে, কত টাকার লেনদেন হয়, লাভ-ক্ষতি কেমন, তা তাদের অজানা ছিল।

গত সপ্তাহে রাজধানী ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন ক্লাব ও সুরম্য অট্টালিকায় পুলিশের অভিযানের পর ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের যে দৃশ্যের প্রকাশ ঘটে, তা থেকে তারা কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। জানতে পারে, ক্যাসিনোতে জুয়া খেলায় লাখ, লাখ টাকা নিয়ে জুয়াড়িরা নামে। কেউ মুহূর্তে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করে, কেউ হারিয়ে বসে। এ খেলায় সাধারণ মানুষের পক্ষে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তারাই অংশগ্রহণ করেন, যারা রাজনৈতিকভাবে বিপুল অবৈধ অর্থের মালিক, প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ এবং বিভিন্ন পেশার কোটিপতি। টাকার বস্তা নিয়ে তারা ক্যাসিনোতে ঢুকতেন।

জুয়া খেলে যেমন লাখ লাখ টাকা উড়িয়ে দিতেন, তেমনি লাখ লাখ টাকা আয়ও করতেন। যারা হারেন তারা আবারও লাখ টাকা নিয়ে নামতেন। যারা জিততেন তারাও অধিক উপার্জনের জন্য উৎসাহী হয়ে আরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করতেন। এক কথায় ক্যাসিনো মানে অর্থের ছড়াছড়ি। এই অর্থের ছড়াছড়ির সাথে জড়িয়ে আছে মাদক ও নারী। অর্থাৎ ক্যাসিনো মদ, জুয়া ও নারীর এক অন্ধকার জগৎ। এ জগতের বাসিন্দারা শত শত কোটি টাকার মালিক এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী। ভাবা যায়, ক্যাসিনোর রাজধানী খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসে রয়েছে ১০৪টির মতো ক্যাসিনো। আর ঢাকায় রয়েছে ৬০টি!

দুই.

ক্যাসিনো শব্দটির উৎপত্তি ইটালিতে। এর অর্থ ছোট্ট ভিলা, সামার হাউস কিংবা সামাজিক ক্লাব। এ ধরনের ক্লাব গড়ে তোলা হয় মানুষের আনন্দ-বিনোদনের জন্য। যেমন এতে থাকে লাইভ মিউজিক, কমেডি শো ও খেলাধুলার সুবিধাসহ বিনোদনের নানা সুযোগ সুবিধা। ঊনবিংশ শতকে এটি যুক্ত হয় বিভিন্ন বড় বড় ফাইভ স্টার হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, প্রমোদ তরী, এমনকি বড় বড় শপিং সেন্টারে। কালক্রমে আনন্দ-বিনোদনের পাশাপাশি এতে জুয়া খেলা যুক্ত হয়। এখন ক্যাসিনোর মূল লক্ষ্যই হয়ে উঠেছে জুয়া।

ইউরোপ-আমেরিকায় ক্যাসিনোর অনুমোদন রয়েছে এবং এতে সরকারকে নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব দিতে হয়। তবে এটি পরিচালনা এবং এতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম কানুন রয়েছে। নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে এর গণ্ডি সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। যে কেউ চাইলেই এতে প্রবেশ করতে পারে না। এতে প্রবেশের ন্যূনতম বয়সসীমা ১৮ থেকে ২১ বছর এবং কেউ প্রবেশ করতে চাইলে তার বয়সের প্রমানপত্র দেখাতে হয়। আধুনিক বিশ্বে ক্যাসিনোর জন্য বিখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাস। বলা হয় ক্যাসিনোর স্বর্গরাজ্য।

সারাবিশ্বের জুয়াড়িরা এখানে ভিড় জমায়। সেখানের প্রশাসনও রাজস্ব আয় এবং পর্যটনকে সামনে রেখে অসংখ্য ক্যাসিনো গড়ে তোলার অনুমতি দিয়েছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ধনপতিরা সেখানে বড় বড় হোটেল গড়ে ক্যাসিনো চালু করেছেন। এমনকি হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের পুরোটা জুড়ে ক্যাসিনো গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্বে যাদের অঢেল অর্থকড়ি রয়েছে, তারা আনন্দ-ফূর্তি করতে ক্যাসিনোগুলোতে হাজির হয়। এক রাতের মধ্যে কোটি কোটি টাকা জুয়া খেলে উড়িয়ে দেয়। ক্যাসিনো সংস্কৃতি মূলত পশ্চিমাদের হলেও তা সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে আছে। আমাদের এই উপমহাদেশে থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারতে ক্যাসিনো বহু বছর ধরেই চলে আসছে। বাংলাদেশে যারা ধনপতি এবং জুয়ার নেশা রয়েছে, তারা সপ্তাহের শেষ দিন এসব ক্যাসিনোতে চলে যান।

বৃহস্পতিবার বিকেলে প্লেনে গিয়ে সারারাত জুয়া খেলে শুক্র ও শনিবার ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন। এ তালিকায় সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পপতি থেকে শুরু করে শোবিজের অনেক তারকা, নির্মাতাও রয়েছেন।

বাংলাদেশের ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে হাউজিসহ বিভিন্ন ধরনের জুয়ার আসর চলে আসলেও ক্যাসিনোর মতো বড় ধরনের জুয়ার আসরের কথা শোনা যায়নি। গত প্রায় এক দশকে ধীরে ধীরে ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো সংস্কৃতির প্রচলন শুরু হয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা যারা অবৈধ উপায়ে বিপুল ভিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন, তারা ক্লাবগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করেন। এ থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা আয় করতে থাকেন।

দেশে ক্যাসিনো অবৈধ হলেও ক্ষমতার প্রভাব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই জুয়ার আসর চলে আসছে। মূলত এসব ক্যাসিনো পরিচালনা এবং জুয়ায় অংশগ্রহণ করত ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে দুর্নীতির মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া একশ্রেণীর মানুষ, প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যও। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে এখন তা প্রকাশ হয়ে পড়েছে।

দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে এবং শ্রমে-ঘামে, নীতি-নৈতিকতার মধ্য দিয়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছে, তখন ক্ষমতাসীন দল সংশ্লিষ্ট ও প্রশাসনের কিছু মানুষের জুয়া খেলার মাধ্যমে গাছের পাতার মতো অর্থ উড়িয়ে দিচ্ছে। এর অর্থ এই এসব মানুষ এতটাই অর্থ-বিত্তের মালিক যে টাকা খরচ করার কোনো জায়গা তারা খুঁজে পাচ্ছে না। টাকাকে তারা খেলার গুটির মতো ব্যবহার করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমান সরকার বিগত প্রায় একযুগ ধরে ক্ষমতাসীন থাকায় তার একশ্রেণীর নেতা-কর্মী কতটা দোর্দন্ড প্রতাপশালী হয়ে উঠেছে এবং কীভাবে শূন্য থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে, তা ক্যাসিনোর এক ঘটনা থেকেই তা মানুষ বুঝতে পারছে।

দুঃখের বিষয়, যেখানে সরকার তার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অর্থ জোগাড়ের জন্য প্রতি বছর বাজেটে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করার জন্য বিভিন্ন খাত খুলে অর্থ সংগ্রহ করছে, সেখানে তার দলেরই কিছু নেতা-কর্মী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায় করে নিজেদের ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে আছে। অন্যদিকে দলবাজ একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাও বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে টাকা কোথায় খরচ করবে, তার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। এই খুঁজে না পাওয়া থেকেই ক্যাসিনোর মতো জুয়ার আসর তারা সম্মিলিতভাবে চালু করে আনন্দ-ফূর্তিতে মেতে উঠে। পত্র-পত্রিকায় ক্যাসিনোতে ব্যবহার করা জুয়ার যন্ত্রপাতি ও সামগ্রীর ছবি দেখে যে কারো মনে হবে, এটা বাংলাদেশ নয়। এ যেন ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশের চিত্র।

তিন.

এটা কি ভাবা যায়, ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন এভাবে অবাধে ক্যাসিনোর মতো জুয়াড় আসর বসিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে! কোনো দেশের ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের কাছ থেকে কি এটা আসা করা যায়? জনগণ তো তাদের নির্বাচিত করেছে, দেশের পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা করে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং দেশের মানুষের কাছে আদর্শের প্রতীক।

এ বিষয়টি কি তারা একবার চিন্তা করেছে? প্রধানমন্ত্রীর কর্ম প্রক্রিয়া কি তারা অনুসরণ করছে বা তা বাস্তবায়নে সহায়তা করছে? করছে না। করলে কি আর নিজেদের ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকত? অবৈধ উপায়ে অর্থ কামাই করত? প্রধানমন্ত্রী বহুবার বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় এসেছে দেশের মানুষের সেবা ও কল্যাণের জন্য। ভোগ-বিলাসে মত্ত হওয়ার জন্য নয়। তিনি যেখানে দিন-রাত পরিশ্রম করে দেশের মানুষের উন্নতির জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁর এই আন্তরিকতা ও শ্রমকে বদনামের মোড়কে আবদ্ধ করার অধিকার কি তাদের আছে?

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, তাতী লীগসহ ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণীর নেতা-কর্মীর কাজ কি যে কোনো উপায়ে অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়া? জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের সাথে একাত্ম না হয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করা? এটা তো কল্পনাও করা যায় না, পড়ালেখা অবস্থায় একজন ছাত্রনেতার কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়া! তার বা তাদের কাজ কি ছাত্র রাজনীতি করে বিত্তশালী হওয়া, নাকি শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত সর্বোপরি দেশে আদর্শ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা? যুব নেতৃত্বের কাজ কি চাঁদাবাজি, মাস্তানি, অস্ত্রবাজি করে অর্থ কামাই করা? অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে সম্রাট হয়ে ভোগ-বিলাসে নিমজ্জিত হয়ে থাকা? নাকি দেশের যুবকদের সঠিক পথে রেখে পথ চলতে সাহায্য করা?

অন্য রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠনের কথা বাদ দিয়েও বলা যায়, এই ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং ক্ষমতাসীন দলের অন্যান্য দলগুলোর তো দেশের কল্যাণে কাজ করার ঐতিহাসিক এবং গৌরবজ্জ্বোল ভূমিকা রয়েছে। তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছে। এখন কি তারা তার বিনিময় নিচ্ছে? দেশের মানুষের কল্যাণের কথা না ভেবে, ত্যাগের রাজনীতি ভুলে নিজেদের বিত্তবান করার মধ্য দিয়ে কি তারা সেই পাওনা বুঝে নিচ্ছে?

জীবনে অর্থ-বিত্তের প্রয়োজন আছে। তার অর্থ এই নয়, প্রভাব খাটিয়ে, অবৈধ উপায়ে অর্থ রোজগার করতে হবে। আওয়ামী লীগ তো একটি আদর্শভিত্তিক ও ত্যাগের রাজনীতির দল। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ভাগ্য উন্নয়নই তার একমাত্র লক্ষ্য। এখন দেখা যাচ্ছে, দলটির একশ্রেণীর শীর্ষ নেতা সেই ত্যাগের কথা ভুলে ভোগের রাজনীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। অথচ আওয়ামী লীগ বিগত প্রায় এক যুগ ধরে যে ক্ষমতাসীন, এ সুযোগে তারা যদি নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যস্ত না থেকে দেশের মানুষের কল্যাণে সরকারকে সহযোগিতা করত, তাহলে দেশ আজ অনেক দূর এগিয়ে যেত।

বিশিষ্টজনরা যে প্রতিনিয়ত বলছেন, দেশ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে, সুশাসন নেইÑতাদের কথাই তো তারা এখন প্রমাণ করে দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং প্রশ্রয় দেয়, তাহলে প্রশাসনের সুবিধাবাদীরা সে সুযোগ নেবে এবং দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড স্থবির হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। এই যে সরকারের নেয়া একের পর এক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ সঠিক সময়ে শেষ হচ্ছে না, খরচ বেড়ে যাচ্ছেÑএর মূল কারণই তো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ও প্রশাসনের সুবিধাবাদীদের দুর্নীতি। আগেই বলেছি, জীবনে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। তবে তা কত?

অর্থ রোজগারের লক্ষ্য কি ক্যাসিনোতে জুয়া খেলে রাতের মধ্যে লাখ লাখ টাকা উড়িয়ে দেয়া? যারা এই অর্থ উড়িয়ে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন, তারা কি একবার ভাবেন না এ অর্থ দিয়ে সমাজের অনেক সেবা ও কল্যাণমূলক কাজ করা যেত! তাদের আশেপাশে কত মানুষ, কত পরিবার কত কষ্টে দিনাতিপাত করছে। তাদের উদ্বৃত্ত এই অর্থ নিয়ে কি এসব মানুষ ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায় না? বলা বাহুল্য, জুয়া, মাদক ও নারীর নেশা এমন যে তা মানুষকে আর মনুষত্ববোধের মধ্যে রাখে না। তার ভেতরের পশুকে জাগিয়ে তোলে। এই পশুর উন্মত্ততাই প্রকাশিত হয়েছে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে।

তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, অভিযানে এ পর্যন্ত যে কয়জন দুর্নীতির মাধ্যমে তিল থেকে তালে পরিণত হয়েছে এবং ধরা পড়েছে তারা হচ্ছে ‘টিপ অফ আইসবার্গ’ বা বিশাল হিমশৈলীর চূড়া মাত্র। তাদের মতো এমন আরও অসংখ্য দুর্নীতিবাজ দেশের প্রশাসন থেকে শুরু করে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমরা জানি না, এ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তারা ধরা পড়বে কিনা। কারণ প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এ কাজটি করা কঠিন। অনেক বাধা আসতে পারে। তবে আশার কথা, তিনি এ কথাও বলেছেন, যতই বাধা আসুক তিনি এর মূলোৎপাটন করবেনই। তাঁর এই দৃঢ়তা আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তা পারবেন এবং তাঁর এই দৃঢ়তার পাশে দুর্নীতিবাজরা ছাড়া দেশের সব মানুষ রয়েছে।

চার.

আমরা মনে করি, দুর্নীতিবিরোধী এই অভিযানকে কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। একে দেখতে হবে দেশের সার্বিক কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে।

দুর্নীতিবাজ যে দল-মতের হোক না কেন, দেশে নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকাতে তার বিনাশ জরুরি। দেশের সুষম, টেকসই ও আদর্শভিত্তিক উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই। সমাজের যারা নিয়ন্তা এবং যাদের দায়িত্ব নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সঠিক ধারায় প্রবাহমান রাখা, তারা যখন আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, তখন এর বিরুদ্ধে বড় ধরনের আঘাত হানা ছাড়া কার্যকর বিকল্প কিছু নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়টি উপলব্ধি করেই জিরো টলারেন্স নীতির মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। এই অভিযানের বড়ই প্রয়োজন ছিল। তবে দেশের মানুষ আশা করে, এ অভিযান যাতে কিছু দূর এগিয়ে আবার থেমে না যায়। একে চিরকালের মতো বলবৎ রাখা অপরিহার্য। যাদের অঢেল অর্থ-বিত্ত রয়েছে, তাদের উচিত হবে, আশপাশের মানুষের দিকে দৃষ্টি দেয়া। শুধু নিজেদের স্বার্থের দিকে তাকালে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। প্রকৃত মানুষ তারাই যারা মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসে।

ক্যাসিনো বা জুয়ায় নিজের ধ্বংস এবং পাপ ছাড়া কিছ্ইু অর্জিত হয় না। বরং তাদের এই অর্থ যদি এক বা একাধিক মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, তাই হবে তাদের জীবনের পাথেয়।

[email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.