Home সম্পাদকীয় বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের মূল বার্তা কী?

বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের মূল বার্তা কী?

0

।। মাসুম খলিলী ।।

ভারতের বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের খবর ও মূল্যায়ন শুধু উপমহাদেশেই নয়, বিশ্ব মিডিয়াতেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই প্রকাশ হচ্ছে। এ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টির ১৩৪ বছর পর এই মামলার রায় বের হলো। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে মুসলিম পক্ষকে অযোধ্যার কোনো ভালো জায়গায় ৫ একর জমি দিয়েই মামলার নিষ্পত্তি করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বাবরি মসজিদ মামলা সত্যিই কি অযোধ্যা শহরের অন্যত্র ৫ একর জমি প্রাপ্তির জন্য ছিল? ভারতের বেশির ভাগ মুসলিম নেতা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় তারা অবশ্যই মেনে নিচ্ছেন, কিন্তু এই রায়ে তারা হতাশ।

রায় বেরোনোর পর ভারতের মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জোট সংগঠন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, এই রায় বাবরি মসজিদের মামলাধীন জমিতে রামমন্দির নির্মাণের সমস্ত পথ উন্মুক্ত করে দিলো। রায়ে অসন্তুষ্ট হলেও তারা চান, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর যেন শান্তি ও সদ্ভাব বজায় থাকে। এই মামলার অন্যতম আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি বলেছেন, কয়েকটি তথ্য এবং সুপ্রিম কোর্টের কিছু আবিষ্কার নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন, তারা এই রায়ের কিছু অংশ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন।

ভারতের প্রধান বিচারপতি গগৈ রায়দানের সময় যেসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন তার মধ্যে রয়েছে, হিন্দুরা বিশ্বাস করেন এখানে রামের জন্মভূমি ছিল। তবে কারো বিশ্বাস যেন অন্যের অধিকার হরণ না করে। বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে জমির মালিকানা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তিনি জোর দিয়েছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টের ওপর। তারা বলেছে, মসজিদের নিচে আরো একটি প্রাচীন কাঠামো ছিল। আর সেটা কোনো ইসলামি স্থাপত্য ছিল না। তবে বিচারপতি গগৈ এও বলেন, মসজিদের নিচে যে কাঠামোর সন্ধান মিলেছিল তা যে কোনো মন্দিরেরই কাঠামো ছিল, পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের রিপোর্টে তাও কিন্তু বলা হয়নি। গগৈ আরো বলেছেন, যদি বাবরি মসজিদের নিচের কাঠামোটি কোনো হিন্দু স্থাপত্য হয়েও থাকে, তাহলেও এত দিন পর ওই জমিকে হিন্দুদের জমি হিসেবে মেনে নেয়া ঠিক হবে না।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আরো বলা হয়েছে, ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাবরি মসজিদে নিয়মিত নামাজ হয়েছে। এ সময় হিন্দুরা রাত্রিকালীন নামাজের পর মসজিদের মিম্বরে যে রামলালা ও সীতার মূর্তি স্থাপন করে, সেটিও ছিল অন্যায় ও বেআইনি কাজ। এ ছাড়া ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর কথিত করসেবকদের হাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করাও ছিল বেআইনি। তবে বাবরি মসজিদের মামলাধীন জমির ওপর রামলালার অধিকার স্বীকার করে নেয়া আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার প্রশ্নের সাথে যুক্ত।

প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সুপ্রিম কোর্ট কিসের ভিত্তিতে ওই মামলাধীন জমিকে রামলালার মালিকানাভুক্ত জমি হিসেবে ঘোষণা করলেন? সুপ্রিম কোর্টের খ্যাতনামা সাবেক বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় অনেকগুলো আইনি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট নিজেই বলেছেন, হিন্দুরা বাইরের প্রাঙ্গণে পূজা করত। আর ভেতরের প্রাঙ্গণে মসজিদের মধ্যে হতো নামাজ। যুক্তি মতে, বাইরের প্রাঙ্গণটি মন্দিরের জন্য আবেদনকারী হিন্দুদের দেয়া হলে আইন-সংবিধান ও ন্যায়বিচার রক্ষা হতো। কিন্তু পুরোটাই হিন্দুদের দেয়া হয়েছে।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের এই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এই রায় কিসের ভিত্তিতে দেয়া হলো তা বুঝতে পারছেন না বলে উল্লেখ করে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদালত একটি রায় দিলে তাকে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু ৪০০-৫০০ বছর ধরে একটি মসজিদ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মসজিদকে ২৭ বছর আগে ভেঙে দেয়া হলো বর্বরদের মতো আক্রমণ চালিয়ে। আর আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত বললেন, ওখানে এবার মন্দির হবে। সাংবিধানিক নৈতিকতা বলে তো একটা বিষয় রয়েছে! এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে দেশের সংবিধানের ওপর থেকে কারো ভরসা উঠে যায়। আজ অযোধ্যার ক্ষেত্রে যে রায় হলো, সেই রায়কে হাতিয়ার করে ভবিষ্যতে এ রকম কাণ্ড আরো ঘটানো হবে না, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন?

তিনি উল্লেখ করেন, শুধু অযোধ্যায় নয়, মথুরা এবং কাশীতেও একই ঘটনা ঘটবে বলে বলা হতো। যারা গুণ্ডামি করে বাবরি মসজিদ ভেঙেছিলেন, তারাই বলতেন। এখন আবার সেই কথা বলা শুরু হচ্ছে। যদি সত্যিই মথুরা বা কাশীতে কোনো অঘটন ঘটানো হয় এবং তার পরে মামলা-মোকদ্দমা শুরু হয়, তাহলে কী হবে? সেখানেও তো এই রায়কেই তুলে ধরে দাবি করা হবে যে, মন্দিরের পক্ষেই রায় দিতে হবে বা বিশ্বাসের পক্ষেই রায় দিতে হবে।

বিচারপতি অশোক উল্লেখ করেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত বললেন, অনেক হিন্দুর বিশ্বাস যে, ওখানে রামের জন্ম হয়েছিল। বিশ্বাস বা আস্থার মর্যাদা রাখতে ওই বিতর্কিত জমি রামলালার নামে দিয়ে দেয়া হলো। এটা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত হলো? রামচন্দ্র আদৌ ছিলেন কি না, কোথায় জন্মেছিলেন, সেসবের কোনো প্রামাণ্য নথি কি রয়েছে? নেই। রাম শুধু মহাকাব্যে রয়েছেন। সেই সূত্রে অনেক মানুষের মনে একটা বিশ্বাসও রয়েছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের বলে একটা মসজিদের জমি মন্দিরের নামে হয়ে যেতে পারে না। কালকে যদি আমি বলি, আপনার বাড়ির নিচে আমার একটা বাড়ি রয়েছে, এটা আমার বিশ্বাস; তাহলে কি আপনার বাড়িটা ভেঙে জমি আমাকে দিয়ে দেয়া হবে?

বিচারপতি আশোক বলেন, ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ করা তো আদালতের কাজ নয়। আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছেন অকাট্য প্রমাণ এবং প্রামাণ্য নথিপত্রের ভিত্তিতে। বাবরি মসজিদ যে ওখানে ছিল, পাঁচ শতাব্দী ধরে ছিল, তা আমরা সবাই জানি। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট এ দিনের রায়েও মেনে নিয়েছেন যে, অন্যায়ভাবে মসজিদটি ভেঙে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৫২৮ সালের আগে ওখানে রামমন্দির ছিল কি না, আমরা কেউ কি নিশ্চিতভাবে জানি? রামমন্দির ভেঙেই বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল, এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ কি কেউ দাখিল করতে পেরেছিলেন? পারেননি। তা সত্ত্বেও যে নির্দেশটা শীর্ষ আদালত থেকে এলো, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক নয় কি?

বিশ্ব মিডিয়ায় এই রায়কে মোদি ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের জয় হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, ‘কয়েক শতাব্দীর বিতর্কিত জমি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হিন্দুদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। মোদি এবং তার অনুগামীরা যে নতুন করে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি থেকে সরিয়ে হিন্দুত্বের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন, তার পক্ষে এটা বড় জয়।’ ওয়াশিংটন পোস্ট-এ লেখা হয়েছে, ‘মুসলিমদের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত জমি হিন্দুদের পুরস্কার দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। এটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বড় জয়।’ পত্রিকাটিতে ভারত একই সাথে প্রাথমিকভাবে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ নয়’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ অযোধ্যা রায়কে মোদির লোকসভা ভোটে জয়ের সাথে তুলনা করেছে। পাকিস্তানি দৈনিকগুলোতে ‘প্রধানমন্ত্রী মোদির জয়’-এর চেয়েও পাক মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক। দ্য ডন-এ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের রায় ভারতের যুযুধান হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।’

বাবরি মসজিদ রায়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এর দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এবং এর আপাত পরিসমাপ্তির সময়টি। ষোড়শ শতাব্দীতে এই মসজিদ নির্মাণ অথবা এর পরবর্তী চার শতকের বেশি সময়ব্যাপী এটি নিয়ে কোনো বিতর্ক ওঠেনি। এই বিতর্ক বিশেষভাবে উত্থাপিত হয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষের দিকে, যখন হিন্দু-মুসলিম দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে উপমহাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ব্যাপারে এক ধরনের ঐকমত্য সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রলম্বিত করার জন্য তখনকার ব্রিটিশ নীতির একটি কৌশল ছিল দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসে তা চাঙা করা। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)সহ বেশ কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয় এ সময়ে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এসব হিন্দুত্ববাদী সংগঠন তখন দলগতভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সংগঠিত করা বা নেতৃত্ব দানে কোনো ভূমিকা রাখেনি। স্বাধীনতা আন্দোলনে আত্মোৎসর্গকারীদের যে তালিকা রয়েছে তাতে আরএসএসের কোনো নেতার নাম নেই। স্বাধীনতা-উত্তর কংগ্রেস সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভ ভাই প্যাটেলকে আরএসএস এখন তাদের ধ্যানধারণার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে গ্লোরিফাই করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আরএসএস সংশ্লিষ্টতার গোপন পরিচয় থাকলেও কংগ্রেস নেতা হিসেবেই প্যাটেল ভূমিকা রেখেছেন।

বাবরি মসজিদের ঘটনার ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করা হলে যেটি বেরিয়ে আসে তাতে দেখা যায়, ১৯৪৯ সালে মসজিদে রামলালার মূর্তি স্থাপনের সময় বল্লভ ভাই প্যাটেল ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরিকল্পিতভাবে বিতর্ক সৃষ্টি এবং সেটিকে অজুহাত করে মসজিদে মুসলিমদের নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় তখন। এরপর তারা রামলালার পূজা করার অনুমতি প্রার্থনা করে মামলা করে আদালতে। বিতর্কিত কাঠামোতে হিন্দুদের পূজার অনুমতি দান করা হয় এবং এতে উত্তেজনা দেখা দিলে তা নিরসনে স্থিতাবস্থা জারি করেন আদালত। এরপর যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয় তখন উত্তর প্রদেশে ছিল কল্যাণ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন বিজেপির সরকার। মাঝখানে তিন মেয়াদে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার দিল্লির নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় দ্বিতীয়বারের মতো অধিষ্ঠিত হলে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় আসে, যাতে রামমন্দির স্থাপনের কাজ সরকারেরই উদ্যোগ নিয়ে করে দেয়ার অবকাশ তৈরি হয়।

বিজেপির এই চলতি মেয়াদে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা ভোগকারী রাজ্য জম্মু কাশ্মিরকে দ্বিখণ্ডিত ও মর্যাদা বিলুপ্ত করে কেন্দ্রের অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভারতজুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আন্দোলন সৃষ্টির জন্য তিনটি ইস্যু চাঙা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো গো-রক্ষা আন্দোলন। এই আন্দোলনে গরুকে গো-মাতা, এর মূত্রকে সর্বরোগের মহৌষধ হিসেবে প্রচার চালানো হচ্ছে। এই আন্দোলনে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে হত্যার অনেকগুলো ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

দ্বিতীয় কাজটি করা হচ্ছে তথাকথিত নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) মাধ্যমে যেসব অঞ্চলে মুসলিম প্রভাব রয়েছে, সেখানে তাদের প্রভাব মুছে ফেলার প্রচেষ্টা। আসাম দিয়ে এটি শুরু করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে পশ্চিম বাংলাকে। এ দু’টি হলো বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বড় দুই রাজ্য। আসামে এনআরসি বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সাথে জোট করে বিজেপি সরকার গঠন করে। আর পশ্চিমবঙ্গে ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে হিন্দুত্ববাদী প্রচার জোরদার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রসহ অন্য যেসব রাজ্যে মুসলিম প্রভাবিত পকেট রয়েছে, সেখানেও একই ধরনের প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে।

তৃতীয় কাজটি করা হয়েছে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন সংবলিত সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫/৩ অনুচ্ছেদ বাতিল করার মাধ্যমে। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে এক দিকে কাশ্মিরে জনসংখ্যার মুসলিম ভারসাম্য পরিবর্তনের কৌশল নেয়া হয়েছে। অন্য দিকে পাকিস্তানবিরোধী উগ্র চেতনা ভারতব্যাপী চাঙা করার সক্রিয় প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। বাবরি মসজিদ মামলার রায়টি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এ পদক্ষেপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান ও বিবিসির বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার ইঙ্গিত রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, লোকসভা নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিজয়ের পর বাবরি মসজিদের রায় নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির জন্য বিচারাঙ্গনে আরেক বড় বিজয়। সংসদ আর বিচার বিভাগের বাইরে আরো তিনটি প্রতিষ্ঠান বিজেপি ও সংঘ পরিবারের ডকট্রিন বা মতবাদ বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি হলো সশস্ত্রবাহিনী, একটি গোয়েন্দা বিভাগ আর তৃতীয়টি হলো নির্বাচন কমিশন।

বিচার বিভাগে সংঘ পরিবারের যে বিজয় তা অর্জনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টগুলোতে হিন্দুত্ববাদের ডকট্রিনে বিশ্বাসীদের নিয়োগ দানের কাজ হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত রায়ে স্পষ্ট সেই প্রচেষ্টা কতটা ফলবতী হয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোতে নেতৃত্বে নিয়োগ দানে একই ডকট্রিনে বিশ্বাসীদের নিয়ে আসা হয়েছে। যার ফলে সশস্ত্রবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দেয়া বক্তব্য আর বিজেপি-সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কাশ্মিরে সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা আর বিজেপির রাজনৈতিক সরকারের ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য করা এখন কঠিন। ভারতের রাজনৈতিক সরকারগুলো অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা আইবি এবং বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা র’কে ব্যবহার করত। একইভাবে সরকারের নানা এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হতো সিবিআইকে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ভর করেছে। পেশাদারিত্বের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এখন অনেক বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে।

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রতিষ্ঠান হলো নির্বাচন কমিশন। ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে এক ধরনের সুনাম ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটিও প্রশ্নের মধ্যে পড়ে গেছে। লোকসভা নির্বাচনের পর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আপ প্রধান কেজরিওয়াল, সাম্প্রতিক মহারাষ্ট্র নির্বাচনে শরদ পাওয়ারের দল এনসিপি এবং এর আগে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস ইভিএমে ভোট গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তারা দেখিয়েছেন, কিভাবে ভোটাররা এক প্রার্থীকে ভোট দেয়ার পর তা বিজেপির পদ্মফুলে যোগ হয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানেও বিজেপির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে বলে মনে হয়।

অন্তত দু’টি লক্ষ্য সামনে রেখে বিজেপি ও সংঘ পরিবার ভারত রাষ্ট্রের সার্বিক ক্ষমতা ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ন্ত্রণ আনতে চাইছে। এর একটি হলো- ভারতকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর, যেখানে অহিন্দুরা হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বকে মেনে নিয়ে অনুগত নাগরিক হিসেবে বসবাস করবে। দ্বিতীয়টি হলো- ভারতের আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে দিল্লির হাতে, যার চূড়ান্ত রূপ হবে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা।

অযোধ্যার বাবরি মসজিদ রায়কে এই বৃহত্তর ক্যানভাসে বিবেচনা করতে হবে। এ কারণে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক অশোক গাঙ্গুলি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বাবরির পর মথুরা-কাশীর মসজিদ-মন্দির ইস্যু সামনে আসবে আর অযোধ্যার ক্ষেত্রে দেয়া রায় সে সবের ওপরও কার্যকর হবে। তথ্য-উপাত্ত, দলিলের ওপর তথাকথিত বিশ্বাসের প্রাধান্য তৈরি হবে। সুপ্রিম কোর্টের আরেকজন বিচারপতি মার্কান্দে কাটজু উল্লেখ করেছেন, রাম জন্মভূমির যে বিশ্বাসের ওপর সুপ্রিম কোর্টের রায় দেয়া হয়েছে, সে বিশ্বাসের নায়ক রামচন্দ্র বাল্মীকির রামায়ণে কোনো অবতার ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানুষ, প্রথমে রাজপুত্র এবং পরে রাজা। কোনো রাজার নামে উপাসনা বা মন্দির হওয়ার কথা নয়।

এ ধরনের যুক্তির ওপর প্রচার-প্রচারণাই এখন ভারতের সার্বিক পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছে। এ কারণে সুন্নি মুসলিম ওয়াকফ বোর্ড বলেছে, অযোধ্যার মামলা একটি মসজিদ অথবা একটি জমির অধিকারের মামলা নয়, এটি ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার, অস্তিত্ব, মর্যাদা ও আইনের নিরাপত্তা প্রাপ্তির মৌলিক একটি বিষয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যে অভিমুখে ভারতের এখন যাত্রা ঘটছে তাতে দেশটির সংখ্যালঘু এবং আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য আরো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ সামনে অপেক্ষা করছে। অযোধ্যা মামলা তার একটি পর্বের সমাপ্তি ঘটিয়ে অন্য এক পর্বের দিকে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করেছে বলেই মনে হচ্ছে।

ই-মেইল: [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.