Home সম্পাদকীয় প্রসঙ্গ: ইসলাম অবমাননা

প্রসঙ্গ: ইসলাম অবমাননা

0

।। মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান ।।

ইসলাম অবমাননা এবং মুসলমান নির্যাতন অধূনা তামাম বিশ্বে একটি সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। পাশ্চাত্য ইহুদী খ্রীস্টান অধ্যূষিত। চীন মিয়ানমার’সহ বেশ কয়েকটি দেশ বৌদ্ধ অধ্যূষিত। এসব দেশে অল্প সংখ্যক মুসলমানের বসবাস। উপলক্ষ্য চাকুরী অথবা ব্যবসায় কোনো কোনো অভিবাসী সেই সকল দেশে অভিবাসী হলেও নাগরিকত্ব প্রাপ্ত। ব্রিটেনে তিন জন বাঙ্গালী মহিলা পার্লামেন্টে সদস্য পদও পেয়েছেন। আনোয়ার হোসেন নামের এক বাঙ্গালী হাই কমিশনার (রাষ্ট্রদূত) ছিলেন এক সময়ে।

আর মিয়ানমারের রাখাইন নামের প্রদেশটির পূর্ব নাম আরাকান। আরাকান একসময়ে একটি পৃথক রাজ্য ছিল। রাজ্যটি ছিল মুসলিম অধ্যূষিত। এখানে মধ্যযুগীয় কবি আলাওল রাজ্যসভায় স্থান পেয়েছিলেন। আরও কয়েকজন কবি ছিলেন রাজ্যসভায়। এখানে থাকাকালে আলাওল ‘পদ্মাবতী’ নামে বাংলাভাষায় মহাকাব্য রচনা করে সুনাম অর্জন করেন। রাজ্যটি ছিল মুসলমান অধ্যূষিত। সেই মুসলমানরাই রোহিঙ্গা নামে কথিত। এরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। বর্তমানে এই রাজ্যটি মিয়ানমারের একটি প্রদেশ, নাম রাখাইন।

রাখাইন বৌদ্ধদের একটি গোত্রের নাম। রাখাইন গোত্র রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে বহুকাল ধরে। নির্যাতন করছে সরকারের সেনাবাহিনীও। চলছে পাশবিক অত্যাচার। তাদের ঘর-বাড়ী পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মসজিদ মাদ্রাসা ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে। লুঠে নেওয়া হচ্ছে তাদের যথা সর্বস্ব। নারীরা হচ্ছে ধর্ষিতা। হিংস্র জানোয়ারকে হার মানিয়েছে অহিংস বুদ্ধের অনুসারী এই নরপিশাচেরা।

দীর্ঘকাল পরে গণতন্ত্রের কথিত এক মানস কন্যা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অংসান সূচী সরকারে আসার পরে রোহিঙ্গা মুসলমান নির্যাতন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাতে তাকে আরও একবার নোবেল পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। তিনি মিয়ানমারকে মুসলমান শূন্য করবার মিশন চালু করেছেন নতুন করে। এটা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। রোহিঙ্গা মুসলমানরা আজ পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছেন। সেনাবাহিনী আর রাখইন মগদের হাতে কত রোহিঙ্গা মরেছে কে তার হিসাব রাখে?

ইহুদী, খ্রীস্টান, বৌদ্ধদের দেশে বসবাসরত মুসলমানরা বহিরাগত অভিবাসী হয়েও অনেকেই সেই সকল দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছে। অবশ্য মিয়ানমারের (সাবেক আরাকান) প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানরা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। অথচ ক্ষমতার দাপটে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সরকার। চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের মুসলমানরাও স্থায়ী আদি বাসিন্দা হয়েও তাদের সন্তানদের মুসলমানী নাম রাখা সরকার নিষিদ্ধ করেছে। আছে আরো বহু বাঁধানিষেধ, যা মুসলমানী স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে বসবাস তাদের পক্ষে দূরূহ।

অমুসলিম দেশে মুসলমান বসবাসকারীরা তাদের ধর্ম ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলতে বাঁধার সম্মুখীন হয়। সেই সকল দেশে মেয়েদের পর্দা ও হিজাবের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারী করার খবর পাওয়া যায়। তাছাড়া কোনো সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটলে প্রমাণ পাওয়া আবশ্যক হয় না। সেটা মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাদের উপর অত্যাচার করা হয়। কয়েক বছর পূর্বে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে বোমা হামলায় ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করা হয়। এই ইস্যুতে আফগানিস্তান আক্রমণ করে দেশটাকে ছারখার করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত লাদেনকে পাকিস্তান থেকে ধরে নিয়ে সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। অথচ, লাদেন যে টুইন টাওয়ারে বোমা হামলা করেছে এমন কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি।

মুসলমান নিধনের জন্য বিধর্মীদের একটা অজুহাত থাকলেই হলো। প্রমাণের কোনো আবশ্যক হয় না। তাছাড়া সেসব দেশে ইসলামধর্ম এবং ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে ব্যাঙ্গচিত্র, সিনেমা, নাটক লিখে অবমাননার খবর আমরা পত্র-পত্রিকা মারফত জানতে পারি। শুধু যে ইহুদী-খ্রীষ্টানেরাই এসব করছে তা নয়। আত্মঘাতী মুসলমানও এ কাজ করে থাকেন।

একবার ভারতীয় মুসলমান নামধারী সালমান রুশদী মহানবী (সা.)কে অবমাননাকর উপন্যাস স্যাটানিক ভার্সেস লিখে মুসলমানদের উত্তেজিত করে। তখন আমেরিকা তাকে শেল্টার দেয়। যেন ইসলাম অবমাননা দোষের নয়। আবার একদল প্রগতিবাদী বাকস্বধীনতাকামী মুসলমানও আছেন, যারা এসব ঘৃন্য কাজকে সমর্থন করেন।

দেখা যাচ্ছে, মুসলমান কখনও ভিন্নধর্ম নিয়ে ব্যাংগ-বিদ্রুপ করে না। এটা কোনো বিশেষ প্রশংসনীয় বিষয় নয়। কিন্তু বিধর্মীরা ইসলাম অবমাননা করলে মুসলমান যদি ক্ষিপ্ত হয়ে কোনো কাণ্ড ঘটায়, তবে তারা জঙ্গী এবং মৌলবাদী নামে আখ্যায়িত হয়। বিধর্মীরা ইসলাম অবমাননা করে মুসলমানকে জঙ্গী খেতাব দেবার জন্য; বললে কি অসঙ্গত হবে?

ভারতীয় মুসলমানরা সে দেশে অভিবাসী নয়। তারা পুরুষানুক্রমে দীর্ঘকাল সেখানে বসবাস করছে। এদেশে মুসলমানদের শাসনকাল শুরু হয় প্রায় আটশত বছর আগে। তখন থেকে তারা ভারতের বাসিন্দা। ১৯০ বছর ভারতে ইংরেজ শাসন চলেছে। তারা এদেশে শাসনক্ষমতা মুসলমানদের হাত থেকেই কেড়ে নিয়েছিল।

এদেশের স্বধীনতা আন্দোলন করেছে হিন্দু মুসলমান একযোগে। অবশ্য স্বাধীনতা লাভ হয় ভারত দ্বিখন্ডিত হয়ে। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী হিন্দুরা অবশ্য অখন্ড ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিল। কিন্তু কতিপয় মুসলমান রাজনৈতিক নেতারা তা মানেনি। তাই ভারত দ্বিখন্ডিত হয়ে স্বাধীন পাকিস্তান এবং ভারতীয় ডমিনিয়ন নামে দু’টো স্বাধীন দেশের জন্ম হয়।

মুসলমান যেহেতু সংখ্যালঘু তাই পাকিস্তানের ভাগে ভারতের এক চতুর্থাংশের বেশী জায়গা পড়েনি। লোক সংখ্যা তখন ভারতে প্রায় একশো কোটি এবং পাকিস্তানে সাড়ে সাত কোটি মাত্র। ভারতে মুসলমান থেকে যায় পাকিস্তানের লোক সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। স্বাধীনতার পর ভারতকে সেক্যুলার রাষ্ট্র ঘোষণা করলেও তা সত্যিকারের সেক্যুলার ছিল না। ভারতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মুসলমানেরও অংশ গ্রহণ ছিল। এমনকি মুসলমানকে রাষ্ট্রপতি পদেও নেওয়া হয়েছে।

তথাপি সেখানে হিন্দু-মুসলমানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। মুসলমানদের বাবরী মসজিদ ভেংগে রামমন্দির নির্মাণের পাঁয়তারা চলেছে। বিহারী মুসলমান বিহার থেকে বিতাড়িত হয়ে পূর্ব বাংলায় (পূর্ব পাকিস্তানে) আশ্রয় নিয়েছে। কাশ্মীরী মুসলমানরা আজও সাম্প্রদায়িকতার শিকার। ২০০২ সালে গুজরাট রাজ্যে হাজার হাজার নিরীহ মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। গোরক্ষা সমিতির নামে মুসলমানদের গরুর গোস্ত খাওয়াকে বন্ধ করার চেষ্টা চলেছে। অধুনা গরুর গোস্ত খাওয়া এবং রাখার অপরাধে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। ঘরওয়াপসি প্রোগ্রামে নিম্ন শ্রেণীর মুসলমানদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এ সব সংবাদপত্রের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। তাহলে ভারত কেমন সেক্যুলার রাষ্ট্র?

আমাদের বাংলাদেশও সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) রাষ্ট্র। সেক্যুলার সম্পর্কে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের বক্তব্য: রাষ্ট্র কোনো ধর্মের পক্ষপাত করবে না। সবাই নির্বিবাদে স্ব-স্ব ধর্ম পালন করতে পারবে। সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। এ যুক্তি মেনে নেওয়া যেতো যদি না ধর্ম নিয়ে দেশে সমাজে কোনো সংঘাত না ঘটতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বিশেষত: ইসলামধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কিছু লোক উঠে পড়ে লেগেছে। ব্লগে ফেইসবুকে ইসলামের অবমাননা করে পোস্ট দেওয়ার খবর মাঝে মাঝে সংবাদপত্রে আসে।

এর ফলে দ্বীনদার মুসলমানেরা কেউ কেউ উত্তেজিত হন। ফলে কখনও কখনও অনভিপ্রেত অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়। আর তার দায়-দায়িত্বটা বর্তায় প্রতিবাদী মুসলমানদের উপর। একবার রামুর এক বৌদ্ধ যুবক কুরআন অবমাননাকর একটি ছবির পোস্ট দেয় ফেসবুকে। আরেক বার এক হিন্দু যুবক কাবাঘরের উপর শিবলিঙ্গ স্থাপন করা এক ছবি দিয়েছিল ফেসবুকে। এ সব ঘটনাতেও কতিপয় দ্বীনদার মুসলমান ক্ষিপ্ত হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে ঘটে গিয়েছিল অনর্ভিপ্রেত বিশৃংখলা।

১২ই নভেম্বর (২০১৭ ইং) এর নয়াদিগন্ত দৈনিক সংবাদপত্রের একটি সংবাদ শিরোনাম: ফেসবুকে স্ট্যাটাস নিয়ে রংপুরে সংঘর্ষ। গ্রেফতার ৫৩: দোষীদের বিচার দাবীতে মানববন্ধন। তাতে লেখা হয়েছে: ফেসবুকে ইসলামকে অবমাননা করে দেয়া স্ট্যাটাসের জেরে রংপুরের ঠাকুরটারীতে মুসল্লিদের বিক্ষোভ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০টি ঘর ও দুটি মন্দিরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ৫৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অজ্ঞাত ৬হাজার লোককে আসামী করে কোতোয়ালী ও গঙ্গাচড়া থানায় হয়েছে ২টি মামলা। গ্রেফতার আতঙ্কে ঠাকুরটারী গ্রামের আশপাশের তিন উপজেলার ২০ গ্রাম পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে।

এরূপ ঘটনা নতুন নয়। যখনই কেউ ইসলাম অবমাননা করে, তখনই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এটা আগেও কয়েকবার ঘটেছে। একজন হিন্দু যুবক ইসলাম অবমাননা করলে ইসলামের এবং মুসলমানের কোনো ক্ষতির আশংকা নেই। প্রতিবাদ করতে গিয়েই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফলশ্রুতিতে মুসলমানরাই গ্রেফতার হয়েছে। তাদের বিচার এবং শাস্তিও অবধার্য। আরও অজ্ঞাত ছয় হাজার মুসলমান আসামী হয়েছে। গ্রেফতারের ভয়ে কয়েক গ্রামের পুরুষের বাড়ী ছাড়া পলাতক। কী ভোগান্তি তাদের। কিন্তু সেই ইসলাম অবমাননাকারী যুগেন নাথের ছেলে টিটু এবং তার পরিবার পরজিনের কোন অসুবিধা ঘটেছে বলে পত্রিকায় পাওয়া যায়নি। সম্ভবত: তারা বহাল তবিয়তেই আছে।

যারা ইসলামের অবমাননা করে তাদের ধর্মগ্রন্থে কাজটা বৈধ না অবৈধ লেখে, তা জানি না। তবে ইসলামের আসমানী কিতাব আল-কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তাহারা আল্লাহকে ছাড়িয়া যাহাদের বন্দনা করিতেছে, তোমরা তাহাদিগকে মন্দ বলিও না, কেননা তাহা হইলে তাহারা অজ্ঞতা বশত: আল্লাহকে অতিশয় মন্দ বলিয়া ফেলিবে। (সূরা আনআম- ১০৯)।

তাই বলবো, মুসলমানদের পক্ষে হিন্দুদের মন্দির ভাঙ্গা কুরআন মোতাবেক অতিশয় অন্যায়। ইসলামের হুকুমত প্রতিষ্ঠার পর থেকে খেলাফতী শাসনামল পর্যন্ত মুসলমান বহুদেশ জয় করেছে। কোথায়ও মুসলমানরা বিধর্মীর মন্দির, গীর্জা ভেঙ্গে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছে- এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নেই। রংপুরের ঠাকুরটারী গ্রামে হিন্দুদের মন্দির ভাংগা, ঘরে আগুন দেওয়া, যেকারণেই হোক, অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। এই অন্যায় কাজ ছয় হাজার লোকে নিশ্চয় করেনি। যে ক’জনে করেছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। তবে এ- কারণে কোনো নির্দোষ মানুষকে হয়রান করা অনুচিত। ধর্ম নিরপেক্ষতা যদি ইসলাম নিরপেক্ষতা না হয়, তাহলে ইসলাম অবমাননাকারী হিন্দু যুবকটির দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হওয়া উচিত। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরণের কাজ করতে সাহস না পায়।

পরিশেষে বলবো, সবাইকে ধৈয্যশীল হওয়া উচিত। নতুবা আমাদেরকে এ-ধরণের ভোগান্তিতে পড়তেই হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.