Home বুক রিভউ গ্রন্থ আলোচনা- ‘বুড়িগঙ্গা থেকে হাডসন’

গ্রন্থ আলোচনা- ‘বুড়িগঙ্গা থেকে হাডসন’

0

।। সায়েমা আহমদ মনিকা ।।

আমেরিকা আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২৬ গুণ বড় এবং জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ মাত্র। অপরদিকে আমেরিকানদের জনপ্রতি বার্ষিক আয় বাংলাদেশীদের চেয়ে প্রায় ৩৪ গুণ বেশী। এবং আমেরিকা বিশ্বের সবচে উচ্চ আয়ের দেশ। বিপরীতে বাংলাদেশ বলতে গেলে বিশ্বের সবচে নিম্ন আয়ের দেশসমূহের একটি।

বাংলাদেশের শ্রমমূল্যও বিশ্বের সবচে কম বলা চলে। আর আমেরিকায় শ্রমের পাশাপাশি বলতে গেলে প্রায় সবকিছুই অতি উচ্চমূল্যে বিক্রয় হয়। নিউ ইয়র্ক সিটিতে প্রতিঘন্টা ন্যূনতম মুজুরী ১৫ ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১,৩৫০ টাকা। বাংলাদেশে ১,৩৫০ টাকায় আয় করতে একজন দিনমুজুরের কত দিন সময় লাগে বলতে পারবেন?

এই বাংলাদেশে একজন মানুষ যদি তার মোবাইল ফোনটি দিয়ে সারা মাসব্যাপী যতখুশী (আনলিমিটেড) ফোন কল, টেক্সট মেসেজেস এবং হাইস্পীড ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তাহলে কত টাকা বিল হতে পারে?

আমার নিজের কথাই বলি, একজন ব্যবসায়ী হিসাবে আমি দেশে থাকতে প্রতিমাসে কমবেশী প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা মোবাইল বিল পরিশোধ করতাম। আর এই ২৬ গুণ বড় ও বিশ্বের সবচে উচ্চমূল্যের দেশটিতে সারামাস আনলিমিটেড ফোন কল, আনলিমিটেড টেক্সট মেসেজেস এবং আনলিমিটেড হাইস্পীড ইন্টারনেট ব্যবহার করছি মাত্র ২০ ডলারে; যা বাংলাদেশী টাকায় মাত্র ১,৮০০ টাকারও কম। অথচ প্রতিজন আমেরিকান সিটিজেনের বাৎসরিক গড় আয় ৫৫ হাজার ডলার, যেখানে একজন বাংলাদেশীর আয় মাত্র ১,৫০০ ডলার।

প্রতিবাদী লেখক হিসাবে ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে পরিচিত তৌফিকুল ইসলাম পিয়াস। প্রতিবাদ করার পূর্বে এভাবেই অংক কষে নেন। মানুষকে সচেতন করতে চান তার নিজের অধিকার আদায় করে নেবার জন্য; মানুষ হিসাবে তার ন্যায্য পাওনা বুঝে নেবার জন্য। একজন নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রকে সে ট্যাক্স দেবার পাশাপাশি রাষ্ট্রে তার জনগণের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য ঠিকঠাক পালন করছে কি না সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার জন্য। খেটে খাওয়া জনগণের রক্ত ঘাম করা ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্র বা সরকারের পরিচালকরা বিদেশে চিকিৎসা নিবেন, কিন্তু সেই জনগণ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে- সেটা যে কোন সঠিক সরকার ব্যবস্থাপনা নয় তাও বুঝিয়ে দেবার জন্য এবং শেষটায় শুধুমাত্র একটা স্বাধীন ভূখন্ডের ভৌগলিক মালিকানা দিয়ে নয়, আপনি নিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে পারছেন কি না বা আপনি শোষিত হচ্ছেন কিনা সেটাতেই যে প্রকৃত স্বাধীনতা শব্দটি ফুঁটে উঠে সেটা তুলে ধরার।

এই বিশাল পৃথিবীর অসংখ্য দেশ, হাজার হাজার শহরে গিয়েছেন লেখক তৌফিকুল ইসলাম পিয়াস। ব্যাবসা ও ভ্রমন দু’টোই কাজে লাগিয়েছেন একসঙ্গে। চায়নার একদলীয় গণতন্ত্রে অন্য দশজনের সাথে সাথে ঠিক যেমনটা দেখেছেন নাগরিকদের মুখ বন্ধ করে করে রাখার সরকারী হীনকর্মকান্ড; আবার আরও একটু বেশী গভীরে ঢুকে এও দেখেছেন যে সেই একদলটির ভেতরের অতি চমৎকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ।

বিশ্বেও সবচে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতের অভ্যন্তরিণ গণতন্ত্রেও রসিকতাও সমান তালে উপভোগ করেছেন নিজের তীক্ষ্ণ দু’চোখেই।

বাংলাদেশটা ঠিক যেমন ‘নদীমাত্রিক’ একটা দেশ; নদীগুলি প্রকৃতির দেয়া কিন্তু বিপরীত দিকে আমেরিকা একটি মানুষ নির্মিত ‘রাস্তামাত্রিক’ দেশ; কত কত লক্ষ লক্ষ মাইল রোড নেটওয়ার্ক দেশটিতে রয়েছে সেটা কল্পনায়ও আনা সম্ভব না।

উন্নতির শীর্ষে অবস্থান করা দেশটিতে তিনি কিন্তু বিশাল অট্টালিকা আর রোড নেটওয়ার্ক দেখে ততটা আনন্দ পাননি; যতটা আনন্দ তিনি পেয়েছেন এটা দেখে যে, এই দেশটিতে একজন মানুষ আসলেই একজন ১০০% মানুষ। এখানকার মানুষটি মন চাইলে এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকলে ‘সবকিছুই’ করে ফেলতে পারেন। মন খুলে কথা বলতে পারেন, যা খুশী তাই লিখতে পারেন। প্রতিটি মানুষই এই ভূখন্ডে শতভাগ নিরাপদ।

ইসলাম ধর্ম ঠিক যেমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণের নির্দেশনা দেয় মজার বিষয়টি হচ্ছে সেটা বাংলাদেশ বা সৌদী আরবে না দেখা গেলেও আমেরিকায় তার শতভাগ উপস্থিতি দেখা যায়। শুধুমাত্র ধর্মে এরা মুসলিম নয়। মুসলিম না হলে কি হবে- এদেশের সুপ্রিম কোর্টে আমাদের মুহাম্মদ (সা)কেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান আইনপ্রণেতার রাজসিংহাসনটি যে তারাই দিয়ে রেখেছেন।

বাংলাদেশে মানুষের সামনে তিনি বারবার আমেরিকার প্রসঙ্গে, তাদের জীবন-চারণ তুলে এনে এটা বুঝাতে চাননি যে- বাংলাদেশের সকলে মিলে আমেরিকায় চলে আসা দরকার; বরং তিনি বুঝিয়েছেন- বাংলাদেশের মানুষ চাইলে বাংলাদেশটাকেও আমেরিকার মতোই বানিয়ে ফেলা সম্ভব।

বইটি পড়লে আমেরিকা সম্পর্কে বাংলাদেশীদের ধারণা শতভাগ পাল্টে যাবে। আদতে এতকাল বাংলাদেশে আমেরিকাকে ভ্রান্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে; তাদের সামাজিক মানদন্ড, মানবাধিকার, শিক্ষা, পোষাক, রুচি, সভ্যতার প্রতিযোগীতা ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেক নতুন কিছু জানা যাবে, নিজেকে সেই উচ্চতায় নিতে আগ্রহ জন্মাবে।

‘বুড়িগঙ্গা থেকে হাডসন’ তৌফিকুল ইসলাম পিয়াসের দ্বিতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ। তার প্রথম লেখা বইটির নাম ছিল ‘থ্যাংক য়্যূ’ যেটা প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ সালের একুশে বইমেলায়। তারপর ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় দীর্ঘ বিরতি। অবশ্য ফেসবুকে তিনি সরব। তার প্রতিবাদী লেখনী পাঠকদের মাঝে ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছে প্রতিনিয়তই। সত্যের পথে মোসাহেবীর বিপক্ষে তার লেখনী।

বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন রাগীম আহসান। মূল্য ৫০০ টাকা। রকমারীতে অর্ডার করে ঘরে বসেও বইটি পাওয়া যাবে। বইটি প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ।

একুশে বইমেলা ২০২০ এর বিদ্যাপ্রকাশের প্যাভেলিয়ান (ষ্টল নাম্বার ২৬৬, ২৬৭, ২৬৭, ২৬৯) এ বইটি পাওয়া যাচ্ছে। শিগগিরই সারাদের অভিজাত লাইব্রেরীগুলিতে বইটি পাওয়া যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.