Home ইসলাম রাসূলুল্লাহ (সা.)এর পারিবারিক জীবন

রাসূলুল্লাহ (সা.)এর পারিবারিক জীবন

1

।। মুফতী জাকির হোসাইন কাসেমী ।।

আজকের এ বিশাল উন্নত বিশ্বে মানব সন্তান উন্নতির চরম চড়ায় উন্নীত। ক্বিয়ামত পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব উন্মেষের যে ধারাবাহিকতার কথা আমরা পবিত্র কুরআন মাজীদ এবং রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অমিয় বাণীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি, তা যেন একের পর এক মানব সন্তান আবিষ্কার করেই চলেছে। মহাশন্য আবিষ্কার অভিযানের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে গগণচুম্বী অট্টালিকা আর প্রাসাদ নির্মাণের প্রতিযোগিতা। প্রগতিশীল এ দুনিয়ার মাঝে যেন ধিক ধিক করছে প্রাচুর্য্যরে এ অশুভ প্রতিযোগিতা। ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহে মানুষ গড়ে তুলছে বিলাস বহুল প্রাসাদ ও মনোরম অট্টালিকা।

ইসলামের নবী রহমতে দোআলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনি সমগ্র বিশ্ব জগতের জন্য প্রেরিত হয়েছেন রহমত হয়ে, মসজিদে নববীই ছিল তাঁর মদীনা রাষ্ট্রের তথা বিশ্বের সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী। মদীনায় হিজরত করে মসজিদ তৈরীর কাজ সমাপ্ত করে তিনি নিজের বাসস্থান তৈরীর চিন্তা-ভাবনা করেন। মসজিদ সংলগ্ন বাড়ীখানা ছিল সাহাবী হযরত হারেস বিন নো’মান আনসারী (রাযি.)এর। তিনি তাঁর বাড়ীখানা রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিয়ে দেন। ঐ বাড়ীতেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মত জননীগণের জন্য হুজরা তৈরী করেন।

হিজরতের প্রায় সাত মাস পর হযরত সাওদা (রাযি.) ও হযরত আয়েশা (রাযি.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় এসে রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হন। মদীনায় সর্বপ্রথম তাঁদের জন্য দু’টি হুজরা বা কুটির তৈরী করেন। এগুলোর নির্মাণ সামগ্রী ছিল খেজুর গাছের কাণ্ড, ডাল ও পাতা। ছাদ ও দেওয়াল ছিল কাদামাটির প্রলেপ দেয়া। ক্রমান্বয়ে নতুন বিবিগণ তাঁর বিবাহ্ বন্ধনে আসার সাথে সাথে পৃথক পৃথক হুজরা তৈরী করে দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত হুজরার সংখ্যা দাঁড়ায় নয়টিতে।

হুজরাগুলোর আকৃতিঃ

নয়টি হুজরার মধ্যে চারটি ছিল কাঁচা ইঁটের দেওয়াল ঘেরা এবং অবশিষ্টগুলো ছিল শুধু খেজুর শাখা দ্বারা নির্মিত। প্রত্যেক হুজরাতেই একটি মাত্র দরজা ছিল। সে দরজাগুলোতে চট বা ছেঁড়া কম্বলের একটা পর্দা টানানো থাকত। হযরত আয়েশার (রাযি.) হুজরার দরজাটি ছিল শুধু কাঠের তৈরী একপাট বিশিষ্ট। হুজরাগুলোর ছাদের উচ্চতা ছিল মানুষের মাথার সমান উঁচু। এসব হুজরাসমহের আয়তন ছিল দৈর্ঘ্যে ১০ হাত এবং প্রস্থে ৬/৭ হাত। দরজার উচ্চতা ছিল সাড়ে চার ফুট এবং প্রস্থে পৌনে দুই ফুট। এ ছিল বিশ্বনবীর বিশ্রামাগার। যেসব জীর্ণ কুটিরে তিনি বসবাস করেছেন রাতের অন্ধকারে এগুলোতে অনেক সময় বাতিও জ্বলেনি।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওমাতুল জান্দালের যুদ্ধে গমন করার পর হযরত উম্মে সালমা (রাযি.) তাঁর হুজরাটি কাঁচা ইঁট দ্বারা পুনঃনির্মাণ করেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে ইঁট দ্বারা নির্মিত গৃহ দেখে ফরমান- হে উম্মে সালমা! একি করেছো? উত্তরে হযরত উম্মে সালমা (রাযি.) আরয করেন, ইয়া রাসলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! পর্দা রক্ষা করা এবং আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে এটি বেশী নিরাপদ হবে। জবাবে রহ্মতে দোআলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, “মুসলমানদের অর্থ অপচয়ের যতগুলো পথ রয়েছে তন্মধ্যে চাকচিক্যময় গৃহ নির্মাণ একটি।” নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে দেখা যায়, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মীনীগণের মধ্যে সর্বশেষে যিনি ইন্তিকাল করেন তিনি হলেন হযরত উম্মে সালমা (রাযি.)। তাঁর ইন্তিকাল হিজরী ৬১ সনে সংঘটিত হয়। এছাড়া হযরত আয়েশা (রাযি.) ৫৭ হিজরীতে এবং হযরত সাওদা (রাযি.) হিজরী ৫৫ সনে ইন্তিকাল করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এঁরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্পর্শ ধন্য এসব জীর্ণ কুটিরেই বসবাস করে গেছেন।

মুসল্লীদের সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মসজিদে নববী সংস্কার করার প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উম্মত জননীগণের স্পর্শধন্য হুজরাগুলো ভেঙ্গে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, তখন উম্মত জননীগণের কেউ জীবিত ছিলেন না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ সহধর্মীনী হযরত উম্মে সালমার ইন্তিকালের প্রায় তিন দশক পর হযরত উমর বিন আব্দুল আযীযের রাজত্বকালে মসজিদে নববীর সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। তখনও খেজুর শাখার তৈরী হুজরাগুলো তার স্ব-স্ব অস্তিত্ব নিয়ে মওজুদ ছিল বলে জানা যায়।

বিশ্বনবী (সা.)এর পবিত্র বিছানা-পত্রঃ

বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে মাসঊদ (রাযি.) বলেন, আমি একদা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে হাজির হলাম। এসময় তিনি একটি মাদুরে শুয়ে আরাম করছিলেন। মাদুরের চিহ্ন তাঁর পবিত্র দেহে ফুটে উঠছিল। তা দেখে আমার কান্না রোধ করতে পারলাম না। হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বল্লেন, কি হলো কাঁদছো কেন? আরয করলাম, ইয়া রাসলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কায়সার ও কিসরা মখমলের গদীতে নিদ্রা যায় আর আপনি এই মাদুরে! নবীজী ফরমান, এটা কান্নার কথা নয়- তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখেরাত।

হযরত ইমাম বাকের (রাহ্.) বলেন, হযরত আয়েশা (রাযি.)কে কেউ জিজ্ঞাসা করল, “আপনার গৃহে রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানা কেমন ছিল? উত্তরে বল্লেন, চামড়ার ছিল, যার ভেতর খর্জুরের ছাল ভর্তি ছিল।” একদা হযরত হাফ্সা (রাযি.)কে কেউ জিজ্ঞাসা করল, “আপনার হুজরায় রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানা কেমন ছিল? তিনি বল্লেন, একটি চট ভাঁজ করে রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বসতে দিতাম। একদিন ভাবলাম এটাকে চার ভাঁজে ভাঁজ করে বিছিয়ে দিলে বসতে একটু আরাম হবে বৈকি। আমি তা-ই করলাম। এতে হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সকালে জিজ্ঞেস করলেন, রাতে আমার বসার জন্য কি বিছিয়ে ছিলে? আমি বল্লাম, সেই নিত্যদিনের বিছানা- কিন্তু তাকে চার ভাঁজ করে বিছিয়ে ছিলাম। যেন বসতে একটু আরাম হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বল্লেন, একে পর্বাবস্থায় রেখে দাও। কারণ, এর নম রাতে আমাকে তাহাজ্জুদে বাধা দেয়।

মহানবী (সা.)এর পবিত্র স্ত্রীগণঃ

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পঁচিশ বছর বয়স কালে মক্কার ধনাঢ্য বিধবা মহিলা হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাযি.)এর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন। চল্লিশ বছর বয়স্কা হযরত খাদিজা (রাযি.) এরপর আরো পঁচিশ বছর কাল জীবিত ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি। একবার হযরত আয়েশার সাথে হযরত খাদিজা (রাযি.)এর সম্পর্কে রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা হচ্ছিল। এক পর্যায়ে তিনি হযরত আয়েশা (রাযি.)কে লক্ষ্য করে বল্লেন, “মানুষ যখন আমাকে মিথ্যেবাদী বলেছিল, তখন তিনি আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। যখন মানুষ কাফির ছিল তখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যখন আমার কোন সাহায্যকারী ছিলনা তখন তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন।”

হিজরতের পর মদীনা জীবনে সর্বপ্রথম যাঁরা হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে মিলিত হন, তন্মধ্যে রয়েছেন হযরত আয়েশা বিন্তে আবু বকর (রাযি.)। নবুওয়্যাতের ত্রয়োদশ বর্ষে হিজরতের পর হযরত আয়েশা (রাযি.)কে মক্কা থেকে মদীনায় নিয়ে আসা হয়।

সময় তাঁর বয়স মাত্র ন’বছর। তিনি সখীদের সাথে দোলনায় খেলতেন। এই অল্প বয়স্কা কোমল মতি মহিলাই কালে দুনিয়া জোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। হযরত আয়েশা ও হযরত সাওদা (রাযি.) ব্যতীত যাঁরা মদীনা জীবনে হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহধর্মীনী ছিলেন তাঁরা হলেন- (১) হযরত হাফ্সা (রাযি.) (২) হযরত জয়নব (রাযি.) (৩) হযরত উম্মে সালমা (রাযি.) (৪) হযরত জোয়াইরিয়া (রাযি.) (৫) হযরত উম্মে হাবীবা (রাযি.) (৬) হযরত মায়মুনা (রাযি.) (৭) হযরত সাফিয়া (রাযি.)।

রাসলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটা সাধারণ অভ্যাস ছিল যে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বিবিগণের হুজরায় গমন করতেন। কিছু সময় তাঁদের সাথে অবস্থান করতেন। যাঁর হুজরায় যেদিন রাত্রি যাপন করবেন অবশেষে সে হুজরায় পৌঁছে রাত্রিযাপন করতেন। বিবিগণের মধ্যে কখনও মানব সলভ মতানৈক্য দেখা দিলে কিংবা পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি দেখা দিলে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তার সমাধান দিতেন।

পারিবারিক সহনশীলতাঃ

মদীনা জীবনে রাসলে খোদার নয় জন বিবির সংসার ছিল। সকলেই ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের। আবার অনেকে ছিলেন ঐশ্বর্য আর প্রাচুর্যের মধ্যে লালিত-পালিত। কয়েকজন ছিলেন কোমল মতি অল্প বয়স্কা। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুমহান চারিত্রিক মাধুর্যে সকল বিবিগণের মন-মানসিকতার এমনভাবে পরিবর্তন হয়েছিল যে, একটু বিলাসিতা ও জাঁকজমকের দিকে নজর দেয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পরিবার পরিজনের প্রতি তাঁর স্নেহ-মমতা, প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা ও আন্তরিক হৃদ্যতা ছিল সীমাহীন। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসল হয়ে তিনি বাস্তবে দেখিয়ে গেছেন আদর্শ পারিবারিক জীবন যাপন পদ্ধতি। তিনি নিজে যেভাবে পারিবারিক জীবনের প্রতিটি কর্ম সম্পাদন করেছেন, অপরকেও সেভাবে করতে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি নিজে যেমন কোনদিন ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের দিকে আকৃষ্ট হননি, তেমনি পরিবারের কোন সদস্য/সদস্যাকে সেদিকে মোহিত হবার সুযোগ দেননি। তাঁর সুমহান চারিত্রিক বৈশিষ্টের প্রভাবে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে সততা, ধৈর্য ও সহনশীলতার সর্বোত্তম বিকাশ ঘটেছিল।

প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা সকলেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শকে সামনে রেখে তাঁর পতপবিত্র চরিত্রে চরিত্রবান হই, তাঁর আদর্শে আদর্শবান হই। তাঁর জীবনের প্রতিটি অনুপম সুন্নাতকে আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলন ঘটিয়ে আল্লাহ্ এবং তাঁর প্রিয় হাবীবের সন্তুষ্টি লাভে ব্রতী হই- তাতেই আমাদের সফলতা ও মুক্তি।

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী এবং নায়েবে আমীর- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর। ই-মেইল- [email protected]

 

ওয়াযাহাতি জোড়ে উলামায়ে কেরামের ইজমায়ী সিদ্ধান্ত মেনে চলাতেই কল্যাণ: মুফতী জাকির হোসাইন কাসেমী