।। মাওলানা মুনির আহমদ ।।
গাজার উপর থেকে অবরোধ ভাঙতে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-র যাত্রা বিশ্বজুড়ে আবারও এক আবেগময় ঢেউ তুলেছে। মানবিক ত্রাণ নিয়ে সাহসিকতার এই গল্পে আমরা উচ্ছ্বসিত হই, কিন্তু এর পেছনের ‘রাজনৈতিক কৌশল’ এবং মনস্তাত্ত্বিক খেলাটি কি আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছি?
ফ্লোটিলার মতো এমন উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। ২০১০ সালের ‘মাভি মারমারা’ ঘটনার পর থেকে একই চিত্র আমরা বারবার দেখছি: নৌবহরকে ঘিরে তীব্র আবেগ সৃষ্টি হয়, গাজার জলসীমায় ইস/রায়েলি নৌবাহিনী বাধা দেয়, আরোহীদের গ্রেপ্তার করে এবং এরপর তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।
আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই অ*বরোধ ভাঙার তৎপরতা তখনই সবচেয়ে বেশি জোরালো হয়, যখন ইস/রায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ওপর চরম বর্ব/রতা, গণহত্যা বা নিপীড়ন চলে এবং ইস/রায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্ষোভ ও নিন্দা প্রবলতর হয়।
গত পনেরো বছর ধরে পশ্চিমের বেসরকারী উদ্যোগের এই ধরনের বেসামরিক নৌ মহড়া গাজার অবরোধ ভাঙতে কার্যত কিঞ্চিৎ ভূমিকাও রাখতে পারেনি। তবে পশ্চিমা শক্তির জন্য এর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সফলতা বিশাল। কারণ, এর মূল উদ্দেশ্য গাজার অবরোধ ভাঙা নয়, কৌশলটি আসলে অন্য জায়গায়।
এই ফ্লোটিলা কৌশলটি— ইস/রায়েলের শর্তহীন ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকা ও ইউরোপসহ পশ্চিমাবিশ্বের প্রতি শান্তিকামী মানুষ ও মুসলিমবিশ্বের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ও ঘৃ/ণা প্রশমনের একটি ‘নিরাপত্তা কপাট’ (Safety Valve) হিসেবে কাজ করে। ইস/রায়েলের প্রতি পশ্চিমা সরকারগুলোর অন্ধ সমর্থনের কারণে দেশের ভেতরে ও বাইরের বিশ্বে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষের মুখে এই ফ্লোটিলা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে একটি নিয়ন্ত্রিত নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রশমিত রাখার পথ তৈরি করে।
আরও পড়তে পারেন-
- আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ইসলামের ভূমিকা
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন হুমকির মুখে না পড়ে
- সমৃদ্ধ জাতি নির্মাণে দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও আলেমদের এগিয়ে আসা
- সালাম-কালামের আদব-কায়দা
- বিবি খাদিজা (রাযি.): ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নারী
যখন গ্রেটা থানবার্গ, ইয়াসেমিন আকার, মেলানি শ্বাইৎজার, কারেন ময়নিহান, মারিয়া এলেনা ডেলিয় ‘সহ সুপরিচিত পশ্চিমা মানবাধিকার কর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টরা ফ্লোটিলায় যোগ দেন এবং ইস/রায়েলি বাহিনী দ্বারা আটক হন, তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটি ব্যাপক প্রচার পায়। এই প্রচারের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করা হয় যে, “পশ্চিমা সরকারগুলো ইস/রায়েলের পক্ষে হলেও, পশ্চিমা সমাজের মানুষ অনেক মানবিক ও শান্তিকামী।”
একই সাথে, এই নৌবহরে তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকেও এমন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ও অ্যাক্টিভিস্টদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যাদের অনেকে নিজ নিজ দেশে কার্যত পশ্চিমা এজেন্ডা বা নীতির মুখপাত্রের ভূমিকায় কাজ করে থাকেন। এই অভিযানের মাধ্যমে তাদের একটি উজ্জ্বল ও সাহসী ভাবমূর্তি তৈরি হয়, যা তাদের ভবিষ্যতে যেকোনো পশ্চিমা নীতিকে নিজ নিজ সমাজে আরও সহজে ও দক্ষতার সাথে জনপ্রিয় করতে সাহায্য করবে। একদিকে সহানুভূতি তৈরি, অন্যদিকে নির্বাচিত কিছু মানুষের রাজনৈতিক সুবিধা পোক্ত।
গত ১৫ বছর ধরে এমন নৌ অভিযানের একই গল্পে দিনের আলোর মতো এটা পরিষ্কার যে, “সুমুদ ফ্লোটিলা”-এর মতো অভিযান একরকম প্রতা/রণাপূর্ণ ইতিবাচক মনোভাব তৈরির চেষ্টা। এটি সেইসব পশ্চিমা সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার একটি কৌশল, যারা একদিকে ইস/রায়েলকে সামরিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিতে সাহায্য করছে, আবার অন্যদিকে তাদের নাগরিকদের এই ধরনের ‘অহিংস প্রতিবাদ’ করার সুযোগ দিয়ে জনগণের ক্ষোভকে নগণ্য নাগরিক উদ্যোগে প্রশমিত রাখছে।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








