বাংলাদেশে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সহায়তায় ৪ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থ সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নয়, বরং ইইউ’র নিজস্ব পর্যবেক্ষক দল ও কিছু বেসরকারি সংস্থার কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হবে—ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে এর বাস্তব প্রভাব নগণ্য।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জানান, “বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রস্তুতিতে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত।”
তার ভাষায়, “২০২৬ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আমরা ৪ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিচ্ছি, যা নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নাগরিক পর্যবেক্ষণ, বিরোধ নিষ্পত্তি ও অপারেশনাল পরিকল্পনায় কাজে লাগবে।”
ইসির বরাদ্দের তুলনায় অঙ্কে সামান্য
ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার জন্য ৫,৯২১ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। এর তুলনায় ইইউ’র ৫৬ কোটি টাকা প্রায় ১ শতাংশেরও কম—যা বিশেষজ্ঞদের মতে প্রতীকী সহায়তা মাত্র।
ইইউ রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার “সংস্কারের অজুহাতে নির্বাচন বিলম্বিত করার” চেষ্টা করেছেন বলে রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ উঠেছে। এক পর্যায়ে তিনি নির্বাচনের দ্রুত আয়োজনের দাবি থেকে সরে এসে বলেন— “নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়, তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন হওয়া জরুরি।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ইইউ’র এই অবস্থান আসলে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের সময় দেওয়ার কৌশল, যা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত।
রোহিঙ্গা ও অভিবাসন নীতিতেও দ্বৈত মান
রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইইউর অবস্থানেও বৈপরীত্য রয়েছে। মাইকেল মিলার জানান, “আমরা ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রায় ৫০ কোটি ইউরো সহায়তা দিয়েছি। এখন সহায়তা কিছুটা কমিয়ে আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির দিকে জোর দিচ্ছি।”
কিন্তু কূটনৈতিক সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ফান্ড ক্রমেই কমছে, অথচ ইইউ এখনো বাংলাদেশের ওপর তাদের প্রত্যাবাসন নীতির চাপ বজায় রেখেছে।
আরও পড়তে পারেন-
- আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ইসলামের ভূমিকা
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন হুমকির মুখে না পড়ে
- সমৃদ্ধ জাতি নির্মাণে দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও আলেমদের এগিয়ে আসা
- সালাম-কালামের আদব-কায়দা
- বিবি খাদিজা (রাযি.): ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নারী
অন্যদিকে, ইইউর কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ২৯ জন বাংলাদেশি ফেরত পাঠানো হয়, আর মার্চে ফিরিয়ে দেওয়া হয় আরও ৬০ জনকে।
অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বাণিজ্যিক চাপ
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মূল্য কমানোর ইইউ’র নীতি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। তারা বাংলাদেশের রফতানি পোশাকের দাম কমাতে চাপ দিচ্ছে—যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।”
‘দ্বিচারিতা’র অভিযোগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন একদিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে কথা বলে, কিন্তু অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সদস্যদেশের সুবিধা রক্ষায় নীতির বিপরীত আচরণ করে। তাদের ভাষায়, “ইইউ অভ্যন্তরীণভাবে উদারনীতি চর্চা করে, কিন্তু বাইরের বিশ্বে অভিবাসন, বাণিজ্য ও কূটনীতিতে বাস্তবতা নির্ভর দ্বৈত মান বজায় রাখে।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ইইউ তাদের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করার অধিকার রাখে, তাই সরকার এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চায় না।”
উম্মাহ২৪ডটকম: আইএএ








