Home শিক্ষা ও সাহিত্য ইলম হাসিলের মূল চাবিকাঠি: উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্ক ও আদব

ইলম হাসিলের মূল চাবিকাঠি: উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্ক ও আদব

।। মুফতি তাজুল ইসলাম আশরাফী ।।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাআল্লুক তথা সম্পর্ক ও ভালোবাসার যে মহান নিয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্ক নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বরকতময়। এটি এমন এক পবিত্র বন্ধন, যার মাধ্যমে দ্বীন ও শরীয়তের ইলম কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। যতদিন এই সম্পর্ক দৃঢ় থাকবে এবং এর হক যথাযথভাবে আদায় করা হবে, ততদিন ইলম দুনিয়ায় বিদ্যমান থাকবে। পক্ষান্তরে, সম্পর্ক যত দুর্বল হবে এবং এর প্রতি অবহেলা যত বাড়বে, ইলম তত হ্রাস পাবে, এমনকি এক সময় দুনিয়া ইলমশূন্য হয়ে যাবে।

মনে রাখা দরকার, একটি হলো সম্পর্কের সুরত (বাহ্যিক রূপ), আরেকটি হলো এর হাকীকত (প্রকৃত মর্ম)। কেবল বাহ্যিক কাঠামো দিয়ে প্রকৃত উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। এ প্রসঙ্গে বিদায় হজ্জের খুতবায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “হে মানুষ! ইলম উঠিয়ে নেওয়ার আগে তা গ্রহণ করে নাও”। (সহীহ বুখারী, হাদিস- ১০৬)।

এ সময় এক সাহাবী আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর নবী! আমাদের মাঝে কুরআন বিদ্যমান, আমরা তা শিখেছি এবং আমাদের স্ত্রী, সন্তান ও খাদেমদেরও শিক্ষা দিয়েছি। তাহলে আমাদের কাছ থেকে ইলম কীভাবে উঠিয়ে নেওয়া হবে?” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস- ৪০৪৮)।

এ প্রশ্নে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরক্ত হয়ে বললেন, “আরে, তোমার মা তোমাকে হারাক! ইহুদী-নাসারাদের কাছেও তো কিতাব আছে, কিন্তু তাদের নবীগণ যা নিয়ে এসেছিলেন, তার এক অক্ষরের সঙ্গেও তারা সম্পর্ক রাখে না। এরপর তিনি তিনবার ঘোষণা দিলেন, শুনে রাখো! ইলম চলে যাওয়ার অর্থ হলো, উলামায়ে কেরামের ইন্তিকাল”। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস- ২২২৯০)।

অতএব, উস্তাদের সামনে বসে কিতাব পড়া বা কিছু শব্দ মুখস্থ করে নেওয়াই ইলমের প্রকৃত মর্ম নয়। হাকীকত হলো সেই আন্তরিক সম্পর্ক, যা আমাদের পূর্বসূরি মনীষীরা ধারণ করেছিলেন। সেই হাকীকী সম্পর্কের বরকতেই দ্বীন ও শরীয়তের ইলম আজ পর্যন্ত সুরক্ষিত রয়েছে।

ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর জীবনীতে উস্তাদ-শাগরিদের এই হাকীকী সম্পর্কের এক অনন্য দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আচার-আচরণ ও স্বভাবে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। তাঁর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য ছিল আলকামা (রহ.)-এর; আলকামার সঙ্গে ইবরাহীম নাখাঈ (রহ.)-এর; তাঁর সঙ্গে মানসুর ইবনে মু’তামির (রহ.)এর; মানসুরের সঙ্গে সুফিয়ান সাওরী (রহ.)এর; সুফিয়ানের সঙ্গে ওয়াকী (রহ.)-এর; আর ওয়াকী (রহ.)-এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য ছিল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর”। (সিয়ারু আলামিন নুবালা- ১১/৩১৬-৩১৭)।

আচার-আচরণ ও স্বভাবে এই ধারাবাহিক সাদৃশ্য তখনই গড়ে ওঠে, যখন উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্ক হয় হাকীকী ও প্রাণবন্ত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজ ইলমী অঙ্গনে এই সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আগে এর হাকীকত দুর্বল হয়েছিল, আর এখন তার বাহ্যিক কাঠামোও ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক তালেবে ইলমের মাঝে উদ্ভট ও আজনবী চিন্তাধারা প্রসার লাভ করছে। সম্পর্ক যত দুর্বল হবে, এ ধরনের বিচ্যুতি তত বাড়বে।

সুতরাং ইলমের প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্ককে হাকীকী করতে হবে। এর জন্য সম্পর্কের হক যথাযথভাবে আদায় করা অপরিহার্য। এ বিষয়ে নিম্নোক্ত তিনটি গ্রন্থে মূল্যবান দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। যথা-

  • হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.)-এর সংকলিত বাণী- استاد اور شاگرد کے حقوق اور تعلیم و تربيت کے طریقے (সংকলন- মাওলানা মুহাম্মাদ যায়েদ মাযাহেরী (দা.বা.)।
  • শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা (হাফি.)এর “মাআলিমু ইরশাদিয়্যাহ”।
  • মাওলানা সায়্যিদ সিদ্দীক আহমাদ বান্দভী (রহ.)এর “আদাবুল মুতাআল্লিমীন ও আদাবুল মুআল্লিমীন”।

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আদব
১. উস্তাদের প্রতি আজমত (শ্রদ্ধা), মহব্বত ও খেদমত

উস্তাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, অন্তরে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রাখা, তা বাহ্যত প্রকাশ করা এবং এমন সব আচরণ থেকে বেঁচে থাকা, যা উস্তাদের মনঃকষ্টের কারণ হতে পারে। কারণ, উস্তাদকে কষ্ট দেওয়া বা তাঁর অসন্তোষের কারণ হওয়া ইলম হাসিলের পথে এক বিরাট অন্তরায়।

সালাফে সালেহীনের জীবনে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এখানে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা উপস্থাপন করা হলো।

রবী ইবনে সুলায়মান রাহিমাহুল্লাহ (জন্ম- ১৭৪ হি., মৃত্যু- ২৭০ হি.) ছিলেন ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ-এর খাস শাগরিদ। ইমাম সুবকী রাহিমাহুল্লাহ (৭৭১ হি.) তাঁর জীবনী তাবাকাতুশ শাফিয়্যাতিল কুবরাতে এভাবে শুরু করেন-

صَاحِبُ الشافعي ورَاوِيةُ كُتُبِه، والثِّقةُ الثَّبْتُ فِيمَا يَروِيهِ…
অর্থ- “তিনি ছিলেন ইমাম শাফেয়ীর সঙ্গী ও তাঁর কিতাবসমূহের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী”।

তাঁর নির্ভরযোগ্যতা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, ইমাম শাফেয়ীর কোনো বক্তব্য নিয়ে তাঁর সঙ্গে আবু ইবরাহীম মুযানীর মতভেদ হলে, মাযহাবের আলেমগণ রবী ইবনে সুলায়মানের বর্ণনাকেই প্রাধান্য দিতেন। অথচ আবু ইবরাহীম মুযানীও ছিলেন অত্যন্ত ইলমী মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব।

কিন্তু রবী ইবনে সুলায়মানের প্রারম্ভিক অবস্থা কী ছিল? ইমাম সুবকী (রহ.) লিখেছেন, “কাফফাল (রহ.) উল্লেখ করেন, রবী ইবনে সুলায়মানের বুঝশক্তি ছিল ধীর। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁকে একটি মাসআলা চল্লিশবার বোঝালেন; তবু তিনি বুঝতে পারলেন না। লজ্জায় তিনি মজলিস থেকে উঠে যান। তখন ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁকে আলাদা করে বুঝিয়ে দেন এবং অবশেষে তিনি তা আত্মস্থ করতে সক্ষম হন”।

আরও পড়তে পারেন-

একটি মাসআলা চল্লিশবার না বুঝতে পারা সেই ছাত্র-ই পরে মাযহাবের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হয়ে ওঠেন। এ সাফল্যের রহস্য কী? রহস্য হলো, উস্তাদ ও শাগরিদের আন্তরিক সম্পর্ক। ছাত্রের অন্তরে উস্তাদের প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও খেদমত ছিল; আর উস্তাদের অন্তরে ছাত্রের প্রতি ছিল পূর্ণ স্নেহ ও মমতা।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) স্বীকার করে লিখেছেন, “রবী ইবনে সুলায়মান আমার যে খেদমত করেছে, অন্য কেউ তা করেনি”। অন্যদিকে রবী ইবনে সুলায়মান (রহ.) উস্তাদের প্রতি নিজের ভক্তি প্রকাশ করে বলেন-

والله ما اجترأتُ أن أشرب الماء والشافعيّ ينظر إليَّ هيبةً له.
অর্থ- “আল্লাহর কসম! শাফেয়ী (রহ.) আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবশত পানি পান করারও সাহস পেতাম না”। (মানাকিবুশ শাফিয়ী, বায়হাকী ২/১৪৫)।

উস্তাদের প্রতি এই সীমাহীন ভক্তি ও খেদমতের কারণেই ইমাম শাফেয়ী (রহ.) তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তিনি একবার বলেছিলেন- مَا أَحَبَّكَ إِلَيَّ! “তোমার প্রতি আমার অন্তরে কতই না ভালোবাসা জাগে!”

আরেকবার বলেন- يَا رَبِيع لَو أَمْكَنَنِي أَن أُطْعِمَكَ الْعلمَ لَأَطْعَمْتُكَ “রবী! যদি ইলম খাইয়ে দেওয়া সম্ভব হতো, তবে আমি তোমাকে খাইয়েই দিতাম”।

এতে স্পষ্ট হলো, উস্তাদের ভালোবাসা জোর করে অর্জন করা যায় না। বরং তালেবে ইলমের প্রধান দায়িত্ব হলো, উস্তাদকে সন্তুষ্ট রাখা এবং সম্পর্ককে প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল রাখা।

২. উস্তাদের আদব-আখলাক ও চিন্তাধারা ধারণের চেষ্টা করা

উস্তাদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো, তাঁর আদব-আখলাক, স্বভাব ও চিন্তাধারা গ্রহণ করা। কেবল ইলম অর্জনই নয়, বরং চরিত্র ও মানসিকতা গঠনে উস্তাদের সোহবত অপরিহার্য।

সালাফে সালেহীনের জীবনে এ বিষয়ে বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইমাম হাকিম আবু আবদিল্লাহ নিশাপুরী (রহ.) বলেন-
كان شيخنا أبو بكر بن إسحاق إذا ذُكِرَ عقلُ أبي علي الثقَفي يقول : ذلك عقلٌ مأخوذٌ من الصحابة والتابعين…
“আমাদের শায়েখ আবু বকর ইবনে ইসহাক যখন আবু আলী সাকাফীর বিচক্ষণতার কথা শুনতেন, তিনি বলতেন- ‘এটা সাহাবা ও তাবেয়ীনের কাছ থেকে প্রাপ্ত আকল। মালেক ইবনে আনাস তা তাঁদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। হারামাইনের আলেমগণও এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন’।” (মানাকিবু মালিক ইবনি আনাস, ইবনে ফিহর মিসরী, পৃ. ২২৩)।

তিনি এরপর আদব গ্রহণের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন-

  • ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া তামীমী মালেক ইবনে আনাস (রহ.)-এর কাছে এক বছর অবস্থান করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো- “আপনার তো মুয়াত্তা শোনা শেষ হয়ে গিয়েছিল, তবু এতদিন কেন থাকলেন?”

তিনি উত্তর দিলেন- “আমি অবস্থান করছিলাম তাঁর আদব-আখলাক শেখার জন্য। কারণ, তা সাহাবা-তাবেয়ীনের আদব-আখলাক”।

  • এরপর মুহাম্মাদ ইবনে নসর মারওয়াযী ইয়াহইয়ার নিকট অবস্থান করেন সেই আদব গ্রহণের জন্য। ফলে খোরাসানে তাঁর চেয়ে বিচক্ষণ আর কেউ ছিলেন না।
  • তারপর আবু আলী সাকাফী চার বছর মারওয়াযীর সোহবতে থেকে সেই আদব আত্মস্থ করেন। (মানাকিবু মালিক ইবনি আনাস, ইবনে ফিহর মিসরী, পৃ. ২২৩)।

এই ঘটনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইলমের পাশাপাশি চরিত্র ও চিন্তাধারার উন্নতির জন্য উস্তাদের সোহবত কতটা অপরিহার্য।

৩. উস্তাদ থেকে ইলম ও তাফাক্কুহ (গভীর জ্ঞান) হাসিলে সচেষ্ট হওয়া

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সালাফে সালেহীনের জীবনীতে এমন দৃষ্টান্ত বিরল যে, দীর্ঘদিন উস্তাদের খেদমতে থেকেও কোনো ছাত্র উস্তাদের ইলমী মীরাসে (জ্ঞানগত উত্তরাধিকার) বিশেষ মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। পূর্ববর্তীদের যুগে “উস্তাদের খাস খাদেম” আর “উস্তাদের ইলমী উত্তরাধিকারী”- প্রায় সমার্থকই ছিল। কারণ, তাঁরা খেদমতের পাশাপাশি ইলম ও তাফাক্কুহ হাসিলে সদা সচেষ্ট থাকতেন।

এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ। তিনি ছিলেন ফকীহুল ইরাক, হাম্মাদ ইবনে আবি সুলায়মান রাহিমাহুল্লাহর খাস শাগরিদ। আঠারো বছর ধরে তিনি তাঁর সান্নিধ্যে থেকে ইলম ও ফিকহে অতুলনীয় কৃতিত্ব অর্জন করেন।

হাম্মাদ (রহ.)এর বোন আতেকা বলেন- “নুমান (ইমাম আবু হানিফা) আমাদের বাড়ির দরজায় তুলা ধুনতেন, আমাদের জন্য দুধ-সবজি ইত্যাদি কিনে আনতেন। কেউ মাসআলা জানতে এলে তিনি প্রথমে নিজেই উত্তর দিতেন, তারপর বলতেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন’। এরপর ভেতরে গিয়ে হাম্মাদ (রহ.)-এর কাছে বলতেন, ‘একজন এ প্রশ্ন করেছে, আমি এ উত্তর দিয়েছি, এখন আপনি কী বলেন?’ তখন হাম্মাদ (রহ.) বলতেন, ‘আমাদের উস্তাদগণ এ সম্পর্কে এ হাদিস বর্ণনা করেছেন, আমাদের মাশায়েখ এভাবে বলেছেন, ইবরাহীম নাখাঈ (রহ.) এমন বলেছেন’। সব শোনার পর নুমান জিজ্ঞেস করতেন, ‘আমি কি লোকটিকে আপনার পক্ষ থেকে এটি জানিয়ে দেবো?’ তিনি বলতেন, ‘হ্যাঁ’। তখন নুমান বাইরে গিয়ে বলতেন, ‘হাম্মাদ এভাবে বলেছেন’।” (তাবাকাতুল মুহাদ্দিসীন বি আসবাহান, আবুশ শায়খ ১/৩৩০)।

এই ঘটনায় বহু শিক্ষা নিহিত। স্পষ্ট বোঝা যায়- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কীভাবে দৈনন্দিন খেদমতের পাশাপাশি উস্তাদের সান্নিধ্যকে ইলম আহরণের জন্য সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন। এ থেকে এ কথাও স্পষ্ট হয় যে, উস্তাদ থেকে ইলম ও তাফাক্কুহ হাসিলের সুযোগ ছাত্রকেই সচেতনভাবে বের করতে হয়। তবে এটি তখনই সম্ভব, যখন তালেবে ইলমের অন্তরে ইলমের জন্য অদম্য আগ্রহ থাকবে। সর্বদা এই চিন্তা থাকতে হবে- কখন, কীভাবে উস্তাদ থেকে সর্বোচ্চ ফায়দা নেওয়া যায়। অন্যথায় বছর কেটে গেলেও ঝুলি ফাঁকা থেকে যাবে।

৪. উস্তাদের আস্থা অর্জন

উস্তাদের আস্থা একজন শাগরিদের জীবনের মহামূল্যবান পাথেয়। উস্তাদের আস্থা যত দৃঢ় হবে, উস্তাদ-শাগরিদের সম্পর্ক তত অটুট হবে; ইফাদা (জ্ঞান প্রদান) ও ইস্তিফাদা (জ্ঞান গ্রহণ) তত সহজ ও বরকতময় হবে।

তালেবে ইলমের কর্তব্য হলো- মেহনত, আদব, তাওয়াযু (নম্রতা), হুসনে আখলাক (সুন্দর চরিত্র) ও হুসনে আ‘মাল (সৎ আমল) দ্বারা উস্তাদের সুধারণা ও আস্থা অর্জন করা। যাতে উস্তাদ তাঁর শাগরিদের বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

আকাবিরে দেওবন্দের জীবন থেকে এর একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আপবীতী গ্রন্থে শায়খুল হাদিস যাকারিয়া রাহিমাহুল্লাহ নিজের জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

১৩৪৩ হিজরি (১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে) প্রচণ্ড বন্যায় শহরের নদী-নালা উপচে পড়ে। আলোচনায় আসে, খানে আলমপুরার নদীর পানি এত বেড়েছে যে, কালই শহর প্লাবিত হতে পারে। তখন কেউ বলল, “মৌলভী যাকারিয়াও তো গতকাল দেখতে গিয়েছিল, তাঁর কাছ থেকে জেনে নিন”।

হযরত মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী (রহ.) একদম স্বাভাবিকভাবে বললেন, ‘না, সে যায়নি’। উপস্থিত এক ব্যক্তি তর্ক করে বললেন, ‘তিনি তো সামনে আছেন, জিজ্ঞেস করুন’। হযরত আবারও দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘না, সে যায়নি’।

শেষ পর্যন্ত যাকারিয়া (রহ.) নিজে বললেন, ‘হযরত, আমি একদম যাইনি। কেবল একটি ভাঙা ঘরের সংবাদ শুনে তা দেখতে গিয়েছিলাম’। তখন হযরত বললেন, ‘এটাই সঠিক’। তখন উপস্থিত ব্যক্তি মন্তব্য করলেন, ‘কারও প্রতি সুধারণা হলে এমনই হয়’। (আপবীতী- ১/৩৮৪-৩৮৫)।

এটি স্পষ্ট যে, এমন আস্থা একদিনে তৈরি হয় না। এটি গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের আমানতদারি, আদব, তাওয়াযু, হুসনে আমাল ও হুসনে আখলাকের ভিত্তিতে।

উপসংহার: দ্বীনি ইলমকে ধারণ করে কিয়ামত পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার যে মহান দায়িত্ব উম্মতের কাঁধে অর্পিত, তা কেবল উস্তাদ-শাগরিদের হাকীকী সম্পর্কের মাধ্যমেই সফল হতে পারে। যে সম্পর্কে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আনুগত্যের গভীরতা থাকে, সেখানে রবী ইবনে সুলায়মানের মতো ধীরবুদ্ধির ছাত্রও যুগশ্রেষ্ঠ আলেম হয়ে উঠতে পারেন। যে সম্পর্কে ইলমের পাশাপাশি আদব ও আখলাক ধারণের অনুশীলন থাকে, সেখানে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতো ব্যক্তিত্বরা সালাফে সালেহীনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন।

এই আলোচনার সারমর্ম হলো-

  • উস্তাদের খেদমত ও সোহবত।
  • ইলম আহরণের অদম্য আগ্রহ।
  • আদব ও চরিত্রে উন্নতি।
  • এবং সর্বোপরি উস্তাদের আস্থা অর্জন-
    এসবই ইলম হাসিলের প্রকৃত শর্ত। কেবল কিতাব মুখস্থ করলেই ইলমের আসল নূর ও রূহ অর্জিত হয় না। বরং উস্তাদের খুশি রাখা, তাঁকে সম্মান করা এবং তাঁর দেওয়া ইলমকে সঠিকভাবে ধারণ করাই ইলমকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার একমাত্র চাবিকাঠি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সেই আদর্শ সম্পর্ক গড়ে তোলার তাওফীক দান করুন এবং দ্বীনের প্রকৃত খাদেম হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন- আমীন॥

লেখক: শায়খুল হাদীস, ঢাকা খিলগাঁও তিলপাপাড়া মদীনাতুল উলূম ইসলামিয়া মাদ্রাসা।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।