।। মাওলানা মাহমূদ হাসান নাহিয়ান ।।
শিক্ষা মানবসভ্যতার উৎকর্ষ, স্থিতি ও টেকসই অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি। দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি, স্বস্তি ও সফলতা অর্জনের জন্য যেমন দ্বীনী ইলম অপরিহার্য, তেমনি জাগতিক উন্নয়ন- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ক্ষেত্রেও সুসংগঠিত জ্ঞানচর্চার কোনো বিকল্প নেই। সারকথা, মানবজীবনের প্রতিটি স্তর- ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সভ্যতাগত; ইহজগৎ থেকে পরজগৎ পর্যন্ত সব স্তরই শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় এই যে, এই শিক্ষা যখন নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তা কল্যাণের পরিবর্তে ধ্বংস, অবক্ষয় ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নীতি-আদর্শশূন্য জ্ঞান মানুষের অন্তর্গত মানবিকতাকে ক্ষয় করে দেয়; ফলত সে তার প্রকৃত মর্যাদা হারিয়ে নৈতিক অধঃপতনের এমন এক স্তরে উপনীত হয়, যা তাকে চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও হীনতর অবস্থানে নিক্ষেপ করে।
আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টির পূর্বেই ‘আলমে আরওয়াহ’ বা রূহের জগতে তাদের কাছ থেকে রবুবিয়্যতের স্বীকৃতি ও নৈতিক জিম্মাদারির অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। ইরশাদ হয়েছে- ألست بربكم قالوا بلى شهدنا অর্থ- “আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলেছিল, অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি”। (সূরা আল-আরাফ- ১৭২ আয়াত)।
এই অঙ্গীকার কেবল একটি স্বীকৃতি ছিল না; বরং এটি ছিল মানবজাতির নৈতিক ভিত্তি, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির প্রথম পাঠ। সৃষ্টির সূচনালগ্নেই মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তার অস্তিত্ব ও অর্জিত জ্ঞান কেবল স্রষ্টার আনুগত্য ও মানবতার কল্যাণে নিবেদিত হতে হবে।
ইসলামের ইতিহাসে হেরা গুহার নির্জনতায় হযরত জিবরাঈল (আ.)এর মাধ্যমে অবতীর্ণ প্রথম ওহী ছিল জ্ঞানার্জনের নির্দেশনা—اقرأ باسم ربك الذي خلق অর্থ: “পাঠ করো তোমার সেই রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”। (সূরা আলাক- ১)।
এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জ্ঞানার্জন মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সেই জ্ঞান অবশ্যই রবের সাথে সম্পর্কিত হয়ে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।
সমাজে প্রচলিত উক্তি, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’; বাস্তবে পূর্ণতা পায় তখনই, যখন এর সাথে ‘সু-শিক্ষা’ যুক্ত হয়। নৈতিকতা ও মূল্যবোধবিহীন শিক্ষা প্রকৃত অর্থে শিক্ষা নয়; বরং তা দিকভ্রান্ত জ্ঞানমাত্র। সু-শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড- চাই তা দ্বীনী শিক্ষা হোক কিংবা জাগতিক; আদর্শের স্পর্শ ব্যতীত উভয়ই লক্ষ্যচ্যুত হতে বাধ্য।
ইসলাম জ্ঞানকে কেবল তথ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেনি; বরং নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির সাথে এর গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- إنما يخشى الله من عباده العلماء অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে”। (সূরা ফাতির- ২৮ আয়াত)।
অতএব প্রকৃত আলেম সেই ব্যক্তি, যার জ্ঞান তাকে আল্লাহভীতি, বিনয় ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে। আধ্যাত্মিকতা ও চরিত্রবোধ বর্জন করে কেবল তথ্যের সঞ্চয় কখনোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপায় হতে পারে না।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল ডিগ্রি অর্জন ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গভীর অশনিসংকেত হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।। এমনকি দ্বীনি শিক্ষাঙ্গন বা কওমী ধারার আঙিনাতেও কোথাও কোথাও ইলমী গভীরতার পরিবর্তে কেবল কাগুজে সার্টিফিকেট ও নাম-যশের মোহ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
যে ব্যক্তি নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে কেবল পার্থিব প্রতিষ্ঠা চায়, তার ব্যক্তিত্ব থেকে আখলাকের সৌন্দর্য ক্রমশ লোপ পায় এবং সে ধীরে ধীরে মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়।
একজন শিক্ষিত ব্যক্তি যখন নীতিভ্রষ্ট হয়, তখন তার দ্বারা সংঘটিত অন্যায় অশিক্ষিত ব্যক্তির তুলনায় বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। কারণ, তার জ্ঞানই অন্যায়কে অধিক সুসংগঠিত ও গ্রহণযোগ্য রূপ দিতে সক্ষম হয়। নীতিহীন উচ্চশিক্ষার ভয়াবহ পরিণতি হলো- ভুল চিকিৎসায় জীবননাশ, ভুল ফতোয়ায় ঈমান বিনাশ এবং নীতিহীন প্রশাসনের হাতে ইনসাফের অপমৃত্যু।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন- إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق অর্থ- “নিশ্চয়ই আমি উত্তম চরিত্রের পরিপূর্ণতা বিধানের জন্য প্রেরিত হয়েছি”। (মুয়াত্তা মালিক, মুসনাদ আহমাদ)।
অতএব যিনি চরিত্রে বলীয়ান নন, তাঁর জ্ঞান যত বিস্তৃতই হোক, তা কখনোই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হতে পারে না। জ্ঞান বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করা শ্রেষ্ঠত্ব নয়; বরং তা ধ্বংসের সূচনা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে ইরশাদ করেন- ولا تقف ما ليس لك به علم إن السمع والبصر والفؤاد كل أولئك كان عنه مسؤولا অর্থ- “যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে যেও না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর; এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে”। (সূরা আল-ইসরা- ৩৬)। এই আয়াত মানবজীবনে দায়িত্বশীল জ্ঞানচর্চার এক কঠোর নির্দেশনা ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।
অতএব, শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হতে হবে, কেবল তথ্য বা ডিগ্রি প্রদান নয়; বরং উন্নত চরিত্র ও নৈতিক মানুষ গঠন করা। যদি শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দিকটি উপেক্ষিত হয়, তবে তা কোনোভাবেই জাতির মেরুদণ্ড নয়; বরং সমাজের জন্য এক নীরব অথচ গভীর ধ্বংসের কারণ।
ইসলাম আমাদের শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বিত পথ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। তাই আমাদের এখনই নিয়ত পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র গঠনের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ইলম ও আখলাকের এই বিচ্ছিন্নতা দূর করে একটি নৈতিক সমাজ বিনির্মাণ করাই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক জ্ঞান, বিশুদ্ধ নিয়্যাত এবং নৈতিকতা-সমৃদ্ধ জীবন গঠনের তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: তরুণ আলেম ও শিক্ষার্থী, ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ (দারুল ইফতা), জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ







