Home মহিলাঙ্গন কুরআনে নারীর মোহর: বিধান, দিকনির্দেশনা ও শিক্ষা

কুরআনে নারীর মোহর: বিধান, দিকনির্দেশনা ও শিক্ষা

।। আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন ।।

ইসলাম-পূর্ব জাহেলি সমাজে নারীর কোনো ব্যক্তিত্ব বা আর্থিক অধিকার ছিল না। তাকে সম্পত্তির মতো ভোগ করা হতো, এমনকি মৃত স্বামীর ওয়ারিশরা তার ওপর কর্তৃত্ব করতো। মোহর পরিশোধ না করা বা জোরপূর্বক ফেরত নেওয়া তখন ছিল এক স্বাভাবিক রীতি। আল্লাহ তাআলা কুরআনের মাধ্যমে এই বর্বরতা চিরতরে নিষিদ্ধ করেছেন এবং নারীকে তার মোহর ও সম্পদের ন্যায্য অধিকার দান করেছেন। এর মাধ্যমে নারীকে পুরুষের দয়ার উপকরণ থেকে মুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব ও অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে।

মোহর শুধুই টাকার অঙ্ক নয়; এটি স্বামীর দায়িত্বশীলতার শপথ, স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার প্রতীক এবং পারিবারিক জীবনে ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার। মোহর প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম জানিয়ে দিয়েছে যে, বিবাহ কোনো একতরফা বন্ধন নয়; বরং এটি উভয়ের অধিকার ও কর্তব্যের ভিত্তিতে দাঁড়ানো এক সুসমন্বিত চুক্তি।

এই নিবন্ধে আমরা কুরআনের আলোকে তালাক, মোহর ও খোলা সম্পর্কিত মূলনীতি ও বিধান আলোচনা করব। পাশাপাশি দেখবো কীভাবে ইসলাম নারীর অধিকার সুরক্ষিত করেছে, পুরুষকে দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিয়েছে এবং পারিবারিক শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে।

বিয়েতে মোহর অপরিহার্য

পবিত্র কুরআনে কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেছেন-

وَ اُحِلَّ لَكُمۡ مَّا وَرَآءَ ذٰلِكُمۡ اَنۡ تَبۡتَغُوۡا بِاَمۡوَالِكُمۡ مُّحۡصِنِیۡنَ غَیۡرَ مُسٰفِحِیۡنَ ؕ فَمَا اسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِهٖ مِنۡهُنَّ فَاٰتُوۡهُنَّ اُجُوۡرَهُنَّ فَرِیۡضَۃً ؕ وَ لَا جُنَاحَ عَلَیۡكُمۡ فِیۡمَا تَرٰضَیۡتُمۡ بِهٖ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡفَرِیۡضَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیۡمًا حَكِیۡمًا

অর্থ- তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ নারীদের ছাড়া অন্যান্য সকল নারীদেরকে অর্থের মোহরের বদলে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাওয়াকে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে, অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য নয়। অতঃপর তাদের মধ্যে যাদের তোমরা সম্ভোগ করেছ, তাদেরকে তাদের ধার্যকৃত মোহর প্রদান কর। তোমাদের প্রতি কোনও গুনাহ নেই মোহর ধার্যের পরও তোমরা উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে মোহরের পরিমাণে হেরফের করলে, নিশ্চয় আল্লাহ সবিশেষ পরিজ্ঞাত ও পরম কুশলী। (সূরা নিসা, ২৪ আয়াত)।

আয়াত থেকে প্রাপ্ত বিধান-

১. মুহাররামাত ছাড়া অন্য নারীর সাথে বিবাহ হালাল।

২. মোহর বিবাহ হালাল হওয়ার জন্য অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আকদের সময় নির্ধারিত না হলেও মোহরের দাবি বাতিল হয় না।

৩. স্বামীর কর্তব্য হলো  নির্ধারিত মোহর যথাযথভাবে পরিশোধ করা।

৪. বিয়ের পর সহবাস, অথবা বৈধ একান্ত সাক্ষাত হলে (খালওয়াতে সহীহা) পূর্ণ মোহর দিতে হয়। আকদের সময় মোহর নির্ধারণ না হলে স্ত্রী তার সমমর্যাদার নারীর মোহর পরিমাণ তথা মোহরে মিছল পাওয়ার অধিকারী হবেন।

৫. স্ত্রী চাইলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বেচ্ছায় মোহরের অংশ ছেড়ে দিতে পারে এবং স্বামীও চাইলে বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে স্ত্রীকে প্রভাবিত করে বা জোর করে মোহরের পরিমাণ কমানো বা মাফ নেওয়া যাবে না।

৬. মোহর অবশ্যই এমন কিছু হতে হবে, যা শরীয়তে সম্পদ (মাল) হিসেবে গণ্য হয়, যেমন- সোনা, রূপা, নগদ টাকা ইত্যাদি।

৭. হানাফি ফিকহ মতে সর্বনিম্ন মোহর হলো দশ দিরহাম (প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম রূপা)।

৮. ইজাব-কবুল ও সাক্ষী ছাড়া বিবাহ জায়েয হয় না।

আখলাকি শিক্ষা

১. মোহর কেবল উপহার নয়, এটি স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। যেমন- সে ভালোবাসা ও আস্থা দিয়ে নিজেকে অর্পণ করেছে, তেমনি স্বামীর দায়িত্ব মর্যাদার সাথে তার মোহর প্রদান করা।

২. মোহর প্রদানে অবহেলা করা গুরুতর অন্যায়। হাদিসে এমন স্বামীকে ‘যানী’ বলা হয়েছে, যার অর্থ ‘ব্যভিচারী’। (মাজমাউয যাওয়াইদ- ৪/৫২২-৫২৩)।

৩. মোহরের পরিমাণে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা বা একেবারে তুচ্ছ নির্ধারণ করা- উভয়ই ন্যায্য নয়। তাই সর্বাবস্থায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরামের রীতি অনুসরণ করাই উত্তম।

হাদিস থেকে উদাহরণ

* হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদেরকে সাড়ে বারো উকিয়া অর্থাৎ পাঁচশ’ দিরহাম মোহর দিতেন। (সহীহ মুসলিম, হাদিস- ১৪২৬)। উল্লেখ্য, এক দিরহাম সমপরিমাণ রূপা হচ্ছে ৩.০৬১৮ গ্রাম।

* উম্মে হাবীবা (রাযি.)এর মোহর ছিল চার হাজার দিরহাম। এটি পরিশোধ করেছিলেন হাবশার বাদশাহ নাজাশী। (আবু দাউদ, হাদিস- ২১০৭)।

* হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা.)এর যুগে সাধারণত মোহর হতো দশ উকিয়া (চারশ’ দিরহাম)। (নাসায়ী- ৬/১১৭)।

খুশি মনে মোহর আদায় কর

পবিত্র কুরআনে কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেছেন-

وَ اٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِهِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَكُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡهُ نَفۡسًا فَكُلُوۡهُ هَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا

অর্থ- “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তি সহকারে খাও”। (সূরা নিসা- ৪ আয়াত)।

শিক্ষা ও বিধান

১. মোহর আদায় করা স্বামীর উপর ফরয; আল্লাহ তাআলা সরাসরি এর আদেশ দিয়েছেন।

২. মোহর নারীর একক অধিকার। তার সম্মতি ছাড়া স্বামী বা অন্য কেউ তা ভোগ করতে পারবে না। অন্যথায় তা হবে ‘الأكل بالباطل’ তথা অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস তুল্য অপরাধ।

৩. একজন মুমিন স্বামীকে খুশিমনে ও বিলম্ব না করে তার স্ত্রীর মোহর পরিশোধ করতে হবে। অনুরোধ বা জোর-জবরদস্তির অপেক্ষায় থাকা কুরআনের শিক্ষা ও চাহিদার পরিপন্থি।

৪. স্ত্রী স্বেচ্ছায় মোহরের কিছু অংশ ছাড়লে স্বামী তা ভোগ করতে পারে।

৫. পূর্ণ মোহর ছাড়ার অধিকার স্ত্রীর আছে, তবে আংশিক দেওয়া উত্তম।

৬. চাপ প্রয়োগ করে বা কৌশলে প্রভাবিত করে স্ত্রীর কাছ থেকে মোহর মাফ করানো আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। (তাফসীর ইবনে কাছীর, আহকামুল কুরআন, বয়ানুল কুরআন, তাফসীরে উসমানী)

আরও পড়তে পারেন-

যদি তাদের মোহর আদায় কর

হে মুমিনগণ! ঈমানদার নারীরা যখন আপনার নিকট হিজরত করে আসে, তাদের পরীক্ষা করুন; আল্লাহ তাদের ঈমান ভালোভাবে জানেন। যদি তারা মুমিন বলে প্রমাণিত হয়, তবে তাদেরকে কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠাবেন না। যারা তাদের আগে বিয়ে করেছিলেন, তাদের খরচ ফিরিয়ে দিন। এই নারীদের বিয়ে করলে আপনারা কোনো পাপে অপরাধী হবেন না, যদি তাদের মোহর আদায় করেন। (সূরা মুমতাহিনা-১০)।

এই আয়াতটি হুদায়বিয়ার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে এবং বিশেষ পরিস্থিতির কিছু বিধান বর্ণিত হয়েছে। এখান থেকে মোহরের বিষয়ে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো-

১. মোহর হলো নারীর প্রাপ্য অধিকার। এটি ‘আজর’ বা বিনিময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই তা পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।

২. বিবাহবন্ধন মোহর আদায়ের সঙ্গে শর্তযুক্ত। অর্থাৎ, এই নারীদের বিয়ে করলে মোহর আদায় করলে আপনারা আল্লাহর কাছে অপরাধী হবেন না। এটি মোহরের অপরিহার্যতা প্রমাণ করে।

৩. পূর্বে হিজরত করা মুমিন নারীরা যদি কাফির স্বামীর কাছ থেকে মোহর পেয়ে থাকেন, সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবুও নতুন বিবাহের জন্য নতুন মোহর অপরিহার্য। এতে প্রমাণ হয় যে, অতীত মোহরের হিসাব নতুন মোহরকে বাতিল করতে পারে না।

৪. মোহর ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দুইটি আলাদা দায়িত্ব। স্বামীকে উভয় কর্তব্য পূর্ণভাবে পালন করতে হবে। স্ত্রীর খরচকে অজুহাত বানিয়ে মোহর পরিশোধ না করা শয়তানের ওয়াসওয়াসার অন্তর্গত।

৫. স্ত্রী তার মোহর কীভাবে ব্যয় করবে, তা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। স্বামীর কর্তব্য হলো, যথাসম্ভব সঠিকভাবে মোহর প্রদান করা।

অতএব, যে কোনো স্ত্রীর সাথে বিবাহে মোহর পরিশোধে অবহেলা করা উচিত নয়। নিছক উপহার বা অন্য খরচ মোহরের স্থান নিতে পারে না। কুরআন ও হাদিস উভয়ই উভয় পক্ষকে সহজ, উদার ও ন্যায্য আচরণের জন্য উৎসাহিত করেছে।

তালাক ও মোহর

পবিত্র কুরআনে কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ করেছেন-

لَا جُنَاحَ عَلَیۡكُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡهُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَهُنَّ فَرِیۡضَۃً…..

“তোমরা গুনাহগার হবে না, যদি স্ত্রীদেরকে এমন অবস্থায় তালাক দাও- যখন না তাদেরকে স্পর্শ করেছ, না মোহর ধার্য করেছ, তবে তাদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সামগ্রী দাও…। আর যদি মোহর ধার্য করার পর সহবাসের আগেই তালাক দাও, তবে অর্ধেক প্রদান করো। স্ত্রী স্বেচ্ছায় ছাড় দিলে কিংবা স্বামী পূর্ণ প্রদান করলে সেটি উত্তম। আর ক্ষমাশীলতা তাকওয়ার নিকটতর”। (সূরা বাকারা- ২৩৬-২৩৭)।

আয়াত থেকে শিক্ষা ও বিধান

১. আকদের সময় মোহর ধার্য না করলেও বিয়ে হয়। তবে সহবাস বা একান্ত সাক্ষাতের পর মোহরে মিছল ওয়াজিব হয়।

২. সহবাস বা সাক্ষাতের আগে তালাক হলে মোহরের বদলে মাতা’- অর্থাৎ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবহার্য সামগ্রী দিতে হবে।

৩. মোহর ধার্য থাকলে এবং সহবাসের আগে তালাক হলে অর্ধেক মোহর দিতে হবে।

৪. স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় প্রাপ্য ছেড়ে দেয়, বা স্বামী পূর্ণ মোহর দেয়, তবে তা সওয়াবের কাজ।

৫. তবে প্রাপ্য ছেড়ে দেওয়ার ফলে যদি অসুবিধা হয়, তবে প্রাপ্য গ্রহণ করাই উত্তম। (আহকামুল কুরআন, বয়ানুল কুরআন)।

আয়াতের মৌলিক বিধান ও শিক্ষা

১. আকদের সময় মোহর ধার্য না থাকলেও বিবাহ বৈধ। তবে স্বামী-স্ত্রীর সহবাস বা একান্ত সাক্ষাতের পর ‘মোহরে মিছল’ ওয়াজিব হয়। আর যদি সহবাস বা সাক্ষাতের আগে তালাক ঘটে, তবে মোহরের বদলে সামর্থ্য অনুযায়ী ‘মাতা’ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

২. কুরআন মাতায়ে মোহরের নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করেনি। স্বামী নিজ সামর্থ্য অনুসারে তা প্রদান করবে। ফকীহগণ বলেন, মাতায়ে মোহর পাঁচ দিরহামের কম এবং ‘মোহরে মিছল’-এর অর্ধেকের বেশি না হওয়াই উত্তম।

৩. আকদের সময় মোহর ধার্য থাকলে এবং সহবাস বা একান্ত সাক্ষাতের আগে তালাক হয়, তখন ধার্যকৃত মোহরের অর্ধেক দিতে হবে। তবে স্ত্রী যদি তার অধিকার ছেড়ে দেয়, কিংবা স্বামী পূর্ণ মোহর প্রদান করে, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই; বরং এটি সাওয়াবের কাজ।

৪. সাধারণভাবে, সদাশয়তার কারণে প্রাপ্য ছেড়ে দেওয়া সাওয়াবের কাজ। তবে বাস্তব প্রয়োজনে প্রাপ্য গ্রহণ করাও ঠিক। যেমন, যদি স্বামী অর্থের তাগিদে বা অন্য কোনো কারণে প্রাপ্য ছাড় না নিলে, তখন তা আদায় করাই সমীচীন। (সূত্র- আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ১/৪৩৩-৪৪২; বয়ানুল কুরআন- ১/১৪০-১৪১)।

সুন্দরভাবে বিদায় দাও

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِن قَبْلِ أَنْ تَمْسُوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تُعْتَدُّونَهَا فَمُتِّعُوهُنَّ وَسَرِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا

“হে মুমিনগণ! যদি তোমরা মুমিন নারীদের বিয়ে করো এবং তাদের স্পর্শ করার আগে তালাক দাও, তবে তোমাদের জন্য কোনো ইদ্দত পালন বাধ্যতামূলক নয়। তাদেরকে প্রাপ্য সামগ্রী দাও এবং সুন্দরভাবে রোখসত কর।” (সূরা আহযাব- ৪৯)।

বিয়ের পর, যদি কোনো কারণে সহবাস বা একান্ত সাক্ষাতের আগেই তালাক হয়ে যায়, তবে স্ত্রীকে কতটুকু মোহর বা সামগ্রী দেওয়া হবে, তা সূরা বাকারার (২৩৬-২৩৭) আয়াতের আলোকে নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, আকদের সময় মোহর ধার্য থাকলে অর্ধেক মোহর দেওয়া হয়। আর ধার্য না থাকলে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় বা সামগ্রী প্রদান করতে হয়। (তাফসীরে ইবনে কাছীর- ৩/৭৯৩)।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, তালাকের সময় নারীকে ইদ্দত পালন করতে হয় না। এছাড়া ‘সুন্দরভাবে রোখসত করা’ মানে হলো- নারীর পাওনা পুরোপুরি দেওয়া, অপমান বা কটূকথা না বলা এবং অন্য কোনো কষ্ট না দেওয়া। এভাবে রোখসত করা নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রধান শর্ত। (বয়ানুল কুরআন)।

তালাকপ্রাপ্তা নারীর অধিকার

وَلِلْمُطَلَّقَاتِ مَتَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ

“তালাকপ্রাপ্তা নারীগণ নিয়ম অনুযায়ী সম্পদ বা সামগ্রী পাবে; এটি খোদাভীরু পুরুষদের দায়িত্ব।” (সূরা বাকারা- ২৪১)।

আরবিতে متاع শব্দের অর্থ হলো “যা কিছু মানুষ ভোগ-ব্যবহার করে।” বৈবাহিক জীবনের কারণে স্ত্রী যা কিছু পায়, যেমন- মোহর, খোরপোষ, প্রয়োজনীয় জামা-কাপড় বা অন্যান্য উপকরণ- সবই এতে অন্তর্ভুক্ত। তবে কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সম্পদ বা সামগ্রী তার প্রাপ্য হবে, তা অন্যান্য আয়াত ও হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই নিবন্ধেও পূর্বে আমরা বিভিন্ন আয়াতের আলোকে এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি।

কিছুই ফেরত নিও না

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا…

“হে মুমিনগণ! নারীদেরকে জোরপূর্বক বা বলপূর্বক মালিক হয়ে যাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়। তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করো না, যদি না তারা স্পষ্ট গর্হিত কাজে লিপ্ত হয়। তাদের সাথে সদাচরণে জীবন কাটাও। যদি তাদের মধ্যে কারো প্রতি তোমার অপছন্দ থাকে, হতে পারে আল্লাহ সেখানে প্রচুর কল্যাণ রেখেছেন।

আর যদি এক স্ত্রীর বদলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে চাও এবং তাদের একজনকে অগাধ সম্পদও দিয়েছ, তবুও কিছু ফেরত নিও না। তোমরা কি তা ফেরত নেবে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বা স্পষ্ট পাপকর্মে লিপ্ত হয়ে? এবং কীভাবে তা ফেরত নেবে যখন তোমরা একে অপরের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়েছ এবং তারা তোমাদের থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছে।” (সূরা নিসা ১৯-২১)।

এই আয়াতের মূল শিক্ষা

এই আয়াতসমূহে সেইসব অন্যায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা ইসলামপূর্ব জাহেলী সমাজে নারীর ওপর ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য ছিল। তখন নারীর নিজের সত্তা ও সম্পদের ওপর কোনো অধিকার ছিল না। মৃত স্বামীর ওয়ারিশরা যেমন তার সম্পদের উত্তরাধিকারী হতো, তেমনি তার স্ত্রীর ওপরও তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতো। তারা চাইলে নিজে বিয়ে করত, চাইলে অন্যত্র বিয়ে দিত এবং মোহরের অর্থ আত্মসাৎ করত। উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা, মোহর না দেওয়া বা জোরপূর্বক বা কৌশলে ফেরত নেওয়া- এসব তখন প্রচলিত ছিল।

কুরআন এইসব প্রথা চিরতরে নিষিদ্ধ করে নারীকে তার সম্পদের এবং ব্যক্তিত্বের পূর্ণ অধিকার প্রদান করেছেন। প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় মূলত মোহর, তাই এখানে মোহর সংক্রান্ত মূলনীতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

১. মোহরের উপর নারীর অধিকার স্থির হওয়ার পর তা পরিশোধ না করা বা অন্যায়ভাবে ফেরত নেওয়া হারাম।

২. স্বামী-স্ত্রীর সহবাস বা একান্ত সাক্ষাত (খালওয়াতে সহীহা) হলে পূর্ণ মোহর ওয়াজিব হয়; আকদে মোহর ধার্য থাকলে সেই পূর্ণ মোহর, না থাকলে মোহরে মিছল প্রাপ্য।

৩. বড় অঙ্কের মোহর ধার্য করা কাম্য নয়, তবে ধার্য হলে তা পরিশোধ করা অপরিহার্য।

৪. উপহার বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ স্ত্রী স্বেচ্ছায় না দিলে তা ফেরত নেওয়া জায়েয নয়। (আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ২/১০৯-১১১; তাফসীরে ইবনে কাসীর- ১/৪৬৬-৪৬৭; তাফসীরে উছমানী- ১০৩-১০৪)।

খোলা ও মোহর

الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَامْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ…

“তালাক দুই দফায়। এরপর স্ত্রীকে নিয়ম অনুযায়ী ধরে রাখো অথবা সদাশয়তার সঙ্গে মুক্তি দাও। আর তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছুই নেওয়া তোমাদের জন্য জায়েয নয়। তবে যদি আশঙ্কা হয় তারা আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলবে না, তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে মুক্তি পাবে, তাতে কারোর কোনো অপরাধ হবে না। এগুলো আল্লাহর বিধান; তাই এগুলো লঙ্ঘন করো না। আর যারা আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে, তারাই জালিম।” (সূরা বাকারা- ২২৯ আয়াত)।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, অন্যায়ভাবে মোহর ফেরত নেওয়া বা প্রাপ্য আদায় করা থেকে বিরত থাকা হারাম। কখনও কেউ স্বামী হিসেবে স্ত্রীকে রেখে দিতে চায় না, আবার নিয়ম অনুযায়ী মুক্তি দেয় না। পরে স্ত্রী অতিষ্ঠ হয়ে প্রাপ্য অর্থ দাবি করলে, সেটি নেওয়া তার বৈধ অধিকার।

খোলা হলো বিবাহ-বিচ্ছেদের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া, যেখানে স্ত্রী নিজ অর্থের বিনিময়ে বিবাহ-বন্ধন থেকে মুক্তি পায়। এটি সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর সম্মতির ওপর নির্ভরশীল। তবে পুরুষের কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে- যা অমান্য করলে সে আল্লাহর কাছে অপরাধী হবে। যথা-

১. যদি বিবাহ-বিচ্ছেদের মূল কারণ স্বামী হয়, যেমন অন্য স্ত্রী গ্রহণের আগ্রহ, তাহলে স্ত্রীর সম্মতি থাকলেও অর্থ গ্রহণ জায়েয নয়। স্বামীর দায়িত্ব হলো অর্থ ছাড়া স্ত্রীকে সহজ ও সুন্দরভাবে মুক্ত করা।

২. খোলা-চুক্তিতে ধার্যকৃত অর্থ মোহরের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। নবী কারীম (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে, মোহরের অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা জায়েয নয়।

৩. স্ত্রীর অজ্ঞতা বা অপারগতা থাকা অবস্থায় সম্মতি গ্রহণ জায়েয গণ্য হবে না। খোলার অর্থ গ্রহণ কেবল তখনই বৈধ, যখন বিবাহ-বিচ্ছেদের কারণ যথাযথ এবং চুক্তি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।

শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া বিবাহ-বিচ্ছেদ করা নিন্দনীয়। স্বামী ও স্ত্রী উভয়কেই আবেগ, অভিমান বা স্বভাবগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে খোলা প্রস্তাব বা প্রার্থনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

হাদিসে বলা হয়েছে, যে নারী বিনা কারণে স্বামীর কাছে তালাক চায়, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। এছাড়া স্বামীর অবাধ্য হওয়া বা খোলার জন্য অনধিকার প্রার্থনা করা নারীকে মুনাফিকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। (তিরমিযী; আবু দাউদ; ইবনে মাজাহ; মিশকাতুল মাসাবীহ- ২৮৩)।

উপসংহার:

কুরআনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে যায়- নারীর মোহর নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা উপহার নয়; বরং এটি তার পূর্ণাঙ্গ অধিকার। ইসলামের পূর্বে জাহেলি সমাজে যে নারীকে সম্পত্তির মতো ভোগ করা হতো, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, এমনকি মোহরের মতো সামান্য প্রাপ্যও কূটকৌশলে কেড়ে নেওয়া হতো- কুরআন সেই বর্বরতাকে চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে। বরং আল্লাহ তাআলা মোহরের মাধ্যমে নারীর সম্মান, মর্যাদা ও আর্থিক অধিকারকে সুসংহত করেছেন।

একজন মুসলিম পুরুষের জন্য মোহর কেবল একটি অর্থনৈতিক লেনদেন নয়; বরং এটি হলো স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অঙ্গীকার, তার অধিকার আদায়ের দায়িত্বশীল ঘোষণা। যে পুরুষ স্ত্রীর মোহর প্রদানে টালবাহানা করে, প্রকৃতপক্ষে সে কেবল স্ত্রীর অধিকার হরণ করছে না, বরং আল্লাহর হুকুম অমান্য করে নিজের ঈমান ও আমলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অন্যদিকে, খোলা বা বিবাহ-বিচ্ছেদ কোনো খেয়ালী বা আবেগতাড়িত বিষয় নয়। এটি কেবল তখনই বৈধ, যখন উভয়ের মধ্যে প্রকৃত অমিল দেখা দেয় এবং শরীয়তসম্মত কারণে বৈবাহিক জীবন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে ইসলাম স্ত্রীর জন্য এক মর্যাদাপূর্ণ বিকল্প রেখেছে, যাতে সে নিজের সম্মতি ও অর্থের বিনিময়ে মুক্তি লাভ করতে পারে। তবে এখানেও আল্লাহর সীমারেখা অতিক্রম করার অবকাশ নেই- মোহরের অতিরিক্ত কিছু দাবি করা বা নারীর অজ্ঞতা ও দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে নেওয়া চরম অপরাধ।

এভাবেই ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার রক্ষা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পারিবারিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। মোহর প্রদানের মাধ্যমে স্বামী দায়িত্বশীলতার অঙ্গীকার করে, আর খোলার বিধান নারীর জন্য এক আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে, যাতে তাকে অবমাননা বা অবিচারের শিকার হতে না হয়।

অতএব, আমাদের জন্য শিক্ষা হলো- আমরা যেন কুরআনের এ বিধানগুলোকে কেবল আইনগত আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখি। বরং এগুলোকে মনে করি আমাদের ঈমান, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরীক্ষা। যেসব পরিবারে মোহর যথাযথভাবে আদায় হয় এবং আল্লাহর সীমারেখা অটুট থাকে, সেসব পরিবারেই প্রকৃত শান্তি ও সুস্থ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর বিধানসমূহকে আন্তরিকতার সাথে মান্য করার তাওফিক দান করুন এবং দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করার সামর্থ্য দান করুন। আমীন।

লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম এবং প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব- নূরানী তালীমুল কুরআন বোর্ড, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।