Home অন্যান্য খবর শরীয়তের যে সকল বিধানে রোযা কাফফারা রূপে ধার্য

শরীয়তের যে সকল বিধানে রোযা কাফফারা রূপে ধার্য

প্রশ্ন: রোযা ইবাদাতটি অনেক ক্ষেত্রেই কাফফারা হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন, ফরয রোযার কাফ্ফারা হিসেবে রোযাকেই ধার্য করা হয়েছে। এমনিভাবে কসমের কাফফারা হিসেবেও রোযাকে ধার্য করা হয়েছে। আমি শুনেছি রোযাকে এমন আরও অনেক বিধানের কাফফারা ধার্য করা হয়েছে। আমার জানার বিষয় হলো, ঠিক কোন কোন বিধানের কাফ্ফারা রোযা ধার্য করা হয়েছে? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

– রফিকুল ইসলাম, দেবিদ্বার, কুমিল্লা।

ফতোয়া: শরীয়তে একাধিক বিধানের ক্ষেত্রে রোযাকে কাফফারা হিসেবে ধার্য করা হয়েছে। নিম্নে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো-

এক. যিহারের কাফফারা হিসেবে। যিহার মূলত স্ত্রী থেকে বিচ্ছেদ হওয়ার বা তালাক প্রদানের একটি প্রক্রিয়া। কেউ যদি নিজের স্ত্রীকে বলে, তুমি আমার জন্য আমার মায়ের পিঠের মতো। তাহলে যিহার সংঘটিত হয়ে যাবে। এতে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের উপর হারাম হয়ে যাবে। অবশ্য এই হুরমত তুলে নেওয়ার অবকাশ রয়েছে। স্বামী যদি কাফফারা আদায় করে তাহলে পুনরায় তার জন্য স্ত্রী হালাল হয়ে যাবে। যিহারের কাফফারার তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথমত, একটি দাস মুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুই মাস লাগাতার রোযা রাখতে হবে। তৃতীয়ত, ষাটজন মিসকীনকে একদিন দুবেলা খাওয়াতে হবে।

এখানে যিহারের কাফফারার দ্বিতীয় ধাপে রোযাকে কাফফারা হিসেবে ধার্য করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-

وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا ذَلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ * فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَتَمَاسَّا فَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ذَلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ

‘যারা তাদের স্ত্রীর সাথে যিহার করে, অতঃপর তাদের বক্তব্য থেকে ফিরে আসে, তাদের কাফফারা হলো, তারা একে অপরের সংস্পর্শে আসার আগে একটি দাস মুক্ত করবে। তোমাদেরকে এই উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, তোমাদের কৃত- কর্মের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা সম্যক অবগত। আর যাদের এই সামর্থ্য নেই, তারা একে অপরের সংস্পর্শে আসার আগে ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোযা রাখবে। আর যাদের এই সক্ষমতাও নেই, তারা ষাটজন মিসকিনকে (দুবেলা) খাওয়াবে। তোমরা যাতে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি খাঁটি বিশ্বাস স্থাপন করো, এই জন্যই এই বিধান। এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা মুজাদালা, ৩-৪ আয়াত)।

আরও পড়তে পারেন-

দুই. ফরয রোযা কোনো গ্রহণযোগ্য উযর ব্যতীত ইচ্ছাকৃত ভেঙে ফেলার কাফফারা হিসেবে। কোনো ব্যক্তি যদি রমাযানে রোযা রেখে জেনেবুঝে স্ত্রী সহবাস করে বা খানাপিনা করে তবে তাকে সেই রোযা কাযা করতে হবে। সাথে সাথে কাফফারাও দিতে হবে। ফরয রোযার কাফফারা যিহারের কাফ্ফারার অনুরূপ। হয়ত দাস মুক্ত করতে হবে। সম্ভব না হলে দুই মাস ধারাবাহিক রোযা রাখতে হবে। তাও সম্ভব না হলে ষাটজন মিসকীনকে দুবেলা খাওয়াতে হবে। এক সাহাবী রমাযান মাসে রোযা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে ফেলেন। পরে বিচলিত হলে রাসূল (স.)এর দরবারে হাজির হয়ে অপরাধ স্বীকার করে সমাধান চান। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সমাধান কল্পে ইরশাদ করেন-

هل تجِدُ ما تُعتِقُ؟ قال: لا. قال: هل تستطيعُ أن تصومَ شَهرينِ مُتَتابعينِ؟ قال: لا. قال: فهل تجِدُ إطعامَ سِتِّينَ مِسكينًا؟ قال: لا. قال: فمكث النبيُّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم، فبينا نحن على ذلك أُتِيَ النبيُّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم بعَرَقٍ فيها تَمرٌ- والعَرَقُ: الْمِكتَلُ- قال: أين السَّائِلُ؟ فقال: أنا. قال: خذْ هذا فتصَدَّقْ به.

‘তোমার কাছে  মুক্ত  করার মতো কোনো কৃতদাস আছে? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি কি ধারাবাহিক দু’মাস রোযা রাখতে পারবে? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি কি ষাটজন মিসকিনকে (দু’বেলা) খাওয়াতে পারবে? সে বলল, না। আবু হুরাইরা (রাযি.) বলেন, এরপর নবী কারীম (সা.) থেমে গেলেন, আমরাও এই অবস্থায় ছিলাম, এই সময় নবীজির সামনে এক ‘আরাক’ পেশ করা হলো, যাতে খেজুর ছিল। আরাক হলো ঝুড়ি। তিনি বললেন, প্রশ্নকারী কোথায়? সে বলল, আমিই। তিনি বললেন, এগুলো নিয়ে সদকা করে দাও’। (সহীহ বুখারী, হাদীস- ১৯৩৬)।

তিন. ভুলক্রমে হত্যার কাফফারা হিসেবে। কোনো মুসলিম যদি অপর কোনো মুসলিমকে ভুলক্রমে হত্যা করে। আর ভুলক্রমে হওয়াটা যদি প্রমাণিত হয় তবে তাকে কাফফারা দিতে হবে। তাকে একজন মুসলিম দাস স্বাধীন করতে হবে। সম্ভব না হলে ষাটটি রোযা রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأً وَمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَنْ يَصَّدَّقُوا فَإِنْ كَانَ مِنْ قَوْمٍ عَدُوٍّ لَكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَإِنْ كَانَ مِنْ قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِنَ اللَّهِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا

‘কোনো মুমিন অপর মুমিনকে হত্যা করতে পারে না। তবে ভুলবশত (হলে ভিন্ন কথা)। যদি কোনো মুমিনকে সে ভুলবশত হত্যা করে ফেলে, একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং নিহতের পরিবারকে রক্তপণ দিতে হবে। তারা মাফ করে দিলে ভিন্ন কথা। আর যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রুপক্ষের হয় এবং মুমিন হয়। তাহলে একজন মুমিন দাস মুক্ত করবে। আর যদি নিহত এমন কোনো কওমের হয় যার সাথে তোমাদের শান্তিচুক্তি রয়েছে, তাহলে তার পরিবারকে রক্তপণ দিতে হবে এবং একজন মুমিন দাস মুক্ত করতে হবে। আর যে দাস মুক্তির সামর্থ্য রাখে না সে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের জন্য দুই মাস ধারাবাহিকভাবে রোযা রাখবে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়’। (সূরা নিসা- ৯২)।

চার. কসমের কাফ্ফারা হিসেবে। কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নামে কসম করলে সেই কসম পূর্ণ করতে হয়। কোনো কারণে পূর্ণ করতে না পারলে কাফফারা দিতে হবে। দশজন মিসকীনকে খাওয়াতে হবে অথবা পোশাক দিতে হবে। নচেৎ এক দাসকে স্বাধীন করতে হবে। অথবা তিন দিন রোযা রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-

لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِنْ يُؤَاخِذُكُمْ بِمَا عَقَّدْتُمُ الْأَيْمَانَ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ذَلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ

‘তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন না। কিন্তু তোমরা ইচ্ছাকৃত কসম করে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভেঙে ফেললে তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। অতএব, তার কাফফারা হলো, তোমরা নিজ পরিবারকে যে ধরনের খাবার দাও, সম-মানের খাবার দিয়ে দশজন মিসকিনকে খাওয়াবে, বা তাদেরকে পরিধেয় দিবে বা দাস মুক্ত করবে। যে তা পারবে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা হচ্ছে তোমাদের কসমের কাফফারা, যখন তোমরা কসম করো এবং তোমরা কসমকে রক্ষা করো’। (সূরা মায়েদা, আয়াত- ৮৯)।

পাঁচ. হজ্জে ইহরাম পরিপন্থি কোনো কাজের কাফফারা হিসেবে। হজ্জে ইহরাম পরিপন্থি কোনো কাজ করলে কাফফারা আদায় করতে হয়। হয়ত দম দিতে হয়, অথবা ছয়জন মিসকীন খাওয়াতে হয়, অথবা তিন দিন রোযা রাখতে হয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-

فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ بِهِ أَذًى مِّن رَّأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِنْ صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكٍ

‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয়, কিংবা কারও মাথায় যদি কোনো সমস্যা থাকে (যার কারণে সময়ের আগেই মাথা মুণ্ডাতে হয়) তাহলে সে রোযা, সদকা বা কুরবানী দ্বারা ফিদয়া দিবে’। (সূরা বাকারা, আয়াত- ১৯৬)।

ফতোয়া দিয়েছেন- আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন (দা.বা.)

মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও সহকারী পরিচালক-
জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।