।। মাওলানা মুনির আহমদ ।।
ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শ ও সামাজিক অঙ্গনের জন-ভাবমূর্তি নির্মাণেরও একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র। বিশেষত আলেম-উলামা, দ্বীনি দাঈ ও ইসলামপন্থী ব্যক্তিত্বদের জন্য অনলাইন উপস্থিতি এখন কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং তা দাওয়াহ, জনআস্থা ও ইসলামী অঙ্গনের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতার সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই বাস্তবতায় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—সব বৈধ বিষয় সর্বত্র আলোচনা করার প্রয়োজন হয় না, আর সব ব্যক্তিগত বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরাও প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয়।
বাংলাদেশের আইন ও সামাজিক কাঠামো—উভয়ই ইনসাফ, সামর্থ্য ও ভারসাম্য বজায় সাপেক্ষে দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বিবাহের সুযোগ স্বীকৃতি দেয়। শরীয়তের দৃষ্টিতেও এটি বৈধ। কারো প্রয়োজন, সক্ষমতা ও অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে তিনি একাধিক বিবাহ করতেই পারেন। এতে আপত্তির কিছু নেই। আমাদের সমাজে বহু শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষ, আলেম-উলামা ও সাধারণ মুসলমান একাধিক বিবাহ করে স্বাভাবিক ও নীরব পারিবারিক জীবন যাপন করছেন। সমাজ কিংবা রাষ্ট্রও তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিগত জীবনের এমন সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় অপ্রয়োজনীয় শোরগোল সৃষ্টি করার প্রয়োজন কী?
সাধারণ মানুষ একজন আলেম, দ্বীনের দাঈ কিংবা ইসলামপন্থী ব্যক্তিত্বের কাছে একটি উচ্চতর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মান প্রত্যাশা করেন। তারা মনে করেন, এসব মানুষ বিনয়, সংযম, মার্জিত আচরণ ও আত্মিক পরিশুদ্ধতার প্রতীক হবেন। তাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ইসলাম, উম্মাহ ও সমাজকল্যাণের বৃহত্তর ফিকির। সমাজে ন্যায়-ইনসাফ, সুবিচার ও দ্বীনি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁরা নিবেদিত থাকবেন।
সেই জায়গা থেকে যখন প্রকাশ্যে এমনভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়, যাতে মনে হয় একজন আলেম বা দাঈ নিজেই প্রবৃত্তি, গুনাহ কিংবা যৌন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কঠিন সংগ্রামকে জন-আলোচনার বিষয় করে তুলছেন, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে সৌন্দর্যমণ্ডিত প্রতীয়মান হয় না। বরং এতে আলেম-উলামার ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য ও দ্বীনি অঙ্গনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা প্রয়োজন—বৈধতা আর প্রজ্ঞাসম্মত উপস্থাপনা এক জিনিস নয়। ইসলামে বহু বিষয় বৈধ; কিন্তু সব বৈধ বিষয় প্রকাশ্যে প্রচার করা, আবেগময় আত্মপক্ষসমর্থনের ভাষায় উপস্থাপন করা কিংবা সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানানো সবসময় কল্যাণকর হয় না। বিশেষত যারা জনপরিসরে দাওয়াহ, নেতৃত্ব কিংবা আদর্শিক প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব বহন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সংযম ও প্রজ্ঞার গুরুত্ব আরও বেশি।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
কারণ, বর্তমান বিশ্বে ব্যক্তির ডিজিটাল আচরণও তার দাওয়াহর অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন দাঈ কেবল তার বক্তব্যের মাধ্যমে নয়; বরং তার ভাষা, উপস্থাপন, অনলাইন আচরণ ও জন-সংবেদনশীলতার মাধ্যমেও বিচারিত হন। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় কী বলা হচ্ছে, কীভাবে বলা হচ্ছে এবং কোন বিষয়কে কী মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—এসবেরও সামাজিক ও দাওয়াহগত প্রভাব রয়েছে।
আমাদের এটিও মনে রাখা উচিত, ইসলামবিদ্বেষী ও নাস্তিক্যবাদী চক্র বহুদিন ধরেই মুসলমান ও আলেম-উলামার বিরুদ্ধে নারী ও যৌনতা-সংশ্লিষ্ট নানা অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। আদর্শিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানের কারণে তারা অনেক সময় সরাসরি বিরোধিতার ক্ষেত্র না পেয়ে এসব বিষয়কেই প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সামান্য উপলক্ষ পেলেই তিলকে তাল বানিয়ে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা চলে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একই বাস্তবতা দৃশ্যমান। আরব মুসলিমদের দয়া, আতিথেয়তা, পারিবারিক বন্ধন, মানবিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার অসংখ্য অনন্য উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা গণমাধ্যম ও মুসলিমবিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ সচেতনভাবে তাদেরকে নারীলোভী, ভোগবাদী বা পশ্চাৎপদ হিসেবে উপস্থাপন করতে বেশি আগ্রহী। আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও তথাকথিত “লাভ জিহাদ” ইস্যুকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কীভাবে ভয়, সন্দেহ ও বিদ্বেষ তৈরির রাজনীতি করা হয়, সেটিও অজানা নয়।
বাস্তবতা হলো, যৌন অপরাধ বা নৈতিক বিচ্যুতির ঘটনা সমাজের সব স্তরেই ঘটে। তুলনামূলক বিচারে ইসলামী অঙ্গনে এমন ঘটনা অনেক কম। কিন্তু তারপরও ইসলামপন্থী, আলেম-উলামা, মাদ্রাসা শিক্ষক বা ছাত্রদের কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলেই সেটিকে অস্বাভাবিক মাত্রায় প্রচার করা হয়। মূলধারার মিডিয়ার একটি অংশ ইসলামী অঙ্গনের ব্যতিক্রমী বা বিতর্কিত ঘটনাগুলোকে তুলনামূলক বেশি সংবাদমূল্য দিয়ে থাকে—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে আমরা নিজেরাই অনেক সময় না বুঝে সেই নেতিবাচক প্রচারণাকে শক্তিশালী করে তুলছি। বাছবিচারহীন পোস্ট, আবেগপ্রসূত আত্মপক্ষসমর্থন, কিংবা পক্ষে-বিপক্ষে অতি-উচ্ছ্বসিত প্রচারণা—এসবের কারণে ইতিবাচক প্রভাবের চেয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই বেশি তৈরি হচ্ছে। সমাজে ইসলামপন্থীদের প্রতি অস্বস্তি, বিরক্তি ও কটাক্ষের সুযোগ বাড়ছে। এমনকি ধীরে ধীরে জনসম্পৃক্ততা ও জনসমর্থনের ক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে—এ বাস্তবতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাই আলেম-উলামা, মাদ্রাসার ছাত্র এবং ইসলামপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের উচিত—এসব সংবেদনশীল বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা, প্রজ্ঞা ও সংযমের পরিচয় দেওয়া। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিগত বৈধতা এবং জন-উপস্থাপনার উপযোগিতা এক বিষয় নয়। বিশেষত নারী ও যৌনতা-সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গ বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল। এ বিষয়ে কথাবার্তা, উপস্থাপন ও অনলাইন আচরণে বাড়তি দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতা অপরিহার্য।
দাওয়াহ কেবল বক্তব্যের বিষয় নয়; এটি ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, সংযম ও জনআস্থারও বিষয়। ডিজিটাল যুগে এই সত্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লেখক: শিক্ষক- জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী, নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম, সম্পাদক- উম্মাহ২৪ডটকম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








