Home দর্শন দার্শনিক ইমাম গাযালীর দৃষ্টিতে রোযা ও রমযান

দার্শনিক ইমাম গাযালীর দৃষ্টিতে রোযা ও রমযান

।। আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলিপুরী ।।

ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের একটি হচ্ছে পবিত্র রমযান মাসে রোযা পালন করা। সুতরাং এটি যে একটি বিশেষ ইবাদত, তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আর সকল ইবাদতের ফলই পরকালের জন্য সংরক্ষিত থাকে, যদি তা তিনটি শর্ত সাপেক্ষে পালিত হয়। যথা-

(১) ইবাদতকারী যদি ঈমানদার হয়। অর্থাৎ আল্লাহ্কে যদি যথার্থভাবে বিশ্বাস করে। কারণ ইবাদতের ফলাফল বা পুরস্কার দাতা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্। তাই তাঁকেই বিশ্বাস করতে না পারলে ইবাদতের ফল পাওয়ার আশা আর কার কাছে করা যেতে পারে?

(২) ইবাদত যদি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ বা শিক্ষা দেওয়া পদ্ধতি মতে করা হয়। কারণ, তাঁর আবির্ভাবের পর থেকে একমাত্র তাঁর আদর্শ ভিত্তিক ইবাদতই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য, অন্যটি নয়।

(৩) ইবাদতের উদ্দেশ্য যদি নির্ভেজাল হয়। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যদি ইবাদত করা হয়। কারণ, ইবাদতের মাধ্যমে যদি অন্য কারো সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য রাখা হয়, তাহলে এমন ইবাদতের ফল আল্লাহ্ দিবেন কেন?

উপরোক্ত তিন শর্তে ইবাদত করলে তার ফলাফল বা পুরস্কার পরকালের জন্য সংরক্ষিত থাকে। (তাফ্সীরে মাআরিফুল কুরআন)। অবশ্য কোন কোন ইবাদতের অতিরিক্ত পুরস্কার দুনিয়াতেও লাভ করা যায়। তবে তাতে তার মূল পুরস্কারে কোন ঘাটতি আসে না। যেমন, যথারীতি নামায আদায় করলে জীবিকায় বরকত হয় এবং রমযানে মু’মিনের জীবিকা বাড়ে বলে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে। কিন্তু তাই বলে এসব পার্থিব পুরস্কারের কারণে তার পরকালীন পুরস্কার হ্রাস পায় না।

আরও পড়ুন- ‘মাহে রমযান ও সিয়াম সাধনা’

আবার কোন কোন ইবাদত আছে, যা সঠিকভাবে পালন করলে ত্রিমুখী উপকার হয়। প্রথমতঃ ইহলৌকিক বাড়তি পুরস্কার পাওয়া যায়। দ্বিতীয়তঃ পারলৌকিক চিরস্থায়ী পুরস্কার পাওয়া যায়। তৃতীয়তঃ ইবাদতটা সযত্নে করার দ্বারা অন্য সকল ইবাদত করা এবং যাবতীয় পাপ ছেড়ে দেওয়া সহজতর হয়ে যায়। এ প্রকারের ইবাদতসমূহের মধ্যে রমযান মাসের রোযা অন্যতম। বিষয়টি সহজে অনুধাবনের জন্য দার্শনিক ইমাম গাযালীর দর্শন প্রণিধানযোগ্য।

ইমাম গাযালীর দর্শনঃ

রমযানের রোযা সম্পর্কে ইমাম গাযালী (রাহ্.)এর দর্শন নিম্নরূপ- প্রতিটি জীবিত মানুষের মধ্যে প্রধানতঃ দু’টি জিনিসের সমন্বয় থাকে, দেহ এবং আত্মা। দেহ জড় পদার্থ, কিন্তু আত্মা জড় পদার্থ নয়। দেহের প্রধান উপকরণ মাটি, কিন্তু আত্মা কোন জড় উপকরণ ব্যতিরেকে সরাসরি আল্লাহর আদেশে সৃষ্ট। অথচ এর একটাকে বাদ দিয়ে অপরটিকে জীবিত এবং পূর্ণাঙ্গ মানুষ বলা যায় না।

সুতরাং দেহ এবং আত্মা উভয়টির পূর্ণতা সাধনই মানব জীবন স্বার্থক করার পথে সহায়ক। একদিকে যেমন দেহের যত্ন নেওয়া, তাকে খাদ্য দেওয়া, তাকে সুস্থ সবল রাখার জন্য তৎপর থাকা অপরিহার্য এবং এর অভাবে দেহ দুর্বল ও অকেজো হয়ে পড়ে। তেমনিভাবে আত্মারও যত্ন নিতে হয়, তাকেও খাদ্য দিতে হয়, সুস্থ সবল রাখতে হয়। এর অভাবে আত্মাও অসুস্থ, দুর্বল ও অকেজো হয়ে পড়ে।

দেহের খাদ্যঃ

দার্শনিক গাযালী (রাহ্.)এর মতে দেহ যেমন মাটির উপকরণে সৃষ্ট, তেমনি তার যাবতীয় খাদ্যও মাটি থেকেই উৎপাদিত হয়। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে মানুষের জীবনে দেহের খাদ্য হিসেবে যা কিছু গ্রহণ করা হয়, তার সবটুকুই মাটি থেকে উৎপাদিত হয়।

যেমন- মানুষ ভাত খায়, তা মাটি থেকে উৎপাদিত হয়। রুটি খায়, তাও মাটি থেকে উৎপাদিত। দুধ পান করে, তাও গাভী, ছাগল ইত্যাদি যেসব জন্তু থেকে দোহন করে লাভ হয়, সেসব জন্তুর আহার্য ঘাস, খড় ইত্যাদি থেকেই উৎপাদিত হয়। আর ঘাস-খড় ইত্যাদি যে মাটিতেই ফলে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এভাবে মানুষ বিস্কুট, মিষ্টি, গোশ্ত, বিরিয়ানী, পোলাও, কোরমা, কাবাব, ফলমূল যা কিছুই দেহের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, এর সব কিছুই মূলতঃ মাটি থেকে উৎপাদিত। সুতরাং মাটির উপকরণে সৃষ্ট দেহ, মাটি থেকে উৎপাদিত খাদ্য গ্রহণ করেই সুস্থ, সবল, পুষ্ট ও কর্মক্ষম হয়। আর এর অভাবে অসুস্থ, দুর্বল, ক্ষীণ ও অক্ষম হয়ে পড়ে।

দেহের খাদ্যের ফলাফলঃ

মাটির সৃষ্ট দেহ মাটি থেকে উৎপাদিত খাদ্য গ্রহণ করলেই সক্ষম বা কাজের যোগ্য থাকে। দেহের দ্বারা যত মানুষ যত কাজের আশা করে সবটুকুই সম্পন্ন করার জন্য দেহের পুষ্টি, সুস্থতা ও সক্ষমতার প্রয়োজন। যেমন- যারা চাষাবাদ করে, তারা কর্মক্ষম দেহ ছাড়া তা করতে পারে না। তেমনিভাবে যারা ব্যবসা করে, তাদের জন্যও দৈহিক সক্ষমতা প্রয়োজন। যারা চাকুরী করে, তাদের জন্যও দৈহিক সামর্থ প্রয়োজন। এমনকি প্রায় সমস্ত ইবাদতও দৈহিক সামর্থ ছাড়া করা যায় না।

এজন্যই সমাজে এমন কোন বিবেকবানই শুধু নয়, বরং এমন বোকাও পাওয়া বিরল, যে দৈহিক সক্ষমতা লাভের মাধ্যম দেহের খাদ্য গ্রহণে তৎপর হয় না। এতেই একথা পরিস্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, সবাই এ ব্যাপারে সচেতন, দৈহিক সামর্থ বজায় রাখার জন্য দেহের খাদ্য কতটুকু প্রয়োজনীয়।

ত্মার খাদ্যঃ

মাটির উপকরণে সৃষ্ট দেহের জন্য যেমন মাটি থেকে উৎপাদিত খাদ্য অপরিহার্য, তেমনিভাবে আল্লাহর আদেশে সৃষ্ট আত্মারও খাদ্যের প্রয়োজন এবং তা আল্লাহর আদেশ পালন তথা ইবাদতের দ্বারা উৎপাদিত হয়। অর্থাৎ মাটির দেহের জন্য যেমন মাটি থেকে উৎপাদিত খাদ্য প্রয়োজন, তেমনিভাবে আল্লাহর হুকুমে সৃষ্ট রূহের জন্য আল্লাহর হুকুম পালনে উৎপাদিত খাদ্য তথা ইবাদতের প্রয়োজন।

মাটির দেহ যেমন মাটির খাদ্যের অভাবে অকেজো হয়ে পড়তে বাধ্য, তেমনি আল্লাহর হুকুমের রূহ্ বা আত্মা আল্লাহর হুকুম পালনের খাদ্য তথা ইবাদতের অভাবে অচল হয়ে পড়তে বাধ্য। আর মাটির দেহ ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় মাটির খাদ্যের ফলাফল যেমন তার জন্য ক্ষণস্থায়ী, তেমনি মাটির খাদ্যের অভাবে তার অক্ষমতাও ক্ষণস্থায়ী। পক্ষান্তরে আল্লাহর হুকুমের সৃষ্ট আত্মা ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং আত্মা অমর, চিরস্থায়ী।

সুতরাং ইবাদতের খাদ্য পেলে আত্মা সুস্থ, সবল ও সুখী হয় চিরস্থায়ী জীবনের জন্য। আর তার খাদ্যের অভাবে সে অসুস্থ, দুর্বল, অক্ষম এবং দুঃখীও হয় চিরস্থায়ী জীবনের জন্য।

একের খাদ্য অপরের কাজে আসে নাঃ

এতক্ষণে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, দেহ এবং আত্মা উভয়টারই সুস্থতা, সক্ষমতা এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। আরও একটি বিষয় আমরা সকলে বাস্তব অভিজ্ঞতার দ্বারাই উপলব্ধি করতে পারি যে, আত্মার খাদ্য ইবাদত সাধারণতঃ দেহের কোন উপকারে আসে না। কিন্তু যে মূল্যবান বিষয়টি আমরা অনেকেই লক্ষ্যও করি না এবং বোঝারও চেষ্টা করি না, তা হচ্ছে আত্মার খাদ্য ইবাদত যেমন দেহের উপকারে আসে না, তেমনি দেহের খাদ্যগুলোও আত্মার কোন উপকারে আসে না। অর্থাৎ ভাত-মাছ বা গোশ্ত-রুটি ইত্যাদি খেলে শরীরের ক্ষুধা নিবারণ হয় বটে, কিন্তু আত্মার ক্ষুধা নিবারণ হয় না। তেমনিভাবে নামায-রোযা ইত্যাদির দ্বারা আত্মার ক্ষুধা নিবারণ হয়, কিন্তু দেহের ক্ষুধা নিবারণ হয় না।

ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তাঃ

দেহ এবং আত্মার মিলনেই দুনিয়ার জীবন যাপন করতে হয়। পরকালেও এ দুয়ের সমন্বয়েই জীবন যাপন হবে। তবে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী আর পরকালের জীবন চিরস্থায়ী। অবশ্য দুনিয়াতে আসার আগে আত্মা ছিল দেহহীনভাবে, আর দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পর ক্বিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত বরযখী জীবন বা কবর জীবনেও আত্মা থাকবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। কিন্তু দুনিয়াতে এবং আখিরাতে মানুষের জীবন যাপনের ব্যবস্থা হচ্ছে দেহ এবং আত্মার সমন্বয়ে। সুতরাং এ উভয় জীবনে দেহ এবং আত্মার ভারসাম্য রক্ষা করা নিতান্ত জরুরী।

এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়া হচ্ছে পরকালের কৃষি ক্ষেত্র। অর্থাৎ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে যা কিছু করা হবে, তারই ফলাফল পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে ভোগ করা হবে। সুতরাং দুনিয়ার জীবনে যারা দেহ এবং আত্মা উভয়ের পরিমিত খাদ্য দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করেন, পরকালেও তাদের এ দুয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা হবে। অর্থাৎ দেহ এবং আত্মা সুখ-স্বাŽছন্দে চিরকাল জান্নাতে বসবাস করবে।

বৈষম্যের ফলাফলঃ

কিন্তু যারা দুনিয়ার জীবনে শুধু ইবাদতের মাধ্যমে আত্মার খাদ্য দিয়ে দেহকে তার মাটির উৎপাদিত খাদ্য থেকে বঞ্চিত করবেন, তারা শারীরিকভাবে যেমন দুনিয়ার যাবতীয় কাজের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবেন তেমনিভাবে অন্য দিকে ইবাদতের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলবেন। এ জন্যই ইসলামের বিধানে নামায-রোযাকে যেমন ইবাদত বলা হয়েছে, তেমনি, হালাল উপার্জনকেও ইবাদতের মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে।

আর যারা দুনিয়ার জীবনে মাটির দেহকে যথারীতি মাটির খাদ্য দিয়ে থাকে, কিন্তু আত্মাকে ইবাদতের খাদ্য থেকে বঞ্চিত রাখে, এরা একদিকে দুনিয়াতে দেহের অতিরিক্ত ভোগের লালসার শিকারে পরিণত হয়। এদের দেহ শুধু পুষ্ট ও সক্ষমই নয়, বরং ভোগের লালসায় উন্মাদ হয়ে পড়ে। আর অপরদিকে এদের আত্মা থাকে দারুণভাবে ক্ষুধার্ত দুর্বল এবং অকেজো। যার ফলে পরকালে পুলসিরাত পার হওয়ার সময় যখন তাদের ভারী দেহ জাহান্নামের আগুনে পুড়ে যাবে, তখন তাদের ক্ষুধার্ত অকেজো আত্মা তাকে কিছুতেই সামলাতে পারবে না।

সমন্বয়ের উদাহরণঃ

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে দুনিয়াকে পরকালের কৃষি ক্ষেত্র বলা হয়েছে। আমাদের দেশের কৃষকরা যখন ক্ষেতে হালচাষ করেন, তখন তারা সাধারণতঃ একটি জোয়ালের দু’পাশে দু’টি গরু বেঁধে হালচাষের কাজ করে থাকেন। এক্ষেত্রে গরু দু’টির শক্তি সামর্থ প্রায় সমান সমান হওয়ার দরকার পড়ে। অন্যথায় এক পাশের গরুটি বেশী শক্তিশালী এবং অন্য পাশেরটি বেশী দুর্বল হলে যে হাল চলবে না, সে কথা কোন চাষী মাত্রকেই বোঝাবার দরকার পড়ে না।

অনুরূপভাবে দুনিয়াতে দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে পরকালের ফসল উৎপাদনের জন্য ইবাদতের কৃষিকাজ করতে হয়। তাই এখানেও দেহ এবং আত্মার পরিমিত শক্তির দরকার হয়। দেহ তার খাদ্যের অভাবে দুর্বল হলে যেমন দুনিয়াতে বিপর্যয় অবধারিত, তেমনি আত্মাও তার খাদ্যের অভাবে দুর্বল হলে পরকালে বিপর্যয় অবধারিত। সুতরাং দুনিয়াতে দেহের পরিমিত শক্তির জন্য যেমন তার খাদ্য দিতে হবে, তেমনি পরকালে রূহের পরিমিত শক্তির জন্য তাকেও ইবাদতের খাদ্য দিয়ে লালন করতে হবে।

জড় জগতের বৈশিষ্ট্যঃ

কিন্তু দুনিয়ার জড় জগতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মানুষ যখন জড় দেহ ধারণ করতঃ এখানে আসে তখন আত্মার ভোগের জগৎ পরকালের কথা ভুলে যায়। তাই সে তখন শুধুমাত্র জড় দেহটাকেই তার খাদ্য দিতে থাকে, আর আত্মাকে তার খাদ্য থেকে বঞ্চিত করে রাখে। যার অনিবার্য পরিণাম পরকালের ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। এ বিপর্যয়ের হাত থেকে তাকে রক্ষার ব্যবস্থা দানের জন্যই আল্লাহ্ যুগে যুগে অগণিত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তারা সবাই জগদ্বাসীকে আত্মার খাদ্য আল্লাহর ইবাদত হাসিল করার সন্ধান দিয়ে গেছেন।

রমযান ও রোযার অবদানঃ

কিন্তু এর পরও মানুষ এগারটি মাস পর্যন্ত দেহের খাদ্য দিন রাত নির্বিশেষে অবাধে দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় তার মধ্যে ক্রমান্বয়ে দৈহিক ভোগের লালসা বাড়তে থাকে। এ লালসার তাড়নায় কেউ আত্মার খাদ্য ইবাদত বন্ধ করে দিয়ে অবৈধ উপায়ে দৈহিক ভোগে লিপ্ত হয়। আর কেউ ইবাদত বন্ধ করে না দিলেও তাতে অলসতা এবং দৈহিক অবৈধ ভোগে লিপ্ত না হলেও তার প্রবৃত্তি সে দিকে উঁকি মারতে থাকে। ইবাদতের এ অলসতা দরীকরণে এবং প্রবৃত্তি দমনের সংযম সাধনে রোযার কোন বিকল্প নেই।

এর দ্বারা একদিকে আত্মার খাদ্য ইবাদতের আগ্রহ বাড়ে, অন্যদিকে এগার মাসের অলসতা বশতঃ ইবাদতের ক্ষয়ক্ষতি পুরণ হয়। সর্বোপরি যারা এগার মাস ইবাদত ছেড়ে দিয়ে প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়েছিল, তাদের জন্যও প্রবৃত্তির দাসত্বমুক্ত হয়ে ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার প্রেরণা জাগ্রত হয়। কিন্তু সেটা কিভাবে? তা নিম্নে বর্ণিত হয়েছে।

রমযান মাসের রোযা তাক্বওয়ার মাধ্যমঃ

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি (রমযান মাসের) রোযা ফরয করা হল, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য ফরয করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাক্বওয়া হাসিল করতে পার।” (সূরা বাক্বারাহ- ১৮৩)।

তাক্বওয়া শব্দটি পবিত্র কুরআনে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত। এর সারমর্ম হচ্ছে, আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলা। আর নামান্তরে এটাই হচ্ছে ইবাদত। তাহলে উক্ত আয়াতের মর্ম দাঁড়ায়, রমযানের রোযার মাধ্যমে আল্লাহর যাবতীয় ইবাদত সহজ হয়ে যায়। কারণ ইবাদতের বিশেষ অন্তরায় হচ্ছে, জড়বাদী ভোগের লালসা। আর রোযা নামের ইবাদতের মাধ্যমে এই ভোগের লালসা বা প্রবৃত্তি নিবারণের প্রশিক্ষণ হয়।

প্রবৃত্তি দমনের প্রশিক্ষণ রোযাঃ

মানুষ তার আত্মার খাদ্য ইবাদত থেকে বিরত থাকার একমাত্র কারণ হচ্ছে, দৈহিক চাহিদা পুরনের অবাধ প্রবৃত্তি। আর দৈহিক চাহিদা পুরণের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে, দু’টি অঙ্গ। বলাবাহুল্য যে, অঙ্গ দু’টিই হাড় বিহীন। এর একটি বত্রিশ দাঁতের বেষ্টনে অবস্থান করে। নাম তার জিহ্বা। অপরটি দুই উরুর বেষ্টনে অবস্থান করে। নাম তার লজ্জাস্থান। প্রধানতঃ এ দু’টি অঙ্গের অবাধ চাহিদা পুরন কল্পেই মানুষ পরকাল সম্পর্কে উদাসীন হয়ে আত্মার খাদ্য ইবাদত বর্জন করে। তাই দেখা যায়, এক হাদীসে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি এ দু’টি অঙ্গের যিম্মাদার হতে পারবে, আমি তাকে জান্নাতে পৌঁছাবার জামিন হতে পারব।”

সুতরাং জিহ্বা এবং লজ্জাস্থান, এ দু’টি অঙ্গের অবাধ চাহিদা পুরনের লালসাই মানুষকে তার আত্মার খাদ্য ইবাদত থেকে বিরত রাখে। জিহ্বার চাহিদা হচ্ছে, খাদ্য গ্রহণ, আর লজ্জাস্থানের চাহিদা হচ্ছে, যৌন ক্ষুধা নিবারণ। রমযান ছাড়া বাকী এগারটি মাস পর্যন্ত অন্তত হালাল উপায়ে এ দু’টি অঙ্গের চাহিদা পুরণে উল্লেখযোগ্য কোন ধরাবাঁধা নিয়ম বা সময়ানুবর্তিতা নেই। বরং রাতদিন নির্বিশেষে যখন ইচ্ছা তখনই খেতে পারে, যখন ইচ্ছা তখনই সহবাসে লিপ্ত হতে পারে।

আর মানুষের একটি সৃষ্টিগত ও চিরন্তন স্বভাব হচ্ছে এই যে, যতই উপভোগ করে, ততই তার লালসা আরো বাড়ে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যে ব্যক্তি কিছুই খেতে পায় না, সে অন্তত শাক-শুঁটকি খেয়ে জীবন বাঁচাতে চায়। যখন শাক-শুঁটকি খেতে পায়, তখন মাছ-গোশ্ত খাওয়ার লালসা বাড়ে। যখন মাছ-গোশ্ত খেতে পায়, তখন কোরমা-পোলাও খাবার লালসা প্রবল হয়। যখন এটা খেতে পায়, তখন আরো উন্নত মানের খাদ্য খাওয়ার লিপ্সা জাগ্রত হয়।

এভাবে যতই উন্নত মানের খাদ্য পায়, ততই আরো উন্নত মানের খাদ্য চায়। এ ক্রমবর্ধমান লালসা যেখানে গিয়ে আর হালাল উপায়ে নিবারণের উপায় থাকে না, তখনই অবৈধভাবে নিবারণের উপায় খোঁজে। এজন্যই তো মোটা অংকের বেতনের চাকুরীজীবিদেরেও ঘোষ খেতে দেখা যায়। বরং বেশী লম্বা বেতনের চাকুরীজীবিদেরে বেশ মোটা অংকের ঘোষ খেতে দেখা যায়। এর একমাত্র কারণ ভোগের অনন্ত লালসা মানুষকে এক সময় হালালের গণ্ডি লঘন করিয়ে হারাম উপভোগে উদ্বুদ্ধ করে।

আরও পড়ুন- মুসলমানদের নৈতিক অধঃপতন এবং ধ্বংস থেকে বেঁচে থাকার উপায়

এতো হচ্ছে, জিহ্বার উপভোগের অবস্থা। এবার যৌন উপভোগের অবস্থা তলিয়ে দেখা যাক। যার বিপরীত লিঙ্গের সাথে মিলনের ব্যবস্থা নেই, সে অন্তত বিয়ের মাধ্যমে এ মিলনের ব্যবস্থা করতে চায়। কিন্তু দাম্পত্য মিলনে একটি উল্লেখযোগ্য সময় অতিক্রম হওয়ার পর থেকে পুরাতন মিলন সঙ্গী/সঙ্গীনীকে বাদ দিয়ে নতুন মিলন সঙ্গী/সঙ্গীনীর সাথে যৌন আচরণের লালসা জাগে। এ পর্যায়ে এসে যদি হালাল উপায়ে কোন ব্যবস্থা না হয়, তখন হারাম উপায় অবলম্বন করে।

এজন্যই তো বহু লোক ঘরে আপন স্ত্রী রেখেও পরকীয়া প্রেমে মত্ত হয় অথবা পতিতালয়ে গমন করে। শুধু পুরুষের বেলায়ই নয়। নারীরাও যেহেতু মানুষ, তাই তাদেরও একই অবস্থা। এজন্যই তো বহু নারীকে আপন স্বামী এমনকি øেহের ছেলে মেয়েকে ছেড়ে ভিন্ন পুরুষের হাত ধরে উধাও হয়ে যেতে দেখা যায়। এসবের মূলে একমাত্র কারণ হচ্ছে, পূর্বোল্লিখিত দু’টি অঙ্গের অবাধ ভোগের লালসা। এটিকে ক্রমান্বয়ে দমন করার জন্য রমযানের রোযার বিকল্প নেই। কিন্তু কি ভাবে? সে প্রশ্নের জবাবটাই হচ্ছে এ নিবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়। আর তা পরিস্কারভাবে অনুধাবন করার জন্য পূর্বোল্লিখিত কথাগুলো স্মরণ রাখার পর এ পর্যায়ে রোযার সংজ্ঞা উপলব্ধি করা দরকার।

রোযার সংজ্ঞাঃ

রোযার সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা হচ্ছে, আল্লাহর বিধান বা ইবাদতের উদ্দেশ্যে সাহ্রী থেকে ইফ্তার পর্যন্ত সময়টুকু জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের উপভোগ থেকে বিরত থাকা। এটি রমযান মাসে ফরয। বাকী এগার মাস এ দু’টি অঙ্গকে উক্ত সময়ে তার হালাল উপভোগ থেকে বিরত রাখা ফরয নয়। কিন্তু রমযানে এ অঙ্গ দু’টিকে একটা নির্ধারিত সময়ের জন্য তার হালাল উপভোগ থেকেও বিরত রাখার বিধান দেওয়া হল কেন? প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব পাওয়া যায় পূর্বোল্লিখিত আয়াতে। যেখানে আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন যে, “রমযানের রোযা তোমাদের জন্য ফরয করা হল, যেন তোমরা সংযম অবলম্বন করতে পার।”

এ সংযম কীভাবে অবলম্বন করা যাবে? তার বিবরণ হচ্ছে, রমযানের পূর্ণ মাসটিতে যারা শুধুমাত্র আল্লাহর বিধান পালনের উদ্দেশ্যে একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য হালাল উপভোগ থেকেও সেই দু’টি অঙ্গকে নিবৃত্ত রাখার অভ্যাস গড়তে পারবে, যে অঙ্গ দু’টি সকল পাপের মূল, তাদের পক্ষে বাকী এগারটি মাস পর্যন্ত আল্লাহর বিধান পালনার্থে সকল প্রকার হারাম উপভোগ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়ে যাবে।

রমযানের প্রশিক্ষণঃ

উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় একথা পরিস্কার হয়ে গেল যে, গোটা রমযান মাসটাই একটা প্রশিক্ষণের মাস। কিসের প্রশিক্ষণ? আল্লাহর ইবাদত পালনে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য সংযমের প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণ মু’মিনদের মধ্যে চলতে থাকবে গোটা মাস ব্যাপী। এটি দু’এক দিনে অর্জন হওয়ার নয়। মাত্র এক দু’দিন রোযা রাখলে এ প্রশিক্ষণ অর্জন হবে না। আবার সারা রমযান ব্যাপী রোযা রাখা অবস্থায় কোন পাপে লিপ্ত থাকলেও প্রশিক্ষণটি অর্জন হবে না।

কেননা, নিম্নোক্ত দু’রকম হাদীসের দ্বারা তা পরিস্কার হয়ে যাবে। প্রথমতঃ রমযান মাস আসলে প্রায় লোকেই একটি হাদীস আলোচনা করে থাকেন। হাদীসটি হচ্ছে, রমযানের প্রথম দশ দিন রহ্মতের, দ্বিতীয় দশ দিন গুনাহ্ মাফের, আর তৃতীয় দশ দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রমযানের প্রথম দশক ছাড়া অন্য সময় কি আল্লাহর রহমত থাকে না? দ্বিতীয় দশক ছাড়া অন্য সময় কি মাগফিরাত হয় না? তৃতীয় দশক ছাড়া আর কখনো কি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না? অবশ্যই যায়। তবে আর রমযানের বৈশিষ্ট্য কি? বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাত পেতে হলে দু’টি অপরিহার্য শর্ত পালন করতে হয়। আর তা হচ্ছে, আল্লাহর ইবাদত করা এবং পাপ ছেড়ে দেওয়া।

আর এটি সহজসাধ্য করার অনুপম ব্যবস্থা হচ্ছে, রমযানের পূর্ণ মাসের রোযা। দু’একদিনের রোযার দ্বারা এটা সহজসাধ্য হয় না। কারণ, দীর্ঘ এগার মাসের অবাধ ভোগের ফলে প্রবৃত্তি বড়ই শক্তিশালী হয়ে উঠে। তাই সে সহজে আল্লাহর একনিষ্ঠ ইবাদতে মগ্ন অথবা অবাধ ভোগ ত্যাগ করতে চায় না। তাই মাস ব্যাপী রোযার অনুশীলনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে সে প্রশিক্ষণ অর্জন করতে হবে।

রমযানের প্রথম দশকের প্রশিক্ষণেই যারা আল্লাহর ইবাদত ও হারাম উপভোগ বর্জনে অভ্যস্ত হতে পারবে, তাদের জন্য প্রথম দশককে রহমত বলা হয়েছে। দ্বিতীয় দশকে যারা পারবে, তাদের জন্য দ্বিতীয় দশককে মাগফিরাত বলা হয়েছে। আর শেষ দশকে যারা পারবে, তাদের জন্য এটিকে নাজাত লাভের দশক বলা হয়েছে। (দ্রঃ ফাযায়েলে রমযান -আল্লামা যাকারিয়া [রাহ্.])।

এখানে দেখা গেল রমযান আমাদেরে যে সংযমের প্রশিক্ষণ দিতে চায়, তা গ্রহণের জন্য স্তরভেদে পূর্ণ একটি মাসের দরকার। কেউ ইচ্ছা করলে পূর্ণ মাসটির যে কোন দশকে এগার মাসের অভ্যস্ত পাপ ত্যাগ এবং ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার সাধনা করতে পারে। কিন্তু এ দিকে লক্ষ্য নিয়ে যত্নবান না হলে রমযানের এ সংযম সাধনা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের হাদীসগুলো তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

দ্বিতীয় পর্যায়ের হাদীসগুলোর একটিতে হযরত জিব্রাঈল (আ.) তিন শ্রেণীর মানুষের জন্য অপদস্ত হওয়ার কথা বলেছেন। আর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে সমর্থন দিয়েছেন। তন্মধ্যে এক শ্রেণীর লোক হচ্ছে তারা, যারা রমযানের পূর্ণ এক মাসেও যথারীতি ‘তাওবা’ বা পাপ বর্জনের মাধ্যমে অতীতের গুনাহ্ মাফ করাতে পারল না। আরেকটি হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, যারা বিভিন্ন ধরনের পাপে লিপ্ত থাকা অবস্থায় রমযানের রোযা রাখল, তাদের রোযার ফল শুধুমাত্র উপবাসের কষ্টভোগ ছাড়া আর কিছুই হল না। (দ্রঃ ফাযায়েলে রমযান)।

তাহলে এবার উভয় প্রকার হাদীস মিলিয়ে রমযান মাসের আগমন ও প্রস্থানের প্রেক্ষিতে সকল মানুষকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমঃ যারা রমযানের প্রথম দশকেই সকল পাপ ছেড়ে দিয়ে ইবাদতে লিপ্ত হল, তাদের জন্য প্রথম দশক থেকেই রহমত নাযিল শুরু হয়ে যায়। দ্বিতীয়ঃ যারা দ্বিতীয় দশকেও এ মহান কাজটি সাধন করতে পারে, তাদের জন্য দ্বিতীয় দশক থেকে মাগফিরাত শুরু হয়।

আরও পড়ুন- বছরের মাঝে সম্পদের তারতম্য হলে যাকাত আদায়ের নিয়ম

তৃতীয়ঃ যারা শেষ দশকের ভিতরেও পাপ বর্জন ও ইবাদতে লিপ্ত হতে পারে, তাদের জন্য  উপরোক্ত শেষ দশকেই জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা হয়। চতুর্থঃ কিন্তু যারা শেষ দশকেও এ সাধনাটি লাভ করতে পারে না, তারা চতুর্থ দলের অন্তর্ভুক্ত, যাদের জন্য রমযান রহমত, মাগফিরাত অথবা নাজাত; এর কোন একটি বার্তাও দিয়ে যেতে পারে না। বাকী তিন শ্রেণীর লোকেরা এ তিনটি সুসংবাদ প্রাপ্ত হয় শুধুমাত্র উপবাস পালনের কারণে নয়, বরং উল্লিখিত বর্ণনামতে রমযান কেন্দ্রিক বিশেষ সংযম সাধনার মাধ্যমে।

এ সাধনাটিকেই ইমাম গাযালী (রাহ্.)এর দর্শনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এভাবে যে, যে দেহের চাহিদা এগার মাস পর্যন্ত অবাধে পূরণ করা হয়েছে, তা রমযান মাসে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তখনই আত্মার চাহিদা পূরণের পথ সুগম হবে।

ত্মার ক্ষুধা নিবারণের প্রকৃষ্ট ব্যবস্থা রমযানঃ

উপরোক্ত আলোচনায় একটি বিষয় পরিস্কার হয়ে গেল যে, রমযানের দিনের বেলায় দেহকে তার হালাল উপভোগ থেকেও বিরত রাখার অভ্যাস করতে, হারাম উপভোগের লালসাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হয়ে যায়। এটিই হচ্ছে পাপ থেকে বিরত থাকার সিয়াম সাধনা। কিন্তু বিগত এগারটি মাসে দেহের অবাধ চাহিদা পূরণের কারণে আত্মার খাদ্য ইবাদতে যেসব ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটেছে, সেটি পূরণেরও অনুপম ব্যবস্থা দান করা হয়েছে রমযানে। ফাযায়েলে রমযানের হাদীসগুলোর এক হাদীসে বলা হয়েছে, রমযানের একটি নফল ইবাদত অন্য সময়ের একটি ফরয ইবাদতের সমতুল্য, আর রমযানের একটি ফরয ইবাদত অন্য সময়ের সত্তরটি ফরয ইবাদতের সমতুল্য। রমযানুল মুবারকের এ বিশেষ অনুপম ব্যবস্থার মাধ্যমে এগার মাস আত্মার খাদ্যে যেসব ঘাটতি হয়েছিল, তা পূরণ হয়ে যায়।

পরিশিষ্টঃ

হযরত ইমাম গাযালী (রাহ্.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘ইয়াহ্ইয়াউল উলম’-এর আসরারুস্ সাওম অধ্যায়ে রোযা ও রমযানের যে দর্শন পেশ করেছেন, মোটামুটিভাবে এখানে ব্যক্ত করা হল। যার সার সংক্ষেপ হচ্ছে, এগারটি মাস পর্যন্ত দেহের চাহিদা অবাধে পূরণের কারণে মানুষের প্রবৃত্তি ক্ষণস্থায়ী জীবনের ভোগের লালসায় ঝুঁকে পড়ে। ফলে আত্মার খাদ্য ইবাদত থেকে তাকে পূর্ণ বা আংশিকভাবে বঞ্চিত করা হয়।

রমযানের আগমনে একদিকে দেহের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতঃ আÍসংযমের প্রশিক্ষণ গ্রহণের দারোদ্ঘাটন করা হয়। যার ফলে প্রবৃত্তি দমনের ব্যবস্থা হয়। অপরদিকে রমযানের ইবাদতের মান অন্য সময়ের চেয়ে বহুগুণে বর্ধিত করে দেওয়া হয়। যার ফলে আত্মার খাদ্য ইবাদতের এগার মাসের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ হয়ে যায়। এ ক্ষুদ্র নিবন্ধে উল্লিখিত আয়াত এবং হাদীসগুলোকে একটু গভীর মনযোগে অধ্যায়ন করলে বিষয়টি অতি সহজেই অনুধাবন করা যায়।

সুতরাং আমরা যারা ‘রমযানের প্রথম দশক রহ্মতের, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের, আর শেষ দশক জাহান্নাম থেকে নাজাতের’ হাদীসটির কথা আলোচনা করি, আমাদের জন্য ‘রমযানের যারা যথারীতি তাওবার মাধ্যমে গুনাহ্ মাফ করাতে পারল না, তাদের জন্য হযরত জিবরাঈল (আ.) অপদস্ত হওয়ার কথা বলেছেন এবং হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে সমর্থন দিয়েছেন’ এছাড়া ‘যারা বিভিন্ন পাপের কাজে লিপ্ত থেকে রমযানের রোযা রাখল, তাদের রোযার ফলাফল শুধুমাত্র উপবাস ছাড়া আর কিছুই হল না’ এ জাতীয় হাদীসগুলোও চর্চা করা দরকার। তখনই রোযা ও রমযান সম্পর্কে ইমাম গাযালী (রাহ্.)এর দর্শন উপলব্ধি করা আমাদের পক্ষে সহজ হবে।

লেখক: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও মুফাসসিরে কুরআন।

আরও পড়ুন- ‘ধর্মনিরপেক্ষতার অন্তরালে’