Home শিক্ষা ও সাহিত্য ঈদ: সেকাল একাল

ঈদ: সেকাল একাল

।। রহিমা আক্তার মৌ ।।

১০ এপ্রিল ২০১৯ রোজ বুধবার ছোট মেয়ে অভ্র’র স্কুলে গেলাম। তিন্নির আম্মুর হাতে বড় একটা ব্যাগ দেখেই প্রশ্ন— বেড়াতে যাচ্ছেন না কি, সাথে বড় ব্যাগ যে?– না তিন্নিকে স্কুলে দিয়ে শপিং এ গেলাম। এখুনিই এলাম, তাই সাথে ব্যাগ। — কি কিনলেন এতো।– ঈদের শপিং করেছি। আসলে রমজান এসে যাচ্ছে, রোজা করে যেতে পারিনা তাই আগেই সেরে নিচ্ছি। আত্মীয় স্বজন অনেক তো, সবাইকে কিছুনা কিছু দিতেই হয়। তাই আগেই কিনে ফেলি।

তিন্নির আম্মুর কথা শুনে হিসাব করলাম আজ মাত্র এপ্রিল মাসের ১০ তারিখ। এপ্রিলের ২২ তারিখ সবে বরাত, তার ও ১৫ দিন পর রমজান। হিসেব অনুযায়ী মে মাসের প্রথম সাপ্তাহে রোজা শুরু আর জুন মাসের প্রথম সাপ্তাহে ঈদুল আযহা। দুই মাস আগেই শপিং, সত্যিই আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। তবে কি আমরা সব দিক দিয়েই এগিয়ে যেতে পেরেছি।

আসলে সেকাল বা একাল সবকালেই ঈদ আনন্দময়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের ধরণ হয়তো পাল্টে গেছে হয়তো পালটেছে আনন্দ উদযাপনের পদ্ধতি ও। কিন্তু  সবাই জানে ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে উৎসব, ঈদ মানেই আনন্দ ভাগাভাগির এক মহান মিলনমেলা। এ মিলনমেলায় এক কাতারে শামিল হয় ধনী-গরিব আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। ঈদ মূলত সবার জীবনেই কমবেশি আনন্দ বয়ে আনে। আনন্দানুভূতির ধরন-বৈচিত্র্যতা বদল এলেও সেকাল-একাল যে কালেই হোক না কোন ঈদের আনন্দ মূলত শিশুদেরই। আর শিশুদের নিয়ে বড়দের আনন্দ যাত্রা।

রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ…। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এক অমর গান এটি। এই গানের সুরে প্রতিটি মুসলিম বাঙালীর হৃদয়ের কোণে জেগে ওঠে ঈদের আনন্দ। এক মাস রোজা থাকার পর শেষ ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে যখন ঈদের নতুন চাঁদ দেখা যায় তখন আনন্দ যেন একসঙ্গে উপচে পড়ে সবার ঘরে ঘরে। আর রেডিও টিভিতে যখন নজরুলের এই গান বেজে ওঠে তখন আকাশ-বাতাস মনে হয় হেসে ওঠে ঈদ আনন্দে।

খুব মনে পড়ে ‘৯১ এর আগের কথা, জন্ম কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। ৫/৬ বছর বয়স পর্যন্ত ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। এরপর গ্রামে চলে যাই, আমার গ্রামের বাড়ী নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলায়। ‘৯১ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চলে আসি স্বপ্নের শহর ঢাকায়। আজো আছি এই শহরে, শুকরিয়া। বুঝ হবার পর থেকেই দেখেছি বাবা দুই ঈদের এক ঈদ করতেন আমাদের সাথে। বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। ছুটি পেতেন ঈদের আগের দিন। এর মাঝে শপিং করতেন আমাদের জন্যে। বেশিরভাগ সময়ে বাবা চাঁদ রাতেই বাড়ি যেতেন, রাতে লুকিয়ে নতুন জামা দেখতাম। কেউ দেখবে বলে নিজের কাছেই রেখে দিতাম।

ঈদের আসল আমেজটা শুরু হতো সবে কদরের রাত থেকেই। ২৬ রমজানে পাতলা হালুয়া (বুটের/সুজির/আটার) আর রুটি বানানো, বাড়ির সবার ঘরে দেয়া। যাদের ঘরে মেয়ে সন্তান নাই, তাদের রুটি করার সমস্যা হতো। আমরা দুই বোন চলে যেতাম তেমনি দুই পরিবারে। উনাদের রুটি বানিয়ে দিতাম। সূর্য ডুবার সময়ে ৪০ বার (লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লাবিল্লহ—-) ইস্তিগফার পড়তাম সমবয়সী সবাই মা চাচী দাদীরা সহ।

মাগরিবের পর গোসল করে গামছা দিয়ে মাথার পানি নিতাম না, জেনে এসেছি যত পানি পড়বে চুল থেকে তত সওয়াব। জানিনা কতটা সত্য কতটা ভুল। গোসল সেরে নফল নামাজ, ইবাদত করতাম। রাত জেগে কেউ কেউ মেহেদী দিতাম। বলতাম সবে কদরের মেহেদী ঈদুল আজহা পর্যন্ত থাকলে অনেক ভালো। এই রাতে মেহেদী দেয়া না হলে চাঁদ রাতেই দিতাম।  ডালা কুলা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে মেহেদি সংগ্রহ করা হতো।

তারপর রাতে শিল-পাটা নিয়ে মেহেদি বাটতে বসত। চারদিকে গোল হয়ে বসতাম আমরা। চলত গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা-গান। মেহেদি প্রস্তুত হলে একটি ছোট কাঠি দিয়ে হাতে মেহেদির নকশা আঁকা হতো বা চুন দিয়ে নকশা একে হাতের তালুতে মেহেদি ছাপ মেরে রাখা হতো। পরে দেখা যেত হাত লাল-সাদা নকশা হয়েছে। রাত জেগে উঠোনেতে বসে হারিকেন জ্বালিয়ে মেহেদী পরা সেই কি আনন্দের দিন। এখন  কিশোরী-তরুণীর হাতে মেহেদি লাগানো সেকাল-একাল দুই কালেই খুব জনপ্রিয়। মেহেদি তাদের হাতে আনন্দ যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। আনন্দ যেন হাতের মুঠোয় থাকে।

তবে আমাদের মতো তাদের মেহেদি তোলা বাটার আয়োজন হয় না। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন রংয়ের মেহেদি রেডিমেড পাওয়া যায়, যা হাতে লাগানোর সহজ উপায় আছে। তখন আমরা যে করে মেহেদি দিতাম কষ্টকর কাজটিই ঈদ আনন্দের প্রধান আকর্ষণে পরিনত হতো।

মেহেদি পরতে পরতে রাতে ঘুমাতাম দেরি করে, কিন্তু সকালে উঠতাম ভোরেই। মা চাচী ব্যস্ত থাকতেন রান্নাঘর নিয়ে, কাজ পাগল আমি উঠেই ঘর গোছানো থেকে শুরু করে ভাইদের রেডি করা নিয়ে মেতে উঠতাম। ঈদের গোসল সেরে নতুন পোশাক পরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে সেমাই খাওয়ার প্রচলনও ছিল নিয়ম করাই। গ্রামে মিঠাই গুড়ের পায়েস ছিল পরিচিত। (গুড় আতপ চাল আর নারকেল দিয়ে করা হতো) বেশির ভাগ ঘরে এমন পায়েস আর বাংলা সেমাই রান্না হতো। এখনকার মতো উন্নতমানের প্যাকেটজাত সেমাইয়ের প্রচলন কম ছিল, তবে খোলা দামী সেমাইকে বলা হতো বিলাতী সেমাই। সবাই এটা করত না। যারা মোটামুটি স্বচ্ছল তারাই করতো। খুব সুস্বাদু ছিল বিলাতী সেমাই। মিষ্টি মুখ করে পুরুষরা যেতো ঈদের নামাজে, ছোটরা যেতো ঈদের মাঠে। বাঁশি খেলনা কিনে ফিরতো বাসায়। বড়রা নামাজ পড়ে আসলেই ঈদ সালামের পর্ব শুরু হতো। আর নতুন নতুন নোট জমা করতাম।

অবশ্য এখন ঈদ মাঠের আনন্দও সীমিত হয়ে গেছে। কেমন জানি মেকি মেকি ভাব স্থান করে নিয়েছে আমাদের আবেগের জায়গাগুলো। শহরে শুক্রবারের জুমার নামাজ আর ঈদের নামাজের মাঝে ব্যবধান খুঁজে পাওয়া যায় না। ঈদের জামাতে কোলাকুলির প্রচলনও উঠে যাচ্ছে। ঈদে আনন্দ দিতে বা ঈদ আনন্দকে চার দেয়ালে বন্দী করতে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোই যথেষ্ট। সপ্তাহব্যাপী চলতে থাকে ঈদ অনুষ্ঠান। কর্ম ব্যস্ত মানুষগুলো ও তা গিলে খাচ্ছে। মধ্যবয়সীরা এই নিয়ে থাকলেও অল্পবয়সীরা কিন্তু এসবে সন্তুষ্ট নয়, নতুন গানের সিডি নতুন সিনেমার সিডি বন্ধু বান্ধব নিয়ে ব্লক বাস্টাডে সিনেমা থ্রিডি দেখায় ব্যস্ত থাকে। ঈদের অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতা যাই থাকুক না কেন, ঈদের আনন্দ থাকে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে, ধর্মীয় অনুভূতিতে। 

পঞ্চাশ দশকের দিকে ঈদের দিন সবার আকর্ষণ ছিল চকবাজারের মেলা। সকালে পাড়া ঘুরে ঘুরে সেলামি সংগ্রহ করা হতো। তখনকার দিনে আট আনাই ছিল সর্বোচ্চ ঈদি। সারা দিন ঘুরে ও কেনাকাটা করে ওই টাকা শেষ হতো না। মেলা থেকে মাটির টোপাটাপি (হাঁড়ি-পাতিল) ও মাটির পুতুল কেনা, বায়োস্কোপ দেখা এবং ডুগডুগি কেনা চলত। সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের খাবারও কেনা হতো বলে জানান অগ্রজেরা। 

ঈদের আগে আমরা নিজেরা বিভিন্ন নকশাকৃত ঈদ কার্ড বানাতাম, তাই বিলি করতাম সমবয়সীদের। কিন্তু এখন তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি ও স্যাটেলাইট টিভির প্রভাবে বর্তমানে ঈদ উদযাপনের পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। বর্তমানে অফিস ও কর্পোরেট জগতে এর প্রচলন থাকলেও ব্যক্তি পর্যায়ে তেমন একটা নেই। গ্রুপ করে একটা খুদেবার্তা পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করে অনেকেই। আর ফেসবুক, ভাইবার, টুইটার, ইমেইল তো আছেই। গ্রামের বাড়িতে ঈদ আনন্দের আরেক বৈশিষ্ট্য ছিল আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়ানো। তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়, নিমন্ত্রণ দেয়া আর নেয়া ঈদের সময় অনেকেই গ্রামে যায়, এই সুযোগে ঈদকে কেন্দ্র করে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এতে করে সবাই অংশ নিতে পারতো।  

কিন্তু যে ঈদের জন্য এত আয়োজন সেই ঈদের দিনে কি আগের দিনের মতো আনন্দ হয়? ঈদের দিনে দল ধরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বেড়ানো যাওয়া কখনও একপ্লেটে কখনও আলাদা খাওয়ার সেই আনন্দ আজও চোখে ভাসে। গ্রামে এসব কিছুটা থাকলেও শহরে এখন নেই বললেই চলে।

সারাদিন অলস সময় কাটানোর পর বিকেলে খুব হলে শিশুদের নিয়ে শিশু পার্ক, এ্যামিউজমেন্ট পার্ক বা আত্মীয়স্বজনদের বাসায় বেড়াতে বের হয় কেউ কেউ। আর যারা নাড়ীর টানে যায় গ্রামে তারা ঠিক আনন্দে মেতে উঠে সবার সাথে সেই ছোট বেলার মতো। ইদানীং শহরের অনেক ক্যালচার দখল করেছে গ্রামকেও, তাই কিছু জায়গায় ঠিক শূন্যতা থেকেই যায়।

ঈদে দেশি ফ্যাশনে একাল সেকাল নিয়ে বিশ্বরং-এর বিপ্লব সাহা বলেন, ফ্যাশনের একটি মুখ্য বিষয় থেকে যায় আর্ট বা শিল্পতে। চারুকলার শিক্ষার্থী হওয়ায় আর্টই আমার ফ্যাশন জগতে ঢোকার অন্যতম হাতিয়ার ছিল। শুধু আমি নই, দেশীয় ফ্যাশন হাউস মালিকদের বেশিরভাগের চিন্তাই আর্ট ও দেশকে ঘিরে। এই দুইকে এক করে ফ্যাশনে প্রয়োগ করাটাও এক ধরনের দক্ষতা।

আমাদের এই দক্ষতা ও সবার প্রচেষ্টাতেই দেশীয় হাউসগুলো এত দূর এসেছে। আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগের কথাই চিন্তা করা যাক। তখন দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো সবে জমজমাট হয়ে উঠছে। ওই সময়টি আসলে আমাদের জন্য এক রকম ফ্যাশন বিপ্লব বলা যায়। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সবাই আমাদের সঙ্গে ছিল। অনেক সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছি। আবার ঠিক তার আগের মুহূর্ত ছিল ভয়ঙ্কর। দেশে কাপড় বা পোশাক বলতে সবই ছিল বিদেশিদের দখলে। তবে ওই বিপ্লবে বড় এক ধরনের পরিবর্তন আসে এবং দেশীয় কাপড়ের প্রভাব অনেক গুণে বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউজ অঞ্জনস এর কর্ণধার শাহীন আহম্মেদ বলেন, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে সবকিছুরই একটা পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ছেলে মেয়ে উভয়েরই পোশাকের ফ্যাশনের কাটিং ও ডিজাইনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।

এখন স্যালোয়ারের লেন্থ ১০ বছর আগের মতো থাকলেও চওড়া, ডিজাইন, কালার, ঢং এ অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখনকার পাজামা বা স্যালোয়ার গুলো চওড়ায় অনেক বড়, পায়ের কাছে আলাদা নকশাসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন এসছে। এখন যেহেতু ইন্টারনেটের যুগ তাই আমরা যারা ফ্যাশন সচেতন তারা খুব সহজেই চলমান বিশ্বের সকল ফ্যাশনের আপডেট মূহুর্তের মধ্যেই পেয়ে যাই। আমাদের ফ্যাশন হাউজ সবসময়ই দেশিয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে পোশাক সর্বরাহ করে থাকে।

বছর ঘুরে ঘুরে ঈদ আসে ঈদ চলে যায়। মুসলমান ধর্মের সবাই অপেক্ষা করে এই আনন্দের জন্যে। সংস্কৃতি ঠিক থাকুক বা না থাকুক সাধ্যমত আনন্দ করতে চায় সবাই। সেকালের স্মৃতি নিয়ে একালের সাথে চলতে পারাই যেন আমাদের কাজ হয়। যে কালের সাথেই হোক ঈদ হোক আনন্দের ঈদ হোক সবার।

লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক। [email protected]

গার্মেন্টসকর্মীদের দুঃখ, যন্ত্রণা আর হাহাকার আর কতকাল চাপা পড়ে থাকবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.