Home ইসলাম ইসলামে হজ্বের তাৎপর্য, ফাযায়েল ও মাসায়েল

ইসলামে হজ্বের তাৎপর্য, ফাযায়েল ও মাসায়েল

।। মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী ।।

হজ্বের তাৎপর্য

হজ্ব ইসলামের পঞ্চভিত্তির অন্যতম। এ হজ্বকে কেন্দ্র করে কা’বা শরীফে এবং আরাফার ময়দানে বিশ্বের মুসলমান একত্রিত হয়। এতে গড়ে উঠে বিশ্ব মুসলিমের মাঝে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালোবাসা। সৃষ্টি হয় এক বেহেশতী পরিবেশ। পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্যে সর্বপ্রথম যে ঘরটি নির্মিত হয়, তা হলো- পবিত্র কা’বা শরীফ। কালের বিবর্তনে এ ঘর একসময় হারিয়ে ফেলে তার স্বকীয়তা। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) সে ঘর পুনরায় নির্মাণ করেন।

এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত ইবরাহীম (আ.)কে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন, “যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দণ্ডায়মানদের জন্যে এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্যে। এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার করো। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।” (সূরা হজ্ব, আয়াত- ২৬-২৭)।

হজ্বের ফাযায়েল

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি জিনিসের ওপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে- (১) এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ তায়ালা ছাড়া আর কোনো মাবূদ নেই। হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ্র রাসূল। (২) নামায কায়েম করা। (৩) যাকাত প্রদান করা। (৪) সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্যে বায়তুল্লাহর হজ্ব করা। (৫) রমযানের রোযা রাখা।’ (বুখারী ও মুসলিম)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে হজ্ব পালন করবে; আর তাতে সে অশ্লীল কোনো কথা বলবে না, কোনো প্রকার গুনাহ করবে না, সে হজ্ব থেকে সেদিনের মতো ফিরবে, যে দিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিলো। অর্থাৎ- সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়ে যাবে।’ (বুখারী ও মুসলিম)।

হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) একটি হাদীসে কুদসী বর্ণনা করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন “আমি যে বান্দার শরীর সুস্থ রেখেছি এবং রিযিক প্রশস্ত করে দিয়েছি আর এ অবস্থায় পাঁচ বছরের ভিতর সে আমার ঘর পরিদর্শন (হজ্ব) করতে আসেনি, সে নিশ্চয় বঞ্চিত হবে।” (বাইহাকী শরীফ)।

হযরত ইবনে মাসঊদ (রাযি.) বলেন, ওমরা ও হজ্ব পর পর আদায় করো। কারণ এতে দারিদ্র ও গুনাহ এমনভাবে মুছে যায়, যেভাবে হাপর লোহা, সোনা ও রূপার ময়লা দূর করে। আর কবুল হজ্বের সাওয়াব জান্নাত ব্যতীত কিছুই নয়। (তিরমিযী, নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ ও ইবনে মাযাহ)।

হজ্বের সংজ্ঞা

হজ্বের আভিধানিক অর্থ হলো, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সংকল্প করা। শরীয়তের পরিভাষায় হজ্ব দ্বারা ওই সমস্ত কাজকে বুঝানো হয়, যা হজ্বের নিয়তে ইহরাম বাঁধার পর বিশেষ বিশেষ জায়গায় সম্পাদন করা হয়। আর তা হলো, ফরয তাওয়াফ এবং আরাফায় অবস্থান, নির্দিষ্ট সময়ে যা আদায় করতে হয়।

হজ্ব আদায় না করার শাস্তি

হযরত আলী (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার যাবতীয় খরচের মালিক অথচ হজ্ব আদায় করেনি, সে ইহুদী হয়ে মারা যাক বা খ্রীস্টান, তাতে কিছু আসে যায় না। আর তা এ কারণে যে, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘মানুষের ওপর বায়তুল্লাহর হজ্ব করা ফরয, যে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার সমর্থ রাখে।’ (তিরমিযী, মিশকাত)।

হযরত আবু উমামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, ‘নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কোনো অনিবার্য প্রয়োজন অথবা অত্যাচারী শাসক বা এমন কোনো কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হয়নি যে- হজ্ব পালন করতে অক্ষম- তারপরও সে হজ্ব আদায় না করেই মারা যায়, তাহলে সে যেমন খুশী মরতে পারে, ইহুদী অবস্থায় মারা যাক কিংবা খ্রীস্টান।’ (দারিমী)।

ওমরার ফযীলত

হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) নবী কারীম (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- “হজ্ব ও ওমরা আদায়কারীগণ হলেন, আল্লাহর মেহমান। তারা যদি আল্লাহর নিকট কোনো দোয়া করে, তিনি তাদের দোয়া কবুল করেন। তারা যদি গুনাহ মাফ চায় আল্লাহ তায়ালা তা মোচন করেন।” (তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ্)।

নবী কারীম (সা.) আরো বলেন, “যে ব্যক্তি ৫০ বার বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করবে, সে গুনাহ থেকে এরূপ পবিত্র হয়ে যাবে যেন তার মা সদ্য তাকে জন্ম দিয়েছে”। (তিরমিযী)।

হজ্বের প্রকারভেদ

হজ্ব তিন প্রকার। যথা- (ক) হজ্বে ইফরাদ। আর তা হলো- প্রথমে শুধু হজ্বের নিয়ত করে ইহরাম বাঁধবে। ওমরাকে হজ্বের সাথে মিলাবে না। এ হজ্ব আদায়কারীকে ‘মুফরিদ’ বলে। (খ) হজ্বে ‘কেরান’। এ হজ্বের সাথে ওমরাও করবে এবং উভয় ইহরাম এক সাথে বাঁধবে। এ প্রকার হজ্ব পালনকারীকে ‘কারেন’ বলা হয়। (গ) ‘হজ্বে তামাত্তু’। এ হজ্বের সাথে ওমরাকে এভাবে একত্রিত করবে যে, মিকাত থেকে শুধু ওমরার ইহরাম বাঁধবে। এ ইহরামে হজ্বকে শরীক করবে না। তারপর মক্কায় পৌঁছে শাওয়াল অথবা যিলহজ্ব মাসের কোনো তারিখে ওমরার কার্যাদি সম্পাদন করে মাথার চুল ছেঁটে অথবা মুন্ডিয়ে ইহরাম খুলবে। আর ৮ই যিলহজ্ব মক্কা থেকে হজ্বের ইহরাম বেঁধে যথারীতি হজ্বব্রত আদায় করবে। এটা হলো, হজ্বে তামাত্তু। তামাত্তু সম্পাদনকারীকে ‘মুতামাত্তি’ বলা হয়।

হজ্ব কার ওপর ফরয

প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ-সবল ও বায়তুল্লাহ পর্যন্ত যাতায়াতের খরচ বহন এবং পরিবার-পরিজনের নিত্য খরচাদির সুব্যবস্থা করতে সক্ষম ব্যক্তির ওপর হজ্ব করা ইসলামে ফরয। তবে খরচাদি ঋণমুক্ত ও হালাল উপার্জন হতে হবে। তাই ঋণী ব্যক্তির ওপর হজ্ব করা ফরয নয়। আবার এ ধরনের রোগী যারা সফর করতে পারে না, যেমন- অন্ধ ও পঙ্গু এদের ওপরও হজ্ব করা ফরয নয়।

যে ব্যক্তি ধনী নয় আবার বায়তুল্লায় পৌঁছতে সক্ষমও নয়; কিন্তু কোনো কারণে মক্কা শরীফে পৌঁছে হজ্বের দিনগুলোতেই সেখানে অবস্থান করে এবং হজ্ব আদায় করতে তার কোনো বাঁধাও না থাকে, তার উপরও হজ্ব ফরয। এ অবস্থায় হজ্ব করলে তার হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি কর্জ করে মক্কা শরীফ পৌঁছে যায় এবং হজ্ব আদায় করে নেয়, তার ফরযও আদায় হয়ে যাবে।

হজ্বের মাসায়েল

মাসআলা: হজ্বের পথখরচ থেকে ব্যয়ের বিষয়টি মধ্যম পর্যায়ের হওয়া উদ্দেশ্য, যাতে অপব্যয় ও কৃপণতা কোনোটাই থাকবে না। (হিদায়া-১/২৩১)।

মাসআলা: যদি কেউ অন্য কোনো ব্যক্তিকে হজ্ব করার জন্যে যাবতীয় খরচ প্রদান করে, এক্ষেত্রে এ ব্যক্তির ওপর তা গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়। ব্যয়বহনকারী তার আত্মীয়-স্বজন থেকে হোক, যেমন- মা-বাবা, ছেলে-সন্তান অথবা অপরিচিত ব্যক্তিদের থেকে। তবে হ্যাঁ! সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হজ্ব করার জন্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ খরচ প্রদান করা হলে, যদি সে তা গ্রহণ করে এবং ঋণীও না হয়, তাহলে তার ওপর হজ্ব করা ফরয। (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৭)।

মাসআলা: যদি কারো নিকট প্রয়োজনাতিরিক্ত ঘর বা অন্য কোনো আসবাব কিংবা কিতাব অথবা এমন জায়গা-জমি ও বাগান থাকে, যার উৎপাদনের মুখাপেক্ষী হতে হয় না। উল্লিখিত জিনিসসমূহের মূল্য নেসাব পরিমাণ হলে, তা বিক্রি করে হজ্ব করা ওয়াজিব।  (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৭)।

মাসআলা: যদি কারো নিকট বসবাসের জন্যে অতিরিক্ত ঘর থাকে এবং তা বিক্রি করে হজ্ব করা সম্ভব। হজ্ব করার জন্যে তা বিক্রি করা ওয়াজিব নয়, তবে বিক্রি করে হজ্ব করা ভালো; কিন্তু বিক্রি করে ফেললে যদি হজ্বের খরচ পরিমাণ হয়, হজ্ব করা ফরয হবে।  (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৭)।

মাসআলা: যদি কারো নিকট সারা বছরের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুদ থাকে, বিক্রি করে হজ্ব করা ওয়াজিব নয়। তবে যদি এক বছরের অতিরিক্ত খাদ্যশস্য মজুদ থাকে, যার মূল্য নেসাব পরিমাণ হয়, তা বিক্রি করে হজ্ব করা ওয়াজিব। (তাতারখানিয়া- ৩/৪৭২)।

মাসআলা: যদি কারো নিকট জীবিকা নির্বাহের অতিরিক্ত জমি থাকে, যার মূল্য নেসাব পরিমাণ হয়, তা বিক্রি করে হজ্ব করা ফরয। আর যদি বিক্রির কারণে জীবিকা নির্বাহ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিক্রি করে হজ্ব করা ফরয নয়। (তাতারখানিয়া- ৩/৪৭২)।

মাসআলা: যদি কারো নিকট হজ্বের জন্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ সম্পদ থাকে, পাশাপাশি তার ঘর নির্মাণেরও প্রয়োজন হয় এবং সময়টা হজ্বের মৌসুম হয়, তাহলে উক্ত মাল দিয়ে হজ্ব করা ফরয। আর হজ্বের মৌসুম না হলে, সে সম্পদ ঘর নির্মাণের কাজে ব্যয় করা বৈধ। (তাতারখানিয়া- ৩/৪৭৩)।

মাসআলা: সরকারী ট্যাক্স, হজ্ব মুআল্লিমদের বেতন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ হাজীদের পথ খরচের অন্তর্ভুক্ত। (রদ্দুল মুহতার- ৩/৪৬৩)।

মাসআলা: মদীনা মুনাওয়ারায় সফর করার খরচাদি অনেকেই হাজীদের পথ খরচের অন্তর্ভুক্ত মনে করে, তা না থাকায় হজ্বে যায় না। এটা নিতান্তই ভুল। মদীনা মুনাওয়ারায় যাওয়ার টাকা না থাকার কারণে হজ্বে বিলম্ব করার প্রয়োজন নেই। (দুররে মুখতার- ২/৩৫২)।

মাসআলা: হারাম সম্পদ দিয়ে হজ্ব করা অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি তা দিয়ে হজ্ব আদায় করে ফেলে, হজ্ব কবুল হবে না; কিন্তু তার যিম্মা থেকে হজ্বের ফরয রহিত হয়ে যাবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক- ৫/২০)।

মাসআলা: হজ্ব ফরয হওয়ার জন্যে আরেকটি শর্ত হলো, হজ্বের মাস হওয়া। অর্থাৎ- শাওয়াল, যিলক্বদ ও দশই যিলহজ্ব। (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৯)।

মাসআলা: হজ্বের মৌসুম আসার আগে তার সকল শর্ত পাওয়া গেলেও হজ্ব ফরয হয় না। সুতরাং হজ্বের সময় আসার পূর্বে যদি কেউ উক্ত টাকা-পয়সা কোনো কাজে ব্যয় করে ফেলে, তাহলে তার যিম্মায় হজ্ব করা ফরয হবে না। তবে হজ্ব করা অপ্রয়োজনীয় মনে করে তা অন্য কাজে ব্যয় করা মাকরূহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৯)।

মাসআলা: হজ্ব ফরয হওয়ার জন্যে আরেকটি শর্ত হলো- হজ্বের মৌসুমে মক্কা মুকাররমায় পৌঁছতে সক্ষম হওয়া।

মাসআলা: ফরয নামাযের নির্ধারিত সময়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া হজ্বের সময়ের অন্তর্ভুক্ত। তাই হজ্ব সফরে হজ্বকারীর উপর  নির্দিষ্ট সময়ে ফরয নামায আদায় করাই কর্তব্য। (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৯)।

মাসআলা: কোনো ব্যক্তি যিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখে মক্কা মুকাররমায় এমন সময় পৌঁছল, যথা সময়ে ইশার নামায আদায় করলে আরাফার ময়দানে পৌঁছতে পারবে না। এ ব্যক্তির জন্যে এ ওয়াক্তের নামায ক্বাযা করা জায়েয।

হজ্ব আদায় ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহঃ হজ্ব আদায় ওয়াজিব হওয়ার শর্ত ৫টি। (ক) সুস্থ থাকা। (খ) গ্রেফতারী পরওয়ানা কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বাঁধা না থাকা। (গ) রাস্তা নিরাপদ থাকা। উল্লিখিত শর্ত তিনটি পুরুষ-মহিলা সকলের জন্যে প্রযোজ্য।

তবে মহিলাদের জন্যে অতিরিক্ত শর্ত হলো- (ঘ) মাহরাম থাকা (ঙ) ইদ্দত অবস্থায় না হওয়া।

মাসআলা: হজ্ব আদায় এবং ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ যার মাঝে পাওয়া যাবে, তার ওপর হজ্ব করা ফরয। আর যদি শুধু হজ্ব ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ পাওয়া যায়, আদায়ের কোনো শর্ত না পাওয়া যায়, তাহলে ওই ব্যক্তির ওপর হজ্ব করা ওয়াজিব হবে না; বরং বদলী হজ্ব করানো অথবা অসিয়ত করা ওয়াজিব হবে। (রদ্দুল মুহতার- ৩/৪৫৬)।

মাসআলা: যদি কোনো ব্যক্তি অন্ধ, প্যারালাইসিস কিংবা ল্যাংড়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সফর করতে না পারে এবং হজ্বের অন্যান্য শর্তও তার ওপর আরোপিত হয়, তাহলে এ ব্যক্তির ওপর হজ্ব করা ফরয হবে কিনা এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে উভয় প্রকার অভিমতই পাওয়া যায়। হজ্ব ফরয হওয়ার মতটিকে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম গ্রহণ করে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন। তবে এ ব্যক্তি যদি হজ্ব করতে অপারাগ হয়, তাহলে তার ওপর বদলী হজ্ব করানো বা হজ্বের অসিয়ত করা ওয়াজিব। আর যারা বলেছেন- এমন ব্যক্তির ওপর হজ্ব করা ওয়াজিব নয়, তাদের নিকট সে ব্যক্তির জন্যে বদলী হজ্ব করানো অথবা অসিয়ত করা কোনোটাই ওয়াজিব না।

জরুরী জ্ঞাতব্যঃ এ মতানৈক্য অপারগ হওয়ার কারণে হজ¦ আদায়ে অক্ষম ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হ্যাঁ! যদি কারো ওপর সুস্থ অবস্থায় হজ্ব ফরয হয়, এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে হজ্ব আদায়ে অপারগ হয়ে যায়, তাহলে সকল উলামায়ে কিরামের মতে তার জন্যে হজ্ব করা ওয়াজিব। নিজে আদায়ে সক্ষম না হলে বদলী হজ্ব করানো অথবা হজ্বের অসিয়ত করা তার জন্যে ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৮)।

মাসআলা: কোনো ব্যক্তি গ্রেফতার হলে বা বাদশাহ তাকে হজ্ব করা থেকে নিষেধ করলে তার ওপর নিজে হজ্ব করা ওয়াজিব হবে না; বরং বদলী হজ্ব করানো কিংবা অসিয়ত করা তার ওপর ওয়াজিব। (হিন্দিয়্যাহ- ১/২১৮)।

মাসআলা: কোনো ব্যক্তি অন্যের পাওনা আদায়ে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তা আদায় না করার কারণে গ্রেফতার হলে এবং তার ওপর হজ্বও ফরয হলে, এ গ্রেফতারী হজ্ব আদায় না করার জন্যে ওযর বলে বিবেচিত হবে না; বরং তার ওপর হজ্ব করা ওয়াজিব হবে। (রদ্দুল মুহতার- ৩/৪৫৬)।

মাসআলা: মহিলাদের হজ্ব করার জন্যে তাদের সাথে কোনো ধার্মিক মাহরাম অথবা স্বামী থাকা শর্ত। যদি কোনো মাহরাম না থাকে অথবা মাহরাম আছে; কিন্তু সাথে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত নয় এবং স্বামীও যেতে ইচ্ছুক না হয়, এ মহিলার জন্যে হজ্বে যাওয়া ওয়াজিব হবে না। তবে হজ্ব করার সুযোগ না হলে, তার ওপর হজ্ব করানোর অসিয়ত করা ওয়াজিব হবে। (ইলাউস সুনান- ৫/১২)।

মাসআলা: হজ্বের সফরে মাহরাম বলে ঐ সমস্ত পুরুষকে বুঝানো হয়, যাদের সাথে বিবাহ-শাদী কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। চাই বংশীয় কারণে হোক অথবা দুধ পান করার কারণে। যেমন- দুধ শরীক ভাই। অথবা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে। যেমন- শশুর, স্বামী। কিন্তু বর্তমানে ফিতনা ফাসাদের কারণে বৈবাহিক সম্পর্কের আত্মীয় এবং দুধ সম্পর্কের আত্মীয় থেকেও সতর্ক থাকা জরুরী। (বাদায়ে সানায়ে- ২/৩০০)।

মাসআলা: স্বামী ও মাহরাম- প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং ধার্মিক হওয়া শর্ত। (বাদায়ে সানায়ে- ২/৩০০)।

মাসআলা: যে মেয়ে বালেগ তথা প্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার নিকটবর্তী সে বালেগের মতোই। সুতরাং মাহরাম ছাড়া তার হজ্বে গমন বৈধ হবে না। (দুররে মুখতার- ৩/৪৬৪)।

মাসআলা: বিধবা মহিলার কোনো মাহরাম না থাকলে হজ্ব করার জন্যে তার বিবাহ বন্ধনে আবাদ্ধ হওয়া ওয়াজিব নয়।

মাসআলা: মাহরাম বা স্বামী ছাড়া কোনো মহিলা হজ্ব পালন করলে তার হজ্ব হয়ে যাবে, তবে সে গুনাহগার হবে।

মাসআলা: বৃদ্ধা ও বালেগ হওয়ার নিকটবর্তী মহিলার সাথেও মাহরাম থাকা শর্ত।

মাসআলা: হিজড়া মহিলাদের সাথেও মাহরাম থাকা শর্ত। ফিতনা ও কামভাবের আশঙ্কা করা যায় না এমন মাহরামের সাথে মহিলাদের হজ্ব সফরে যাওয়া জায়েয। কোনো কারণে কামভাব এসে যায় এমন মাহরমের সাথে যাওয়া জায়েয হবে না।

মাসআলা: কোনো মহিলার উপর হজ্ব করা ফরয আবার তার মাহরামও যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত, এ সময় তার স্বামী তাকে ফরয হজ্ব থেকে বাঁধা দিতে পারবে না। তবে মাহরাম না থাকলে বা নফল হজ্ব হলে বাঁধা দিতে পারবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা-৮/৫৩২)।

মাসআলা: কোনো মহিলা হজ্ব করার মান্নত করলে তার এ মান্নত সহীহ হবে। তবে স্বামীর অনুমতি ছাড়া হজ্বে যেতে পারবে না। যদি তার জীবদ্দশায় হজ্ব করার সুযোগ না হয়, তাহলে ইন্তেকালের সময় হজ্ব করানোর জন্যে অসিয়ত করে যাবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা-৮/৫৩৮)।

মাসআলা: কোনো মহিলা হজ্বের মৌসুম আসার পূর্বে অথবা নিজ এলাকার হাজীদের হজ্বে যাওয়ার সময় আসার পূর্বে হজ্বে যেতে চাইলে তার স্বামী তাকে হজ্বে যাওয়া থেকে বাঁধা দিতে পারবে। তবে সে দুই-এক দিন পূর্বে যেতে চাইলে বাঁধা দিতে পারবে না।

মাসআলা: মাহরাম ছাড়া মহিলাকে অন্য মহিলাদের সাথে হজ্বে পাঠানো জায়েয নেই। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা-১/৬৩৮)।

মাসআলা: মহিলাদের ইদ্দতের সময় হজ্বে যাওয়া বৈধ হবে না। এটা তালাকের ইদ্দত হোক অথবা স্বামীর মৃত্যুর। তবে এ অবস্থায় হজ্ব করে ফেললে তার হজ্ব হয়ে যাবে, তবে সে গুনাহগার হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা-৮/৫০৪)।

মাসআলা: হজ্বের সফরে স্বামী স্ত্রীকে তালাকে রজয়ী দিলে স্ত্রী স্বামীর সাথে থাকবে। সে স্বামীর সামনে থাকুক অথবা পিছনে। এ ক্ষেত্রে স্বামীর স্ত্রী থেকে পৃথক না হওয়া উচিত। তবে উত্তম হলো, তালাক প্রত্যাহার করে নেয়া। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা-৩/৭৫)।

লেখকঃ ফাযেলে- দারুল উলূম দেওবন্দ (দাওরা ও ইফতা), মুফতী ও মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা, ঢাকা এবং উপদেষ্টা সম্পাদক- উম্মাহ ২৪ডটকম।

মহান আল্লাহর কুদরত ও মহিমা

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.