Home ইতিহাস ও জীবনী বিশ্বনবী (সা.)এর মহান জীবনাদর্শ

বিশ্বনবী (সা.)এর মহান জীবনাদর্শ

।। হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসান ।।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূত-পবিত্র জীবনাদর্শকে সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলা হয়। এ বিষয়ে ইতিহাস পর্যালোচনায় দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত যত ধর্ম প্রবর্তক, ধর্ম প্রচারক, রাষ্ট্রনায়ক ও সমাজ সংস্কারকের আবির্ভাব হয়েছে, তাঁদের মধ্যে পরিপূর্ণ ও নিখুঁত চরিত্র এবং মহান আদর্শ হিসেবে আল্লাহর আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই শ্রেষ্ঠতম। কেননা, এ বিশ্বের মানুষ সর্বযুগে এবং সর্বকালে গভীরভাবে অনুধাবন করে আসছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শই একমাত্র মানব জীবনের প্রতি স্তরে, প্রতি মুহূর্তে মানবতার কল্যাণ ও বিকাশ সাধনে উন্নত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং অনুপম-অমর জীবনাদর্শ।

কর্মমুখর পৃথিবীতে এর বাস্তব নমুনা এই যে, বস্তুজগতের সূর্য রশ্মির আলোকে যেমন মানব জাতির কেউ শীত নিবারণের নিমিত্ত রোদ পোহাচ্ছে, কেউ গ্রন্থ রচনা করছে, কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদান বা শিক্ষাগ্রহণ করছে, কেউ শিল্প-কলা শিখছে, আবার অনেকে কল-কারখানা, যমী চাষাবাদ, ধান নিড়ানো, কাপড় শুকানো, রোগ নিরাময়ের উপকরণ আবিস্কার, খেলাধুলাসহ যাবতীয় ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ক্রিয়াকর্মে লিপ্ত রয়েছে।

একইভাবে আল্লাহর নবী রাহমাতুল্লিল আলামীনও সমগ্র বিশ্ব জাহানের জন্য মধ্যাহ্ন সূর্য রশ্মির মতই সর্বস্তরের মানুষের নিমিত্তে পরিপূর্ণ আদর্শ ও পূর্ণাঙ্গ অনুসরণীয়। কেননা, মানব সমাজের সকল স্তরে ও সর্বমহলে সর্বোৎকৃষ্ট নিয়ম-পদ্ধতি মোতাবেক উন্নতি ও মঙ্গল পথে যার যেরূপ প্রয়োজন সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে তা-ই পাচ্ছে এবং এ দুনিয়ার লয়-ক্ষয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নিখিল বিশ্বের সকল মানুষকে তাঁর অনুপম আদর্শ অনুসরণ করতেই হবে।

পক্ষান্তরে বাঁদুর, চামচিকা ও হিংস্র পশুর দল যেমন এই সূর্য রশ্মিকে তাদের মন-চাহি কাজকর্ম ও চলার পথে অন্তরায় এবং শত্রু মনে করছে, তেমনিভাবে আল্লাহর নবী রাহ্মাতুল্লিল আলামীনকে পূত-পবিত্র আদর্শবান হওয়া সত্ত্বেও শয়তানী কর্মকাণ্ডের মোহে সহ্য করতে না পেরে হিংস্র নরপশুর দল তাদের পাশবিক ক্রিয়াচক্রের পথে বাঁধা মনে করছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান আদর্শ তথা মানব জীবনের সার্বিক উন্নতির উৎস এহেন দীপ্তিমান আলোকে বরদাশ্ত করতে না পেরে ছলে-বলে, কলে-কৌশলে এর বিরোধিতা করছে। অথচ এসব বল্গাহীন পাশবিক কর্মকাণ্ডের হোতারা বিশ্বের বাস্তব ও প্রকৃত ইতিহাস কি কোনদিন তা জানারও চেষ্টা করে না।

বস্তুতঃ মানুষের মধ্যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও যাঁরা প্রকৃত জ্ঞানী তাঁরা প্রকৃত ইতিহাসের আলোকে সম্যক উপলব্ধি করতঃ এই চির সত্যে একমত যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ শিক্ষাতেই রয়েছে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর তাওহীদ (একত্ববাদ), ইসলামের সাম্যবাদ, প্রকৃত গণতন্ত্র, দাসমুক্তি, নারী অধিকার, মানবিক সমতা, বিশ্ব মানবতা, দয়া-দরদ এবং ইনসাফ ও সুবিচার।

এরই বাস্তব প্রমাণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় জীবনের প্রথমেই বিশ বছর বয়সে সমাজ সংস্কার আন্দোলনে মনোনিবেশক্রমে তৎকালীন আরবের কতিপয় উৎসাহী যুবক ‘হিল্ফুল ফুযুল’ নামে এক সেবা সংঘ গঠন করেন। যার উদ্দেশ্যাবলী ছিল নিম্নরূপ-

(১) আমরা নিঃস্ব, দুর্বল অসহায় ও দুর্গতদের সেবা করবো।
(২) অত্যাচারীকে যথোচিত প্রতিকার কল্পে প্রাণপণে বাধা দিবো।
(৩) মজলুম ও অত্যাচারিতকে সাহায্য-সহযোগিতা করবো।
(৪) দেশের শান্তি ও শৃংখলা রক্ষা করবো।
(৫) সমাজে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সদ্ভাব ও সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবো।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এই সেবা সংঘের সর্বাঙ্গীন উন্নতির লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টায় রত থেকে কোথায় কার প্রতি যুলুম-অত্যাচার করা হচ্ছে, কোথায় কে ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পাচ্ছে, কোথায় কোন অসহায় দুঃস্থ-পীড়িত বা রুগ্ন ব্যক্তি আর্তনাদ করছে, কোথায় কোন্ এতিম, বিধবা, নিরাশ্রয় নারী অসহায়-নিরুপায় হালে দিশেহারা হচ্ছে, অনুসন্ধান করে তাদের যথার্থ সেবার ব্যবস্থা করতেন।

এমন কি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো এতিম শিশুকে কোলে নিয়ে আদর-যত্ন করতেন, কখনো রোগীর শয্যাপাশে উপবিষ্ট হয়ে পরিচর্যা করতেন এবং অহরহই মানব সমাজের সর্বপ্রকার কল্যাণজনক কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করতঃ সমাজ সংস্কারে ব্রতী থাকতেন। তদুপরি সমাজের সর্বস্তরের সকল মানুষের সাথে অমায়িক ব্যবহার, বিশেষতঃ সততা-সত্যবাদিতা ও আমানত সংরক্ষণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অদ্বিতীয় ও বেনজীর ছিলেন।

নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে যৌবনকালেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সদাচারিতা-সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা প্রভৃতি অতুলনীয় গুণাবলীতে বিমুগ্ধ হয়ে গোটা আরব জাহান তাঁকে “আল্ আমীন” উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর কথায় ও কাজে এরূপ অপূর্ব সঙ্গতি ও মিল ছিল যে, যে সত্যের প্রতিষ্ঠাকল্পে আলোচনা করতেন ও মনোভাব ব্যক্ত করতেন, তা অবশ্যই বাস্তবে-কার্যে পরিণত করতেন। অযথা কিছু বলা এবং অনর্থক সময় নষ্ট করা তাঁর অভ্যাস ছিল না, বরং সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও মানব জাতির কল্যাণ চিন্তাই ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক ধ্যান-ধারণা।

খৃস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগে পবিত্র মক্কা নগরীর রাজপথে বিচরণ কালেও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নেহায়েত শান্ত ও গভীর চিন্তায় মগ্ন অবস্থায় বিচরণ করতে দেখা গেলেও এরূপ নিুমুখী হয়ে চলতেন, যেন তিনি বিশ্ব স্রষ্টার ধ্যানেই নিরন্তর তন্ময় ও ভাবুক। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই অবস্থা দৃষ্টে মনে হতো, তিনি যেন অজানা কোন দিক-নির্দেশনা সূচিত আলোকময় রাজ্যের বাদশাহের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ব্যাকুল ও উদগ্রীব।

বস্তুতঃ এই ধ্যান-চিন্তা নিমগ্নতার মধ্যে হযরতের উদ্দেশ্য ছিল মরা-বাঁচা বা জন্ম-মৃত্যুর মধ্যে এই নশ্বর জগতের মানুষগুলোকে সঠিক মানুষ রূপে গড়ে তোলার প্রকৃত উপায় কি? এবং এর জন্য বিশ্ব স্রষ্টাকে জেনে তাঁর ওয়াহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত বাস্তব নির্দেশবাণী কি- এরই অনুসন্ধানের নিমিত্তে তিনি অপেক্ষা করেছেন।

মহান আল্লাহর অপার করুণা বলে দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর তিনি অপেক্ষমান সত্যের সন্ধান তথা নবুওয়্যাত ও রিসালাত প্রাপ্তির বদৌলতে আসমানী বাণীর মাধ্যমে মানব সমাজের আহুত সকল সমস্যার সঠিক ও সুষ্ঠু সমাধান এবং প্রকৃত উন্নতি তথা বিশ্ব মানবতার কল্যাণ ও পরিপূর্ণ উৎকর্ষ সাধনের চিরন্তন ও স্থায়ী সংবিধান মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন প্রাপ্ত হন। আর এই মহান উদ্দেশ্য সাধন কল্পে ওয়াহী প্রাপ্ত হন-

(১) নিশ্চয়ই এই কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশবাণী। (সূরা আন্আম)।

(২) (তিনিই আল্লাহ্) যিনি সারা দুনিয়ার বরকতের উৎস সমগ্র জাহানের মানুষের সতর্কীকরণ উদ্দেশ্যে তাঁর বান্দার (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) প্রতি সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কিতাব (পবিত্র কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন। (সূরা ফুরক্বান)।

(৩) (জেনে রাখুন) হে নবী! প্রত্যেক জাতির জন্য যেরূপ পথ-প্রদর্শক ছিলেন, (তদ্রুপ) আপনিও পথ-প্রদর্শক হিসেবে মানুষের জন্য সতর্ককারী। (সূরা রাআদ)।

(৪) আপনি বলুন, হে দুনিয়ার মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল (পয়গাম্বর)। (সূরা আন্আম)।

(৫) হে নবী! আমি আপনাকে বিশ্ব মানবের প্রতি (সৎকর্মের পুরস্কার প্রাপ্তির) সুসংবাদ দাতা এবং (পাপকর্মের ভয়াবহতা থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে) সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। (সূরা সাবা)।

(৬) হে নবী! আপনি বলুন, (আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি) আমি তো একজন সতর্ককারী। (সূরা সোয়াদ)।

(৭) হে নবী! আমি (আল্লাহ্) আপনাকে সত্যসহ সুসংবাদ দাতা এবং (পাপ থেকে বেঁচে থাকার জন্য) ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি। (সূরা বাক্বারা)।

(৮) হে নবী! নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ্) আপনাকে সত্যসহ শুভ সংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি। (সূরা ফাতির)।

(৯) হে নবী! আপনি বলে দিন, তোমরা (সত্য বুঝে) আল্লাহর দিকে ধাবিত হও, আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহ প্রেরিত স্পষ্ট সতর্ককারী। (সূরা যারিয়াত)।

(১০) হে নবী! আপনি উপদেশ দিতে থাকুন। কেননা, নিশ্চয়ই উপদেশ মু’মিন (বিশ্বাসী)দের উপকারে আসবে। (সূরা যারিয়াত)।

(১১) হে নবী! (বিশ্ব মানবের কল্যাণ, উন্নতি, নিখুঁত চরিত্র এবং আদর্শবান হওয়ার লক্ষ্যে) আপনি তো মানুষকে সৎপথ প্রাপ্তির জন্য হিদায়াত ও উপদেশ প্রদান করবেন। (সূরা শূরা)।

(১২) তবে এক্ষেত্রেও মালিকানা হিসেবে মানুষকে কিসে তাদের ইহ-পারলৌকিক পরিপূর্ণ কল্যাণ ও উন্নতি- তা বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আপনার উপর নয়, বরং আল্লাহ্ যাকে চান আপন করুণা বলে তাকে বুঝিয়ে দেবেন। (সূরা বাক্বারা)।

বিশ্ব মানবের কল্যাণ-উন্নতি এবং শান্তি ও নিরাপত্তার উদ্দেশ্য সাধনেই বিশ্ব নিয়ন্তা আল্লাহ্ তাআলা মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্ণ আদর্শের উৎস এবং আঁকর হিসেবে পয়দা করতঃ এক দিকে যেমন গোটা মানব জাতিকে ফেরেশ্তার চাইতেও অধিক মর্যাদার ভূষণে অলংকৃত করেছেন।

তেমনি অপর দিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারাই আল্লাহ্ তাআলা তাঁর পূর্ববর্তীদের আগমনের উদ্দেশ্যকে সার্থক ও পরিপূর্ণ করেছেন, আর এটাই মহান আল্লাহর অলংঘনীয় বাস্তব বিধান। যার মূল রহস্য হল, সকল নবী-রাসূল এবং বিশ্বের সকল ধর্মপ্রবর্তক ও ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে সার্থক ও সফল হিসেবে মানব জাতির উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধনের কাজ পরিপূর্ণভাবে সম্পাদিত রূপে দেখার গৌরব কেবলমাত্র হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংরক্ষিত ছিল। তাই তাঁর নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পূর্বের ও পরের যিন্দেগীর পূত-পবিত্র আদর্শ ও চরিত্র সর্বযুগে, সকল দেশের ও সকল মানুষের জন্যই একান্ত নির্দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য, সুবিস্তৃত ও সুমহান।

দুনিয়ার ইতিহাস কর্তৃক প্রমাণিত যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন ধারা ছিল বিশ্বের সকল মানুষের জন্য অনুকরণীয় এবং অনুপম ও নিষ্কলুষ চরিত্রে ছিল সততা-সত্যবাদিতা, অমায়িক ব্যবহার-সদাচার, সংযত আচরণ-সুমধুর বচন, সৌজন্য-ভালবাসা, মানুষের প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধ, সকল কাজে নিয়মানুবর্তিতা, অটল বিশ্বস্ততা, শ্রমে সহিষ্ণুতা, ব্যবহারে উদারতা, উপার্জন-দান ও বিতরণ, দোষীকে ক্ষমা ও সহাস্যবদনে মুক্তিদান। দেশী-বিদেশী, কালো-সাদা, ধনী-দরিদ্র, পর-আপন, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকলের জন্যই ছিল তাঁর মধ্যে দয়া-দরদ, ত্যাগ-তিতীক্ষা।

সেবা-পরোপকার, ধৈর্য-ক্ষমা, উদারতা-সহিষ্ণুতা, সৎসাহস-নির্ভীকতা, বীরত্ব-মহত্ব, সংযম-আত্মবিশ্বাস, সৃষ্টির প্রতি স্নেহ-মমতা, স্রষ্টার প্রেম ও ভক্তি এবং তাঁরই নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ তাঁকে মহান আদর্শের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছিয়েছে চির অমর করে। পরন্তু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে পূর্ণ মানবতার বাস্তব রূপ লাভ করেছিল তাঁর স্বাদেশিকতা, জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা, সহাবস্থান নীতি, ভিন্ন ধর্মের লোকদের ধর্ম-কর্ম পালনে সহিষ্ণুতা এবং বিশ্বমানবতা প্রভৃতি তাঁর মধ্যে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্টভাবে সমুজ্জ্বল ও উদীয়মান ছিল। তাই একান্ত দ্বিধাহীন চিত্তে বলা চলে যে, তাঁর মত সর্বগুণ সমন্বিত অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মহামানব বিশ্বজগতে আর নেই।

অতএব ইতিহাসের আলোকে একথাই বলা যায় যে, নিখিল সৃষ্টির সমস্ত গুণ ও সৌন্দর্য একমাত্র তাঁর মধ্যেই প্রতিবিম্বিতরূপে বিদ্যমান ছিল। যে কারণে তাঁর জীবনীর পরিসর এতই ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, ধুলার ধরণী হতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর আরশ পর্যন্ত সর্বত্র ছিল তাঁর কর্মস্থল। যদ্দরুন এক দিকে যেমন তিনি এক মহান সর্বজনপ্রিয় সম্রাট হয়ে রাজ্য পরিচালনা করেছেন, তেমনিভাবে তিনি রাখাল বেশে মাঠে মেষ-বকরী চরিয়েছেন।

একদিকে যেমন তিনি অসাধারণ আইনজ্ঞ হিসেবে খোদা প্রদত্ত আসমানী বাণীর সাহায্যে সুষ্ঠু ও সময়োপযোগী আইন-কানুন রচনা দ্বারা ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা এবং হক-বাতিলের পার্থক্য ও পরিচয়-ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশ্ব মানবের শান্তি ও শৃংখলা আনয়ন করেছেন, অন্যদিকে তেমনিভাবে তিনি বিচারাসনে অধিষ্ঠিত অবস্থায় দেশ ও সমাজের ছোট-বড় সকল বিষয়াদির যথোচিত হক ফায়সালা দিয়েছেন। ফলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দূরদর্শী উদ্যোগের দ্বারা তিনি পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সকল সমস্যার সুষ্ঠু ও অপূর্ব সমাধান দিয়েছেন এবং বিশ্বের সকল বিচারপতিদের জন্য অমূল্য আদর্শ রেখে গেছেন।

বস্তুতঃ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ এরূপ বৈচিত্রময় ছিল যে, একদিকে জিহাদের ময়দানে তিনি শ্রমিকের মত মাটি কেটেছেন, অপরদিকে সেনাপতি ও সেনা নায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। একদিকে তিনি আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়ে তাঁর ইবাদত-বন্দেগীতে তন্ময় রয়েছেন, অপরদিকে খোদায়ী বার্তাবাহক হিসেবে ই’লায়ে কালিমাতুল্লাহ্র দায়িত্ব পালন মানসে ইসলামের প্রচার-প্রসার কল্পে দ্বীনের তাবলীগ কার্যে আত্মনিয়োগ করেছেন।

পথভুলা মানব জাতির মধ্যে তাওহীদ ও রিসালতের অমিয় সুধা বিলিয়ে দিয়েছেন। একদিকে বিবাহ-শাদীর মাধ্যমে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও পাড়া-প্রতিবেশীর প্রতি স্বীয় দয়া-মায়া বিজড়িত কর্তব্য পালনে ব্রতী রয়েছেন। অপরদিকে আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে নিবিষ্টচিত্তে গিরি-গুহায় কঠোর সাধনায় নিমগ্ন রয়েছেন। একদিকে হিজরত করে উপযুক্ত ক্ষেত্র নির্ণয়ে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেছেন, অপরদিকে ইসলাম বিরোধী অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে জিহাদ করে আত্মরক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন।

একদিকে মহান সেনাপতির দায়িত্ব পালনে বীরের মত জিহাদ করে শত্রুকে পরাস্ত ও পর্যুদস্ত করেছেন, অপরদিকে পরম শত্রুকেও ক্ষমা করতঃ আপন বক্ষে স্থান দিয়েছেন। একদিকে একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের আসনে সমাসীনরূপে সত্যদ্রোহীদের গুপ্ত ষড়যšের খবর রেখেছেন এবং খেজুর পাতার পর্ণকুটীরে বসে শত শত মাইল দূরবর্তী শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করেছেন। অপরদিকে কারো সাথে সন্ধি করেছেন আবার কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছেন। একদিকে সমাজের ও পরিবারবর্গের নিত্য প্রয়োজন মিটানোর উদ্দেশ্যে তাদের খোঁজ-খবর রেখেছেন, অপরদিকে অসীম রহস্যালোকে প্রবেশ করতঃ আল্লাহ্ তাআলার সাথে আসমানী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কথা বলেছেন এবং মা’রিফাতে ইলাহীর পরিচয় দ্বার উদঘাটন করেছেন।

ফলকথা, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিকে যেমন আল্লাহ্ তাআলার অনন্ত-অসীম ও অফুরন্ত জ্ঞান সমুদ্রে ডুব দিয়ে নিখিল সৃষ্টির কল্যাণার্থে অমূল্য ও অসংখ্য মণিমানিক্য সংগ্রহ করেছেন, অন্যদিকে সেই মণিমুক্তা দ্বারা লক্ষাধিক সাহাবাবৃন্দকে অলংকৃত ও বিভূষিত করতঃ রাব্বানী শিক্ষায় তাঁদেরকে শিক্ষিত করে নিজ আদর্শে গড়ে তুলেছেন এবং বিশ্বের সঠিক কল্যাণ ও উন্নতির দিশারী রূপে তাঁদেরকে আদর্শ মানব হিসেবে রেখে গেছেন।

মোদ্দাকথা, জ্ঞানী শিক্ষক সম্পর্কে জানতে হলে যেরূপ তাঁর ছাত্রদেরকে চেনা-জানা দরকার, মনিব সম্পর্কে জানতে হলে যেরূপ তাঁর খাদেম ও গোলামদেরকে চেনা-জানা দরকার, সম্মানী ও জ্ঞানী পিতাকে জানতে হলে যেরূপ তাঁর পুত্রদেরকে চেনা-জানা দরকার। তেমনিভাবে মহান আদর্শের পরম উৎস বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও পূর্ণাঙ্গরূপে জানতে হলে তাঁরই হাতে গড়া সাহাবায়ে কিরামগণকে জানা দরকার। এ সম্পর্কে ইংরেজ রাইটার ড. স্প্রীঙ্গার রচিত “লাইফ অব মুহাম্মদ” নামক পুস্তকে এই চির সত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ বলেছেন, দুনিয়ার বুকে এমন কোন জাতি নেই, এমন কোন জাতি জন্মেনি যারা মুসলমানদের মত আস্মাউর রিজাল শাস্ত্র প্রণয়ন করেছে। মুসলমানদের এ শাস্ত্রের বলে আজ আমরা পাঁচ লক্ষ লোকের (সাহাবাগণের) জীবন চরিত নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে পেরেছি।

বিশেষতঃ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান জীবনাদর্শ বা সীরাতুন্নবী এমন এক মহা সমুদ্র, যার সঠিক কুলকিনারা নির্ধারণ করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূত-পবিত্র জীবনী সম্পর্কে ইমাম আযম হযরত আবু হানিফা (রাহ্.)এর বর্ণনা একান্ত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন- আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তদীয় জন্মের পর থেকে এ নশ্বর জগত ত্যাগের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সর্ববিধ কলুষমুক্ত ও পূত-পবিত্র ছিলেন এবং বিশ্বের সর্বস্তরের সকল মানুষের জন্যই তিনি ছিলেন অনুপম অনুকরণীয় আদর্শ।

অতএব এ পৃথিবীতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, উস্তাদ-শাগ্রিদ, পীর-মুরীদ, রাজা-প্রজা, শাসক-শাসিত, রাষ্ট্রপতি-জনসাধারণ, উজির-নাজির, বাদশা-ফকীর, অফিসার-পাবলিক, জজ-ব্যারিষ্টার, সিপাহী-সেনাপতি, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, কৃষক-শ্রমিক, মালিক-মজুর, ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, মাতা-পিতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, মেহমান-মুসাফির, দেশী-বিদেশী, শত্রু-মিত্র, স্বধর্মী-বিধর্মী, মানুষ-জ্বিন সকলের জন্য তিনি জ্বলন্ত আদর্শ।

তাই পার্থিব জগতের তিনি যেমন মহান আদর্শ, আধ্যাত্মিক জগতেরও তিনি সেরূপ অমর আদর্শ। একারণে মহাগ্রন্থ কুরআনে তাঁকে (মানব জাতির কল্যাণ ও উন্নতির পথে) হিদায়াতের মধ্যাহ্ন সূর্য বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং তাঁর শানে বলা হয়েছে যে, সূর্য মধ্যাহ্ন গগনে পৌঁছা মাত্র সকল গ্রহ-উপগ্রহ, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি যেরূপ বিলীন হয়ে যায়, তদ্রুপই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই সকল নবী ও রাসূলের নবুওয়্যাত ও রিসালাত রহিত হয়ে গেছে।

আর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনিত সত্যধর্ম ইসলামের অমর বিধি-বিধান ক্বিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে ও সমগ্র বিশ্ব ব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করবে। এই মহান উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন হয়েছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষা ও জ্ঞানের মহিমা প্রচারের মাধ্যমে। যদ্বারা একথা বাস্তবে প্রমাণিত হল যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা এবং তাঁর বাতলানো পথেই মানব জগতের সার্বিক কল্যাণ ও উন্নতি নিহিত। যে কারণে বিশ্বের স্থির মস্তিষ্কসম্পন্ন জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ পঞ্চমুখে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুপম আদর্শ ও সুমহান চরিত্রের স্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন।

পক্ষান্তরে ইসলাম ও বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোর শত্রুরা তাদের অদম্য চেষ্টা, ছল-চাতুরী এবং সত্য বিকৃতির মাধ্যমে তাঁর মহান আদর্শের মোকাবেলায় খড়গ হস্তে বিরুদ্ধ শিবিরে অবস্থান করেও সফলকাম হতে পারছে না এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত পারবেও না, ইন্শাআল্লাহ্।

তাই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে একমাত্র বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতাদর্শ ভিত্তিক তাঁর সীরাত বা জীবন চরিতই চির অনুকরণীয়, চির অপরিবর্তনীয় এবং সর্বযুগে গ্রহণযোগ্য। কেননা, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতাদর্শই যে একমাত্র চিরসত্য এর বাস্তব প্রমাণই হল, তিনি ছিলেন বিশ্ব মানবতার কল্যাণ, উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধনের মহান আদর্শ। আর এই মহাদর্শের মহাগুণেই তিনি সমাসীন ছিলেন মানব জগতের স্বর্ণ শিখরে।

লেখক: ভাইস প্রিন্সিপাল ও মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা-ঢাকা, প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল- ঢাকা উত্তরা রওজাতুস সালিহাত মহিলা মাদ্রাসা, খতীব-  উত্তরা ১২নং সেক্টর বায়তুন নূর জামে মসজিদের এবং সাংগঠনিক সম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন- ‘ছাত্রদের প্রতি জরুরী ৮টি উপদেশ’