Home মহিলাঙ্গন মহানবী (সা.)এর মহিয়সী সহধর্মীনীগণ

মহানবী (সা.)এর মহিয়সী সহধর্মীনীগণ

0

।। মুফতী জাকির হোসাইন ।।

আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনের বিভিন্ন সময়ে মতান্তরে এগারোজন মহিয়সী রমণীকে স্বীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পবিত্রাত্মা আযওয়াজে মুতাহ্হারাগণকে ‘উম্মুল মু’মিনীন’ বা ‘উম্মতের জননী’ নামে অভিষিক্ত করা হয়। সর্বপ্রথম নবীজি (সা.) হযরত খাদিজা (রাযি.)কে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করেছিলেন। প্রথমা স্ত্রী বেঁচে থাকাকালীন তিনি দ্বিতীয় কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি। মুহ্তারামা উম্মত জননীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিম্নরূপ।

(১) হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাযি.): তাঁর পিতার নাম খুয়াইলিদ এবং মাতার নাম ফাতিমা বিনতে যাইদা। রাসূলুল্লাহ (সা.)এর পতিত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি দু’জন স্বামীর ঘর করেছিলেন। প্রথম পক্ষে দু’জন পুত্র সন্তান এবং দ্বিতীয় পক্ষে মাত্র একজন কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। প্রথম পক্ষের ‘হিন্দ’ নামক এক পুত্র ইসলাম গ্রহণ করতঃ জঙ্গে জামালে হযরত আলী (রাযি.)এর পক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেন।

হযরত খাদিজা (রাযি.)এর গর্ভে হযরত নবী কারীম (সা.)এর একজন পুত্র মতান্তরে দু’জন পুত্র বাল্যকালে ইন্তিকাল করেন। পরবর্তীতে চার জন কন্যা যথাক্রমে হযরত যাইনাব (রাযি.), হযরত রুক্বাইয়্যা (রাযি.), হযরত উম্মে কুলসূম (রাযি.) এবং খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমাতুয্ যুহরা (রাযি.) যথারীতি সংসার জীবন-যাপন করেন। হযরত ফাতিমা (রাযি.)এর বংশধারার মাধ্যমেই আহলে বাইতের রক্তধারা আজও দুনিয়ায় বিদ্যমান রয়েছে।

হযরত খাদিজা (রাযি.) ৪০ বছর বয়সে ২৫ বছর বয়স্ক নবী কারীম (সা.)এর সাথে মুবারক দাম্পত্য জীবন শুরু করতঃ পরবর্তীতে মাত্র ২৫ বছর দুনিয়ায় বেঁচে ছিলেন। হযরত নবী কারীম (সা.) তাঁকে সবচেয়ে বেশী ভালবেসেছেন। জীবনে তিনি অন্য কোন স্ত্রীকে তাঁর চেয়ে অধিক ভালবাসেননি। এ ব্যাপারে একদিন হযরত আয়েশা (রাযি.) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন, “একজন বৃদ্ধা, তাও মারা গেছেন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাঁর চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করা সত্ত্বেও আপনি সবসময় শুধু তাঁরই স্মৃতিচারণ করে থাকেন।” জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, “কখনো তোমরা তাঁর চেয়ে উত্তম নও। হে আয়েশা! যখন মানুষ আমাকে মিথ্যাবাদী বলত, তখন সে-ই আমাকে সত্যবাদী বলে মেনে নিয়েছিল। যখন মানুষ কাফির ছিল, তখন সে-ই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যখন আমার কোন সাহায্যকারী ছিল না, তখন সে-ই আমাকে সাহায্য করেছিল।” উল্লেখ্য, ইসলামের ইতিহাসে মহিলাদের মধ্যে হযরত খাদিজা (রাযি.) সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত খাদিজা (রাযি.) হিজরতের পর পঁয়ষট্টি বছর বয়সে মক্কায় ইন্তিকাল করেন। নবীপত্নীগণের মধ্যে একমাত্র তাঁরই কবরগাহ্ পবিত্র মক্কায় অবস্থিত। আজও মুসলমানরা শ্রদ্ধাভরে তাঁর কবর যিয়ারত করে থাকেন।

(২) হযরত সাওদা (রাযি.): হযরত খাদিজা (রাযি.)এর ইন্তিকালের পর রাসূলুল্লাহ (সা.)এর নিঃসঙ্গতা অবলোকন করতঃ হযরত খাওলা বিনতে হাকিম (রাযি.) তাঁর সম্মতিক্রমে হযরত সাওদা (রাযি.)এর পিতার বরাবরে বিবাহের প্রস্তাব পেশ করেন। পরবর্তীতে হযরত সাওদা (রাযি.)এর সম্মতিক্রমে হযরত জামআ (রাযি.) চারশ’ দিরহাম মোহর ধার্য করতঃ নিজেই মুবারক বিবাহ পড়িয়ে দেন।

হযরত সাওদা (রাযি.) ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করতঃ প্রথম স্বামী হযরত সাফ্ওয়া ইব্নে উমায়ের (রাযি.)এর সঙ্গে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর তাঁর স্বামী ইন্তিকাল করায় একমাত্র পুত্র হযরত আব্দুর রহমানকে নিয়ে বৈধব্য জীবন কাটান। পরবর্তীতে তাঁর উক্ত পুত্র জালুলার যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন।

হযরত সাওদা (রাযি.) রাসূলুল্লাহ (সা.)এর আনুগত্য ও নির্দেশ পালনে সব স্ত্রীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। উদারতা ও দানশীলতায় তিনি হযরত আয়েশা (রাযি.) ব্যতীত সবার চেয়ে শীর্ষে ছিলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ ও স্থূল দেহ বিশিষ্ট। এ কারণে তাঁর চলাফেরার গতি ছিল খুব মন্থর।

তাঁর মাধ্যমে মাত্র পাঁচটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং বুখারী শরীফে মাত্র একটি হাদীস উল্লিখিত হয়েছে। তিনি হযরত উমর (রাযি.)এর খিলাফতের শেষ সময়ে মদীনায় ইন্তিকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত হন।

(৩) হযরত আয়েশা (রাযি.): নবুওয়্যাতের দশম বর্ষে হযরত খাওলা বিন্তে হাকিমের প্রস্তাবনায় রাসূলে কারীম (সা.)এর সাথে চারশ’ দিরহাম মোহরে পবিত্র শাওয়াল মাসে মাত্র ৬ বছর বয়সে হযরত আয়েশা (রাযি.)এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর নবীজি (সা.) মাত্র এক বছর মক্কায় ছিলেন। হযরত আয়েশা (রাযি.)এর পিতা হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রাযি.) রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সার্বক্ষণিক সাথী ছিলেন। তাঁর মাতার নাম হযরত উম্মে রুম্মান (রাযি.)।

মদীনায় হিজরতের পর নবী কারীম (সা.) ও হযরত আবুবকর (রাযি.) তাঁদের স্ব-স্ব পরিবার পরিজন মদীনায় আনয়নের অব্যবহিত পরেই মাত্র ৯ বছর বয়সে শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশা (রাযি.)এর মুবারক দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। তাঁর বয়স যখন মাত্র আঠার বছর তখন নবী কারীম (সা.)এর ওফাত হয়। এরপর তিনি ৪৮ বছর দুনিয়ায় বেঁচে ছিলেন। হিজরী ৫৭ সনে ৬৬ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। হযরত আবু হুরাইরাহ্ (রাযি.) তাঁর নামাযে জানাযার ইমামতী করেন এবং রাতের আঁধারেই তাঁকে জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তিনি ২২১০টি হাদীস বর্ণনা করেন। তন্মধ্যে এককভাবে ৫৪টি হাদীস বুখারী শরীফে এবং ৬৮টি মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে। কারো কারো মতে শরীয়তের বিধিমালার এক চতুর্থাংশ তিনিই বর্ণনা করেন। তিনি একাধারে মুহাদ্দিস ও ফক্বিহ ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি অনেক জটিল বিষয়ে ফায়সালাসহ ফাতওয়া প্রদান করতেন। বড় বড় সাহাবীগণও অনেক জটিল ব্যাপারে তাঁর ফাতওয়ার শরণাপন্ন হতেন।

(৪) হযরত হাফ্সা (রাযি.): তিনি ছিলেন ইসলামের লৌহ মানব হযরত উমর (রাযি.) ও হযরত যাইনাব বিন্তে মাজঊন (রাযি.)এর কন্যা। নবুওয়্যাতের ৫ বছর পূর্বে তিনি মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম বিবাহ হযরত খুলাইস ইব্নে হুযাইফা (রাযি.)এর সাথে সম্পন্ন হয়। স্বামীর সঙ্গে মদীনায় হিজরত করার পরবর্তীতে তাঁর স্বামী বদর যুদ্ধে আহত হয়ে মদীনায় শাহাদত বরণ করেন। নিঃসন্তান হযরত হাফ্সা (রাযি.)এর বৈধব্যের কারণে হযরত উমর (রাযি.) বেশ চিন্তাযুক্ত ছিলেন। হযরত নবী কারীম (সা.) ইসলামের এ বীর পুরুষের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করতে গিয়ে নিজেই প্রস্তাব করে তাঁকে বিবাহ করেন।

হযরত হাফ্সা (রাযি.)এর মেজাজ পিতার মত একটু কড়া ছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সাথে কথায় সমান উত্তর দিতে অভ্যস্ত ছিলেন। হযরত উমর (রাযি.) বিষয়টি জ্ঞাত হয়ে তাঁকে সাবধান করে দিয়ে তিরস্কার করেন।

হযরত আয়েশা (রাযি.)এর সাথে তাঁর সবচেয়ে বেশী হৃদ্যতা ছিল। অবশ্য মাঝেমধ্যে তাঁদের উভয়ের মধ্যে স্বপত্নী সূলভ বিরোধেরও সৃষ্টি হত।

হিজরী ৪৫ সনে হযরত মুআবিয়া (রাযি.)এর আমলে তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। যৎসামান্য আসবাবপত্র ছিল, তা তিনি গরীব-মিসকীনদের মধ্যে অন্তিমকালে বিলিয়ে দেন। তৎকালীন মদীনার শাসনকর্তা হযরত মারওয়ান ইব্নে হাকাম (রাযি.) তাঁর জানাযার নামাযে ইমামতী করেন। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে উমর (রাযি.) এবং তাঁর পুত্রগণ তাঁর লাশ কবরস্থ করেন। হযরত আবু হুরাইরাহ্ (রাযি.)ও তাঁর দাফনে অংশগ্রহণ করেন।

(৫) হযরত যাইনাব বিন্তে খুযাইমাহ্ (রাযি.): প্রথমে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে জাহ্শ (রাযি.)এর সাথে তাঁর বিবাহ সম্পাদিত হয়। উহদের যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহীদ হওয়ায় রাসূলুল্লাহ (সা.) বৈধব্যদশায়ই তাঁকে বিবাহ করেন। বিবাহের পর তিনি মাত্র ৩/৪ মাস বেঁচে ছিলেন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন এবং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জানাযার নামায পড়ান। জান্নাতুল বাকীতে তিনি সমাহিত হন।

তিনি গরীব-মিসকীনদের প্রতি অত্যন্ত সদয়া ছিলেন। তাই তিনি ‘উম্মুল মাসাকীন’ বা মিসকীনদের জননী নামেই সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। হযরত খাদিজা (রাযি.)এর পরে একমাত্র তিনিই রাসূলুল্লাহ (সা.)এর মুবারক হাতে কবরস্থ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।

(৬) হযরত উম্মে সালামা (রাযি.): তাঁর প্রকৃত নাম হিন্দ এবং ডাক নাম উম্মে সালামা। তাঁর পিতার নাম সুহাইল এবং মাতার নাম আতিকা। তাঁর প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয় রাসূলুল্লাহ (সা.)এর দুধ ভাই হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে আবুল আসাদ (রাযি.)এর সঙ্গে। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করতঃ স্বামীর সাথে হাবশাতে হিজরত করেন। পরবর্তীতে হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে আসেন এবং দ্বিতীয় দফায় মহিলাদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম মদীনায় হিজরত করেন। তাঁর স্বামী উহুদ যুদ্ধে মারাত্মক আহত হন এবং পরবর্তীতে মদীনায় শাহাদত বরণ করেন। সে সময় তিনি সন্তান সম্ভবা ছিলেন। সন্তান প্রসবান্তে ইদ্দত পালনের পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই প্রস্তাব পাঠিয়ে তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন।

তিনি উম্মুল মু’মিনীনগণের মধ্যে সর্বশেষে মদীনায় ইন্তিকাল করেন। তাঁর ইন্তিকালের তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে তিনি ৮৪ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।

মেধা ও পান্ডিত্যে হযরত আয়েশা (রাযি.)এর পরেই তাঁর স্থান সর্বজন স্বীকৃত। হযরত আয়েশা (রাযি.)এর মতামতের পর তাঁর মতামতকেই প্রাধান্য দেওয়া হত।

হযরত সাঈদ ইব্নে যায়েদ (রাযি.) মতান্তরে হযরত আবু হুরাইরাহ্ (রাযি.) তাঁর জানাযার নামাযে ইমামতী করেন এবং তিনি জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত হন।

(৭) হযরত যাইনাব ব্নিতে জাহ্শ (রাযি.): হযরত যাইনাব বিন্তে জাহ্শ (রাযি.) রাসূলুল্লাহ (সা.)এর ফুফাত বোন ছিলেন। প্রথমে হযরত যায়েদ (রাযি.)এর সাথে তাঁর বিবাহ সম্পাদিত হলেও তিনি হযরত যায়েদ (রাযি.)এর সাথে ঘর করতে অনিহা প্রকাশ করার প্রেক্ষিতে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে তিনি ৩৫ বছর বয়সে নবী কারীম (সা.)এর স্ত্রী হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। তিনি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই হযরত আয়েশা (রাযি.)এর সমকক্ষতা আশা করতেন।

তিনি ইবাদত-বন্দেগীতে ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী ও উদার চিত্তের অধিকারীনী। তিনি নিজ হাতে উপার্জন করে কষ্টে জীবন যাপন করেও সবকিছু আল্লাহর রাহে ব্যয় করতেন। হযরত উমর (রাযি.)এর খিলাফতকালে ২০ হিজরীতে তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। তিনি তাঁর কাফনের সরঞ্জাম নিজেই আগাম ব্যবস্থা করে রাখেন। হযরত উমর (রাযি.) তাঁর নামাযে জানাযার ইমামতী করেন। হযরত উসামা (রাযি.), হযরত মুহাম্মদ ইব্নে আব্দুল্লাহ্ (রাযি.), হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে আহমদ (রাযি.) প্রথমে তাঁর লাশ জান্নাতুল বাকীর কবরে নামান। নবীজি (সা.)এর ইন্তিকালের পর নবীপত্নীদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইন্তিকাল করেন।

(৮) হযরত জুওয়াইরিয়াহ্ (রাযি.): তাঁর পিতার নাম হারিস ইবনে যারারা। তাঁর পিতা মুস্তালিক গোত্রাধিপতি ছিলেন। মুনাফ ইব্নে সাফ্ওয়ানের সাথে তাঁর প্রথম বিবাহ হয়। মুরাইসীর যুদ্ধে তাঁর স্বামী নিহত হওয়ায় তিনি যুদ্ধ বন্দিনীরূপে মদীনায় আনীত হন। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে তিনি হযরত সাবিত ইব্নে কায়েস ইব্নে শাম্মাস (রাযি.)এর ভাগে পড়েন। তৎকালীন আইন মোতাবেক অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে ঊনিশ উকিয়া স্বর্ণ মুক্তিপণের শর্ত চূড়ান্ত করতঃ রাসূলুল্লাহ (সা.)এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে মুক্তিপণ আদায়ের ব্যাপারে তাঁর ব্যক্তিগত সাহায্য প্রার্থনা করেন। উল্লেখ্য, এরই মধ্যে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। দয়ার নবী (সা.) তাঁর মুক্তিপণ আদায়ের নিশ্চয়তা প্রদান করতঃ বিবাহের প্রস্তাব পেশ করলে তিনি বিবাহে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।

পরবর্তীতে এ বিবাহের খবর জানাজানি হলে সাহাবায়ে কিরাম বনী মুস্তালিক গোত্রের প্রায় সাত শতাধিক যুদ্ধবন্দীকে (যারা দাসদাসী হিসেবে ইতিমধ্যে সাহাবীগণের মধ্যে বণ্টিত হয়ে গিয়েছিলেন) মুক্তি প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)এর এই দাম্পত্য সম্পর্কের শুভ প্রতিক্রিয়া বহুদর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত জুওয়াইরিয়াহ্ (রাযি.)এর অনুরোধেই এ মুক্তির ঘটনা ঘটে। তিনি ৫০ হিজরী সনে ৬৫ বছর বয়সে মদীনায় ইন্তিকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত হন।

(৯) হযরত উম্মে হাবীবাহ্ (রাযি.): তাঁর প্রকৃত নাম রামলা এবং কুনিয়ত উম্মে হাবীবাহ্। তিনি নবুওয়্যাতের ১৭ বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে উবায়দুল্লাহ্ ইব্নে জাহাশের সাথে বিবাহ হয়। নবুওয়্যাতের পর স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ইসলাম গ্রহণের গৌরব লাভ করেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই হাবশায় হিজরত করেন। সেখানে হাবীবাহ্ নামের তাঁদের এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে।

আবিসিনিয়ায় পৌঁছে তাঁর স্বামী খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণ করলেও তিনি ইসলাম ধর্মের উপর অটুট থেকে স্বামী পরিত্যক্তারূপে দিন কাটান। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর বিপন্নাবস্থা ও ঈমানের দৃঢ়তার বিষয় জানতে পেরে হযরত উমর ইব্নে উমাইয়া মুযারী (রাযি.)কে বাদশা নাজ্জাশীর কাছে হযরত উম্মে হাবীবাহ্ (রাযি.)এর জন্য বিবাহের পয়গাম নিয়ে প্রেরণ করেন। বাদশা নাজ্জাশীর প্রস্তাবনায় হিজরতকারী মুসলমানদের উপস্থিতিতে ৪০০ স্বর্ণমুদ্রা মোহরের বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সাথে তাঁর বিবাহ সম্পাদিত হয়। বাদশা নাজ্জাশী নিজে মোহরের অর্থ পরিশোধ করতঃ ওলীমা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন।

পরবর্তীতে বাদশা নাজ্জাশী বেশ কিছু উপঢৌকনসহ সাহাবী হযরত শরাইবিল ইব্নে হাসনা (রাযি.)এর মাধ্যমে হযরত উম্মে হাবীবাহ্ (রাযি.)কে মদীনায় রাসূলুল্লাহ (সা.)এর খেদমতে প্রেরণ করেন। তিনি হিজরী ৪৪ সনে মদীনায় ইন্তিকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত হন।

(১০) হযরত মাইমুনাহ্ (রাযি.): হযরত মাইমুনাহ্ (রাযি.)এর পিতার নাম হারিস এবং মাতার নাম হিন্দা। প্রথম স্বামী মাসঊদ ইব্নে উমাইরীর কাছ থেকে তালাক প্রাপ্ত হয়ে দ্বিতীয় স্বামী আবু রহম ইব্নে উজ্জার মৃত্যুর পর তিনি নবী কারীম (সা.)এর পত্নী হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর নিজেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর খেদমতে উৎসর্গ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করার প্রেক্ষিতে ‘সরফ’ নামক স্থানে দয়ার নবী (সা.)এর সাথে তাঁর বিবাহ সম্পাদিত হয়। হযরত আব্বাস (রাযি.) উক্ত বিবাহ পড়ান। দীর্ঘদিন পর তিনি একই স্থানে ইন্তিকাল করেন এবং হযরত আব্দুল্লাহ্ ইব্নে আব্বাস (রাযি.) তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং লাশ কবরস্থ করেন।

তাঁর মৃত্যুর সন সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশের মতে তিনি হিজরী ৫১ সনে ‘সরফ’ নামক স্থানে ইন্তিকাল করেন।

(১১) হযরত সাফিয়্যাহ্ (রাযি.): তাঁর প্রকৃত নাম যাইনাব, পিতার নাম হুওয়াই ইব্নে আখ্তাব, মাতা বনু কুরাইযা গোত্রের সর্দারের কন্যা। তাঁর পিতা বনু নযীর গোত্রের প্রধান তথা খাইবার অধিপতি ছিলেন। যুদ্ধবন্দিনী হিসেবে মদীনায় পৌঁছে পরবর্তীতে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)এর স্ত্রী হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। যুদ্ধলব্ধ মালের দলপতির জন্য রক্ষিত সর্বোৎকৃষ্ট অংশকে ‘সাফিয়্যাহ্’ বলা হয়। এই সুবাদেই তাঁকে সাফিয়্যাহ্ নামে ডাকা হত।

তাঁর প্রথম স্বামীর নাম সালাম ইব্নে মাশকামুল কাবশী। প্রথম স্বামীর নিকট থেকে তালাক প্রাপ্ত হয়ে কানানা ইব্নে আবুল হাফীফ-এর সাথে দ্বিতীয় বিবাহ হয়। কানানা খাইবার যুদ্ধে নিহত হয়। একজন সর্দারের কন্যা হওয়ার সুবাদে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে মুক্ত করে দেন। তাঁর নিজের অভিপ্রায়ের প্রেক্ষিতে খাইবার থেকে ফেরার পথে ‘সাহবা’ নামক স্থানে দয়ার নবী (সা.)এর সাথে তাঁর বিবাহ সম্পাদিত হয় এবং সঙ্গে রক্ষিত খাদ্য সামগ্রী দিয়েই ওলীমা অনুষ্ঠান করা হয়।

হযরত নবী কারীম (সা.) তাঁকে বিশেষ মুহাব্বত করতেন। সর্বক্ষেত্রেই তাঁর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির প্রতি তিনি বিশেষ খেয়াল রাখতেন। তিনি হিজরী ৫০ সনে মদীনায় ইন্তিকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত হন।

(১২) হযরত মারিয়া ক্বিবতিয়া (রাযি.): হযরত মারিয়া ক্বিবতিয়া (রাযি.) সম্পর্কে সাধারণ সীরাত গ্রন্থে তেমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে তিনি ‘আলিয়া’ নামক স্থানে বসবাস করতেন এরূপ বর্ণনা রয়েছে। হিজরী ৮ম সনে তাঁরই গর্ভে রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সর্বকনিষ্ঠ পুত্র সন্তান হযরত ইব্রাহীম (রাযি.) জন্মগ্রহণ করেন। হযরত ইব্রাহীম (রাযি.) মতান্তরে দু’বছর বয়সের পূর্বেই ইন্তিকাল করেন। নবী কারীম (সা.) স্বয়ং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রের জানাযার নামায পড়ান এবং জান্নাতুল বাকীতে হযরত উসমান ইব্নে মাযঊন (রাযি.)এর কবরের পাশেই সমাহিত করেন। হযরত ইব্রাহীম (রাযি.)এর ইন্তিকালের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)এর মুবারক চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রুধারা নেমে আসে। এ ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে, জবাবে সাহাবীদেরকে বলেন, এটা অপত্য স্নেহ অশ্রুর ধারায় বিগলিত হয়ে নেমে এসেছে।

কোন কোন বর্ণনায় নবী কারীম (সা.)এর বিবিগণের সংখ্যা ৯জন বর্ণিত হয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ বর্ণনা মতে তাঁর সম্মানিতা স্ত্রীগণের সংখ্যা ১১ জন। তবে হযরত যাইনাব বিনতে খুযাইমা (রাযি.) এবং মারিয়া ক্বিবতিয়া (রাযি.)এর বর্ণনা খুবই স্বল্প, যেহেতু তাঁরা উভয়ে খুব স্বল্প সময় নবী কারীম (সা.)এর একান্ত সান্নিধ্যে ছিলেন।

এ জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.)এর স্ত্রীগণের সংখ্যা ৯ জন বলা হয়। কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত মারিয়া ক্বিবতিয়া (রাযি.) রাসূলুল্লাহ (সা.)এর ক্রীতদাসী ছিলেন বলে উল্লেখ আছে। তবে তিনি তাঁর সন্তান গর্ভে ধারণ করেছেন- এ সুবাদে বিশেষ মর্যাদার অধিকারীনী হবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

হযরত নবী কারীম (সা.)এর সম্মানিতা স্ত্রীগণের মধ্যে একমাত্র হযরত আয়েশা (রাযি.)ই কুমারী ছিলেন। অন্যান্য স্ত্রীগণের সবাই ২য়, ৩য় অথবা ৪র্থ স্বামী হিসেবেই তাঁর সান্নিধ্য প্রাপ্ত হন। রাসূলুল্লাহ (সা.)এর প্রত্যেকটি বিবাহের নেপথ্যে বিশেষ বিশেষ কারণ নিহিত ছিল। কারো ঈমানের দৃঢ়তার জন্য, কারো কষ্ট লাঘবের জন্য, কারো মার্যাদা রক্ষার জন্য এবং কারো ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ থাকার জন্য বিবাহগুলো অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর সবগুলো বিবাহই পূতপবিত্র। এ ব্যাপার বিরূপ মন্তব্যকারীরা অভিশপ্ত এবং লা’নতপ্রাপ্ত। দয়ার নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর সব কর্মই আল্লাহ অনুমোদিত, তাই এ ব্যাপারে বান্দার মন্তব্যের কোন অধিকারই থাকতে পারে না।

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী , উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডটকম এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর। ই-মেইল- [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.