Home ইতিহাস-ঐতিহ্য বাংলাদেশে ইসলামের আগমন

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন

0

।। মুহাম্মদ আতিকুল ইসলাম ।।

ভূমিকা: আরবের ভৌগলিক সীমারেখা ভেদ করে কখন কিভাবে বাংলাদেশের জনপদে ইসলামের আগমন ঘটেছে তা সম্পুর্ণভাবে জানা যায় নি। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণের  ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে রাসূলে আরবী (সা.)এর সময়কালেই সাহাবী আবু ওয়াক্কাসই (রাযি.) ইসলামের প্রচারক হিসেবে সমুদ্রপথে বাংলাদেশে আগমন করেন। তাছাড়া ঐতিহাসিক এর মতে ইউসুফ (আ.)আমল থেকেই ভারতীয়দের সাথে আরবদের চমৎকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। যার ফলে আরবীয় ও ভারতীয়দের মাঝে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। ইমাম বুখারী (রাহ.)এর বর্ণনায় জানা যায়।

রাসূলে আরবী (সা.) ভারতীয়দের পক্ষ থেকে সুগন্ধ জাতীয় দ্রব্যাদি এমনকি আচার পর্যন্ত উপহার পেয়েছিল। অপরদিকে হুসাইন (রাযি.)এর স্ত্রী ইমাম জয়নুল আবেদীন-এর মা ছিলেন ভারতীয়। ঈসায়ী ষষ্ঠ শতাব্দীর পূ্র্বেও অন্যান্য দেশের ন্যায় উপমহাদেশের সাথে আরবদের সম্পর্ক ছিল চমৎকার। তাদের বাণিজ্যিক জাহাজ আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগর দিয়ে জাভা সুমাত্রা বোর্ণি ও মালয়েশিয়া উপকূলে পাড়ি জমাতো এবং আরো উত্তরে অগ্রসর হয়ে বঙ্গোপসাগর তীরে গাঙ্গেয় মোহনায় নোঙর করত।

চট্টলার ইতিহাস:

চট্টলার ইতিহাসে অষ্টম ও নবম শতকে তার প্রমাণ মিলে। বিশেষ করে ভারত মহাসাগরের পূর্বে প্রান্তে অবস্থিত দেশগুলির একমাত্র এ পথ দিয়েই ইসলামের দাওয়াতী শেকড় বসে বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঅঞ্চলেও অষ্টম শতকে এ পথ দিয়ে ইসলামের আলো উদ্ভাসিত হয়। অপরদিকে আরবের মুসলিম বণিকদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে।

মালাবার (বর্তমান কেরালা অঞ্চল) রাজা চেরুলাম পেরুলাম ইসলাম গ্রহণের প্রচন্ড অভিলাষে সিংহাস ছেড়ে মক্কা গমন করেন এবং রাসূলে আরবী (সা.)এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে রাজা একদল লোকসহ রাসূল (সা.)এর নিকট মূল্যবান বেশ কিছু উপহার সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হন। জানা যায়, সপ্তম অষ্টম শতকে বঙ্গোপসাগর জাহাজ চালালেও সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল বাংলার উপকূলে তাম্রলিপ্ত ও শৎগঙ্গ।

বর্তমান চট্টগ্রাম:

বর্তমান চট্টগ্রাম ছিল প্রধান বন্দর দক্ষিণের উপকূল পথে এসময় ইসলামের সত্যবাণী বাংলায় প্রবেশ করেন। ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে ১২০৪ সনে বখতিয়ার খিলজী নদীয়া বিজয়ের পূর্বপর্যন্ত এটাই একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশ পথ ছিল। ৬২৬ সনে ইসলাম প্রচারকগণ চীনা উপকূল ক্যান্টন বন্দরে নোঙ্গর রাখে। সেখানে সাহাবীদের র.দ্বারা প্রতিষ্টিত কেয়াংটাং মসজিদটি চৌদ্দশত বছর ধরে চীনা মুসলমানদের সর্বপেক্ষা পবিত্র ও প্রিয় জিয়ারতগাহ রূপে সুপ্রসিদ্ধ। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ইবনে খুরদাবা (মৃত ৩০০হিজরী) আল -মারসিলিক ওয়াল মামালিক গ্রন্থে লিখেন। কামরুন থেকে সামন্দরে চন্দন কাঠ মিষ্ট পানির মাধ্যমে পনের বিশ দিনে আনীত হয়। চট্টগ্রামে ইসলাম গ্রন্থে ড.আব্দুল করীম সমন্দরকে চট্টগ্রাম এর সাথে অভিন্ন প্রমাণ করেছেন। আরবদের সাথে বাংলাদেশের
সম্পর্ক (১২০১) বখতিয়ার খিলজী বঙ্গ বিজয়ীর অনেক পূর্বেকার।

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন:

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন সম্পর্কে তথ্য রয়েছে যে খোদ রাসূল সা.এর জীবদ্দশায় এমনকি সম্ভবত হিজরতের পূ্র্বে বাংলার উপকূল অঞ্চলে ইসলামের আলো বিস্তার লাভ করে। এটাও অসম্ভব নয় যে আবু ওয়াক্কাস র.এর সাথে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুসলমানগণও অংশগ্রহণ করেন। চীনা পরিব্রাজক মাহুয়ানের বক্তব্য থেকে তা জানা যায়।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার:

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এর মধ্যবর্তী কোন জায়গায় জাহাজ মেরামত ও নির্মাণ কারখানা ছিল। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রা বিরতি করতো। অন্যদিকে স্থল পথে খলিফা ওমর (রাযি.)এর সময়কালে ১৫ হিজরীর মধ্যভাগে উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে।

এ সি রায়ের মতে এ সময় সিন্ধু অভিযান শুরু হয়। ৫৩৬ সনে ভারতীয় জলসীমায় প্রথম মুসলিম রণতরীর আগমন ঘটে বোম্বাখানা নামক স্থানে। এসময় যে কয়েকজন সাহাবী ভারত আগমনের খবর পাওয়া যায়। যথা-

১. ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবা (রাযি.)। ২. আসেম ইবনে আদী (রাযি.)। ৩. ছুহা’র ইবনে আল-আবদী (রাযি.)। ৪. সুহাইব ইবনে আদী (রাযি.)। ৫. আল হাকাম ইবনে আবিল (রাযি.) ও ওসমান (রাযি.)এর আমলে ইসলাম প্রচারে দু’জন সাহাবী ভারতে আসেন। আলী (রাযি.)এর আমলেও সাহাবীরা এসেছিল কিন্তু তাদের নাম পাওয়া যায়নি। আর ভারত উপমহাদেশ বিজয়ের স্বপ্ন আরব মুসলিমদের হৃদয় থেকে কখনো মুছা যায়নি। বাংলাদেশেও একই শেকড়ের বাঁধনে আবদ্ধ।

রংপুরে চৌদ্দশত (১৪০০) বছরের পুরাতন মসজিদ:

সম্প্রতি রংপুর শহর থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে লালমনিরহাট পঞ্চগ্রামে ৬৯ হিজরীতে প্রতিষ্টিত একখানা মসজিদ ধ্বংসবশেষ পাওয়াগেছে। সিন্ধু বিজয়ের চব্বিশ বছর পূ্র্বে উমাইয়া শাসনকর্তা প্রথম মারওয়ানের পুত্র আব্দুল মালিক শাসন আমলের এ মসজিদটি বাংলাদেশে এ যাবৎ প্রাপ্ত ইসলামে সুপ্রাচীন নিদর্শন।

অন্যদিকে কোন ঐতিহাসিক এর ধারণা আরবের মুসলমানরা চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করছিল। তবে কেউ কেউ এই বক্তব্য সংশয় মুক্ত নয় বলে ধারণা করেন। তবে এটা সত্য যে প্রাচীনকাল থেকে আরবদের যোগাযোগের ফলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর আরবী শব্দ ব্যবহৃত হয়। চট্টগ্রামের কোন কোন এলাকা আজও আরবী নাম বহন করে যাচ্ছে।

এসব কিছুই চট্টগ্রাম তথা বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের সাথে আরবীয়দের প্রাচীন যোগাযোগের প্রমাণ। আরবী ভাষা সংস্কৃতি ও রক্তের মিশ্রণই এ এলাকায় ইসলামের ব্যাপক জোয়ার ঘটে, আলহামদুল্লিহ।

উপসংহার:

স্থল ও জল উভয় পথেই ইসলামের প্রচারকগণ বাংলায় আগমন করেন। জলপথেই প্রথম আগমন ঘটে। অসংখ্য পীর আউলিয়া ও দরবেশদের অক্লান্ত প্রয়াসে এ অঞ্চলে সোনালী অধ্যায় সৃষ্টি হয়। হযরত মখদুম শাহ মাহমুদ গজনবী থেকে বায়েজিদ বোস্তামী হয়ে পীর বাহরাম শাহ পর্যন্ত প্রায় ষাটজনেরও অধিক পীর দরবেশের সন্ধান মিলে যারা বহির্বিশ্ব থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য বাংলাদেশে আগমন করেন। ইসলাম একটি বিশ্বজনীন জীবন ব্যবস্থা।

তাই ইসলামের সুমহান আদর্শ বাণীকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে রাসূল (সা.) হুদায়বিয়ার সন্ধির পর বহির্বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত শুরু করতে চিঠিসহ দূত পাঠান। পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস, মিসরের শাসনকর্তা আজিজ মিসর হাবশার রাজা রাজা ইয়ামামা ও জাসসানী শাসকসহ অনেকের কাছে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানান।

তখন দূরপ্রাচ্যে অবস্থিত এই উপমহাদেশ সম্পর্কে রাসূলে আরবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আলোচনা হয়। রাসূল (সা.) সাহাবীদের বললেন, আমার উম্মতের দু’টি সেনাদলকে মহান আল্লাহপাক জাহান্নামের অগ্নি থেকে নিষ্কৃতি দেবেন। তন্মধ্যে একটি হলো হিন্দ বা ভারত অভিযানকারী সেনাদল।

এই হাদীস সাহাবীদের মনে প্রাণে গভীর রেখাপাত সৃষ্টি করে এবং তখন থেকেই তারা ভারত বিজয়ের স্বপ্ন দেখতেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলে আরবী (সা.)এর যুগেই সাহাবীগণ অত্র অঞ্চলে আগমন করেন। তাদের দৃঢ় প্রত্যয় অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুন্দর স্নিগ্ধ আদর্শে এদেশে ইসলামের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে।

লেখক: গবেষক ও সেক্রেটারি, আল-কোরআন ফাউন্ডেশন, পেকুয়া, কক্সবাজার।
E-mail: m.atikulislam2019 @gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.