।। মাওলানা মুনির আহমদ ।।
আজকের সমাজে এক গভীর উদ্বেগজনক প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে- তরুণ প্রজন্মের একাংশ যেন সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ভুলে যাচ্ছে। জ্ঞান, গবেষণা, শিষ্টাচার, সততা, বিনয়, সহিষ্ণুতা ও পরোপকার; এই স্থায়ী গুণাবলীর পথে অগ্রসর হওয়ার বদলে তারা ঝুঁকছে উল্টো ধারায়।
নিজের মত জোর করে প্রতিষ্ঠা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আবেগপ্রবণ হঠকারিতা, আত্মম্ভরিতা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি যেন নতুন এক “বীরত্বের” রূপে প্রচার পাচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু সমাজের স্থিতি নষ্ট করছে না, তরুণদের নিজের ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করে তুলছে।
কেন এমন হচ্ছে?
এ প্রশ্নের উত্তর সামাজিক ও মানসিক দু’দিকেই নিহিত। ডিজিটাল যুগে সবাই তাৎক্ষণিক সাফল্যের পেছনে দৌড়াচ্ছে। “তাৎক্ষণিক খ্যাতি এবং দ্রুত স্বীকৃতি” পাওয়া এখন সকলের বিশেষ করে তরুণদের এক মানসিক রোগে পরিণত হয়েছে। ফলত, অনেক তরুণ আর অপেক্ষা করতে শিখছে না; ধৈর্য, পরিশ্রম এবং নীরব উন্নতির মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। পরিবারে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্তিবোধ, আত্মসমালোচনা ও শিষ্টাচারের প্রশিক্ষণ না থাকায় তাদের মানসিক গঠন অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এই শূন্যতার মধ্যেই জন্ম নেয় এক ধরনের আত্মম্ভরিতা, যা মূলত দুর্বল আত্মপরিচয়ের মুখোশমাত্র।
এতে করে অভিজ্ঞজন, জ্ঞানী ও মুরুব্বিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে অনীহা, যে কারো প্রতি সহজেই প্রশংসা আবার মুহূর্তেই ঘৃণা, যুক্তির পরিবর্তে গর্জন এবং অল্প জ্ঞানে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস; এইসব আচরণ প্রজন্মের কাছে আধুনিকতা ও সফলতার প্রতীক হিসেবে ভুলভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু তারা কি বুঝতে পারছে, এইসব আচরণই আসলে তাদের ভবিষ্যতের দরজা একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে?
মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি মন্তব্য, প্রতিটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়া- আপনার শিক্ষক, সহপাঠী, কর্মস্থলের সিনিয়র, এমনকি সমাজের সাধারণ মানুষও নীরবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা আপনার কথায় নয়, আচরণে বিচার করছেন আপনার মানসিক পরিণতি ও চরিত্রের গভীরতা।
বিশ্বাস অর্জন কঠিন, কিন্তু হারাতে লাগে মাত্র এক মুহূর্ত। আর একবার তা হারালে, ফিরে পেতে লাগে অনেক সময়; কখনো হয়তো পুরো জীবনও। এর ফলে যে বাস্তব পরিস্থিতি আপনার জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. ভয় ও দূরত্ব:
আপনার আক্রমণাত্মক বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সহপাঠী ও সহকর্মীদের মনে এক ধরনের ভয়, অনাস্থা এবং অবচেতন বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। ফলে ধীরে ধীরে আপনি একা হয়ে পড়েন—আর সেই একাকীত্বের বিষয়টি আপনি টেরও পান না। কারণ, এটা কেউ আপনাকে ব্যাখ্যা করেও বোঝাতে চাইবে না; আপনার প্রতি তাদের ভয়ের ভাবমূর্তি ইতিমধ্যেই দৃঢ় হয়ে গেছে।
২. রুদ্ধ সুযোগ:
এর অনিবার্য ফলাফল স্বরূপ জীবন ও জীবিকার নানা দরজা আপনার অজান্তেই বন্ধ হয়ে যায়।
• কেউ আর আপনাকে চাকরির জন্য সুপারিশ করতে চান না।
• যৌথ উদ্যোগ, ব্যবসা, ধারকর্জ বা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বপূর্ণ পদে কেউ আপনাকে ভরসা করতে পারে না।
• সামাজিক বা পারিবারিক পরিসরে আপনার নাম উচ্চারণেই অনেকে ইতস্তত বোধ করে।
• এমনকি বিবাহের ক্ষেত্রেও আপনার ভাবমূর্তি এক অদৃশ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
শিক্ষিত, ভদ্র ও সম্মানীয় ব্যক্তিরা; যারা আপনার জীবনের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারতেন, তারা ধীরে ধীরে আপনাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।
৩. সংকুচিত কর্মজীবন ও জীবন:
ফলস্বরূপ, আপনার কর্মজীবন সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, সম্পর্ক ক্ষয়ে যায়, আর আপনি নিজেই নিজের চারপাশে এক বদ্ধ দেয়াল তুলে ফেলেন।
সনদ বনাম চরিত্র:
প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কিন্তু মনে রাখবেন, সনদপত্রের ওজন থাকে ফাইলের ভেতর, আর আচরণের ওজন মাপা হয় মানুষের মনে; যেখানেই আপনার আসল যোগ্যতা যাচাই হয়। সুতরাং চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে, নেতৃত্ব কিংবা সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর মূল চাবিকাঠি হলো উত্তম আচরণের সামাজিক স্বীকৃতি।
এই স্বীকৃতিই আপনার প্রকৃত “ট্রাস্ট ক্রেডিট”; যা টাকায় কেনা যায় না, কেবল চরিত্রগুণ দিয়ে অর্জন করা যায়। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বড়দের প্রতি অবজ্ঞা, এমনকি আত্মম্ভরিতায় নিজেকে জাহির করার প্রবণতা; এসবই আপনার চরিত্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং অর্জিত সমস্ত মর্যাদা ও বিশ্বাসকে অর্থহীন করে তোলে।
পরিবারে, সমাজে, প্রতিষ্ঠানে এবং সংগঠনে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ভাঙায় আনন্দ ও বীরত্ব তাৎক্ষণিক মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া ও ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী।
ইতিবাচক উদাহরণ:
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা বিনয়ী থেকেও মহান হয়েছেন, তাদের শ্রেষ্ঠত্ব টিকেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। একজন নীরব গবেষক, এক সৎ শিক্ষক, এক বিনয়ী নেতা; তারা হয়তো আলোচনায় কম আসেন, কিন্তু শ্রদ্ধায় অমর হয়ে থাকেন। কারণ, মানুষ সর্বদা জ্ঞানের চেয়ে চরিত্রের উজ্জ্বলতাকেই স্মরণ করে বেশি।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা:
তরুণদের আচরণ কোনো শূন্যে বা এমনি এমনি জন্ম নেয় না। পরিবারে যদি পারস্পরিক সম্মান, বিনয় ও আত্মসংযমের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, শিক্ষকেরা যদি শ্রেণিকক্ষে কেবল জ্ঞান নয়, আচরণের আদর্শও শেখান, তবে তরুণদের এই বিপথগামিতা রোধ করা সম্ভব। চরিত্রগঠনের পাঠ শুরু হতে হবে ঘর থেকে, তারপর বিদ্যালয় থেকে এবং সমাজে।
ইসলামের আলোকে চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব:
হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَيَّ أَحْسَنَكُمْ خُلُقًا “তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে ভালো।” (সহীহ বুখারি)। রাসূলুল্লাহ (সা.)এর এই বাণীই প্রমাণ করে, শ্রেষ্ঠত্বের আসল মাপকাঠি হলো মানুষ কেমন ব্যবহার করে, কেমন আচরণ করে তার উপর। জীবন চলার পথকে উন্নত ও অগ্রসরমান করতে জ্ঞান ও সনদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি আচরণই তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে। চরিত্রহীন জ্ঞান যেমন বিপজ্জনক, তেমনি বিনয়বিহীন সাফল্যও ক্ষণস্থায়ী।
আহ্বান:
চলুন, আমরা শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতা করি- বিশৃঙ্খলায় নয়, বিনয়ের মাধ্যমে। অশ্রদ্ধায় নয়, জ্ঞানের আলোতে।
অহংকারে নয়, চরিত্রের দীপ্তিতে। বিনয়, ভদ্রতা, সহিষ্ণুতা ও নিরন্তর জ্ঞানচর্চাই হোক আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড। মনে রাখবেন, আচরণের মাধ্যমে আপনি নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণও করতে পারেন, আবার ধ্বংসও করতে পারেন।
আত্মপর্যালোচনার আহ্বান:
চলুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের ভেতর একবার তাকাই- আমাদের কথা, আচরণ, প্রতিক্রিয়া ও উপস্থিতি অন্যের মনে কেমন ছাপ ফেলে? আমরা কি সম্মান অর্জন করছি, নাকি অনিচ্ছায় অবিশ্বাস তৈরি করছি? যদি উত্তরটি অস্বস্তিকর হয়, তবে সেটিই পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ, আর সেটিই প্রকৃত জ্ঞানের সূচনা।
সব শেষে মনে রাখবেন, আপনার সনদপত্র জানায় আপনি কী শিখেছেন, আর আপনার আচরণ জানায় আপনি আসলে কে।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








