|| মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী ||
যে স্মরণ মানুষকে গাফলত থেকে জাগিয়ে তোলে এবং সৎ ও আখেরাতমুখী করে
যে সত্য থেকে কোনো মানুষই পালাতে পারে না, সেটিই মৃত্যু। অথচ এই অবধারিত বাস্তবতাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুলে থাকতে চায়। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ, ব্যস্ততা ও আকাক্সক্ষার ভিড়ে মানুষ এমনভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়ে যে, জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত পরিণতির কথাও তার চেতনার আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
মানুষ প্রতিনিয়ত পরিকল্পনা করে-আগামীকাল কী করবে, ভবিষ্যতে কোথায় পৌঁছাবে, কীভাবে তার জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করবে। কিন্তু খুব কম মানুষই থেমে নিজেকে প্রশ্ন করে, এই জীবনের শেষ কোথায়? এই পথের চূড়ান্ত গন্তব্য কী? যে জীবনকে ঘিরে এত আয়োজন, তার সমাপ্তি কখন ও কীভাবে আসবে, তা সে জানে না; জানার চেষ্টাও করে না।
প্রাণমাত্রই নশ্বর। জন্ম ও মৃত্যু মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। মানবজীবনের এই দুই প্রান্তের কোনোটির ওপরই মানুষের বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। আল্লাহর অমোঘ হুকুমেই এ ধরাতলে আমাদের আগমন; আবার তাঁরই আহ্বানে একদিন চিরপ্রস্থানের ডাক আসবে। কখন, কোথায় এবং কীভাবে, তার জ্ঞান কেবল সেই মহান সত্তার কাছেই, যাঁর হাতে আমাদের জীবন-সুতোর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
জীবনের প্রতিটি ক্ষণ একদিন হিসাবের খাতায় লিপিবদ্ধ হবে। সেই মহান রবের দরবারে দাঁড়িয়ে মানুষকে পেশ করতে হবে তার পার্থিব জীবনের প্রতিটি কর্মের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব। সেই হিসাবের চূড়ান্ত ফায়সালাতেই নির্ধারিত হবে চিরস্থায়ী জান্নাত কিংবা জাহান্নাম।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের পূর্ণ বদলা দেওয়া হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম। আর এই পার্থিব জীবন প্রতারণার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়’। (সূরা আলে ইমরান- ১৮৫)।
মহাকালের আবর্তে বিলীন অস্তিত্ব
মানুষ আজ দম্ভ ও অহংকারে উঁচু অট্টালিকা নির্মাণ করে, ক্ষমতা ও প্রভাবের গৌরবে নিজেকে অমর ভাবতে চায়। কিন্তু একদিন তাকেই সেই প্রাসাদ ছেড়ে আশ্রয় নিতে হবে মাটির নীরব অন্ধকারে। যে মাটি থেকে সে সারাজীবন দূরে থাকতে চেয়েছে, সেই মাটিই হবে তার চিরস্থায়ী ঠিকানা।
একটু ভেবে দেখুন, আজ থেকে শত বছর পর এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের একজনও অবশিষ্ট থাকবে না। আমাদের এই দেহ মাটির সঙ্গে মিশে যাবে; বিলীন হয়ে যাবে সমস্ত বাহ্যিক অস্তিত্ব। কেবল অবশিষ্ট থাকবে রূহের জগতে আমাদের পরিণতি। তিল তিল করে গড়া আমাদের সম্পদ, অট্টালিকা ও অর্জন, সবই হয় ধ্বংস হবে, নয়তো অন্য কারো দখলে চলে যাবে। এমনকি আমাদের স্মরণ করার মতো মানুষও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে, যেমন আমরা আজ আমাদের বহু পূর্বসূরিকে ভুলে গেছি।
অবকাশহীন মহাপ্রস্থান
মানুষ মনে করে, সে চাইলে হয়তো আরও কিছু সময় পাবে, আরও কিছু ইবাদত, আরও কিছু সংশোধনের সুযোগ। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে এক মুহূর্তের জন্যও অবকাশ দেওয়া হবে না।
আল-কুরআনে সেই মর্মান্তিক আকুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে- ‘হে আমার প্রতিপালক! যদি আপনি আমাকে আরও কিছুকালের জন্য অবকাশ দিতেন, তবে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ কিন্তু তখন বলা হবে, নির্ধারিত সময় এসে গেলে আল্লাহ কাউকে আর অবকাশ দেন না। (সূরা মুনাফিকুন- ১০-১১)।
তৃপ্তিহীন মানুষের তৃষ্ণা
মানুষের দুনিয়াবি চাহিদা কখনো পূর্ণ হয় না। তার লোভের কোনো শেষ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই স্বভাবের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন- ‘বনী আদমের যদি স্বর্ণভরা একটি উপত্যকা থাকে, তবুও সে দ্বিতীয় আর একটি উপত্যকার কামনা করবে। মাটি (কবর) ছাড়া অন্য কোনো কিছু দিয়ে তার উদর পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তবে যে ব্যক্তি তাওবা করবে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন’। (সহিহ বুখারী- ৬৪৩৯)।
এই হাদিস আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিতৃপ্তি দুনিয়ায় নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে আখেরাতের সফলতায়।
প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয়
মানুষ নিজেকে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান ভাবতে পছন্দ করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয় ভিন্ন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) বর্ণনা করেন, এক আনসারী সাহাবী নবীজি (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মুমিনদের মধ্যে সর্বোত্তম কে?’ তিনি বললেন, ‘যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম’।
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘মুমিনদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান কে?’
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
নবীজি (সা.) বললেন- ‘যারা মৃত্যুকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য উত্তমরূপে প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তারাই সর্বাধিক বুদ্ধিমান’। (ইবনে মাজাহ- ৪২৫৯)।
অতএব, মৃত্যুচিন্তা কোনো হতাশা নয়; বরং তা একজন মুমিনের প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
স্বাদ-বিনষ্টকারী মৃত্যুকে স্মরণ করুন
দুনিয়ার মোহ, প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা ও নানাবিধ ব্যস্ততা মানুষকে আখেরাত থেকে গাফেল করে দেয়। আল্লাহ বলেন- ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে’। (সূরা তাকাসুর)।
এই গাফলতি দূর করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে একটি সহজ কিন্তু গভীর আমল শিখিয়েছেন- ‘তোমরা বেশি করে স্বাদ-বিনষ্টকারী বস্তু, অর্থাৎ মৃত্যুকে স্মরণ করো’। (তিরমিযী, ২৩০৭)।
মৃত্যুচিন্তা মানুষের হৃদয়কে নরম করে, গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে এবং তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
শিক্ষা ও চেতনার নাম জানাযা
ইসলামে জানাযার নামায ও দাফনে অংশগ্রহণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর পেছনে কেবল সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যই নয়, বরং রয়েছে গভীর আত্মজাগরণের শিক্ষা।
অন্যের নিথর দেহ দেখে নিজের পরিণতির কথা স্মরণ হয়; অন্যকে কবরে শোয়ানো দেখে নিজের কবরের নিঃসঙ্গতা অনুভূত হয়। এই দৃশ্য মানুষকে দম্ভ থেকে মুক্ত করে, হৃদয়কে বিনয়ী করে তোলে এবং তাকে আখেরাতের প্রস্তুতির দিকে ধাবিত করে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করাই জানাযার প্রকৃত শিক্ষা।
বিপদে সবর ও মৃত্যু কামনার বিধান
দুনিয়া সুখ-দুঃখের সংমিশ্রণ। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো- সুখে শুকরিয়া আদায় করা এবং দুঃখে সবর ধারণ করা। পার্থিব কষ্টে অতিষ্ঠ হয়ে মৃত্যু কামনা করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের কেউ দুঃখ-কষ্টে পতিত হওয়ার কারণে যেন মৃত্যু কামনা না করে। যদি একান্তই কিছু বলতে চায়, তবে সে যেন বলে- হে আল্লাহ! আমাকে ততক্ষণ জীবিত রাখুন, যতক্ষণ বেঁচে থাকা আমার জন্য কল্যাণকর হয়; আর আমাকে তখনই মৃত্যু দিন, যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হয়’। (সহিহ বুখারী- ৫৬৭১)।
উপসংহার: মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে দুনিয়া থেকে বিমুখ করে না; বরং তাকে সচেতন, দায়িত্বশীল ও আল্লাহমুখী করে তোলে। এটি অন্তরে জবাবদিহিতার বোধ জাগ্রত করে, গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে এবং আমলকে অর্থবহ করে তোলে। যে হৃদয়ে মৃত্যুচিন্তা জাগ্রত থাকে, তা কখনো উদাসীন থাকে না; বরং সর্বদা প্রস্তুতির তাগিদ অনুভব করে।
এই স্মরণ মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে, তবে দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে বলে না; বরং আখেরাতের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়। তখন জীবন হয়ে ওঠে উদ্দেশ্যপূর্ণ, কর্ম হয় হিসাব-সচেতন, আর প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হয়।
মুমিনের জন্য মৃত্যুচিন্তা ভয়ের নয়- এটি জাগরণ, সতর্কবার্তা ও অনুপ্রেরণা। এটি মনে করিয়ে দেয়, সময় সীমিত, সুযোগ ক্ষণস্থায়ী; আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আখেরাতের বিনিয়োগ।
অতএব, আসুন- আমরা মৃত্যুকে জীবনের সঠিক পথে চলার এক অবিচ্ছেদ্য সহচর হিসেবে গ্রহণ করি এবং প্রতিটি কাজ এই চেতনায় করি যে, একদিন আমাদের মহান রবের সামনে দাঁড়াতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে মৃত্যুর স্মরণ জাগ্রত করে দিন, জীবনকে তা দ্বারা শুদ্ধ করুন এবং উত্তম পরিণতির অধিকারী হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
লেখক: যুগ্মমহাসচিব- হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এবং প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল- জামি’আতুল ইহসান ঢাকা, পরিচালক- আল ইহসান কিন্ডার গার্টেন (মিরপুর শাখা ও দক্ষিণখান শাখা)।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








