স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কার্যবিবরণীতে ভাষ্য দিয়েছেন—পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে ভারত ও কিছু পশ্চিমা দেশের সমর্থক রাজনীতিবিদ, এনজিও ও ব্যক্তিদের যৌথভাবে ‘মহাপরিকল্পনা’ ছক কাটছে; এর মধ্যে আছে ‘গ্রেটার ত্রিপুরা ল্যান্ড’ গঠনের দাবি এবং পার্বত্যাঞ্চলে পূর্ব তিমুর জাতীয়তাবাদী আলাদা রাষ্ট্রের অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা। কার্যবিবরণীটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রেরণের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
দলগত ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের ঘটনাবলীর পরে সীমান্তাঞ্চলে বিভিন্ন রকম অপতৎপরতা বেড়েছে। এই প্রেক্ষিতে সব গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পার্বত্যচারী সম্পর্কিত প্রতিবেদন সংগৃহীত করে উপদেষ্টা কমিটি হয়ে আলোচনা করেছে এবং সেই আলোকে কার্যবিবরণী তৈরি করা হয়েছে। এতে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক ও কৌশলগত সুপারিশও রাখা হয়েছে।
কার্যবিবরণীর একটি বড় অংশে উল্লেখ রয়েছে—ত্রিপুরার রাজপরিবারের প্রধান প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেব বর্মার উদ্ভাবনী বক্তব্য ও টক শো-সাক্ষাৎকারে তার দেওয়া মন্তব্য-দাবি, যেখানে তিনি পার্বত্যাঞ্চলকে ঐতিহাসিকভাবে ত্রিপুরার অংশ আখ্যা দিয়ে ‘গ্রেটার ত্রিপুরা’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। নথিতে বলা হয়েছে, এমন বক্তব্য স্থানীয় সংবেদনশীলতাকে বড্ডই উসকে দিতে পারে।
অন্যদিকে কয়েকটি পশ্চিমা দেশের এনজিও ও শাস্ত্রীয়-রাজনৈতিক সংগঠনের পার্বত্য এলাকায় তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি সূত্র বলেছেন—সামগ্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, পশ্চিমা এনজিও ও কিছু বামপন্থি সংগঠন পার্বত্যাঞ্চলে ‘পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানের পরিস্থিতির অনুরূপ’ নীতিগত ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ও দেশি-বিদেশি কাজ করা ব্যক্তিদেরও সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা থেকে অস্ত্র ও গোলাবারু সরবরাহ হয়; কখনও-কখনও ভারতীয় গ্রুপগুলো আর্থিক প্রয়োজনে অস্ত্র বিক্রি করে থাকে—এমনও নজরে এসেছে। কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, সম্প্রতি মিজোরাম থেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর জন্য গোলাবারু আনার পরিকল্পনা তথ্য ফাঁস হওয়ায় ব্যর্থ হয়েছে।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
নথিতে বেশ কয়েকটি ব্যক্তির নামও উল্লেখ করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে ‘উসকানি’ ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার অভিযোগ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ির কিছু ঘটনার পরে সৃষ্ট উত্তেজনা মিটিয়ে সত্যতা যাচাই না করেই উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে; এর ফলশ্রুতিতে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ, নিহত-আহত এবং জরুরি আইন প্রয়োগ করা-এর মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, একটি ঘটনায় মেডিকেল বোর্ডও তৈরি করা হয়েছিল এবং নিরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘খাগড়াছড়িতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে; কিছু মহল বহিরাগত ইন্ধনে কাজ করছে।’ সাবেক সচিব শফিউল আজিম জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন এবং পর্যাপ্ত সামরিক-প্রশাসনিক সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে বসবাসকারী সব নাগরিককে মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করা, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নীতিমালা জোরদার করা জরুরি।’
কার্যবিবরণীতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, পার্বত্যাঞ্চলে ধর্ম, ভাষা ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কিছু চিহ্ন দেখা যাচ্ছে—যা সংবেদনশীল বিষয়। রেকর্ড ও গবেষণা উদ্ধৃত করে সাবেক সচিব বলেন, অঞ্চলগুলিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অনুন্নয়নের হার বেড়ে যাচ্ছে, এটিও নজর দেওয়ার মতো বিষয়। তিনি সতর্ক করেন, ‘জাতীয় ও কুটনৈতিক স্তরে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।’
সরকারি মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, কার্যবিবরণীতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—সীমান্ত তল্লাশি জোরদার করা, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম-নিয়ন্ত্রণ কেয়ারফুল কলে দেখা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়নমূলক পাইলট প্রকল্প চালু করা এবং স্থানীয় প্রশাসন-সামরিক সমন্বয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধ করা।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








