।। মাওলানা হাফেজ নাজমুল হাসান কাসেমী ।।
পবিত্র কুরআন কেবল তিলাওয়াতের কিতাব নয়, বরং এটি মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ এক জীবন বিধান। বিশেষ করে কুরআন মাজীদের তরজমা ও এর নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর শুরুতে যে মূল্যবান ভূমিকা ও দিকনির্দেশনা থাকে, তা অনেক সময় পাঠকের সামনে তিলাওয়াতের এক নতুন জগত উন্মোচন করে দেয়। এই ধরনের গভীর ও সারগর্ভ আলোচনা পাঠ করলে কুরআন তিলাওয়াতের প্রকৃত গুরুত্ব ও আদব যেমন উপলব্ধি করা যায়, তেমনি এর নূর ও হিদায়াত লাভের সঠিক পাথেয়ও খুঁজে পাওয়া যায়। কুরআনের সেই অমীয় সুধা পান করতে হলে এর প্রতিটি আয়াতের গভীরে লুকায়িত দর্শনের সাথে নিজের কর্মজীবনকে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ওহীর এই আলো যখন কোনো মুমিনের অন্তরে প্রবেশ করে, তখন তার মধ্যে ইবাদতের গভীর মুহাব্বত ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। সেই উদ্দীপনা ও আদর্শিক চেতনা থেকেই আমাদের কর্মজীবনের পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে।
যেমন সূরা হিজরের শেষ দিকের আয়াতগুলোতে আমাদের কর্মজীবনের জন্য পাথেয় হিসেবে যথেষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। বৃহৎ কলেবরের তাফসির গ্রন্থ অধ্যয়ন করার সুযোগ না হলেও যদি কেবল আমাদের আকাবিরে দ্বীনের লিখিত টীকা-টিপ্পনীগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়া যায় কিংবা গভীর মনোনিবেশের সাথে এই আয়াতগুলো পর্যালোচনা করা যায়, তবে এখান থেকেই আমরা একটি সার্থক ও সুন্দর কর্মজীবনের রূপরেখা পেতে পারি।
এই আয়াতগুলোতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে। তবে আমি বিশেষ করে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রথমেই আসে আত্মসম্মানবোধের কথা। আয়াতগুলো সমষ্টিগতভাবে মানুষের মূল্যবোধকে দারুণভাবে জাগিয়ে তোলে। এর মূল শিক্ষা হলো- একজন আলেমে দ্বীনকে তাঁর নিজস্ব সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। টনটনে মূল্যবোধ নিয়ে তাঁকে কর্মজীবনে পা রাখতে হবে; এ ক্ষেত্রে কোনো রকম আপস বা শিথিলতার সুযোগ নেই।
আত্মসম্মানবোধ: আলেমের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার
বস্তুত আত্মসম্মানবোধ প্রতিটি মানুষের একটি অপরিহার্য গুণ। প্রাণ ও সম্পদের মতোই ইজ্জত-সম্মান মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আর এই মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে কেউ প্রাণ বিসর্জন দিলে তিনি শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)এর একটি হাদীস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ইরশাদ করেছেন- “যে ব্যক্তি নিজের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ।” এই হাদীসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আত্মসম্মান কত বড় নেয়ামত এবং এর সুরক্ষায় আমাদের কতটা সজাগ থাকা উচিত।
সাধারণ মানুষের জন্যই যদি আত্মসম্মানবোধ এত জরুরি হয়, তবে আল্লাহ তাআলা যাঁকে তাঁর দ্বীনের আলেম বানিয়েছেন, যাঁকে কুরআন ও সুন্নাহ তথা ওহীর ইলমের জন্য মনোনীত করেছেন, তাঁর চেতনায় স্বীয় মর্যাদা ও অবস্থান কতটা সজীব থাকা উচিত; তা সহজেই অনুমেয়।
কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যমতে, উলামায়ে দ্বীন হলেন শ্রেষ্ঠতম জামাআত। এই জামাআতের অগ্রভাগে রয়েছেন আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.)। আর তাঁদের মধ্যমণি হলেন সায়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে খোদ নবীজি (সা.)এর সুউচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। যে মহামূল্যবান সম্পদ দিয়ে তাঁকে অলংকৃত করা হয়েছে, বারবার সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার উদ্দেশ্য হলো- এই সম্পদের অধিকারীকে আপন শ্রেষ্ঠত্ব ও দায়িত্বের প্রতি সচেতন রাখা।
সেই মহাসম্পদের এক বিশেষ অংশ হলো ‘আস-সাবউল মাছানি’ (সূরা ফাতিহা)। মাত্র সাত আয়াতের ক্ষুদ্র একটি সূরা হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা এটিকে এক মহিমান্বিত দান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে- “(হে নবী!) আমি আপনাকে দান করেছি সাতটি বারবার পঠিতব্য আয়াত এবং এই মহা কুরআন”। (সূরা হিজর- ৮৭)। বাহ্যত ক্ষুদ্র এই সূরার গুরুত্ব ও মর্যাদা যে দুনিয়া ও তার মধ্যকার সকল সম্পদের চেয়েও বেশি, তা পরবর্তী আয়াতের দিকে লক্ষ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়।
তাই ইরশাদ করা হয়েছে- “আমি তাদের (কাফিরদের) বিভিন্ন শ্রেণিকে ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, তার দিকে আপনি কখনো আপনার দৃষ্টি প্রসারিত করবেন না”। (সূরা হিজর- ৮৮)।
অর্থাৎ, যাঁর কাছে ‘আস-সাবউল মাছানি’র মতো অমূল্য সম্পদ রয়েছে, তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্যশালী। তাঁর জন্য দুনিয়াদারদের রাজকীয় অট্টালিকা বা জৌলুসের দিকে লালায়িত দৃষ্টিতে তাকানো মোটেও শোভা পায় না। বরং সকল জাগতিক সম্পদের বিপরীতে ওহীর এই ইলমকেই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতে হবে।
যিনি ‘আস-সাবউল মাছানী’ বা সূরা ফাতিহার অধিকারী, তিনি এতটাই ঐশ্বর্যবান যে, জগতের অন্য কোনো সহায়-সম্পদের দিকে তাঁর ফিরে তাকানোও শোভা পায় না। দুনিয়াদারদের রাজকীয় অট্টালিকা কিংবা বিলাসবহুল গাড়ি তাঁর কাছে অতি তুচ্ছ ও অকিঞ্চিৎকর মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বরং ওহীর এই মহা-সম্পদের সামনে গোটা দুনিয়াকেই তাঁর কাছে নগণ্য মনে করতে হবে।
একবার চিন্তা করে দেখুন, যিনি সমগ্র কুরআনের জ্ঞান লাভ করেছেন, হাদীস-ভাণ্ডারের অংশীদার হয়েছেন এবং ওহীর ইলমের গভীরে অবগাহন করার সুযোগ পেয়েছেন, তিনি কত বড় সৌভাগ্যবান! তিনি এমন এক জ্ঞানের ধারক, যা মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম মর্যাদায় উন্নীত করে। এই ইলম অর্জনের পথে ফিরিশতারা ডানা বিছিয়ে দেয়, সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত তাঁর জন্য দোয়া করে। ওহীর এই নূর পাশবিকতার অন্ধকার দূর করে মানুষের গুণাবলিকে উৎকর্ষের শিখরে নিয়ে যায়। এটি মানবতার জাগরণ ও শান্তি-নিরাপত্তার একমাত্র দিশারি। এই জ্ঞান কোনো সাধারণ উৎস থেকে আসেনি; বরং স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে তা শিখিয়েছেন। যে জ্ঞানকে কোনো মিথ্যা বা সংশয় স্পর্শ করতে পারেনি এবং যা যুগ-পরম্পরায় অবিকৃত অবস্থায় আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। এই ইলমের চর্চা করেছেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মনীষীগণ, যাঁদের জ্ঞান ও কর্মের মাঝে ছিল এক অপূর্ব সমন্বয়।
আপন জ্ঞান ও মর্যাদা সম্পর্কে এই সচেতনতা নিয়ে যখন একজন আলেমে দ্বীন কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হবেন, তখন তাঁর আচার-আচরণ, লেনদেন, ওঠা-বসা তথা জীবনের প্রতিটি গতি ও যতি হবে স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সাধারণ আট-দশজন মানুষ থেকে তাঁর জীবনধারা হবে ব্যতিক্রম। তাঁর এই আদর্শিক স্বাতন্ত্র্য দেখে জগতের প্রতিটি কণা যেন সরবে-নীরবে বলে উঠবে- “যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?” (সূরা যুমার- ৯)।
সুতরাং এই আয়াত থেকে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা হলো- আমাদের গভীর আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন হতে হবে এবং কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই বিশ্বাস ও আদর্শের পরিচয় দিতে হবে।
দায়িত্বশীলতা: ওহীর আলো ছড়িয়ে দেওয়া
আমাদের দ্বিতীয় প্রধান শিক্ষা হলো- দায়িত্বশীলতা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “আপনি বলুন, আমি তো এক স্পষ্ট সতর্ককারী”। (সূরা হিজর- ৮৯)। এর পরেই এসেছে- “অতএব, আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন”। (সূরা হিজর- ৯৪)।
আলেমে দ্বীন হিসেবে আমাদের ওপর অর্পিত সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এই ইলম হলো মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পথনির্দেশ। এটিই হলো প্রকৃত শিক্ষা ও দীক্ষা। আমরা যেখানেই থাকি, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, আমাদের ভেতরে এই দায়বদ্ধতা থাকতে হবে যে, আল্লাহর দেওয়া এই ইলমের আমানত আমরা যথাযথভাবে আদায় করছি কি না। আমার মাধ্যমে মানুষ দ্বীনের আলো পাচ্ছে কি না, তারা সুন্দর চরিত্র (আখলাকে হাসানাহ) শিখছে কি না কিংবা হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝতে পারছে কি না- এই চিন্তা সর্বদা জাগ্রত রাখতে হবে।
আলেমে দ্বীন হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য কেবল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করা জরুরি নয়। একজন আলেম যেখানেই থাকবেন, সেখান থেকেই তিনি দ্বীনের খিদমত করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যবসায়ী আলেম তাঁর ব্যবসা ক্ষেত্রে খরিদ্দার ও ব্যবসায়ী সমাজের মাঝে ইলমের আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন।
এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন হযরত মাওলানা মনযুর নুমানী (রহ.)। তিনি তাঁর পত্রিকা ‘আল-ফুরকান’-এর মাধ্যমে যে খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, তা লক্ষাধিক আলেমের সাধারণ প্রচেষ্টার চেয়েও অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়েছে। ভারত উপমহাদেশের ইলম, আমল ও আখলাকের জগতে ‘আল-ফুরকান’ যে বিপ্লব ঘটিয়েছে, তার নজির মেলা ভার।
দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘জওয়াবদিহিতা’। এই জওয়াবদিহিতা কেবল মানুষের কাছে নয়, বরং সবার আগে নিজের বিবেকের কাছে এবং আল্লাহর কাছে। আমি যে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছি, তা কতটুকু নিষ্ঠার সাথে পালন করছি; সেই হিসাব নিজের কাছে দিতে হবে। মাদ্রাসার মুহতামিম, প্রতিষ্ঠান প্রধান কিংবা সমাজকে জবাব দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু আসল বিষয় হলো নিজের অন্তরের তৃপ্তি এবং আল্লাহর দরবারে দায়মুক্ত হওয়া। প্রতিটি আলেমের উচিত প্রতিনিয়ত নিজেকে এই প্রশ্ন করা- আমি কি আমার দায়িত্ব পালনে যথাযথ সচেতন?
উদার দৃষ্টিভঙ্গি: হৃদয়ের বিশালতা
উক্ত আয়াতগুলো থেকে আমরা যে তৃতীয় শিক্ষাটি লাভ করি, তা হলো- আলেমে দ্বীনকে অবশ্যই উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হতে হবে। তাঁর অন্তর হতে হবে আকাশের মতো বিশাল এবং সাগরের মতো বিস্তৃত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- “অতএব, আপনি পরম সৌজন্যের সাথে ক্ষমা করুন। আর মুমিনদের জন্য আপনার পাখা অবনমিত করুন এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন”। (সূরা হিজর- ৮৫-৮৮)।
এই আয়াতগুলো আমাদের শিক্ষা দেয়- হৃদয়কে সাগরের মতো প্রশস্ত করো, মহানুভব হও। অন্যথায় আপন মহান জিম্মাদারি যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হবে না; বরং অল্পতেই মানুষ ক্লান্ত, হতোদ্যম ও ভেঙে পড়বে।
এই উদারতার বিভিন্ন দিক রয়েছে। একটি দিক হলো- দ্বীনী কাজের সকল শাখাকে আপন করে নেওয়া। আমি দাওয়াত ও তাবলীগের জেনারেল শিক্ষিত ছাত্রদের বিদায়বেলায় একটি কথা প্রায়ই বলে থাকি। তাদেরকে বলি- দ্বীনের কাজ বহু ধারায় হচ্ছে। কেউ মাদরাসা করছে, কেউ মসজিদ আবাদ করছে, কেউ খানকার মাধ্যমে ইসলাহী কাজ করছে, আবার কেউ দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানে মেহনত করছে। প্রতিটি ক্ষেত্রই অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
আমার একার পক্ষে তো সকল ময়দানে কাজ করা সম্ভব নয়। তাই আমি যখন একটি শাখায় কাজ করছি, তখন অন্য শাখায় যারা শ্রম দিচ্ছেন তারা সবাই আমার সহযোগী। কাজ যেহেতু সবগুলোই অপরিহার্য, তাই তারা আমার বোঝা লাঘব করছেন। এই সহযোগিতার মনোভাব আমাদের মাঝে থাকতে হবে। দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে কোনো ভুলত্রুটি পরিলক্ষিত হলে তা সংশোধনের ফিকির করতে হবে, কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষ ভাবা চলবে না। একইভাবে খানকার মাধ্যমে যে তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির কাজ হচ্ছে, তাতে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে; কিন্তু তারা আমাদের শত্রু নয়, বরং সহযোগী।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা একই হকের ওপর কাজ করছি। সুতরাং কারো সমালোচনা বা প্রতিপক্ষ ভাবার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আমি কিছুতেই ‘ফিরকাবন্দী’ বা গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতার শিকার হব না। এই বিভেদ আমাদের শক্তিকে তছনছ করে দিয়েছে। আমরা এক বিশাল জামাআত হওয়া সত্ত্বেও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষুদ্রতার কারণে আজ ছিন্নভিন্ন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ‘সহীহ নাহজ’ বা সঠিক আদর্শের ওপর যারা যে ময়দানেই কাজ করছেন, সবার প্রতি আমাদের উদার ও সহযোগিতামূলক হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
সহনশীলতা: আদর্শিক ধৈর্যের পরিচয়
উদারতার দ্বিতীয় দিকটি হলো- নিজ কর্মক্ষেত্রে অন্যের আচার-আচরণে ধৈর্য ধারণ করা। মানুষের রূঢ় ব্যবহারে বা সমালোচনায় মন খারাপ করা চলবে না। আল্লাহ তাআলা নবী কারীম (সা.)কে লক্ষ করে বলেছেন- “আমি জানি যে, তাদের (কাফিরদের) কথা-বার্তায় আপনার অন্তর সংকুচিত হয়”। (সূরা হিজর- ৯৭)।
মানুষ আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করতে পারে- সেটা হতে পারে সহকর্মী, প্রতিপক্ষ কিংবা সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে। সমাজ হয়তো অনেক সময় ‘কাঠমোল্লা’ বলে বিদ্রুপ করবে, কিংবা ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’ বলে আমাদের কর্মতৎপরতাকে সীমাবদ্ধ করতে চাইবে। এসব শুনে মন ছোট করা চলবে না। মনে রাখতে হবে, সায়্যিদুল মুরসালিন (সা.)কেও তারা কবি, জাদুকর ও উন্মাদ বলে গালি দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন- যখন মন সংকুচিত হবে, তখন মহান রবের দিকে রুজু হতে এবং তাঁর তাসবীহ পাঠ করতে।
হাদীসে কুদসিতে এসেছে- আল্লাহর চেয়ে বড় ধৈর্যশীল আর কে আছেন? মানুষ তাঁর সাথে শিরক করে, তাঁর সন্তান আছে বলে অপবাদ দেয়, অবলীলায় তাঁর নাফরমানি করে; তবুও তিনি সবাইকে রিযিক দেন এবং সহ্য করেন। আমাদের এই খোদায়ী গুণ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মানুষ আমাদের সাথে যে আচরণই করুক না কেন, বিনিময়ে আমাদের আচরণ হতে হবে সহনশীল ও মার্জিত। সমুদ্র যেমন সব আবর্জনা বুকে নিয়েও অপবিত্র হয় না, আলেমের অন্তর তেমন বিশাল হলে কোনো কালিমা তাকে কলুষিত করতে পারবে না।
উঁচু হিম্মত ও সৎসাহস
এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি আত্মসম্মানবোধ, দায়িত্বশীলতা এবং উদারতা নিয়ে। সার্থক কর্মজীবনের জন্য এর পরেই যে গুণটি অপরিহার্য, তা হলো- সৎসাহস ও উঁচু হিম্মত। দ্বীনের পথে চলতে গেলে আমাদের হিম্মত হতে হবে পাহাড়ের মতো অটল। পবিত্র কুরআন আমাদের সেই সাহসই জোগায়। ইরশাদ হয়েছে- “অতএব, আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন। বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই আপনার জন্য যথেষ্ট”। (সূরা হিজর- ৯৪-৯৫)।
যদি আমরা আমাদের ওপর অর্পিত দ্বীনি জিম্মাদারিতে একনিষ্ঠভাবে লেগে থাকি, তবে আল্লাহর সাহায্য সুনিশ্চিত। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত জোর দিয়ে (তাকীদের সাথে) ইরশাদ করেছেন- “আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী”। (সূরা হজ্জ- ৪০)।
আল্লাহর এই ওয়াদার কোনো ব্যত্যয় নেই। সারা পৃথিবী যদি আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায়, তবুও আল্লাহ একাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর যার সাথে স্বয়ং মালিক রয়েছেন, তার ভয় কীসের? শক্তির উৎস তো আল্লাহ। আমরা অতি ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ হতে পারি, কিন্তু যেহেতু আমরা মহান রবের মহান কাজে নিয়োজিত আছি, সেহেতু এর সকল সরঞ্জাম ও তাওফীক তিনিই দান করবেন। যার হিম্মত যত বেশি, তার দ্বারা দ্বীনের খিদমতও তত বড় হয়। উঁচু হিম্মত থাকলে কঠিন থেকে কঠিনতর কাজও সহজ হয়ে যায়।
শৃঙ্খলাবোধ: জীবন ও কর্মে বরকতের চাবিকাঠি
আমাদের কর্মজীবনের জন্য আরেকটি অতীব জরুরি বিষয় হলো- শৃঙ্খলাবোধ। এটি এমন এক গুণ, যা মানুষের সময়, সম্পদ ও কর্মে বরকত বয়ে আনে। শৃঙ্খলার গুরুত্ব বোঝাতে একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। রাস্তাঘাটে যখন গাড়ি চলে, তখন প্রত্যেকেই চায় সবার আগে যেতে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সবাই যখন ট্রাফিক নিয়ম ভেঙে একে অন্যকে টপকে যেতে চায়, তখন জট পাকিয়ে যায়। ফলে আর কারোই আগে যাওয়া হয় না, বরং সবাই পিছিয়ে পড়ে। জীবনের পথও ঠিক তেমন; শৃঙ্খলাহীনতা আমাদের লক্ষ্যচ্যুত করে দেয়।
দুঃখজনকভাবে আমাদের ভেতর এই শৃঙ্খলাবোধের বড় অভাব। অথচ একজন আলেমের প্রতিটি কাজ হওয়া উচিত সুশৃঙ্খল। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের মিতব্যয়ী ও সুশৃঙ্খল হওয়া জরুরি। আল্লাহ তাআলা রিজিক বণ্টন করেছেন তাঁর নিগূঢ় হিকমতে। তিনি দুনিয়াদারদের হয়তো প্রাচুর্য দিয়েছেন, কিন্তু আমাদের দিয়েছেন ওহীর ইলম। আমাদের সম্পদ সীমিত; এখানে যদি আমরা বিশৃঙ্খল হই, তবে মুসিবতের শেষ থাকবে না। যদি আমরা গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতিটি পয়সা ব্যয় করি, তবে এই অল্প টাকাতেই অনেক বরকত হবে।
একই কথা সময়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রতিদিনের রুটিন যদি সুশৃঙ্খল হয় এবং সময়ের কাজ সময়ে করা হয়, তবে দেখা যাবে পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজে অভাবনীয় উন্নতি ঘটছে। শৃঙ্খলাহীন পড়াশোনা কখনো গভীরতায় পৌঁছাতে পারে না। আমরা যদি সময়কে শৃঙ্খলার জালে বাঁধতে পারি, তবে অল্প সময়েই উম্মতের জন্য অনেক বড় কাজ আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে ওহীর এই আদর্শ বুকে ধারণ করে সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক- জামিয়াতুন নূর আল কাসেমিয়া উত্তরা, ঢাকা, খতীব- বাইতুন নূর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, উত্তরা- ১২, ঢাকা, সহসভাপতি- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, নায়েবে আমীর- হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ







