।। মাওলানা আনওয়ার শাহ আযহারী ।।
রমজানুল মুবারক হলো আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য বসন্ত। এটি রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মহিমান্বিত এক মৌসুম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রমজানকে অতি অল্প সময়ের বিশেষ সুযোগ হিসেবে অভিহিত করে ইরশাদ করেছেন— “أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ” — “গণনাযোগ্য কয়েকটি দিন” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৪)। অর্থাৎ এই সময়টুকু অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর রূহানি প্রভাব চিরন্তন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। ইবাদতের এই পবিত্র মৌসুমটি আজ অনেকের কাছে নিছক ‘বিনোদন মৌসুমে’ পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির এই ডামাডোলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি রমজানের হাকিকত ও পবিত্রতা রক্ষা করতে পারছি? নাকি ডিজিটাল পর্দার মায়াবী হাতছানি আমাদের হৃদয়ের নূরকে ম্লান করে দিচ্ছে?
রমজান ও বিনোদন-সংস্কৃতির অদৃশ্য ছোবল
রমজান এলেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথাকথিত বিশেষ সিরিয়াল ও অনুষ্ঠানের জোয়ার শুরু হয়। এসবের বিশাল একটি অংশ মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত করার পরিবর্তে গাফিলতি, ভোগবাদ ও অনৈতিকতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন- رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ > “ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি, যে রমজান পেল অথচ নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না।” (জামে তিরমিজি)
রমজানে একটি রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। সেই মহা-মূল্যবান রাত যদি স্ক্রিনের সামনে অসার বিনোদনে অপচয় হয়, তবে তার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অসার কথাবার্তা ক্রয় করে।” (সূরা লুকমান: ৬) হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘অসার কথাবার্তা’ (লাহওয়াল হাদীস) বলতে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বুঝিয়েছেন। সুতরাং যা মানুষকে বন্দেগি থেকে বিমুখ করে, তা মুমিনের জন্য অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
প্রযুক্তি: নিয়ামত না গাফিলতির সোপান?
প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্দ নয়; এটি দ্বীনি জ্ঞানার্জনের সহজ মাধ্যমও হতে পারে। তবে এর অপব্যবহারই মানুষের পতন ঘটায়। নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন- “দুটি নিয়ামত এমন রয়েছে, যাতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।” (সহিহ বুখারি)
আরও পড়তে পারেন-
- প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের বিবাহ্ সম্পর্কে শরয়ী বিধান
- ইসলামের আলোকে নারীর কর্মপরিধি
- সালাম: উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি রক্ষার অন্যতম বাহন
- বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ: বাস্তবতা ও অপপ্রচার
- সকালের ঘুম যেভাবে জীবনের বরকত নষ্ট করে
রমজান হলো অবসরকে ইবাদতের পুঁজিতে রূপান্তরের শ্রেষ্ঠ সময়। অথচ অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরর্থক সময় কাটায়। অথচ এই প্রযুক্তিই হতে পারে—
- কুরআন তিলাওয়াত শোনার তরী।
- তাফসির ও হাদিস পাঠের জানালা।
- হাক্কানি উলামায়ে কেরামের নসিহত গ্রহণের মাধ্যম।
রমজানে ডিজিটাল সংযম ও ভারসাম্যের ৫টি দিকনির্দেশনা
১. ব্যবহারের সময়-নিয়ন্ত্রণ: স্মার্টফোন ও ডিজিটাল স্ক্রীনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন। লক্ষ্য রাখুন, ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে যেন তিলাওয়াত বা জিকিরের মুহূর্তগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
২. উত্তম কন্টেন্ট নির্বাচন: বিনোদন নয়, বরং দ্বীনি ফায়দাকে অগ্রাধিকার দিন। ইসলামি অ্যাপ, তিলাওয়াত ও নির্ভরযোগ্য আলেমের দারসকে সঙ্গী বানান।
৩. অনৈসলামিক অনুষ্ঠান বর্জন: রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। পাপাচার ও অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক করে তোলে এমন যাবতীয় সিরিয়াল বা নাটক পরিহার করা ঈমানি দায়িত্ব।
৪. পারিবারিক আধ্যাত্মিক পরিবেশ: ইফতারের পর টেলিভিশনের সামনে না বসে পরিবার নিয়ে তিলাওয়াত, দ্বীনি কিতাব পাঠ ও কিয়ামুল লাইলের চর্চা করুন।
৫. সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরত্ব: সামাজিক মাধ্যমে অহেতুক তর্ক, গীবত ও অর্থহীন স্ক্রলিং থেকে নিজেকে সংযত রাখুন। রোজা শুধু পেটের নয়, বরং চোখের ও কানেরও হওয়া চাই।
মধ্যপন্থার অমীয় শিক্ষা
ইসলাম উগ্রতা বা চরমপন্থা শেখায় না। আল্লাহ বলেন: “এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত করেছি।” (সূরা আল-বাকারা: ১৪৩)। অতএব, প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ বর্জন নয়, বরং এর সচেতন ও সংযত ব্যবহারই কাম্য। রোজা যেমন আমাদের খাদ্যে সংযম শেখায়, রমজানের তাকওয়া তেমনি আমাদের স্ক্রিন বা পর্দার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংযমী হতে উদ্বুদ্ধ করে।
উপসংহার: হৃদয় পরিবর্তনের দৃপ্ত অঙ্গীকার
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- “যখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।” (বুখারি ও মুসলিম)
শয়তান যখন শৃঙ্খলিত, তখন আমরা কেন নফসের গোলাম হয়ে প্রযুক্তির জালে আটকা পড়ব? আসুন, এই রমজানকেই আমলনামা পুনর্লিখনের সুযোগ বানাই। ডিজিটাল পর্দা যেন আমাদের হৃদয়ের নূর হরণ করতে না পারে। অল্প কয়েকটি দিনকে এমনভাবে ইবাদতে বিনিয়োগ করি, যাতে কিয়ামতের ময়দানে তা আমাদের জন্য নাজাতের অসিলা হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: তরুণ আলেমে-দ্বীন, সিনিয়র শিক্ষক- জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এসএএম








