মূল: শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)
ভাষান্তর: মুফতি ইলিয়াস বিন নাজেম
ইসলামী আদবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- ঘরে প্রবেশের শালীনতা ও অনুমতির বিধান। একজন মুমিনের চলন-বলন এমন হবে, যাতে কারও মনে ভয়, সন্দেহ বা অস্বস্তি সৃষ্টি না হয়।
ঘরে প্রবেশের পূর্বে আগমনের জানান
যখন তুমি ঘরে প্রবেশ করবে, তখন ঘরের লোকদের কাছে পৌঁছার আগেই তোমার আগমনের জানান দাও; যেন তোমার হঠাৎ উপস্থিতিতে তারা ভীত না হয় এবং তোমাকে দোষ-তালাশকারীর মতো মনে না করে।
আবু উবাইদা আমির ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রহ.) বলেন, “তুমি যখন ঘরে প্রবেশ করবে, তখন এমন আচরণ করো যাতে ঘরের লোকেরা স্বাভাবিক হতে পারে”, অর্থাৎ কথা বলা, কাশির শব্দ করা বা জুতার আওয়াজ শোনানো ইত্যাদির মাধ্যমে আগমন বোঝানো।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন, ব্যক্তি যখন নিজ ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তার জন্য মুস্তাহাব হলো- গলা পরিষ্কার করা কিংবা জুতার আওয়াজ দেওয়া। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ (রহ.) বলেন, আমার পিতা যখন মসজিদ থেকে ফিরতেন, ঘরে প্রবেশের পূর্বে পায়ের শব্দ করতেন বা কণ্ঠস্বর তুলতেন, যাতে ঘরের লোকেরা তাঁর আগমনের খবর পায়।
বুখারি ও মুসলিম শরিফে হযরত জাবের (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিষেধ করেছেন- কেউ যেন রাতের বেলা সফর থেকে এসে আকস্মিকভাবে ঘরে প্রবেশ না করে; যেন সে দোষ অনুসন্ধানকারী বা আক্রমণকারীর ন্যায় না হয়।
এ শিক্ষায় স্পষ্ট যে, ইসলামে পারিবারিক পরিসরও সম্মান ও সংবেদনশীলতার দাবিদার।
কক্ষে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি গ্রহণ
পরিবারের কেউ যদি নিজ কক্ষে অবস্থান করে এবং তুমি তার কাছে যেতে চাও, তবে পূর্বানুমতি গ্রহণ করবে- যেন তাকে এমন অবস্থায় না দেখো যা সে অপছন্দ করে, কিংবা যা দেখা তোমার জন্যও অস্বস্তিকর। এটি মাহরাম-গায়রে মাহরাম সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; এমনকি মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে; সবার জন্যই।
ইমাম মালেক (রহ.) তাঁর ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থে হযরত আতা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি আমার মায়ের কাছে যেতে অনুমতি নেব?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’। লোকটি বলল, ‘আমি তো তাঁর সাথেই থাকি’। নবীজি বললেন, ‘তবুও অনুমতি নেবে’। সে বলল, ‘আমি তাঁর খেদমত করি’। নবীজি বললেন, ‘তুমি কি তাঁকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে চাও?’ লোকটি বলল, ‘না’। তিনি বললেন, ‘তাহলে অনুমতি নেবে’।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.)এর কাছে অনুরূপ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এমন অবস্থাও তো হতে পারে যা দেখা তোমার পছন্দ হবে না’। তাঁর স্ত্রী যায়নাব (রহ.) বলেন, তিনি ঘরে প্রবেশের আগে গলা পরিষ্কার করতেন, যাতে কাউকে অপ্রস্তুত অবস্থায় না দেখেন।
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাযি.)কেও জিজ্ঞেস করা হলে তিনি অনুমতির প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করেন। তাবেয়ী মুসা বিন তালহা (রহ.) বলেন, তিনি পিতার সঙ্গে মাতার কক্ষে প্রবেশ করতে গিয়ে অনুমতি না নেওয়ায় তিরস্কৃত হন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.)কে যখন প্রশ্ন করা হলো, নিজের বোনদের কক্ষে প্রবেশের জন্যও কি অনুমতি লাগবে? তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করেন-
وَإِذَا بَلَغَ الْأَطْفَالُ مِنكُمُ الْحُلُمَ فَلْيَسْتَأْذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ
অর্থাৎ, “তোমাদের শিশু যখন বালেগ হয়, তখন তারা যেন অনুমতি প্রার্থনা করে- যেমন তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতি প্রার্থনা করত”।
তিনি বলেন, সুতরাং যে কোনো ব্যক্তির কক্ষে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি প্রার্থনা করা আবশ্যক।
ইবনে মাসউদ (রাযি.) বলেন, ব্যক্তি তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন- সবার কাছেই অনুমতি নেবে। জাবের (রাযি.) বলেন, ব্যক্তি তার সন্তান ও মায়ের কাছ থেকেও অনুমতি নেবে, যদিও মা অতি বৃদ্ধা হন।
ইসলাম আমাদের এমন এক আদব শিখিয়েছে, যা ঘরের দরজা পেরোনোর মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়। বাইরে আমরা যতই শালীন হই না কেন, ঘরের ভেতর যদি সৌজন্য ও সংবেদনশীলতা না থাকে, তবে সেই শালীনতা অপূর্ণ থেকে যায়।
আগমনের জানান দেওয়া কিংবা অনুমতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করা- দেখতে ছোট একটি আচরণ; কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সম্মান, হায়া এবং পারস্পরিক আস্থার গভীর শিক্ষা। মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান, যেই হোক, প্রত্যেকেরই একটি ব্যক্তিগত পরিসর আছে। সেই পরিসরকে সম্মান করাই প্রকৃত আদব।
আজ আমাদের বহু পারিবারিক অশান্তির পেছনে রয়েছে অসচেতনতা, আকস্মিকতা এবং পরস্পরের সীমারেখা অমান্য করা। অথচ সুন্নাহর এই সহজ শিক্ষাগুলো অনুসরণ করলে ঘরই হয়ে উঠতে পারে শান্তির ঠিকানা।
আসুন, আমরা নিজেদের আমল থেকে শুরু করি। দরজায় কড়া নাড়া, কণ্ঠস্বর দেওয়া, অনুমতি চাওয়া- এই সামান্য অভ্যাসগুলোই ধীরে ধীরে আমাদের ঘরকে আদবের চর্চাক্ষেত্রে পরিণত করবে। কারণ, একটি আদর্শ সমাজ গড়ে ওঠে আদর্শ পরিবার থেকে, আর আদর্শ পরিবার গড়ে ওঠে ছোট ছোট সুন্নাহর যত্নশীল চর্চায়।
অনুবাদক: মুহতামিম- দারুল উলূম ফেনী, খতীব- জহিরিয়া মসজিদ, ফেনী।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








