Home ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন ইনকারুস সুন্নাহ: ইতিহাস, ধারণা ও সমকালীন প্রেক্ষিত

ইনকারুস সুন্নাহ: ইতিহাস, ধারণা ও সমকালীন প্রেক্ষিত

।। সালাহুদ্দীন তোফেল ।।

আহলে কুরআন পরিচিতি:

আহলে কুরআন বলতে এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়, যে ইসলামের প্রামাণ্য-উৎস হিসাবে কুরআনকে যথেষ্ট মনে করে এবং হাদীসকে অস্বীকার করে। হাদীস পরিপূর্ণ অস্বীকার করুক বা হাদীসের অংশবিশেষ। এখানে হাদীস বলতে সুন্নাহ উদ্দেশ্য। শব্দটি অনেকটা ব্যাপক। তথা নবীজি (সা.)-এর মৌখিক আদেশ-নিষেধ, ক্রিয়াকলাপ, মৌন সমর্থন বা স্বীকারোক্তি— এসবকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই মতবাদে যারা বিশ্বাসী, প্রাথমিক ভাবে তাদের মুনকিরুস সুন্নাহ বলা হতো। আর এই মতবাদকে বলা হতো ইনকারুস সুন্নাহ বা ইনকারে হাদীস। আধুনিককালে তাদের আহলুল কুরআন বা কুরআনিস্ট বলা হয়। তবে কুরআনিস্ট মতবাদকে ব্যাখ্যা করলে আরও দু’টি দল এবং ভিন্ন দু’টি নাম সামনে আসে। কারণ, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করতেন, হাদীস যুক্তির ত্রিসীমা ছাড়িয়ে গেলে এবং বোধবুদ্ধির উর্ধ্বে হলে, তা গ্রহণ করা যাবে না। তাদের বলা হয় ‘আকলানিয়্যূন’ তথা যুক্তিবাদী। আবার কেউ কেউ মনে করতেন, হাদীস যুগোপযোগী ও সময়সাপেক্ষ না হলে, তা প্রাত্যাখ্যাত হবে। তাদের বলা হয় ‘আসরানিয়্যূন’ তথা সময়োপযোগবাদী। এগুলোর সবিস্তর আলোচনা সামনে করা হবে।

হাদীস অস্বীকার বিষয়ক নবীজি (সা.)-এর ভবিষ্যৎবাণী:

যেভাবে সাবায়ী, খারেজী, রাফেজী প্রভৃতি ফিতনা বিষয়ে নবীজি (সা.)-এর ইঙ্গিত মূলক ভবিষ্যৎবানী পাওয়া যায়, ঠিক সেভাবে ইনকারে সুন্নাহ বিষয়েও নাবীজি (সা.)-এর পূর্বইঙ্গিত পাওয়া যায়। আবু দাউদ (রহ.) একটি বর্ণনায় এটি উল্লেখ করেছেন। মিকদাম ইবনু মাদিকারিব (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেছেন—

শুনে রাখো! নিশ্চয়ই আমাকে কিতাব (কুরআন) দেওয়া হয়েছে এবং তার সঙ্গে তার মতো আরেকটি (সুন্নাহ) দেওয়া হয়েছে। শুনে রাখো! অচিরেই এমন একজন মানুষ আসবে, আত্মতৃপ্ত হয়ে তার আসনে হেলান দিয়ে বসে বলবে, ‘তোমরা এই কুরআনই আঁকড়ে ধরো; এতে যা হালাল পাবে, তাকে হালাল বলে গ্রহণ করো। আর যা হারাম পাবে, তা হারাম হিসাবে গ্রহণ করো। (সুনানু আবি দাউদ, হাদীস: ৪৬০৪, শুয়াইব আরনাউত বলেছেন, হাদীসটি সহীহ- ৭/১৩, দারুর রিসালাহ, প্রকাশ: ১৪৩০ হি.)

এই একই অর্থের ভিন্ন একটি হাদীস আবু রাফি’ (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবীজি (সা.) বলেছেন— আমি যেনো তোমাদের মধ্যে এমন কাউকে না পাই, যে তার আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকে; তার কাছে আমার কোনো বাণী পৌঁছায়, তা হোক আমি যে বিষয়ে আদেশ দিয়েছি কিংবা নিষেধ করেছি— আর তখন সে বলে, আমি জানি না; আমরা তো কেবল আল্লাহর কিতাবে যা পাই, তাই-ই অনুসরণ করি। (সুনানু আবি দাউদ, হাদীস: ৪৬০৬, শুয়াইব আরনাউত বলেছেন, সহীহ- ৭/১৫)

কুরআনিস্টদের উৎপত্তির ইতিহাস:

হাদীস অস্বীকারের সূচনাকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি; পুরাতন ধারা এবং আধুনিক ধারা। প্রথমে পুরনো ধারাটি নিয়ে আলোচনা করি।

হিজরী চল্লিশের দশকে এর প্রাথমিক সূচনা। এক ব্যক্তি ইমরান বিন হুসাইন (রা.)-এর কাছে কিছু বিষয় জানার জন্য প্রশ্ন করেছেন। তখন ইমরান বিন হুসাইন (রা.) হাদীস থেকে বিষয়গুলোর সমাধান দিলেন। তখন সে ব্যক্তি বললেন, আপনি আল্লাহর কিতাব থেকে বলুন, এর বাহিরে কিছু বলবেন না। ইমরান বিন হুসাইন (রা.) তখন বললেন— তুমি তো দেখি একেবারেই নির্বোধ মানুষ! তুমি কি আল্লাহর কিতাবে (কুরআনে) পেয়ে থাকো যে, যোহরের নামাজ চার রাকআত এবং তাতে জোরে কিরাআত পড়া যাবে না? তারপর তিনি তার সামনে সালাত, যাকাত ইত্যাদি উল্লেখ করে বললেন, তুমি কি এসব কিছু আল্লাহর কিতাবে স্পষ্টভাবে পেয়ে থাকো? বরং আল্লাহর কিতাব তো এগুলোকে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছে, আর সুন্নাহই এগুলো ব্যাখ্যা করে। (বিস্তারিত- জামিয়ূ বয়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার্, হাদীস: ২৩৪৮, ২/১১৯২, দারু ইবনুল জাওজি, প্রকাশ ১৪১৪ হি. আবু ইসহাক ইব্রাহিম দিময়াতী বলেছেন, হাদীসটি হাসান আল- কিফায়া, খতীব বাগদাদী, পাদটীকা, ১/ ৮২-৮৫, দারুল হুদা, প্রথম প্রকাশ ১৪২৩ হি.)

হাদীস অস্বীকারের ইতিহাসে এই ঘটনা সর্বপ্রথম। তবে প্রশ্নকারী তার ভুল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হাদীস বিষয়ে এমন কথা বলেছেন। ইমরান বিন হুসাইন যখন তাকে বিষয়টি শুধরে দিলেন, তখন তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। তাই এই ঘটনাকে অনেকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেন এবং হাদীস অস্বীকারের ইতিহাসে উল্লেখ করেন না। সে হিসাবে হাদীস অস্বীকারের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নাম আসবে খারেজীদের।

খারেজীরা ‘ফিতনা’র পূর্বকার সমস্ত সাহাবিদের সততা ও ন্যায়নীতি সম্পর্কে একমত ছিল। ফিতনা থেকে উদ্দেশ্য হলো, জঙ্গে জামাল (উষ্ট্রী যুদ্ধ), সিফফীন যুদ্ধ এবং হুকুম (জটিল একটি অধ্যায়)। কিন্তু ফিতনা পরবর্তী হযরত আলী, উসমান এবং যারা জঙ্গে জামালে অংশ নেন, হুকুম সম্পর্কে একাত্মতা পোষণ করেন— সবাইকে তারা কাফির বলা শুরু করে। এই দৃষ্টির প্রেক্ষিতে তারা সিংহভাগ সাহাবা, ভিন্ন ভাষায় জুমহুরে সাহাবা থেকে হাদীস নেওয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে এঁরা ছিলেন কাফির। তারা গুটিকয়েক সাহাবিদের থেকে কেবল হাদীস নিতো। এটা একপ্রকার হাদীস অস্বীকারেরই নামান্তর।

এরপর শুরু হয় শিয়াদের জয়জয়কার। তারা আবু বকর, উমর, উসমান, আয়েশা, তালহা, জুবায়ের, মুয়াবিয়া ও জুমহুরে সাহাবা (রা.) নিয়ে বিষোদগার শুরু করে। তাদের ঘৃণা করে। তাই কোনো সাহাবা থেকে তারা হাদীস নেয় না। তবে যাদের সম্পর্কে জানা আছে, তারা আলী (রা.)-কে সহায়তা বা তার সমর্থন করেছেন, তাদের থেকে হাদীস নেয়। এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ সাহাবা মোটে পনেরো জন।

এরপর সামনে আসে মুতাজিলাদের ফিতনা। তারা ২২ দলে বিভক্ত। তাদের কেউ কেউ সরাসরি হাদীস অস্বীকার করে, আবার কেউ কেউ ক্ষেত্রবিশেষ গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের নীতি অবলম্বন করে, আবার কেউ হাদীস গ্রহণে এমন কিছু শর্তারোপ করে, যেগুলির উপস্থিতি মোটের উপর অসম্ভব। প্রত্যেক দলের পৃথক পৃথক মূলনীতি ও মতামত আছে। এ-সবেরের দীর্ঘ পর্যালোচনায় না গিয়ে মৌলিক ভাবে তাদের নাতিদীর্ঘ আলোচনা করি। তারা মৌলিক কিছু নীতিতে একমত। তাদের পাঁচটি মূলনীতি আছে, যেখানে এসে সবাই যূথবদ্ধ। তা হলো যথাক্রমে (১) তাওহীদ,  (২) আদল, (৩) মানজিলা বায়নাল মানজিলাতাইন, (৪) ওয়াদা ও ওয়ায়িদ, (৫) আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার। এ-সবকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে আকল তথা যুক্তি। দীন ও শরীয়ত প্রশ্নে যা যুক্তির পরিপন্থী হবে, তা নিশ্চিত প্রাত্যাখ্যাত হবে। হোক তা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বা সকলের ঐক্যমতে প্রমাণিত। এই নীতির প্রেক্ষিতে বহু হাদীস তারা অস্বীকার করে বসে। আব্বাসি খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ (শাসনকাল ২৩২–২৪৭ হি.)-এর সময়ে মুতাজিলা ফিতনা একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মতবাদ ও মতাদর্শকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসাবে ঘোষণা দেন। এরপর সমষ্টিগত এই ফিতনা তথা হাদীস অস্বীকারের মতবাদ শিকড় গেঁড়ে বসতে পারেনি। মাঝেমধ্যে  এই মতবাদ মাথা ছাড়া দিলেও তা ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং সাময়িক। তবে এই ফিতনা নতুন ভাবে গজতে শুরু করে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে। মিশর এবং ভারত উপমহাদেশ যেনো উভয়ই হাত ধরাধরি করে এই ফিতনাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে। বোঝার সুবিধার্থে ইনকারে সুন্নাহ-এর ভারত উপমহাদেশের ধারা এবং মিশরের ধারা নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা করবো।

কুরআনিস্টদের আধুনিক ধারা:

ভারত উপমহাদেশে হাদীস অস্বীকারের সূচনা হয় উনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের দিকে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান (মৃ ১৮৯৮ইং) এর গোড়াপত্তন করেন। স্যার ছিলেন একজন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও রাজনীতিবিদ। প্রাগম্যাটিজম, অধিবিদ্যা, ভাষা, নন্দনতত্ত্ব, খ্রিস্টান ও ইসলাম— এ-সব ছিল তাঁর আগ্রহের বিষয়। তিনিই ছিলেন আলিগড় আন্দোলনের পুরোধা এবং প্রধান পুরুষ। ভারতের মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার ইস্পাত কঠিন শপথ নিয়ে তিনি নানান কার্যক্রম শুরু করেছেন। তবে তিনি আধুনিকতার ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন নি। আধুনিকতার ব্যাধিতে তিনি রোগাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে এসে তিনি যুক্তির সহায়তা নেন এবং যুক্তির তুলাদণ্ডে ইসলামকে বিচার করতে শুরু করেন। কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। ‘দি মোহামেডান কমেন্ট্রি অন দি হোলি কোরআন’ নামে একটি তাফসির গ্রন্থও লিখেন। এতে আদম (আ.)-কে ফিরিস্তারা সেজদা করার কাহিনি এবং কুরআনের অন্যান্য ঘটনাকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেন। বলা যায়, তিনি আধুনিকতার কবলে পড়ে একপ্রকার আত্মপ্রবঞ্চিত হয়েছেন। ফলত তার মধ্যে জন্ম নেয় নানা বিকৃতি ও ভ্রষ্টতা। এই মানদণ্ডে তিনি হাদীসকেও বিচার করেছেন এবং অযৌক্তিকতার যুক্তি দিয়ে হাদীসের বিশাল একটি অংশকে তিনি অস্বীকার করে বসেন। (রেফারেন্সের জন্য শেষের ‘উৎসপঞ্জী’ দ্রষ্টব্য।)

আরও পড়তে পারেন-

স্যার সৈয়দ খান হাদীস অস্বীকারের মতবাদকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারেন নি। এই কাজ সম্পাদন করেছেন তার হাতেগড়া শিষ্য চেরাগ আলী। চেরাগ আলীর কাজেও কিছুটা ঘাটতি ও শূন্যতা রয়ে গিয়েছিল, যা আব্দুল্লাহ চাগড়ালভী পূর্ণ করেছেন। বলা হয়, চাগড়ালভীই প্রথম ব্যক্তি, যিনি কুরআনিস্ট মতবাদকে পূর্ণাঙ্গ আদর্শ হিসাবে রূপায়ণ করতে পেরেছেন। তার সাথে গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর সম্পর্ক ছিল খুব গভীরের। ইংরেজদের সহায়তায় তারা নির্ভয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছিলেন। চাগড়ালভী ‘আহলুজ জিকর ওয়াল কুরআন’ নামে একটি বইও লিখেন। তার এই সীমালঙ্ঘন দেখে ভারতের ওলামায়ে কিরাম তাকে কাফির ঘোষণা করেন এবং তার মতবাদ খণ্ডনের লক্ষে ‘ইশায়াতুস সুন্নাহ’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। তখন মুহিব্বুল হক আজিমাবাদীও ছিলেন এই মতবাদে বিশ্বাসী। তবে চাগড়ালভীর সাথে বিবিধ মতানৈক্যের কারণে চাগড়ালভী পাকিস্তানে চলে যান। এতে করে নতুন দু’টি ধারার উদ্ভব হয়; পাক ধারা ও ভারতী ধারা। চাগড়ালভীর প্রভাবে প্রভাবিত হন আহমাদুদ্দীন অমৃতসরী। অমৃতসরী ছিলেন কুরআনিস্ট আন্দোলনের একজন প্রভাবশালী নেতা। আলোচনা, বক্তৃতা, রচনা ও প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে তিনি জোরালো ভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যান। তার ব্যক্তিগত একটি পত্রিকাও ছিল।

এরপর এই ধারাবাহিকতায় নাম আসে গোলাম আহমদ পারভেজের। তিনি প্রথমে সঠিক পথে ছিলেন। পরে কুরআনিস্ট মতবাদকে গ্রহণ করে নেন। ‘তুলুয়ে ইসলাম’ নামে তার একটি ম্যাগাজিন ছিল। এই নামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে তার এই আন্দোলনের নাম রেখেছেন ‘নাওয়াদিয়ে তুলুয়ে ইসলাম’। তার সমসাময়িক এই আন্দোলনে কাজ করতেন হাফেজ আসলাম জয়রাজপুরী। কিন্তু সানাউল্লাহ অমৃতসরী (রহ.)-এর প্রতিবাদের মুখে তারা তাদের কাজ বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারেন নি। ফলে সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হওয়ার পর গোলাম আহমদ পারভেজ পাকিস্তান চলে যান। সেখানে ‘তুলুয়ে ইসলাম’ ব্যানারে তার কার্যক্রম চালিয়ে যান। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের সমস্ত আলিমের ঐক্যমতে গোলাম পারভেজকে কাফির ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে তার কার্যক্রম বন্ধ হতে শুরু করে।

এ হলো ভারত উপমহাদেশে কুরআনিস্ট মতবাদের সূচনার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত। ভারত ও পাকিস্তানের কুরআনিস্ট মতবাদ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ইতিহাসে কয়েকটি শব্দ বারংবার সামনে আসে। তা হলো— আহলুজ জিকর ওয়াল কুরআন, উম্মাতে মুসলিমা, তুলুয়ে ইসলাম, জুহুরুল ইসলাম, নাওয়াদি, পারভেজীয়া ও চাগড়ালভীয়া।

মিশরের কুরআনিস্ট ধারা:

মিশরে কুরআনিস্টদের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছিল— এটি নির্ণয় করা বেশ জটিল। তবে সত্য হলো, মিশরের এই ধারার সূচনা হয়েছে পর্যায়ক্রমে। এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উল্লেখ করা হয় শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুহু (মৃ ১৯০৫)-কে। তিনি ছিলেন মুসলিম রেনেসাঁ এবং আলোকায়নের অন্যতম প্রধান পুরুষ। তবে পশ্চিমা দেশে দীর্ঘদিন থাকার ফলে তার মধ্যে একধরনের পশ্চিমামুগ্ধতা কাজ করেছিল। এরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় একপর্যায়ে এসে তিনি ইসলামকে পশ্চিমী দর্শনে মাপতে শুরু করেন। বেশ কিছু হাদীস তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তিনি সম্পূর্ণ রূপে হাদীস অস্বীকার করেন নি। আব্দুহুর আদর্শে তার বেশ কিছু ছাত্র প্রভাবিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন তাওফিক সিদকী, রশীদ রেজা, ইসমাইল আদহাম, মাহমূদ আবু রাইয়া, আহমদ আমিন, ত্বহা হুসাইন, আহমাদ সুবহী মানসূর প্রমুখ। তাদের কেউ কেউ সরাসরি হাদীস অস্বীকার করেন, আবার কেউ কেউ ক্ষেত্র ও স্থান বিশেষ হাদীস অস্বীকার করেন। তারা ছিলেন আধুনিক (মডারেট), মুক্তমনা, স্বাধীনচেতা ও আত্মতুষ্ট। বলা বাহুল্য, এ-সব গুণে যারা গুণান্বিত, তাদের মতাদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা এবং কর্মপথে বিচ্যুতি ও স্খলন থাকবে— এটাই স্বাভাবিক।

তবে মিশরের নিকট অতীতের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ড. আহমদ সুবহী মানসূরই প্রথম, যিনি হাদীসকে প্রামান্য-উৎস হিসাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি মনে করতেন, হাদীস স্পেয়ার তথা অতিরিক্ত। গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানে বাধ্যবাধকতা নেই। হাদীস অস্বীকারের মতবাদ প্রকাশ করার পর আজহার কর্তৃপক্ষ তার থেকে সুস্পষ্ট মত জানতে চেয়েছেন। তিনি ছিলেন আজহারের অধ্যাপক। সুষ্ঠু কোনো জবাব না আসায় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে দেন। তার নামে রাষ্ট্রীয় মামলা হয়। পরে তিনি অ্যামেরিকা চলে যান। বেশকিছু দিন পর আবার ফিরে আসেন। রাষ্ট্রকে তিনি বলেন, মিশর ধর্মনিরপেক্ষতার বৈধতা দিয়েছে। সব ধর্ম ও মতবাদের মানুষ এখানে থাকবে। অতএব আমার নতুন মতবাদের কারণে রাষ্ট্রপক্ষ আমাকে কেনো বাধাগ্রস্ত করবে? এরপর তিনি ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর কুরান’ নামে একটি একাডেমি গড়ে তোলেন, যেখানে কুরআনিস্ট মতবাদের কার্যক্রম চলতো। সুবহী মানসূরের সাথে আরও একজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তিনি হলেন ড. তাওফিক সিদকী। বক্তৃতা, রচনা ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি কাজ করেন। রশীদ রেজা সম্পাদিত ‘মানার’ পত্রিকার ৯ম বর্ষের সপ্তম ও দ্বাদশ সংখ্যায় উপর্যুপরি দু’টি প্রবন্ধ ছেপেছেন। শিরোনাম ছিল, ইসলাম কেবল কুরআনই।

এছাড়া মিশরে কুরআনিস্ট মতবাদকে ছড়িয়ে দেওয়ার এবং সুচারুভাবে আঞ্জাম দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন প্রাচ্যবিদরা। বিশেষত অ্যামেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রো (AUC)-এর শিক্ষকরা। তারা তাদের শিষ্যদের হাদিস অস্বীকারের দিকে আহ্বান করতেন এবং এতে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন।

বাংলাদেশেও কুরআনিস্টদের উপস্থিতি আছে এবং দিনদিন বাড়ছে। তবে এর সূত্রপাত কিভাবে হয়েছিল, এটা আজও কেউ নির্ণয় করতে পারেন নি। তবে সত্য হলো, মিশরের যেকোনো প্রাচ্যবিদ বা নতুন মতবাদের বিশ্বাসী কেউ কোনো কিছু লিখলে এবং বললে, তা মুহুর্তে ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে যেতো। ওয়াজিহ রশীদ নদভী সুন্দর বলেছেন— “পৃথিবীর যে কোনো কোণে যদি কোনো প্রাচ্যবিদ কোনো তত্ত্ব বা কোনো ধারণা পেশ করতেন, তাহলে মিশরে শুধু তার সমর্থকই নয়, বরং এর প্রবক্তা ও ব্যাখ্যাকারী এমন কিছু লেখক বা চিন্তাবিদ উপস্থিত হয়ে যেতো, যারা মানসিক ভাবে আন্তরিক এবং রচনার পূর্ণ শক্তি সম্পন্ন। যেমনঃ কুরআন শরীফ মানুষের রচনা হওয়া, ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ, ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার অস্বীকৃতি, সেকুলারিজমের দিকে আহ্বান, হাদীসের অবমূল্যায়ন ও প্রামাণিকতার অস্বীকার এবং হাদীস বিশুদ্ধতায় আপত্তি ইত্যাদি।”

বাংলাদেশে একটি ছায়া আন্দোলন গড়ে উঠে। যেখানে কুরআনকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। কুরআনক আঁকড়ে ধরতে পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করা হতো, তাফসীর শিখতে বলা হতো এ বং তাফসিরের বিশাল বড় মাহফিলের আয়োজন করা হতো। কিন্তু হাদীস নিয়ে (তাদের) কোনো আগ্রহ ছিল না। বরং বলা যায়, হাদীসের প্রতি (তাদের) একধরনের বিতৃষ্ণা এবং বীতশ্রদ্ধা ছিল। এ ছায়া আন্দোলনের ফলে নতুন প্রজন্ম হাদীসকে সঠিকার্থে শিখতে সমর্থ হয়নি, বরং তাদের মধ্যে একপ্রকার উন্নাসিকতা কাজ করছিল। সাথে তাদের প্ররোচিত করছিল তাদের ফ্রি থট নীতি। এখানে আমি বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে অধ্যায়টি ব্যাপক রেখে দিচ্ছি। এ হলো একটি কারণ। দ্বিতীয়ত বিদেশী কুরআনিস্টদের বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ পড়ে বাংলার মুক্তমনা মানুষগুলো সংশয়ে পড়ছে এবং তাদের উপস্থাপিত আর্গুমেন্ট দেখে প্রভাবিতও হচ্ছে। বাংলাদেশে কুরআনিস্ট মতবাদ নিয়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কর্নেল জাকারিয়া কামাল। তিনি ‘সাইনটিফিক তাফসির’ নামে কুরআনের মনগড়া ব্যখ্যাও করতেন। বেশ কিছুদিন আগে তিনি মারা যান। এখন বেশ সক্রিয়তার সাথে কাজ করছেন আবু সাঈদ খান, সৈয়দ ওলিউল আলম, পান্না চৌধুরী, ডা. মোঃ মতিয়ার রহমান, মাহবুবুর রহমান যশোরী, মোঃ আমিরুল ইসলাম, সজল রোশান, মুরাদ বিন আমজাদ প্রমুখ।

উৎসপঞ্জী:

১— সুনানু আবি দাউদ, শুয়াইব আরনাউত কৃত তাহকিক, দারুর রিসালাহ, প্রকাশ: ১৪৩০ হি.।
২— জামিয়ু বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার, দারু ইবনুল জাওজি, প্রকাশ ১৪১৪ হি.।
৩— দরসে তিরমিযী, তাকী উসমানী, ভূমিকা, মাকতাবা দারুল উলূম, করাচী, প্রকাশ: ১৪৩১ হি.।
৪— আস- সুন্নাহ ওয়া মাকানাতুহা, মুস্তফা সিবাঈ, দারুস সালাম, ৮ম প্রকাশ ১৪৩৮ হি.।
৫— আল- কুরআনিয়্যূন ওয়া সুবহাতুহুম হাওলাস সুন্নাহ, খাদেম হুসাইন ইলাহী বখশ, মাকতাবাতুস সিদ্দীক, সৌদি,  দ্বিতীয় প্রকাশ ১৪২১ হি.।
৬— সুবহাতুল কুরআনিয়্যীন হাওলাস সুন্নাহ, মাহমূদ বিন মুহাম্মাদ মাজরুআ, অধ্যায় বিশেষ।
৭— ইনকারুস সুন্নাহ- তারীখুহু ওয়া ফিরাকুহু, আব্দুল মাজিদ গুরী, প্রকাশ: ২০১৭ ইং।
৮— নিজামে তা’লীম ওয়া তারবিয়ত, ওয়াজিহ রশীদ নদভী, দারুর রশীদ, প্রকাশ: ১৪৩৪ হি.।
৯— আল- কিফায়া, খতীব বাগদাদী, দিময়াতী কৃত তাহকীক, দারুল হুদা, প্রথম প্রকাশ ১৪২৩ হি.।

লেখক: শিক্ষানবিশ, উলূমুল হাদীস ২য় বর্ষ, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী।
ফোন: ০১৬০৩-৯১৮৪০৭, ইমেইল- salahuddintofel@gmail.com

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।