|| মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা ||
কিয়ামতপূর্ব সময়ের অন্যতম প্রধান ও আতঙ্কজনক বৈশিষ্ট্য হলো ফিতনার ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী প্রাদুর্ভাব। হাদীস শরিফের কালজয়ী ভাষ্যমতে, শেষ যামানায় পৃথিবী এমন এক চরম অস্থির ও টালমাটাল পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে, যেখানে মানবিকতা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটবে। এটি এমন এক সময়, যখন সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে এবং ফিতনাগুলো অন্ধকার রাতের টুকরো মেঘের মতো একের পর এক ধয়ে আসবে।
মানুষের অন্তর থেকে চিরন্তন দয়া-মায়া, ভ্রাতৃ ত্ববোধ ও পরার্থপরতা কপূরের মতো উড়ে গিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে স্থান করে নেবে চরম স্বার্থপরতা, পাশবিকতা ও নৃশংসতা।
ব্যক্তিগত রেষারেষি থেকে শুরু করে সামাজিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে এক অশান্তির দাবানল। মানুষের হৃদয়ে ইবাদতের মিষ্টতা ও আখিরাতের ভয় বিলীন হয়ে যাবে, যার ফলে সমাজ হয়ে পড়বে আত্মিক ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া। হজরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বর্ণিত এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই ভয়াবহ চিত্রের অবতারণা করে ইরশাদ করেছেন, ‘যখন কিয়ামত সন্নিকটে হবে, (মানুষের মাঝ থেকে নেক) আমল কমে যাবে, মানুষের অন্তরে সংকীর্ণতা ও কৃপণতা ঢেলে দেওয়া হবে এবং পৃথিবীতে ‘হারজ’ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।’ উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ। ‘হারজ’ আসলে কী? উত্তরে দয়াল নবী (সা.) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু কঠোর ভাষায় এর ভয়াবহতা বর্ণনা করে বললেন, ‘হারজ হলোড় হত্যা এবং হত্যা’। (সহীহ বুখারী, হাদীস- ৬০৩৭)। অর্থাৎ তুচ্ছ
কারণে মানুষের জীবনের মূল্য ঘাসের চেয়েও সস্তা হয়ে যাবে এবং বিনাবিচারে রক্তপাতই হবে সেই যুগের প্রধান বিষফোঁড়া।
বিবেকহীনতার চরম পরাকাষ্ঠা
নবীজি (সা.) উম্মতকে শেষ যুগের ফিতনার যে চিত্র এঁকে দেখিয়েছেন, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এক সময় মানুষ তার আপনজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছে নিজেকে নিরাপদ মনে করত। কিন্তু ফিতনার দাপটে সেই আস্থার জায়গাটি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে মাসউদ (রাযি.) বর্ণিত এক হাদীসে উল্লেখ আছে, সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে মানুষ তার বন্ধুর কাছেও নিরাপদ থাকবে না। এমতাবস্থায় উম্মতের করণীয় সম্পর্কে নবীজি (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন- “তোমার জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখবে, হাত গুটিয়ে রাখবে এবং নিজের ঘরের ভেতরে অবস্থান করবে”। (আবু দাউদ, হাদীস- ৪২৫৮)।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
বস্তুত, ‘হারজ’ বা হত্যাকাণ্ডের এই ব্যাপকতা। কোনো আদর্শিক লড়াই নয়, বরং এটি হবে মানুষের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাওয়ার অশুভ পরিণাম। হযরত আবু মুসা আল-আশআরি (রাযি.) এর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সেই হত্যাকাণ্ড মুশরিকদের সাথে হবে না, বরং তোমরা পরস্পরকে হত্যা করবে। এমনকি ব্যক্তি তার প্রতিবেশী, আপন চাচাতো ভাই এবং নিকটাত্মীয়কেও হত্যা করতে দ্বিধা করবে না।” উপস্থিত সাহাবাগণ বিস্ময়ভরে জিজ্ঞেস করলেন, তখন কি আমাদের বিবেক থাকবে না? নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, “অধিকাংশ মানুষের জ্ঞান ছিনিয়ে নেওয়া হবে এবং অবশিষ্ট থাকবে কেবল একদল নির্বোধ ও মূর্খ লোক”। (ইবনে মাজাহ, হাদীস- ৩৯৫৯)।
উদ্দেশ্যহীন রক্তপাত ও পরকালীন ক্ষতি
ফিতনার যুগের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো উদ্দেশ্যহীনতা। বর্তমান পৃথিবীতে আমরা এমন অনেক সংঘাত দেখি, যার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। নবীজি (সা.) এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, এমন এক সময়
আসবে যখন হত্যাকারী জানবে না সে কেন হত্যা করছে, আর নিহত ব্যক্তিও বুঝবে না কেন তাকে প্রাণ দিতে হলো। এটি মূলত জাহেলিয়াতের এক আধুনিক রূপ, যেখানে মানুষ পশুর চেয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে। হাদীস শরিফে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই অন্যায় রক্তপাতের ফলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি-
উভয়ই জাহান্নামী হবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস- ৭১৯৬)। কারণ, যখন মানুষ ফিতনায় অন্ধ হয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হয়, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়।
ফিতনা থেকে বাঁচার পথ
হাতছানি। ফেসবুক-ইউটিউব থেকে শুরু আজকের অস্থির সমাজে পদে পদে ফিতনার করে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনেও অসহিষ্ণুতা শিকড় গেড়েছে। এই নাজুক সময়ে একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব হলো নিজেকে সব ধরনের সংশয় ও সংঘাত থেকে দূরে রাখা। যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন নির্জনতা অবলম্বন এবং ইবাদতে মশগুল থাকাই হলো ঈমান রক্ষার ঢাল।
আমাদের উচিত রসনাকর্তন বা জিহ্বার হেফাজত করা এবং অন্যের গীবত ও উসকানিমূলক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। মানুষকে দ্বীনের সঠিক বুঝ ও তাকওয়ার
দাওয়াত দেওয়া এখন সময়ের দাবি। মানুষ যত বেশি কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ থেকে দূরে সরবে, সমাজ তত বেশি অন্ধকার ও মূর্খতার অতলে তলিয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই ঘোর ফিতনার যুগে ঈমান ও আমলের হিফাযত করার তাওফিক দান করুন এবং সব ধরনের রক্তপাত ও অন্যায় থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
লেখক: আলেম, খতীব, সাংবাদিক।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








