Home ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন ইসলামী আদবের রূপরেখা: চলনে-বলনে সুন্নাহ

ইসলামী আদবের রূপরেখা: চলনে-বলনে সুন্নাহ

মূল: শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)
ভাষান্তর: ইলিয়াস বিন নাজেম

ইসলামি শরীয়তে মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য রয়েছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ আদব বা শিষ্টাচার। এখানে ছোট-বড় এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই নির্ধারিত আদব বিদ্যমান। নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেন- إنما النساء شقائق الرجال “নিশ্চয়ই নারীগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষেরই অনুরূপ।” (আবু দাউদ, হাদীস- ২৩৬)।

সুতরাং যে শিষ্টাচার বজায় রাখা পুরুষের দায়িত্ব, তা নারীর জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাজ বিনির্মিত হয় এবং উভয়ের মাধ্যমেই ইসলামের সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়।

ইসলাম মূলত এমন সব শিষ্টাচারের দিকেই আমাদের আহ্বান করে, যার মাধ্যমে একজন মুমিনের ব্যক্তিত্ব পূর্ণতা লাভ করে এবং সর্বমহলে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, সুন্দর আদব ও গুণাবলি একজন মুসলিমের আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তার সামাজিক মর্যাদা বাড়ায় এবং মানুষের মনে তার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা সৃষ্টি করে। ইসলামি শরীয়ত চায় এই আদর্শগুলো যেন একজন মুসলিমের সত্তার সাথে মিশে যায়। অর্থাৎ, এই আদবগুলো কেবল ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয় যে মন চাইলে পালন করলাম আর না চাইলে ছেড়ে দিলাম; বরং এগুলো এমন আবশ্যকীয় শিষ্টাচার যা একজন আদর্শ মুসলিমের জীবনে থাকা অপরিহার্য।

ইমাম কারাফী (রহ.) তাঁর ‘আল-ফুরূক’ কিতাবে আদবের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেন, “অধিক আমলের চেয়ে অল্প আদবও উত্তম।” এই লক্ষ্যেই প্রখ্যাত আলেম রুওয়াইম (রহ.) তাঁর পুত্রকে নসিহত করেছিলেন-“হে আমার প্রিয় পুত্র! তোমার আমলকে লবণের মতো আর আদবকে আটার মতো করো।” এর অর্থ হলো, আমলের তুলনায় আদব বা শিষ্টাচারের পরিমাণ এত বেশি হওয়া উচিত যেন খামির তৈরির সময় আটার পরিমাণের তুলনায় লবণের অনুপাত যেমন হয়। অর্থাৎ, অল্প আমল কবুল হওয়ার জন্যও অধিক আদবের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বস্তুত, শিষ্টাচারহীন অধিক আমলের চেয়ে শিষ্টাচারপূর্ণ পরিমিত আমলই শ্রেয়।

আরও পড়তে পারেন-

ইসলামি আদবগুলোর কোনো কোনোটিকে বাহ্যত সাধারণ বা সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু সেগুলোর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন। কেননা, এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যাদের মাঝে সাধারণ শিষ্টাচারের অভাব দেখা যায়, ফলে তাদের পুরো ব্যক্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অথচ একজন মুসলিমের আচার-আচরণ ও চরিত্রে সবসময় মাধুর্য থাকা উচিত। এ বিষয়ে ইঙ্গিত করে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, “তোমরা যখন তোমাদের ভাইদের কাছে যাও, তখন সুন্দর পোশাক পরিধান করো এবং ভালো যানবাহন ব্যবহার করো, যেন তোমাদের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। কেননা, আল্লাহ তাআলা শ্রীহীনতা ও কদর্যতাকে পছন্দ করেন না।” (আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)।

অতএব, একজন মুসলিমের উচিত তার পোশাক-পরিচ্ছদ ও চলন-বলনে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে তাকে দেখেই একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে চেনা যায়।

১. ঘরে প্রবেশ ও প্রস্থানকালিন আদব: যখন কোনো ঘরে প্রবেশ করবেন কিংবা বের হবেন, তখন দরজা খুব জোরে বন্ধ করবেন না বা এমনভাবে ছেড়ে দেবেন না যাতে শব্দ করে তা বন্ধ হয়। এটি অভদ্রতা ও নম্রতাবিরোধী কাজ। ইসলাম সবসময় নম্রতাকে পছন্দ করে, তাই দরজাটি আলতোভাবে বন্ধ করুন। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- إن الرفق لا يكون في شيء إلا زانه ولا ينزع من شيء إلا شانه  “নম্রতা যে কোনো বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, আর নম্রতার অভাব তাকে কলুষিত বা শ্রীহীন করে তোলে।” (মুসলিম)।

২. সালামের আদান-প্রদান: ঘরে প্রবেশ বা বাহির হওয়ার সময় ঘরের লোকদের ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ বলে সালাম দেবেন। সালামের বদলে কেবল ‘শুভ সকাল’, ‘মারহাবা’ বা এই জাতীয় শব্দ ব্যবহার করবেন না। কেননা, সালাম বর্জন করে অন্য শব্দ ব্যবহার করা রাসুলুল্লাহ (সা.)এর প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ ও ইসলামি রীতির পরিপন্থি। সাহাবী হযরত আনাস (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, “হে বৎস! যখন তুমি নিজ ঘরে প্রবেশ করবে তখন পরিবারের লোকদের সালাম করবে; এতে তোমার এবং তোমার পরিবারের ওপর বরকত নাযিল হবে”। (তিরমিযী)।

বিশিষ্ট তাবেঈ হযরত কাতাদা (রহ.) বলেন, “ঘরে প্রবেশের সময় পরিবারের লোকদের সালাম করো। কারণ, তারাই তোমার সালাম পাওয়ার বেশি হকদার।” এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের কেউ যখন কোনো মজলিসে পৌঁছায় তখন যেন সে সালাম দেয়, আবার যখন মজলিস থেকে বিদায় নেয় তখনও যেন সালাম দেয়। প্রথম সালামের গুরুত্ব দ্বিতীয় সালামের চেয়ে কোনো অংশে বেশি নয়”। অর্থাৎ- সাক্ষাতের সময় যেমন সালাম দিতে হয়, বিদায় নেওয়ার সময়ও সালাম দেওয়া তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।

অনুবাদক: মুহতামিম- দারুল উলূম ফেনী, খতীব- জহিরিয়া মসজিদ, ফেনী।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।