।। মাওলানা সাকিব আমজাদ জমিরী ।।
শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১লা মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস’ পালিত হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীন ইউরোপে রোমান পৌত্তলিকরা এ দিনে ফুলের দেবী ‘ফ্লোরা’র উপাসনা করত। পরবর্তীকালে প্রাচীন ও মধ্যযুগে ইউরোপের জনগণ বসন্তের আগমন উপলক্ষে এ দিনটি উদযাপন করত। আধুনিক কালে ১৮৮৬ সালের ৪ঠা মে আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকদের আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে সোশালিস্ট পার্টি ১লা মে-কে ‘আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ক্রমান্বয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ দিবস স্বীকৃতি লাভ করে।
ইসলামে শ্রম ও কর্মকে শুধু মর্যাদা দেওয়া হয়নি; বরং একে ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণের সুদৃঢ় ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে। আজকের আলোচনায় আমরা তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করব: (১) শ্রমের মর্যাদা ও গুরুত্ব, (২) শ্রমিকের অধিকার এবং (৩) শ্রমিকের দায়িত্ব।
শ্রমের মর্যাদা ও গুরুত্ব
ইতোপূর্বে হালাল ও হারাম উপার্জন প্রসঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি যে, একজন মুমিনের জন্য ঈমানের পর সর্বপ্রথম ফরয হলো হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু আহার কর এবং সৎকর্ম সম্পাদন কর। তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত।”
কুরআনের বিভিন্ন স্থানে পবিত্র আহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে ‘আহার’ বলতে শুধু খাদ্যগ্রহণ নয়; বরং উপার্জন, ভোগ এবং জীবনের সকল ব্যবহারের ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং হারাম উপার্জন বর্জন করা এবং হালাল উপার্জনের উপর নির্ভর করা একজন মুমিনের জীবনের অন্যতম ফরয ইবাদত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন— طلب كسب الحلال واجب على كل مسلم “হালাল উপার্জনের অনুসন্ধান করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয।”
হাযিরীন! ইসলামে বৈধ উপার্জনের সঙ্গে শ্রমকে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করা হয়েছে। শ্রম ছাড়া অন্যের দান বা ভাতার উপর নির্ভরশীলতা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে উপার্জন মানেই শ্রম। এই শ্রম হতে পারে কায়িক, মানসিক, মেধাভিত্তিক কিংবা পেশাগত—ছোট বা বড় যে কোনো কাজই এর অন্তর্ভুক্ত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন— أفضل الكسب بيع مبرور وعمل الرجل بيده “সর্বোত্তম উপার্জন হলো সৎ ও কল্যাণকর বাণিজ্য এবং মানুষের নিজের হাতে উপার্জিত শ্রম।”
ব্যবসার সঙ্গেও শ্রম ও পরিশ্রম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কুরআন ও হাদীসে মুমিনদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শ্রমের মাধ্যমে হালাল উপার্জনের জন্য পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— فإذا قضيت الصلاة فانتشروا في الأرض وابتغوا من فضل الله واذكروا الله كثيرًا لعلكم تفلحون “যখন সালাত সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো; আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।”
শ্রম করা শুধু বৈধই নয়; বরং এটি সাহাবায়ে কিরামের সুন্নাতও বটে। হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন— كان أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم عمال أنفسهم “রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীগণ স্ব-শ্রমে উপার্জন করতেন।”
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—“মানুষ নিজের হাতে উপার্জন করে যা আহার করে, তার চেয়ে উত্তম ও পবিত্র কোনো খাদ্য নেই। আর আল্লাহর নবী দাউদ (আলাইহিস সালাম) নিজ হাতে উপার্জন করে আহার করতেন।”
প্রিয় ভাইয়েরা! এ হাদীসসমূহ আমাদের সামনে একটি গভীর বাস্তবতা তুলে ধরে—নিজের পরিশ্রমে অর্জিত হালাল উপার্জনই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়। এটি নবী-রাসূল ও নেককার বান্দাদের সুন্নাত।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমরা নিজেদেরকে ঈমানদার দাবি করলেও বাস্তবে কায়িক শ্রমকে অবজ্ঞা করি। সমাজের বহু পেশাজীবী—জেলে, তাতী, কামার, কুমার, মুচি, মেথর, কুলি, মজুর, রিকশাচালক—যারা হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবন ধারণ করেন, তাদেরকে আমরা অবমূল্যায়ন করি এবং ‘নিম্নশ্রেণী’ হিসেবে দেখি। অথচ বিপরীতভাবে অবৈধ ও হারাম উপার্জনে লিপ্ত ব্যক্তিদের আমরা সম্মান দিই। এটি এক ভয়াবহ নৈতিক বিপর্যয়, যার জন্য আমাদের আত্মসমালোচনা অত্যাবশ্যক।
এই বিকৃত মানসিকতার ফল শুধু আখিরাতে নয়, দুনিয়াতেও আমরা ভোগ করছি। আমাদের সমাজে সন্তানদের তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ করে তুলতে গিয়ে অনেক পিতা-মাতা অবৈধ পন্থা অবলম্বনে দ্বিধা করেন না। কিন্তু কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা ও শ্রমমুখী প্রশিক্ষণের প্রতি তাদের আগ্রহ নেই। কারণ, তারা মনে করেন—এতে নাকি সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়!
ফলত, যে কাজ দেশে করতে লজ্জা বোধ করা হয়, সেই কাজের জন্যই বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যেতে হয়। অথচ সেখানে একই কাজ করতে কোনো দ্বিধা থাকে না। এটি আমাদের চিন্তার গভীর অসংগতি ও আত্মবিরোধিতার পরিচায়ক।
অন্যদিকে, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলে এবং কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রস্তুত করে। ফলে তারা প্রবাসে গিয়ে মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম হয়। আর আমরা শ্রমবিমুখতার কারণে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি।
এ অবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম কোনো অবমাননার বিষয় নয়; বরং এটি মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও সফলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
প্রিয় ভাইয়েরা! আমরা ব্যক্তিগত ও জাতিগতভাবে ঋণ, সাহায্য, ত্রাণ কিংবা শ্রমবিহীন উপার্জনের প্রতি আকৃষ্ট। অথচ আমাদের একমাত্র আদর্শ রাসূলুল্লাহ ﷺ শ্রমবিমুখতাকে অপছন্দ করেছেন। তিনি উম্মতকে বেকারত্ব, পরনির্ভরতা ও অন্যের সাহায্যের আশায় বসে থাকা থেকে বিরত থেকে শ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বারবার উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন—لأن يأخذ أحدكم حبله فيأتي بحزمة الحطب على ظهره فيبيعها فيكف الله بها وجهه خير له من أن يسأل الناس أعطوه أو منعوه “তোমাদের কেউ যদি নিজের দড়ি নিয়ে বের হয়, কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে বহন করে তা বিক্রি করে—এভাবে আল্লাহ তার সম্মান রক্ষা করেন—তবে তা মানুষের কাছে চাওয়ার চেয়ে উত্তম; তারা দিতেও পারে, নাও দিতে পারে।”
হযরত আনাস (রাযি.) বর্ণনা করেন, এক আনসারী ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট এসে সাহায্য প্রার্থনা করল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার ঘরে কি কিছুই নেই?” লোকটি বলল, “একটি চাদর আছে—কিছু অংশ বিছাই, কিছু অংশ গায়ে দিই; আর একটি পেয়ালা আছে, যাতে পানি পান করি।” তিনি বললেন, “উভয়টি আমার কাছে নিয়ে আসো।”
লোকটি তা নিয়ে এলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “এ দুটি কে ক্রয় করবে?” একজন বলল, “আমি এক দিরহামে কিনব।” তিনি বললেন, “এর বেশি কে দেবে?” অবশেষে এক ব্যক্তি দুই দিরহামে তা ক্রয় করল। রাসূলুল্লাহ ﷺ দিরহাম দুটি আনসারীকে দিয়ে বললেন, “এক দিরহাম দিয়ে খাদ্য কিনে তোমার পরিবারের জন্য রেখে আসো, আর অন্য দিরহাম দিয়ে একটি কুঠার কিনে আমার কাছে নিয়ে আসো।”
লোকটি কুঠার নিয়ে এলে তিনি নিজ হাতে তাতে হাতল সংযুক্ত করে বললেন, “তুমি বন থেকে কাঠ কেটে এনে বিক্রি করো। পনেরো দিন পর্যন্ত আমি যেন তোমাকে না দেখি।” লোকটি নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করল। পনেরো দিনে সে দশ দিরহাম উপার্জন করল। তা দিয়ে সে খাদ্য ও বস্ত্র ক্রয় করল। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন—
“তুমি যদি মানুষের কাছে ভিক্ষা করতে, তবে তা কিয়ামতের দিন তোমার মুখে দাগ হয়ে প্রকাশ পেত। এর চেয়ে এভাবে পরিশ্রম করে স্বাবলম্বী হওয়াই তোমার জন্য উত্তম।”
বৈধ উপার্জনের জন্য শ্রমে নিয়োজিত থাকাকে হাদীসে ‘আল্লাহর পথে’ থাকার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কা‘ব ইবনু উজরা (রাযি.) বর্ণনা করেন— এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে দিয়ে অতিক্রম করল। সাহাবীগণ তার শক্তি ও কর্মোদ্যম দেখে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! যদি এই শক্তি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হতো!” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন—
“যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য উপার্জনের উদ্দেশ্যে বের হয়, তবে সে আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে। যদি সে বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য উপার্জনে নিয়োজিত হয়, তবে সে আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে। আর যদি সে নিজেকে পরনির্ভরতা থেকে রক্ষা করতে উপার্জনে নিয়োজিত হয়, তবে সেও আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে।”
প্রিয় ভাইয়েরা! এখানে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। আমরা সাধারণত ‘আল্লাহর রাস্তা’ বলতে জিহাদ, দাওয়াত, ইলম অর্জন বা যিকির-আযকারকেই বুঝি। কিন্তু সংসারের হালাল উপার্জনকে আমরা ‘দুনিয়াদারি’ বলে অবহেলা করি। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন—নিজের শ্রম, মেধা ও কর্মের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের জন্য হালাল উপার্জন করা একটি মহান ইবাদত; আর এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ‘আল্লাহর রাস্তায়’ অবস্থান করে।
শ্রমিকের অধিকার
হক্কুল ইবাদ তথা মানুষের অধিকার বিষয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। শ্রমিকও এ সকল মৌলিক অধিকার লাভ করবে। উপরন্তু, শ্রমিকের জন্য বিশেষ অধিকার নির্ধারণ করে কুরআন ও হাদীসে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
কুরআনে বারবার অধীনস্থদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও অধীনস্থ ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁর ওসীয়তের অন্যতম ছিল— الصلاة وما ملكت أيمانكم “তোমরা নামাযের ব্যাপারে সচেতন থাকবে এবং তোমাদের অধীনস্থদের (অধিকার) বিষয়ে সতর্ক থাকবে।”
এ নির্দেশনা ইসলামে শ্রমিকের অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
অধীনস্থ বা শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার বিষয়ে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা উপলব্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস লক্ষ্য করা যাক। তাবিয়ী মা‘রূর ইবনু সুওয়াইদ (রহি.) বর্ণনা করেন—
তিনি বলেন, আমরা ‘রাবাযা’ নামক স্থানে হযরত আবূ যার গিফারী (রাযি.)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। আমরা লক্ষ্য করলাম, তাঁর গায়ে যে পোশাক, তাঁর খাদেমের গায়েও একই ধরনের পোশাক। আমরা বললাম, “হে আবূ যার! আপনি যদি উভয় কাপড় একত্রে ব্যবহার করতেন, তাহলে একটি সুন্দর পোশাক হতো; আর খাদেমকে অন্য পোশাক দিতেন।”
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
তখন তিনি বললেন, “আমার ও এক ব্যক্তির মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়েছিল। তার মা ছিলেন অনারব। আমি তাকে তার মাকে কেন্দ্র করে কটূক্তি করি। সে বিষয়টি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট অভিযোগ করে। পরে আমি যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে সাক্ষাৎ করি, তিনি আমাকে বললেন, ‘হে আবূ যার! তুমি কি তাকে তার মাকে নিয়ে গালি দিয়েছ? তোমার মধ্যে এখনো জাহিলিয়াতের প্রভাব রয়ে গেছে।’
তিনি আরও বললেন— هُمْ إِخْوَانُكُمْ جَعَلَهُمُ اللهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَأَطْعِمُوهُمْ مِمَّا تَأْكُلُونَ، وَأَلْبِسُوهُمْ مِمَّا تَلْبَسُونَ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ “তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং তোমরা যা খাও, তাদেরকেও তা থেকে খাওয়াবে; তোমরা যা পরিধান কর, তাদেরকেও তা পরিধান করাবে। তাদের উপর এমন কাজ চাপাবে না, যা তাদের সাধ্যাতীত। আর যদি কোনো কষ্টকর কাজ দাও, তবে তাদেরকে সহযোগিতা করবে।”
এই হাদীসের আলোকে কয়েকটি মৌলিক নীতি সুস্পষ্ট হয়— প্রথমত: ভ্রাতৃত্ববোধ।
শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক নয়; বরং তা মানবিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। সামাজিক বা অর্থনৈতিক বৈষম্য যেন এ ভ্রাতৃত্বকে ক্ষুণ্ন না করে।
দ্বিতীয়ত: সম্মানজনক জীবনযাপন নিশ্চিত করা।
শ্রমিকের জন্য এমন পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা মানবিক মর্যাদা বজায় রেখে জীবনযাপন করতে পারে এবং তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়।
তৃতীয়ত: দায়িত্বের সামঞ্জস্যতা।
শ্রমিকের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করা যাবে না, যা তার সাধ্যাতীত। কাজের ধরন ও সময় উভয়ই হতে হবে যুক্তিসংগত ও সহনীয়।
হযরত আবূ যার (রাযি.)-এর জীবন থেকে আমরা দেখি, সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.) এ নীতিগুলো আক্ষরিক অর্থেই বাস্তবায়ন করেছেন। তারা শ্রমিক ও অধীনস্থদের সাথে একত্রে আহার করতেন, সামাজিক জীবনে তাদেরকে পরিবারের সদস্যের মতোই অন্তর্ভুক্ত করতেন। খাদ্য ও পোশাকের ক্ষেত্রেও বৈষম্য দূর করতেন এবং দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের সামর্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন।
শ্রমিক-কর্মচারীর পারিশ্রমিক যথাসময়ে প্রদান করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন— أعطوا الأجير أجره قبل أن يجف عرقه “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক প্রদান করো।”
শ্রমিক ও অধীনস্থদের প্রতি সদাচরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমাশীলতা। কুরআন মাজীদে ক্রোধ সংবরণ ও ক্ষমার প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন— اعفوا عنه في كل يوم سبعين مرة “প্রতিদিন সত্তর বার তার অপরাধ ক্ষমা করো।”
শ্রমিকের দায়িত্ব
মহান আল্লাহ তাআলা অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে সর্বদা ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। যেমন শ্রমিকের অধিকার রয়েছে, তেমনি তার উপর দায়িত্বও বর্তায়। এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তার উপার্জনের বৈধতা ও আখিরাতের মুক্তির অন্যতম শর্ত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন— كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته … والخادم راع في مال سيده ومسؤول عن رعيته “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে… আর কর্মচারী তার মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল এবং সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
অতএব, সরকারি-বেসরকারি কিংবা ব্যক্তিগত—যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার জন্য আমানতদারি অপরিহার্য। কর্মদাতার সাথে চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ সময় ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করাই এ আমানতের যথাযথ আদায়।
আমরা লক্ষ্য করি, ব্যক্তিগত স্বার্থে মানুষ যতটা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করে, অনেক সময় চাকরির ক্ষেত্রে ততটা করে না। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে উভয় ক্ষেত্রেই সমান নিষ্ঠা অপরিহার্য। বরং দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা গোনাহের কারণ হতে পারে।
দুঃখজনকভাবে, আমরা অনেক সময় চাকরি বা কর্মকে ‘দুনিয়াবী কাজ’ মনে করে অবহেলা করি এবং তথাকথিত ধর্মীয় কাজে ব্যস্ত থাকি। অথচ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হলো—নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই ফরয ইবাদত। দায়িত্বে অবহেলা করে নফল ইবাদতে লিপ্ত হওয়া কোনো নেকি নয়; বরং তা বিভ্রান্তি ও আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল।
সুতরাং, প্রত্যেক শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার জন্য আবশ্যক—নিজ দায়িত্বকে আমানত মনে করে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, সততা ও জবাবদিহিতার চেতনায় তা সম্পাদন করা। এর মাধ্যমেই তার উপার্জন হালাল হবে এবং সে আখিরাতে সফলতা লাভ করবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে বুঝার ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: শিক্ষক, আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম এবং খতিব, আমানত আলী মুন্সি জামে মসজিদ হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








