ইরানের চলমান সংঘাত কেবল প্রচলিত সমরাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত এক ভয়াবহ ‘গণহত্যার মেশিনে’ পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি তেহরান টাইমসে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষকে হত্যার প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করে তুলেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ‘ল্যাভেন্ডার’ এবং ‘গসপেল’ নামক দুটি প্রধান এআই সিস্টেম ব্যবহার করছে। আগে যেখানে একজন সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার পক্ষে সপ্তাহে মাত্র কয়েকজন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা সম্ভব হতো, সেখানে এই এআই সিস্টেমগুলো প্রতিদিন শত শত মানুষকে হত্যার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এতে মানুষের বিচারবুদ্ধির বদলে যন্ত্রের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে হামলা চালানো হচ্ছে।
ভুল সিদ্ধান্তের বলি সাধারণ মানুষ
এআই সিস্টেমগুলোর নির্ভুলতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ল্যাভেন্ডার সিস্টেমটি প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুল টার্গেট শনাক্ত করে। কিন্তু ইসরায়েলি সেনারা কোনো রকম যাচাই ছাড়াই এই তালিকার ওপর ভিত্তি করে হামলা চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একজন সন্দেহভাজনকে হত্যার জন্য তার পুরো পরিবারসহ ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। একে প্রতিবেদনে ‘স্বয়ংক্রিয় গণনিধন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
সিলিকন ভ্যালির ‘ডেথ পাইপলাইন’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইসরায়েলের এআই যুদ্ধকে সমর্থনই করছে না, বরং নিজেদের অভিযানেও এটি দ্রুততার সাথে একীভূত করেছে। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন ডেটা অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘পালানটির টেকনোলজিস’।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
তাদের তৈরি ‘মাভেন স্মার্ট সিস্টেম’ যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই এক হাজারেরও বেশি ইরানি লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করেছে। সাধারণ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পক্ষে যা করতে কয়েক মাস সময় লাগত, এই এআই তা করেছে চোখের পলকে। এটি স্যাটেলাইট ইমেজ, কথোপকথন এবং এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরণ বিশ্লেষণ করে হামলার তালিকা তৈরি করে।
মিনাব ট্র্যাজেডি: যন্ত্রের ভুলে ঝরে ১৫০ শিশুর প্রাণ
এই প্রযুক্তির ভয়াবহতম উদাহরণ তৈরি হয়েছে ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিখুঁতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। যখন ক্লাস চলছিল, ঠিক তখনই প্রথম আঘাতটি আসে। এর কিছুক্ষণ পর উদ্ধারকারীরা যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের বের করার চেষ্টা করছিল, তখন চালানো হয় দ্বিতীয় হামলা (ডাবল ট্যাপ)।এই হামলায় ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। পেন্টাগনের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, হামলাটি অত্যন্ত ‘নির্ভুল’ ছিল, যার অর্থ হলো এআই সিস্টেম স্কুলটিকে ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অথচ মার্কিন প্রশাসন একে ইরানের ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
জবাবদিহিতার অবসান: ‘এআই আলিবাই’
প্রতিবেদনে ‘অ্যালগরিদমিক ওয়ারফেয়ার’-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি তুলে ধরা হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইভাপোরেশন’ বা দায়বদ্ধতার বিলুপ্তি। যখন একটি অ্যালগরিদম লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে এবং একজন সেনা কর্মকর্তা মাত্র ২০ সেকেন্ডের মধ্যে তাতে সায় দেয়, তখন কোনো নিরপরাধ মানুষ মারা গেলে তার দায় কেউ নিতে চায় না।
প্রশ্ন উঠছে: দায় কি কোড লিখা প্রোগ্রামারের? নাকি ওই কমান্ডারের যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে সিদ্ধান্ত নিল? নাকি ওই কোম্পানির যারা এই প্রযুক্তি বিক্রি করেছে?বিশেষজ্ঞদের মত: আন্তর্জাতিক রোবট অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কমিটির মতে, এআই সিস্টেমগুলো আসলে দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার একটি যন্ত্র মাত্র।
ইরানে এ পর্যন্ত এআই-চালিত হামলায় ১,২৩০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৭৫ জনই শিশু। এআই-এর দোহাই দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডকে ‘প্রযুক্তিগত ভুল’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যন্ত্রগুলো মানুষই বানিয়েছে এবং হত্যার সিদ্ধান্তগুলোও মানুষেরই নেওয়া। এআই-কে দোষারোপ করা মূলত রক্তমাখা হাত ধুয়ে ফেলার একটি আধুনিক কৌশল মাত্র।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ








