হালাল আহার, যাকাতের হকদার নির্ধারণ, সুন্নাহভিত্তিক জীবনচর্চা ও শৃঙ্খলাবোধে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ
“যার নামায ঠিক, তার সমগ্র জীবনই সুশৃঙ্খল ও সঠিক পথে পরিচালিত হয়”—এই মৌলিক নসীহতকে কেন্দ্র করে হালাল আহার, যাকাতভিত্তিক সুবিধা গ্রহণে সতর্কতা এবং তুলাবাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গঠন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন উম্মুল মাদারিস জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম হাটহাজারী-এর মহাপরিচালক হযরত আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.)।
গত সোমবার (২০ এপ্রিল) বাদ যোহর জামিয়ার কেন্দ্রীয় মসজিদ জামে বায়তুল কারীমে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি এই তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন।
বক্তব্যের সূচনায় জামিয়া মহাপরিচালক বলেন, দ্বীনি শিক্ষালাভের সুযোগ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এক মহামূল্যবান নিয়ামত। এ নিয়ামতের যথার্থ কদর করা, ইলমের প্রতি আন্তরিকতা বজায় রাখা এবং সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করা প্রত্যেক ত্বলিবে ইলমের অপরিহার্য দায়িত্ব।
জিলক্বাদা মাস উপলক্ষে জামিয়ার প্রচলিত ‘খানা জারি’ কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি মূলত যাকাত, ফিতরা ও সদকার অর্থে পরিচালিত আর্থিক অসচ্ছল তুলাবাদের জন্য একটি সহায়তা ব্যবস্থা, যা নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়।
তিনি জানান, বার্ষিক পরীক্ষায় নির্ধারিত গড় নম্বর অর্জনকারী শিক্ষার্থীরাই এ সুবিধার জন্য বিবেচিত হয়। পাশাপাশি দারুল উলূম দেওবন্দ-এর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে থাকে।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন— “মাদ্রাসার খানা যেহেতু যাকাত ও সদকার অর্থে পরিচালিত, তাই যাদের পরিবার সচ্ছল এবং অভিভাবক সহজেই ব্যয় বহনে সক্ষম, তাদের জন্য এ খানা গ্রহণ করা জায়েয নয়; এটি কেবল প্রকৃত অভাবগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত।”
হালাল আহারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের জীবনে খাদ্যের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্য অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, ইলমে বরকত আনে এবং আমলে দৃঢ়তা সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, হারাম ও শুবহাযুক্ত খাদ্য আধ্যাত্মিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করে এবং জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ প্রসঙ্গে তিনি সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদীসের মর্মার্থ উল্লেখ করে বলেন, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে বারবার দোয়া করতে থাকে, “হে আমার রব! হে আমার রব!” অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম এবং পরিধান হারাম; সে হারাম দ্বারা লালিত-পালিত—এ অবস্থায় তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?
তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই হাদীস দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, হারাম খাদ্য কেবল বাহ্যিক জীবনে নয়; বরং বান্দার ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্যতার পথেও বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। অতএব, একজন ত্বলিবে ইলমের জন্য হালাল-হারামের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য; কেননা পবিত্র আহারই ইলমের নূর, আমলের ইখলাস এবং দোয়ার কবুলিয়াতের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।
তাকওয়া ও হালাল লোকমার বরকত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.) একটি ঈর্ষণীয় দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেন, দারুল উলূম দেওবন্দের প্রখ্যাত উস্তায হযরত মাওলানা মুফতি ওসমান সাহেব (দা.বা.)এর পরিবারের সাত ভাই-ই ইলম ও আমলের ময়দানে জগদ্বিখ্যাত আলেম এবং প্রথম সারির দ্বীনি দাঈ। তাঁদের এই সৌভাগ্যের মূলে ছিল তাঁদের পিতার অসামান্য পরহেযগারী। ওস্তাদদের মুখে শুনেছি, তাঁদের পিতা সাধারণ এক সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। ভারতে প্রতি রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে, কিন্তু তিনি সেই ছুটির দিনের বেতন গ্রহণ করতেন না। তাঁর যুক্তি ছিল— ‘যেহেতু এদিন আমি কোনো কাজ করিনি, তাই এর পারিশ্রমিক নেওয়া আমার জন্য সমীচীন হবে না।’
শরীয়তের দৃষ্টিতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের বেতন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেবল উচ্চমানের তাকওয়ার তাগিদে তা পরিহার করতেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর এই সূক্ষ্ম আমানতদারি ও লোকমার পবিত্রতার বদৌলতেই আজ তাঁর পরিবার থেকে বিশ্ববরেণ্য আলেম ও দ্বীনের দাঈ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়তে পারেন-
- মুসলিম উম্মাহর সংকটকাল: ঐক্য ও ত্যাগের শক্তিই উত্তরণের পথ
- ইতিহাসের পাঠ আত্মস্থ করতে পারলে সঠিক পথনির্ধারণ সহজ হয়
- বাজার আর বইয়ের দোকানে সমাজের আয়না
- প্রয়োজন এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থার
- সেক্যুলার চিন্তা যেভাবে আমাদের দ্বীনি মা-বোনদের আক্রান্ত করছে
তিনি বলেন, এ ধরনের উচ্চমানের তাকওয়া ও আত্মসংযমই একটি পরিবারকে ইলম ও দ্বীনের খিদমতে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে।
বক্তব্যে আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.) তিনটি বিষয়কে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেন, যা একজন ত্বলিবে ইলমকে উচ্চ মর্যাদা অর্জন থেকে বঞ্চিত করে। যথা-
১. শুবহাযুক্ত খাদ্য: হালাল-হারামের মিশ্রণযুক্ত বা সন্দেহপূর্ণ খাদ্য আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্তরায়।
২. অযোগ্য সঙ্গ: শৃঙ্খলাবিরোধী, পড়াশোনায় অমনোযোগী এবং আদর্শচ্যুত সঙ্গীর প্রভাব ব্যক্তিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৩. গুনাহে লিপ্ততা: গুনাহ মানুষের নেক আমলের প্রভাবকে নষ্ট করে এবং তাকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
ত্বলাবাগণ আসাতিযায়ে কেরামের নিকট এক মূল্যবান আমানত হিসেবে অভিহিত করে আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.) বলেন, একজন ত্বালিবে ইলম কেবল নিজের নয়; বরং উস্তাদ, প্রতিষ্ঠান এবং সমগ্র উম্মাহর প্রত্যাশার ধারক। এজন্যই আসাতিযায়ে কেরাম তাদের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে নিয়ম-শৃঙ্খলা আরোপ করেন এবং সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করেন। এ শৃঙ্খলা কোনো বাধা নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীর ইলমী, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ অর্জনের জন্য অপরিহার্য মাধ্যম।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বর্তমান সময়ে অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার ত্বলাবায়ে কেরামের জন্য এক মারাত্মক ফিতনায় পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, দৃষ্টির গুনাহ সংঘটিত হয় এবং ধীরে ধীরে ইলমের প্রতি মনোযোগ ক্ষীণ হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এটি আত্মিক পবিত্রতা বিনষ্ট করে এবং চরিত্র গঠনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।
এ প্রসঙ্গে তিনি সহীহ বুখারী-এর একটি হাদীসের মর্মার্থ স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—মানুষের জীবনে এমন দুটি নিয়ামত রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয়, যথা- সুস্থতা ও অবসর সময়।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, একজন ত্বলিবে ইলমের প্রকৃত পুঁজি হলো তার সময়। এই সময় যদি মোবাইলের অপব্যবহারে বিনষ্ট হয়, তবে তা কেবল দুনিয়াবি ক্ষতিই নয়; বরং আখিরাতের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অতএব, তিনি তুলাবাদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেন, মোবাইল ব্যবহারে কঠোর সংযম অবলম্বন করতে হবে, স্মার্টফোন একেবারেই পরিহার করতে হবে এবং বাটন ফোনেরও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে ইলম অর্জন, ইবাদত, যিকির-আযকার ও আত্মশুদ্ধির কাজে নিয়োজিত করতে হবে। তিনি বলেন, যে তালিবে ইলম নিজের সময়ের হিফাযত করতে পারে, সে-ই প্রকৃত অর্থে সফলতা ও কামিয়াবি অর্জন করতে সক্ষম হয়।
বক্তব্যের শেষাংশে নামাযের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় আল্লামা মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.) বলেন—“নামাযের সময় কোনো তালিবে ইলমকে মসজিদের বাইরে দেখা যাওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয়। মনে রাখবেন, যার নামায ঠিক, তার সব কিছুই ঠিক।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, নামায কেবল একটি ইবাদত নয়; বরং একজন মুমিনের ঈমান, চরিত্র ও জীবনের সামগ্রিক শৃঙ্খলার মূলভিত্তি। যে ব্যক্তি নামাযের প্রতি যত্নবান, তার জীবনের অন্যান্য দিকও স্বাভাবিকভাবেই সুশৃঙ্খল ও পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, নামাযে অবহেলা মানুষের অন্তরে গাফলত সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে তাকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনের দিকে ঠেলে দেয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি সুনানে তিরমিযী-এর একটি হাদীসের মর্মার্থ স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে নামাযের; তা সঠিক হলে তার অন্যান্য আমলও গ্রহণযোগ্য হবে, আর তা নষ্ট হলে অন্যান্য আমলও নষ্ট হয়ে যাবে।
তিনি তুলাবাদের প্রতি জোরালোভাবে আহ্বান জানান—জামাআতের সাথে নামায আদায়ের প্রতি অবিচল পাবন্দি বজায় রাখতে হবে, আযানের সাথে সাথে মসজিদে উপস্থিত হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং নামাযকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একজন তালিবে ইলমের প্রকৃত পরিচয় তার নামাযের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। তাই এমন কোনো অবস্থা যেন না হয় যে, নামাযের সময় মানুষ তাকে মসজিদের বাইরে দেখে প্রশ্ন তোলে। বরং তার জীবন এমন হওয়া উচিত, যাতে নামাযের প্রতি তার দৃঢ়তা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে পরিণত হয়।
তিনি তুলাবাগণকে লক্ষ্য করে বলেন, দিনের সূচনা ও সমাপ্তি যেন কুরআনের তিলাওয়াতের মাধ্যমে হয়। সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত হৃদয়কে প্রশান্ত করে, ঈমানকে সতেজ রাখে এবং ইলমে বরকত আনে।
পাশাপাশি তিনি সর্বাবস্থায় সুন্নাহর পাবন্দির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, একজন তালিবে ইলমের জীবনে সুন্নাহর অনুসরণ কেবল একটি আমল নয়; বরং তার পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। আচার-আচরণ, ইবাদত, লেনদেন ও দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নাহকে অনুসরণ করাই একজন প্রকৃত আলেম হওয়ার পূর্বশর্ত।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নামায, কুরআন তিলাওয়াত এবং সুন্নাহর পাবন্দি—এই তিনটি বিষয় যদি একজন তালিবে ইলমের জীবনে সুসংহতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তার ইলম হবে উপকারী, আমল হবে গ্রহণযোগ্য এবং জীবন হবে বরকতময় ও সফল।
পরিশেষে প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মুফতি খলীল আহমদ কাসেমী (দা.বা.) উপস্থিত তুলাবাদের নিকট নিজের সুস্থতা ও আফিয়াতের জন্য আন্তরিক দোয়া কামনা করেন।
তিনি তুলাবাদের উদ্দেশ্যে হৃদয়গ্রাহী আহ্বান জানিয়ে বলেন—হালাল আহার, তাকওয়া, শৃঙ্খলাবোধ, নামাযের প্রতি অবিচল পাবন্দি এবং সুন্নাহভিত্তিক জীবন পরিচালনার মাধ্যমেই একজন তালিবে ইলম প্রকৃত অর্থে গড়ে ওঠে। ইলমের সঙ্গে আমলের সমন্বয়, চরিত্রের পবিত্রতা এবং সুন্নাহসম্মত জীবনযাপন ছাড়া একজন আলেমের মর্যাদা পূর্ণতা লাভ করে না।
তিনি আরও বলেন, তুলাবায়ে কেরামের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন দ্বীনের খিদমতের জন্য প্রস্তুত হয় এবং তাদের জীবন এমনভাবে গঠিত হয়, যাতে তারা সমাজে আদর্শ, আমানতদার ও দায়িত্বশীল আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
বক্তব্যের সমাপ্তিতে তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট তুলাবাদের ইলম, আমল ও জীবনে বরকত কামনা করেন এবং তাদেরকে দীনের পথে অবিচল থাকার জন্য দোয়া করেন।
সম্পাদনায়: মাওলানা মুনির আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম
সম্পাদক- উম্মাহ২৪ডটকম।
উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ







