Home ফিকহ ও মাসায়েল সাদক্বায়ে ফিতর ও যাকাতের বিস্তারিত বিবরণ ও মাসায়েল

সাদক্বায়ে ফিতর ও যাকাতের বিস্তারিত বিবরণ ও মাসায়েল

।। মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস ।।

সদকায়ে ফিতরের বিবরণ ও মাসআলা

‘ফিতর’ শব্দের অর্থ রোযা খোলা বা রোযা ত্যাগ করা। আল্লাহ্ তাআলা স্বীয় বান্দাদের উপর একটি সাদকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা রমযান শরীফ শেষ হওয়ার পর রোযা খোলার (অর্থাৎ রোযা শেষ হওয়ার) খুশী এবং শুকরিয়া হিসেবে আদায় করতে হয়। একে সাদকায়ে ফিতর বলা হয় এবং রোযা খোলার খুশী পালনের দিন হওয়ার কারণেই রমযান শেষের ঈদকে ঈদুল ফিতর বলা হয়।

হযরত ইব্নে আব্বাস (রাযি.) বলেন, রোযাকে অশ্লীল এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে পাকপবিত্র করার জন্য এবং দুঃস্থ-অসহায়-গরীবদের জীবিকা হিসেবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকায়ে ফিতরকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। (আবুদাঊদ, মিশকাত)।

ফিতরা দেওয়ার উপকারিতা হল, এতে রোযা পাকপবিত্র হয়ে আল্লাহ্ তাআলার নিকট কবুল হওয়ার উপযুক্ত হয়। ফিতরা প্রদান করা দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য অর্জন, কবরের আযাব ও মৃত্যুর কষ্ট হতে মুক্তির উপায়ও বটে। (তাহ্তাভী-৩৯৫ পৃঃ)।

ফিতরা দেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব নয়, বরং যে মুসলমান এই পরিমাণ সম্পদের মালিক যে, তার উপর যাকাত ফরয অথবা যাকাত ফরয নয় কিন্তু প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের অতিরিক্ত এ পরিমাণ মূল্যের সম্পদ ও আসবাবপত্র আছে, যে মূল্যের উপর যাকাত ফরয হতে পারে, তাহলে ঐ ব্যক্তির উপর ঈদের দিন এই ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব। চাই এটা ব্যবসার মাল হোক বা না হোক, স্বর্ণ-রৌপ্য হোক বা না হোক, চাই বছর পূর্ণ হোক বা না হোক। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী)।

আরও পড়তে পারেন-

সফল জীবন ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার সহজ উপায়

অমুসলিমদের সাথে ইসলামের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি

মার্কিন গবেষকদের চোখে মুসলমানদের নামাজ

চিন্তার ইতিহাসে সেক্যুলারিজমের জন্ম কীভাবে হয়েছিলো?

মাহে রমযানের ফযীলত এবং বিধি-বিধান ও পূর্ণাঙ্গ মাসআলা

কোন ব্যক্তির কাছে যদি ব্যবহারের কাপড় ছাড়া অতিরিক্ত কাপড় থাকে বা দৈনন্দিন প্রয়োজনের অধিক পিতল, তামা, চিনামাটি ইত্যাদি পাত্র অথবা অতিরিক্ত কোন ঘর খালি পড়ে থাকে অথবা এ ধরনের অন্য যে কোন প্রকারের আসবাবপত্র মৌলিক প্রয়োজনাতিরিক্ত থাকে যেগুলোর মূল্য যাকাতের নিসাবের সমান হয় অথবা বেশী হয়, তাহলে যদিও ঐ ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয নয়, কিন্তু ফিতরা ওয়াজিব। (তাহ্তাবী-৩৯৫, হিন্দিয়া)।

প্রত্যেক সাহেবে নিসাব ব্যক্তির উপর তার নিজের পক্ষ থেকে এবং তার নাবালক দরিদ্র সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব কিন্তু নাবালকের যদি নিসাব পরিমাণ নিজস্ব সম্পদ থাকে, তাহলে তার ফিতরা তার সম্পদ থেকে আদায় করতে হবে। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী-৩৯৪ পৃঃ)।

ঈদের দিন সুব্হে সাদিক হওয়ার সাথে সাথেই এই সাদকা ওয়াজিব হয়। অতএব যে ব্যক্তি সুব্হে সাদিকের পূর্বে ইন্তিকাল করে তার সম্পদ থেকে তার জন্য সাদকায়ে ফিতর দিতে হবে না এবং যে সন্তান সুব্হে সাদিকের পূর্বে জন্ম নিয়েছে তার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে এবং যদি ঈদের দিন সুব্হে সাদিকের পরে কেউ মুসলমান হয় অথবা কোন বাচ্চা জন্মগ্রহণ করে, তাহলে তার উপর সাদকায়ে ফিতর ওয়াজিব নয়। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী- ৩৯৫ পৃঃ)।

ঈদের দিন নামাযে যাওয়ার পূর্বে ফিতরা আদায় করে দেওয়া উত্তম। যদি নামাযের পরে অথবা ঈদের দিনের পূর্বেই আদায় করে দেয়, তাহলেও অসুবিধা নেই। বস্তুতঃ যাদের উপর ফিতরা ওয়াজিব, যতক্ষণ পর্যন্ত আদায় না করবে ওয়াজিব থেকে যাবে, মাফ হবে না। যদিও কোন কারণবশতঃ রোযা না রাখে। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী, হিন্দিয়্যা)।

ফিতরার পরিমাণ

সাদকায়ে ফিতর প্রত্যেক প্রকারের শস্য বা তার মূল্য দিয়ে দেওয়া জায়েয। যদি গম বা গমের আটা বা ছাতু দেয়, তবে প্রত্যেকের ফিতরা বাবদ পৌনে দু’সের করে দিতে হবে। বরং সাবধানতা হিসেবে দু’সের দেওয়াই উত্তম। আর যদি যব (ভূট্টা জাতীয় শস্য বিশেষ) বা যবের আটা বা ছাতু দেয়, তবে সাড়ে তিন সের দিতে হবে। যদি যব এবং গম ছাড়া অন্য কোন শস্য দ্বারা ফিতরা দেয়, যেমন- ধান, চাল, ডাল ইত্যাদি, তবে পৌনে দু’সের গমের মূল্য অথবা সাড়ে তিন সের যবের মূল্যে যে পরিমাণ সেসব শস্য পাওয়া যায়, তা-ই দিতে হবে। আর যদি মূল্য দিয়ে দেয়, তবে পৌনে দু’সের গম বা সাড়ে তিন সের যবের যে মূল্য আসে তাই দিতে হবে। (মারাক্বিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী, হিন্দিয়্যা, শামী)।

যেসব লোকদেরকে যাকাত দেওয়া জায়েয তাদেরকে সাদকায়ে ফিতর দেওয়াও জায়েয এবং যাদেরকে যাকাত দেওয়া জায়েয নয় তাদেরকে সাদকায়ে ফিতর দেওয়াও নাজায়েয। (তাহ্তাবী- ৩৯৩ পৃঃ, শামী)।

ইমাম ও মুয়ায্যিনকে নিয়োগ দানের সময় যদি আযান ও ইমামতির বেতনের মধ্যে ফিতরা দেওয়ারও শর্ত করা হয় যে, প্রতি বছর সাদকায়ে ফিত্রাও দেওয়া হবে, তবে এরূপ শর্ত করে তাদেরকে ফিতরা দিলে আদায় হবে না। যদি এরূপ করা হয়ে থাকে, তাহলে পুনরায় ফিতরা আদায় করতে হবে। তবে কোন প্রকার শর্ত না করে যদি গরীব হওয়ার কারণে তাদেরকে দেওয়া হয়, তাহলে কোন অসুবিধা নেই। কোথাও যদি শর্ত করা না হলেও এরূপ প্রচলিত থাকে যে, এখানে ইমাম-মুয়ায্যিনকে বেতনের বদলায় ফিতরা দেওয়া হয়, তাহলে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়ার সময় কথাটা পরিস্কার করে নিতে হবে যে, তাদেরকে বেতন হিসেবে সাদকায়ে ফিতর দেওয়া হবে না। যাকাতের ব্যাপারেও একই হুকুম। (যাওয়ালুচ্ছিনাহ)।

একজনের ফিতরা একই ব্যক্তিকে অথবা অল্প অল্প করে কয়েক ব্যক্তিকে দেওয়া জায়েয। অনুরূপভাবে কয়েকজনের ফিতরা একই ব্যক্তিকে দেওয়াও জায়েয। (দুররে মুখতার, রদ্দুল মুহ্তার-২/১২৫)।

গম, যব ইত্যাদির বাজার দর বা সরকারী দর হিসেবে দেওয়াও জায়েয। অবশ্য যে হিসেবে মূল্য বেশী হয় সে হিসেবে দেওয়াই উত্তম এবং পরহেযগারী। (মুঈনুল মুফতী ওয়াচ্ছাইল)।

ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম ‘যাকাত’

ইসলাম হল একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল কর্মকাণ্ডে সঠিক দিক নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক সুবিচার এবং মানব সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার যেমন ব্যবস্থা করেছে, তেমনি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারসাম্যমূলক অর্থনীতি উপহার দিয়েছে।

সাহেবে নেসাব তথা যাকাতের হুকুম প্রযোজ্য হওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও যে যাকাত দিবে না সে আল্লাহ তায়ালার নিকট ভীষণভাবে গুণাহ্গার হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কিয়ামতের দিন তার কঠোর শাস্তি ও আযাব ভোগ করতে হবে।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হচ্ছে, যার নিকট সোনা-রূপা মওজুদ থাকা সত্ত্বেও সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তাকে আযাব দেয়ার জন্য সেসব সোনা রূপা দিয়ে পাত বানানো হবে এবং ঐ পাতগুলো দোযখের আগুনে দগ্ধ করে তার বুকে, পিঠে, পাঁজরে এবং কপালে দাগ দেয়া হবে। পাতগুলো একবার ঠান্ডা হয়ে গেলে পুনরায় উত্তপ্ত করে নেয়া হবে।

অন্য হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তায়ালা সম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করেনি (লোভের বসে মাটির নীচে, সিন্দুকের মধ্যে বা ব্যাংকে জমা করে রেখেছে), কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তায়ালার হুকুমে ঐ সম্পদকে অতি বিষাক্ত সাপ বানানো হবে এবং সে সাপ ঐ ব্যক্তির গলা পেঁচিয়ে ধরে উভয় গালে দংশন করবে এবং বলতে থাকবে, আমি তোমার টাকা, আমি তোমার সঞ্চিত ধন।

আল্লাহর ক্ষমা না পেলে ‘জাব্বার’ ‘কাহ্হার’ আল্লাহর আযাব সহ্য করার ক্ষমতা কার আছে? সামান্য লোভের বশীভূত হয়ে মানুষ যেন এমন পাপ কখনো না করে। হে মানুষ! আল্লাহ্রই দেয়া ধন-সম্পদ, আল্লাহর জন্য দান না করা যে কত বড় অন্যায়, তা কি কখনো ভেবে দেখেছ?

ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত তৃতীয় স্তম্ভ। ইসলামের অন্যান্য মূল স্তম্ভের মতই যাকাত ফরয। আভিধানিক অর্থে যাকাতের অর্থ হল, বৃদ্ধি, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধতা ইত্যাদি। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও বিশুদ্ধ হয় এবং মালের পবিত্রতা ও বরকত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ’র অসন্তুষ্টি ও গযব হতে সমাজ মুক্ত ও পবিত্র হয়, এ জন্য যাকাতকে যাকাত বলা হয়। অপরদিকে শরয়ী পরিভাষায় জীবন যাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন মিটানোর পর নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর কাল সঞ্চিত থাকলে, শরীয়ত নির্ধারিত পরিমাণ মোতাবেক অংশ শরীয়ত নির্ধারিত খাতে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া মালিকানা হস্তান্তরকে যাকাত বলে।

উপরে বর্ণিত কুরআন ও হাদীসের আলোকে জানা যায়, ইসলামের যাকাতের বিধান পালন করা অপরিহার্য। বিধান অনুযায়ী যাকাত প্রদান করলে যেমন মালের পবিত্রতা হাসিল হয় এবং সাওয়াব পাওয়া যায়, তেমনি এ বিধান অমান্য বা মালের যাকাত প্রদান না করলে পরকালে কঠোর ও ভীষণ শাস্তি ভোগ করতে হবে। তথাপি এক শ্রেণীর মুসলমান যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত থাকে বা যাকাত প্রদান করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। কেউ আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে সামান্য কিছু গরীব-দুঃখী মানুষকে যাকাত প্রদান করে থাকে। এটি যে লোক দেখানো বা সমাজের মানুষের কাছে দানবীর বা দাতা হিসেবে পরিচিতি লাভের আশায় করা হয়ে থাকে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। গচ্ছিত মালের শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যত টাকা যাকাত প্রদান করা দরকার তা তারা করে না। যদি সঠিক হিসেব-নিকেশ করে যাকাত প্রদান করা হয়, তবে সমাজের অনেক অসহায়, গরীব, মিসকীন উপকৃত হবে।

যাকাত সংক্রান্ত জরুরী মাসআলা

মাসআলাঃ যে ব্যক্তি সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা সাথে ৭ তোলা সোনা কিংবা তৎমূল্যের মালিক হয় এবং তার নিকট ঐ পরিমাণ মাল পূর্ণ এক বৎসরকাল স্থায়ী থাকে, তার উপর যাকাত ফরয হয় না, কিন্তু বেশী হলে যাকাত ফরয হবে। এ পরিমাণ মালকে ‘নিসাব’ বলে এবং যে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হয়, তাবে মালিকে নিসাব বা সাহেবে নিসাব বলা হয়।

মাসআলাঃ যদি কারো নিকট সাতে ৭ তোলা সোনা বা সাড়ে ৫২ তোলা রূপা ৪/৫ মাস থাকার পর তা থেকে কমে যায় এবং ২/৩ মাস কম থেকে আবার নিসাব পূর্ণ হয়ে যায়, তবে তার যাকাত দিতে হবে। মোটকথা, বৎসরের শুরু এবং শেষ দেখতে হবে, বৎসরের শুরুতে যদি মালিকে নিসাব হয় এবং বৎসরের শেষেও যদি মালিকে নিসাব হয়, মাঝখানে কিছু কম হয়ে গেলেও বৎসরের শেষে তার নিকট যত টাকা থাকবে, তত টাকার যাকাত দিতে হবে। অবশ্য বৎসরের মাঝখানে যদি তার সম্পূর্ণ মাল কোন কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তবে পূর্বের হিসাব বাদ দিয়ে পুনরায় যখন নিসাবের মালিক হবে, তখন হতে হিসেব ধরতে হবে, তখন হতেই বৎসর শুরু ধরা হবে।

মাসআলাঃ কারো নিকট ৮/৯ তোলা সোনা ছিল। কিন্তু বৎসর শেষ হওয়ার পূর্বেই তা তার হাতছাড়া হয়ে গেল বা হারিয়ে গেল বা দান করে ফেলল, এমতাবস্থায় তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না।

মাসআলাঃ সোনা এবং রূপা যে কোন অবস্থাতেই থাকুক না কেন, মাটির নীচে পোঁতা থাকুক, কারবারের মধ্যে থাকুক, গভর্ণমেন্টের জিন্মায় বা অন্য কারো নিকট কর্জ হিসাবে থাকুক, অলংকার আকারে তা ব্যবহারে থাকুক বা আজীবন বাক্সে রক্ষিত থাকুক, কাপড়ে, টুপিতে, তলোয়ারে, জুতোয় কারুকার্যরূপে থাকুক, সব অবস্থাতেই নিসাব পরিমাণ পূর্ণ হলে এবং এক বৎসরকাল মালিকের হাতে থাকলে, তাতে যাকাত ফরয হবে। অবশ্য যদি নিসাব পরিমাণ না হয়, বা পূর্ণ এক বৎসরকাল মালিকের নিকট না থাকে, তবে যাকাত ফরয হবে না। সোনা এবং রূপা ব্যতিরেকে অন্য কোন ধাতুতে তিজারত না করা পর্যন্ত যাকাত ফরয হবে না।

মাসআলাঃ সোনা এবং রূপা যদি খাঁটি না হয়ে অন্য কোন ধাতু মিশ্রিত থাকে, যেমন মদ্রা, যেওর বা অন্য কোন সামগ্রী আকারে থাকে, তবে দেখতে হবে যে, এর বেশীর ভাগ সোনা বা রূপা কিনা? যদি বেশীরভাগ সোনা বা রূপা হয়, তবে সম্পূর্ণটাই রূপা বা সোনা হিসেবে ধরে নিতে হবে এবং নিসাব পরিমান পূর্ণ হলে হিসেব করে তার যাকাত দিতে হবে। আর যদি সোনা বা রূপার ভাগ কম হয় এবং অন্য কোন ধাতু যথা রাং, দস্তা ইত্যাদি বেশী হয়, তবে তাতে শুধু নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত ওয়াজিব হবেনা। অবশ্য এ মাল দ্বারা তিজারত করলে তিজারত হিসেবে যাকাত দিতে হবে।

মাসআলাঃ যদি কিছু সোনা এবং কিছু রূপা থাকে, কিন্তু পৃথকভাবে সোনার নিসাবও পূর্ণ হয় না এবং রূপার নিসাবও পূর্ণ হয়না। তবে উভয়ের মূল্য যোগ করলে যদি নিসাব পরিমাণ অর্থাৎ সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা সাথে ৭ তোলা সোনার মূল্যের সমান হয়, তবে যাকাত ফরয হবে; নতুবা যাকাত ফরয হবে না। যদি উভয়টাই নিসাব পূর্ণ থাকে, তবে মূল্য ধরে যোগ করার আবশ্যকতা নেই।

যাকাতের মাসরাফ

মাসআলাঃ মালদার লোকের জন্য যাকাতের অর্থ গ্রহণ করা বা তাকে যাকাত দেয়া জায়েয নাই। (সে মালদার পুরুষ হোক বা স্ত্রীলোক, প্রাপ্তবয়স্ক হোক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক)।

মালদার দু’প্রকার। প্রথম প্রকার মালদার হচ্ছে, যার উপর যাকাত ওয়াযিব হয়। যেমন, যার নিকট সাড়ে ৫২ তোলা সোনা আছে, বা তৎমূল্যের পণ্যসামগ্রী আছে, তার উপর যাকাত, ফিতরা ও কুরবানী ওয়াজিব হবে। সে যাকাত খেতে পারবে না এবং তাকে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না।

দ্বিতীয় প্রকার মালদার হচ্ছে, যার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। যেমন, যার নিকট উপরোক্ত তিন প্রকার মাল নাই বটে, কিন্তু হাজতে আছলিয়া অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবন যাপনোপযোগী অবশ্যকীয় মাল-আসবাব, বাড়ী-ঘর ব্যতিরেকে উপরোক্ত মূল্যের অতিরিক্ত অন্য কোন মাল থাকে, তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়; কিন্তু ফিতরা ও কুরবানী ওয়াজিব। তার জন্য যাকাত-ফিত্রা, মান্নতের মাল, কাফ্ফারার মাল, জিযিয়া, কুরবানীর চামড়ার অর্থ ইত্যাদি সাদ্ক্বায়ে ওয়াজিবা খাওয়া জায়েয নয়।

মাসআলাঃ যার নিকট নিসাব পরিমাণ মাল নেই বরং অল্প মাল আছে কিংবা কিছুই নেই, এমনকি একদিনের খোরাকীও নেই, এমন লোককে গরীব বলে। তাদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয আছে, তাদের যাকাত গ্রহণ করাও জায়েয আছে। অর্থাৎ গরীব ঐ ব্যক্তি, যার নিকট কিছু ধন-সম্পদ আছে বটে, কিন্তু নিসাব পর্যন্ত পৌঁছেনি (যাকাতের নিসাবও নয়, ফিত্রা, কুরবানীর নিসাবও নয়), কিংবা যার নিকট কিছুই নেই, এমন কি একদিনের খোরাকীও নেই, এদেরকে যাকাত দেয়াও জায়েয আছে এবং তাদের যাকাত গ্রহণ করাও জায়েয আছে।

মাসআলাঃ বড় বড় ডেগ, বড় বড় বিছানাপত্র বা বড় বড় শামিয়ানা যা দৈনন্দিন কাজে লাগে না, বৎসরে দু’বৎসরে বিবাহ শাদী ইত্যাদির সময় কাজে লাগে, এসব জিনিসকে হাজতে আছলিয়ার মধ্যে গণ্য করা হয়না।

মাসআলাঃ বসত ঘর বা দালান, পরিধানের কাপড়, বাড়ীর চাকর, বড় গৃহস্থের আসবাবপত্র, আলেম ও তালিবে ইল্মের কিতাবাদী, এসবকে হাজাতে আছলিয়ার মধ্যে গণ্য করা হয়।

মাসআলাঃ যার পাঁচ/দশটি বাড়ী আছে, যেগুলোর ভাড়া দিয়ে সে জীবিকা নির্বাহ্ করে অথবা এক আধ খানা গ্রাম আছে, কিন্তু পরিবারবর্গের খরচ এত বেশী যে, তার আয়ের দ্বারা ব্যয় নির্বাহ হয়না। বরং অনেক কষ্টে জীবন যাপন করতে হয় এবং তার নিকট অন্য কোন জিনিসও যাকাত বা ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার মত নেই। এমন লোককে যাকাতের অর্থ দেয়া জায়েয আছে।

মাসআলাঃ মনে করুন কারো নিকট হাজার টাকা আছে কিন্তু হাজার টাকা বা তদাপেক্ষা বেশী ঋণও আছে। এরূপ লোককে যাকাত দেয়া জায়েয আছে। আর যদি যত টাকা জমা আছে, তার চেয়ে কম ঋণ হয় এবং ঋণ পরিশোধ করে দিলে মালিকে নিসাব না থাকে, তবে তাকেও যাকাত দেয়া জায়েয আছে। যদি ঋণ আদায় করার পর মালিকে নিসাব থাকে, তবে তাকে যাকাত দেয়া বা তার জন্য যাকাত খাওয়া জায়েয নয়।

মাসআলাঃ কেউ হয়ত বাড়ীতে খুব ধনী, কিন্তু বিদেশে এমন মুসীবতে পড়েছে যে, বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছাবার বা বাড়ী থেকে টাকা এনে খরচ চালাবার কোন উপায় নেই। এরূপ লোককে যাকাত দেয়া জায়েয আছে। এরূপ ধনী হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি সাময়িক অভাবে পড়ে, তাকে “ইব্নুস্ সাবীল” বলা হয়। ইব্নুস্ সাবীলকে যাকাত দেয়া জায়েয আছে।

মাসআলাঃ যাকাত অমুসলমানকে দেয়া জায়েয নাই। যাকাত, ওশর, ফিত্রা, মান্নত, কাফ্ফারা ইত্যাদি সাদ্ক্বায়ে ওয়াজিবার মাল মুসলমানকেই দিতে হবে। সাদ্ক্বায়ে নাফেলা অমুসলমানকে দেয়া জায়েয আছে।

মাসআলাঃ যাকাত ইত্যাদি সর্ব প্রকার সাদ্ক্বায়ে ওয়াযিবার হুকুম এই যে, কোন গরীবকে এরূপ মালের মালিক বানিয়ে দিতে হবে। মালিক না বানিয়ে যদি কেউ যাকাতের অর্থ দ্বারা মসজিদ বা মাদ্রাসার ঘর নির্মাণ করে বা এসবের বিছানাপত্র খরিদ করে, বা কোন মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনে খরচ করে, বা তার ঋণ পরিশোধ করে, তবে যাকাত আদায় হবে না।

মাসআলাঃ নিজের যাকাত (সর্ব প্রকার সাদক্বায়ে ওয়াজিবা) নিজের মা-বাপ, দাদা-দাদী, নানা-নানী, পরদাদা ইত্যাদি অর্থাৎ যাদের দ্বারা তার জন্ম হয়েছে, তাদেরকে দেয়া জায়েয নাই। অনুরূপভাবে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাত্নী এবং তাদের বংশধর যারা তার ঔরসে জন্মলাভ করেছে, তাদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয নাই। স্বামী নিজের স্ত্রীকে বা স্ত্রী নিজের স্বামীকেও যাকাত দিতে পারবেনা।

মাসআলাঃ এতদ্ব্যতীত চাচা, মামা, খালা, ভাই, ভগ্নী, ফুফু, ভাগীনেয়, ভাতিজা, সৎমা, শ্বাশুড়ী প্রমূখ আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দেয়া জায়েয আছে।

মাসআলাঃ অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের পিতা যদি মালদার হয়, তবে ঐ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে যাকাত দেয়া জায়েয নাই। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি নিজে মালদার না হয়, তবে শুধু তার পিতা মালদার হওয়ায় তাকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে।

মাসআলাঃ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পিতা মালদার নয়, কিন্তু মা’ মালদার, তবে তাদের ঐ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে।

মাসআলাঃ সায়্যিদকে (মা ফাতেমা (রাযি.)এর বংশধরগণকে সায়্যিদ বলা হয়), হযরত আলী (রাযি.)এর বংশধরগণকে, এরূপভাবে যারা হযরত আব্বাস (রাযি.), হযরত জাফর (রাযি.), হযরত আক্বীল, হযরত হারেস ইব্নে আব্দুল মুত্তালিব প্রমুখগণের বংশধর, তাঁদেরকে যাকাত এবং ওয়াজিব সাদকা দেয়া জায়েয নেই। তাঁদেরকে মান্নত, কাফ্ফারা, সাদ্ক্বায়ে ফিত্রাসহ অন্যান্য দান-খয়রাত করাও নাজায়েয।

মাসআলাঃ বাড়ীর গরীব চাকর বা চাকরাণীকে যাকাত দেয়া জায়েয আছে কিন্তু বেতনের মধ্যে গণ্য করে দিলে যাকাত আদায় হবে না। অবশ্য ধার্যকৃত বেতন দেয়ার পর বখ্শিশ স্বরূপ যদি দেয় এবং মনে মনে যাকাতের নিয়্যাত রাখে, তাতে যাকাত আদায় হয়ে যাবে।

মাসআলাঃ দুধ মা’ বা দুধ ছেলেকে যাকাত দেয়া জায়েয আছে।

মাসআলাঃ কোন মেয়েলোকের এক হাজার টাকা মুহর আছে, কিন্তু তার স্বামী গরবি, মুহরের টাকা আদায়ের মত সামর্থ নেই, অথবা আছে কিন্তু দাবী করা সত্ত্বেও দেয় না, অথবা মেয়েলোকটি তার সম্পূর্ণ মুহর মাফ করে দিয়েছে। (এতদ্ব্যতীত অলংকারপাতি বা অন্য কোন দিক দিয়েও সে মালদান নয়), এরূপ মেয়েলোককে যাকাত দেয়া জায়েু আছে। অবশ্য যদি স্বামী ধনী হয় এবং মুহরের টাকা দাবী করলে দিতে প্রস্তুত থাকে, তবে ঐ মেয়েলোককে যাকাত দেয়া জায়েয নাই।

মাসআলাঃ যাকাততের মুস্তাহেক (যাকাত গ্রহণের যোগ্য) মনে করে যদি কোন অপরিচিত লোককে যাকাত দেয়ার পর জানা যায় যে, সে যাকাতের মুস্তাহেক নয়, সায়্যিদ বা সম্পদশালী, কিংবা অন্ধকার রাত্রে যাকাত দেয়ার পর জানতে পারল যে, সে তার মা, মেয়ে বা নিজের এমন কোন আত্মীয়, যাকে যাকাত দেয়া জায়েয নয়, তবে তার যাকাত আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু যে নিয়েছে তার জন্য ঐ অর্থ হালাল হবে না, এরূপ সে যদি জানতে পারে যে, ইহা যাকাতের অর্থ, তবে তা ফেরত দেয়া তার উপর ওয়াযিব।

অনুরূপ অপরচিতি লোককে দেয়ার পর যদি জানা যায় যে, যাকে দেয়া হয়েছে সে মুসলমান নয়, কাফির, তবে যাকাত আদায় হবে না। পুণরায় দিতে হবে।

মাসআলাঃ যাদি কারো উপর সম্পদশালী হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ জন্মে, তবে সন্দেহের পাত্রকে যাকাত দিবে না। সত্যিকার অভাবগ্রস্ত কিনা তা জেনে তারপর যাকাত দিবে। সত্যিই অভাবগ্রস্ত কিনা, তা না জেনে যদি কোন সন্দেহজনক ব্যক্তিকে যাকাত দেয়া হয় এবং অন্তরে সাক্ষী দেয় যে, সে প্রকৃতই অভাবগ্রস্ত, তবে যাকাত আদায় হয়ে যাবে।

আর যদি অন্তরে সাক্ষী দেয় যে, সে মালদার, তবে যাকাত আদায় হবে না; পুণরায় যাকাত দিতে হবে। আর যদি যাকাত দেয়ার পর জানা যায় যে, বাস্তবিক পক্ষে সে গরীব ছিল, তবে যাকাত আদায় হয়ে যাবে

মাসআলাঃ যাকাত দেয়ার সময় আত্মীয়-স্বজনের কথা মনে করবে এবং তাদেরকে যাকাত দিবে। কিন্তু নিজের আত্মীয়-স্বজনকে দেয়ার সময় যাকাতের কথা উল্লেখ করবে না। করণ এতে হয়ত তারা লজ্জা পেতে পারে। হাদীস শরীফে আছে, নিজের আত্মীয়কে খয়রাত দিলে দ্বিগুণ সাওয়াব পাওয়া যায়। প্রথমতঃ খয়রাতের সাওয়াব, দ্বিতীয়তঃ আত্মীয়ের উপকার ও অভাব মোচন করার সাওয়াব। নিজের আত্মীয়দের অভাব মোচনের পর যা বাকী থাকবে, তা অন্যান্য লোককে দেবে।

সম্পদ সাহেবে নেসাব পূর্ণ হওয়ার পর একজন যাকাতদাতা সহজেই নিম্নোক্ত চার্ট অনুসরণ করে যাকাতের পরিমাণ বের করতে পারবেন-
১,০০,০০০/= এক লক্ষ টাকায় ২,৫০০/= টাকা।
৫০,০০০/= পঞ্চাশ হাজার টাকায় ১,২৫০/= টাকা।
১০,০০০/= দশ হাজার টাকায় ২৫০/= টাকা।
১,০০০/= এক হাজার টাকায় ২৫/= টাকা।
৯০০/= নয়শত টাকায় ২২.৫০ টাকা।
৮০০/= আটশত টাকায় ২০/= টাকা।
৭০০/= সাতশত টাকায় ১৭.৫০ টাকা।
৬০০/= ছয়শত টাকায় ১৫/= টাকা।
৫০০/= পাঁচশত টাকায় ১২.৫০ টাকা।
৪০০/= চারশত টাকায় ১০/= টাকা।
৩০০/= তিনশত টাকায় ৭/= টাকা।
২০০/= দুইশত টাকায় ৫/= টাকা।
১০০/= একশত টাকায় ২.৫০ টাকা।

উপরোক্ত যাকাতের হিসাবানুযায়ী আপনার নিকট সাহেবে নেসাবের পর যত লক্ষ টাকা, যত হাজার টাকা, যত শত টাকা বা যত টাকা-পয়সা থাকবে, আপনি এর যাকাতের পরিমাণ বের করতে হিমশিম খেতে হবে না।

প্রিয় মুসলমান ভাই-বোনেরা! কৃপণতা করবেন না। সম্পদ আপনার একার নয়। কূপণ ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার শত্রু। দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর প্রিয়পাত্র। সুতরাং আল্লাহ’র প্রিয়পাত্র হতে ইসলামের এই অন্যতম স্তম্ভ তথা যাকাতের বিধান যথাযথভাবে পালন করতে যত্নবান হোন।

লেখক: প্রিন্সিপাল- জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলূম নলজুরী, সিলেট, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ডটকম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেসার্স আব্দুল মজিদ এন্ড সন্স, তামাবিল, সিলেট।

উম্মাহ২৪ডটকম:এসএএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

মুসলিম-বিদ্বেষের কারণে বিদেশে চাকরি হারাচ্ছে ভারতীয়রা